জনম জনম

০১. তিথি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে

তিথি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কেন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্যি আঠার-উনিশ বছরের মেয়েরা বিনা কারণেই আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তিথির বয়স একুশ। সেই হিসেবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার একটা অর্থ করা যেতে পারে। এই বয়সের মেয়েরা অন্যের মাঝে নিজের ছায়া দেখতে ভালবাসে। যে...

০২. হারিকেন জ্বালাতে গিয়ে

হারিকেন জ্বালাতে গিয়ে মিনু দেখলেন তেল নেই। অথচ কাল হারিকেনে তেল ভরার পরও বোতলে চার আঙুলের মত অবশিষ্ট ছিল। গেল কোথায়? টুকু ফেলে দিয়েছে? সকালবেলা কেরোসিনের বোতল নিয়ে কি যেন করছিল; মিনুর বিরক্তির সীমা রইল না। টুকু বাড়ি নেই। সকালে টুকুকে তিনি কিছু শাস্তি দিয়েছেন। দুবার...

০৩. সব পুরুষকেই এক রকম মনে হয়

তিথি কখনো তার সঙ্গের পুরুষের দিকে ভাল করে তাকায় না। সব পুরুষকেই তার কাছে এক রকম মনে হয়। একদল কদাকার হাঁসের ছানার মত। সব একই রকম। কাউকে আলাদা করা যায় না। তবে তিথি তার আজকের সঙ্গীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। যদিও খুঁটিয়ে দেখার মত কিছু এই লোকটির নেই। এর বয়স চল্লিশ থেকে...

০৪. বাড়িটা ইসমাইল সাহেবের

হীরুকে ঘণ্টাখানিক ধরে একতলা একটা টিনের ঘরের আশপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যাচ্ছে। এই এক ঘণ্টায় বাড়ির কাছাকাছি এসে কয়েকবার তীক্ষ্ণ শিস দিয়েছে। দুবার ইটের টুকরা টিনের চালে ফেলেছে। এসব হচ্ছে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। চেষ্টায় কোনো ফল হচ্ছে না। কেউ বেরুচ্ছে না বা জানালা দিয়ে উঁকি...

০৫. টুকু পার্কের একটা বেঞ্চিতে শুয়ে আছে

টুকু পার্কের একটা বেঞ্চিতে শুয়ে আছে। তার সমস্ত শরীরে এক ধরনের আরামদায়ক আলস্য। শুধু মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এসব হচ্ছে প্রবল জ্বরের লক্ষণ। সে বুঝতে পারছে তার গায়ে জ্বর। অনেকখানি জ্বর। জ্বরের জন্যেই শ্রাবণ মাসের পড়ন্ত দিনের রোদ তার কাছে এত আরামদায়ক মনে হচ্ছে।...

০৬. টুকুর খোঁজ নেই

দেখতে দেখতে ছ’দিন হয়ে গেল— টুকুর খোঁজ নেই। মিনু প্রায় দুপুরবেলা নিজেই ছেলেকে খুঁজতে বের হন। কাউকে তা বলেন না। টুকুর প্রসঙ্গে কোনো রকম কথাবার্তায় তিনি অংশগ্রহণ করেন না। যেন টুকু নামে তার কেউ ছিল না। এই ক’দিন তিথি টুকুর প্রসঙ্গ তুলেনি। আজ তুলল। হীরুকে বলল, থানায়...

০৭. পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা

জালালুদ্দিন হীরুর সঙ্গে তার পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। পীর-ফকিরের প্রতি তার কোনো রকম বিশ্বাস নেই। তবু এসেছেন। কারণ ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছে করছে। তার মনে ক্ষীণ আশা ছিল যেহেতু চোখে দেখতে পান না হীরু হয়ত একটা রিকশা ভাড়া করবে। অন্ধ বাপকে তো আর হাঁটিয়ে নেবে না। হীরু...

০৯. টুকু বুঝতেই পারল না

টুকু অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুঝতেই পারল না সে কোথায় আছে। অন্ধকার এবং অপরিচিত একটা ঘর। সে শুয়ে আছে মেঝেতে। তার গায়ে দুৰ্গন্ধ মোটা একটা কাঁথা। সে শুনল ইনিয়ে-বিনিয়ে অল্প বয়েসী। একটা বাচ্চা কাঁদছে। কান্নাব শব্দ শুনতে শুনতে টুকু চোখ বন্ধ করল। এই মুহূর্তে সে কিছু ভাবতে চায় না!...

১০. পীর সাহেব বলেছিলেন

পীর সাহেব বলেছিলেন টুকু সাতদিনের মাথায় ফিরে আসবে। কিন্তু সত্যিই যে সাতদিনের মাথায় টুকু এসে উপস্থিত হবে এই বিশ্বাস হীরুর ছিল না। কাজেই ভোর বেলা দরজা খুলে টুকুকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেছে। মনে মনে দুবার বলল, এ ভেরি গ্রেট পীর সাহেব! এ ভেরি গ্রেট...

১১. মনটা খুবই ব্যাড হয়ে আছে

হীরু বলল, মনটা খুবই ব্যাড হয়ে আছে। এ্যানা হেসে ফেলল। হীরু রাগী গলায় বলল, হাসলে কেন? আপনি বললেন মনটা খুব ব্যাড হয়ে আছে–এই শুনে হাসলাম। বললেই হয় মনটা খারাপ হয়ে আছে। হীরু গম্ভীর হয়ে গেল। এই মেয়ে ইদানীং উল্টাপাল্টা কথা বলে তাকে কষ্ট দিচ্ছে। অবশ্যি এটাই মেয়েদের...

