দিনের শেষে (২০০৩)

দিনের শেষে - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. জহির লাজুক মুখে বলল

জহির লাজুক মুখে বলল, স্যার আজ একটু সকাল-সকাল বাড়ি যাব, একটা জরুরি কাজ। বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে গেল, গলার স্বর অন্যরকম শোনাল। কথার মাঝখানে খুখুক করে কয়েকবার কাশল, নাকের ডগা ঈষৎ লালচে হয়ে গেল। হেডক্যাশিয়ার করিম সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন, ব্যাপারটা কি? জহির মাথা নিচু করে।...

০২. ভাদ্রমাসের ঝাঁ-ঝাঁ দুপুরগুলো

ভাদ্রমাসের ঝাঁ-ঝাঁ দুপুরগুলো এম্নিতেই ছমছমে লাগে। আজ যেন আরো বেশি লাগছে। তরু বসার ঘর থেকে ভেতরের বারান্দায় এল, সেখান থেকে শোবার ঘরে ঢুকল। তরুর মা মেঝেতে একটা বালিশ পেতে ঘুমুচ্ছেন। তার মাথার উপর সা-সা করে ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের বাতাসে তাঁর মাথার চুল উড়ছে। এই দৃশ্যটা তরু...

০৩. সারাদিন ঝাঁ-ঝাঁ রোদ ছিল

সারাদিন ঝাঁ-ঝাঁ রোদ ছিল। অথচ সন্ধ্যা মেলাবার আগেই মেঘ জমে আকাশ কালো হয়ে গেল। বরকত সাহেব জহিরকে নিয়ে রাস্তায় নামতেই ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল। বরকত সাহেব বললেন, বৃষ্টি হলে বাঁচা যায়, কি বল জহির? জহির চুপ করে রইল। বরকত সাহেব বললেন, অফিসে আমার মাথার ওপরের ফ্যানটা ছিল...

০৪. করিম সাহেব অবাক হয়ে বললেন

করিম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কিসের কার্ড জহির? জহির কোনো শব্দ করল না। মাথা নিচু করে ফেলল। নিজের বিয়ের কার্ডের কথা মুখ ফুটে বলা যায় না, লজ্জা লাগে। করিম সাহেব খাম খুলতে খুলতে বললেন, বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে গেল? জ্বি স্যার। ঐ মেয়ে? মালিবাগ না কোথায় যেন থাকে বলছিলে? যাত্রাবাড়িতে...

০৫. আজকের সকালটা এত সুন্দর

আজকের সকালটা এত সুন্দর কেন? ঘুম ভাঙতেই আসমানীর চোখ পড়ল আকাশেজানালার ফাঁক গলে ছোট্ট একটা আকাশ। কিন্তু এ আকাশ ছোট্ট না। বিশাল আকাশ। যে কোনো বিশাল কিছুর সামনে দাঁড়ালে মন কেমন করতে থাকে। শুধু আকাশের সামনে মন কেমন করে না, কারণ আকাশ দেখতে-দেখতে অভ্যেস হয়ে গেছে। তবে আজ...

০৬. বারান্দায় কে যেন দাঁড়িয়ে

বারান্দায় কে যেন দাঁড়িয়ে। লম্বা একজন কেউ এমনভাবে দাঁড়িয়ে যেন সে নিজেকে লুকাতে চাইছে। আগে বারান্দায় সারারাত পচিশ ওয়াটের একটা বাতি জ্বলতো—এখন জ্বলে না। সুইচে কি যেন গণ্ডগোল হয়েছে। রাত প্রায় আটটা। দুটা টিউশানি শেষ করে ফিরতে-ফিরতে রাত সাড়ে নটার মতো বাজে, ভাগ্যিস আজ একটা...

০৭. করিম সাহেব জহিরকে ডেকে পাঠিয়েছেন

করিম সাহেব জহিরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। বেয়ারা দিয়ে স্লিপ পাঠিয়েছেন, তুমি দেখা কর। জরুরি। জহির স্লিপ পেয়েই সঙ্গে-সঙ্গে আসতে পারল না। তাঁকে যেতে হল সেজো সাহেবের কাছে। এই অফিসের তিন সাহেব বড়, মেঝো এবং সেজো। সবচে মেজাজী সাহেব হচ্ছেন সেজো জন। অদ্ভুত কোনো কারণে তাঁর ক্ষমতাও মনে...

০৮. একটা সূক্ষ্ম কোন পরিবর্তন ঘটে গেছে

একটা সূক্ষ্ম কোন পরিবর্তন ঘটে গেছে। কেউ কিছু বলছে না কিন্তু বোঝা যাচ্ছে। সব বলতে হয় না। না বললেও অনেক কিছু বোঝা যায়। তা ছাড়া আসমানী বোকা মেয়ে নয়। সে বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে এবং তাকে নিয়েই হয়েছে। সেই কিছুটা কি? তাকে কেউ বলছে না। কখনো বলে না। সে কি নিজেই কাউকে...

০৯. বিয়েটা ভেঙ্গে গেল

আশ্চর্যের ব্যাপার, বিয়েটা ভেঙ্গে গেল। বিয়ের ঠিক তিন দিন আগে ফর্সা লম্বা লাল টাই পরা একটা ছেলে প্রচণ্ড শব্দে আসমানীদের ঘরের কড়া নাড়তে লাগল। যেন সে অসম্ভব ব্যস্ত। যেন তার হাতে এক সেকেন্ড সময় নেই। দরজা খুলল আসমানী। লাল টাই পরা মানুষটি হাসিমুখে বলল, আসমান বল তো আমি কে?...

১০. মনটাকে শক্ত করুন

রাত প্ৰায় দশটা। জহির রান্না বসিয়েছে। তেলটা খারাপ। প্রচুর ধোঁয়া হচ্ছে। জহিরকে বার-বার চোখ মুছতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে বুঝি খুব কাঁদছে। আসলেই তাই। ধোঁয়া ছাড়াই জহিরের চোখ বারবার ভিজে উঠছে। অরুর শরীরটা খুব খারাপ। আজ তৃতীয় দিন। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিল। ক্রমাগত ব্লিডিং হচ্ছে।...