১২. আমার নাম দবির

জালালুদ্দিন বললেন, কে? তিনি বারান্দায় এসে আছেন। সকাল নটার মত বাজে। বাড়িতে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। মিনু গেছেন বাজারে। তিথি কোথায় গেছে। তিনি জানেন না। যাবার আগে তাকে বলে যায়নি। হীরু গত রাতে বাড়ি ফিরেনি। টুকু অবশ্যি রাতে বাড়িতেই ছিল। ভোরবেলা কোথায় বেরিয়ে গেছে। এই...

১৩. ফরিদার চোখ দু’টি

ফরিদার চোখ দু’টি আজ যেন উজ্জ্বল আরো তীক্ষ্ণ। চুলার গানগনে কয়লার মত ঝকঝকি করছে। তার পরনের শাড়িটাও লাল। মাথার চুলগুলিও কেন জানি লালচে দেখাচ্ছে। শুধু মুখের চামড়া আরো হলুদ হয়েছে। এমন হলুদ যে মনে হয় হাত দিয়ে ছুঁলে হাতে হলুদ রঙ লেগে যাবে। ফরিদা বললেন, বস তিথি। চেয়ার টেনে...

১৪. অরু এসে উপস্থিত

ভাদ্র মাসের শুরুতে অরু এসে উপস্থিত। হাতে একটা সুটকেস। তাকে নিয়ে এসেছে। সদ্য গোঁফ উঠা মুখচোরা ধরনের এক ছেলে। ভীতু ছাউনি, একবারও মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছে না। স্যুটকেস নামিয়ে রেখেই সে উধাও হয়ে গেল। মিনু বললেন, ব্যাপার কি রে? অরু মায়াকান্না জুড়ে দিল। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে...

১৬. অজন্তা ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকল

ফরিদা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কে? দরজার পাশ থেকে কে যেন সরে গেল। ফরিদা বললেন, ভেতরে এস অজন্তা। অজন্তা ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকল। তার গায়ে স্কুলের পোশাক, হাতে বই-খাতা এবং পানির ফ্লাস্ক। বলল, স্কুলে যাচ্ছ? অজন্তা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মাকে সে খুব ভয় পায়।...

১৬. টুকু অরুকে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছে

টুকু অরুকে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছে। যাচ্ছে বাসে। অরু বসার জায়গা পেয়েছে টুকু তার পাশেই হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে। অরু বলল, টুকু তুই আমার কোলে বোস। টুকু খুব লজ্জা পেল। কারো কোলে বসে যাবার বয়স কী আছে? তার বয়স বাড়ছে এই কথাটা কারোরই মনে থাকে না। টুকুর প্যান্টে স্টার সিগারেটের...

১৭. তিথি নাসিমুদ্দিনের কাছে এসেছে

অনেক’দিন পর তিথি, নাসিমুদ্দিনের কাছে এসেছে। নাসিম দরজা খুলে অবাক, আরে তুমি? তিথি নিচু গলায় বলল, কেমন আছেন নাসিম ভাই? শরীর এমন কাহিল লাগছে কেন? ইনফ্লুয়েঞ্জার মত হয়েছিল। প্রতি বছর শীতের শুরুতে এরকম হয়। জ্বরজ্বারি। এবার খুব বেশি হয়েছে। এস ভেতরে এস। তিথি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে...

১৮. এ্যানা টি স্টল

হীরুর খুব ইচ্ছা ছিল তার চায়ের দোকানের নাম রাখবে এ্যানা টি স্টল। এ্যানার কারণে তা হল না। এ্যানা কঠিন গলায় বলল, ফাজলামি করবে না তো। ফাজলামি করলে চড় খাবে। হীরু অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বলল, চড় খাব মানে? এটা কী ধরনের কথা! ওয়াইফ হয়ে হাসবেন্ডকে চড় দেয়ার কথা বলছি। সান কী আজ...

১৯. অরুর চাকরি হয়ে গেল

জুন মাসের মাঝামাঝি অরুর চাকরি হয়ে গেল। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পোস্টিং। একটি বিদেশী এনজিওর আস্থায়ী চাকরি। চাকরির মেয়াদ তিন থেকে চার মাস। একুশ’শ টাকা বেতন। খাওয়াথাকা ফ্রি। হালুয়াঘাটে গারো ছেলেমেয়েদের জন্যে স্কুল করা হয়েছে। সেই স্কুলে টিচার। অংক, বাংলা, ইংরেজির সঙ্গে...

২০. তিথি অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে

তিথি অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে। হাঁটতে তার ভাল লাগছে। আকাশ ঘন নীল। ঝলমল করছে। রোদে শিশুদের গায়ের ওম। এমন সময় হঁটিতে ভাল লাগারই কথা। তিথির কোনো গন্তব্য নেই। একটা ফুলওয়ালীর কাছ থেকে সে ফুল কিনল। একজন ভদ্রলোক তার কাছে জানতে চাইলেন, দিলু রোড কোন দিকে? সে ভদ্রলোককে খুব ভাল করে...