ছায়াবীথি (১৯৯৪)

ছায়াবীথি (১৯৯৪) - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. রাত দশটার মত বাজে

রাত দশটার মত বাজে। এমন কিছু রাত না, কিন্তু নায়লার অস্থির লাগছে। গেটে শব্দ হতেই সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ জায়গাটাকে বারান্দা বলা ঠিক না। জায়গাটা ছাদের অংশ। তবু নায়লা বারান্দা বলে। ফ্ল্যাট বাড়ির গেট। কত মানুষ আসছে, কত মানুষ যাচ্ছে। নায়লা বারান্দায় পঁড়িয়ে রইল।...

০২. নায়লাদের বাসাটা ফ্ল্যাটবাড়ি

নায়লাদের বাসাটা ফ্ল্যাটবাড়ি বলতে যা বোঝায় তা না। ফ্ল্যাটের মালিক শুরুতে ছাদে ড্রাইভারদের থাকার জন্য কিছু ঘর করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, এই ঘরগুলি বেশ ভাল টাকায় ফ্ল্যাটের মালিকরা কিনে নেবেন। বাস্তবে দেখা গেল, ড্রাইভারদের জন্যে ঘর নিতে কেউ আগ্রহী নয়। ফ্ল্যাট-মালিক তৈরী...

০৩. বেতনের দিনগুলি

বেতনের দিনগুলি কি আলাদা? জামানের তাই মনে হয়। মাসের প্রথম দিন অফিসের সবার মুখ হাসি-হাসি থাকে। অফিস কেন্টিনে ভিড় বেশি হয়, গল্প-গুজব বেশি হয়। পান খাওয়া বেশি হয় জামান লক্ষ্য করেছে, ঐদিন সবাই অন্যদিনের চেয়েও ভাল কাপড় পরে আসে। শুধু ক্যাশিয়ার যার হাত দিয়ে টাকা বের হয় তার...

০৪. আলমের গলায় মুগ্ধ বিস্ময়

আমি কি চোখে ভুল দেখছি? আলমের গলায় মুগ্ধ বিস্ময়। সে সত্যি সত্যি বিস্মিত। সেজেগুজে তিনজন তার হোটেলের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। নায়লা শ্যামলা ধরনের মেয়ে–প্রথমদিন তাকে যতটা সুন্দর লাগছিল আজ তারচেয়ে হাজার গুণ সুন্দর লাগছে। প্রথম দিন নায়লার চোখে-মুখে চাপা অস্বস্তি ছিল। আজ...

০৫. জামান বড় সাহেবের কাছে ফাইল নিয়ে গিয়েছিল

জামান বড় সাহেবের কাছে ফাইল নিয়ে গিয়েছিল। এক মিনিটে কাজ হয়ে যাবার কথা–দুটা সই দেবেন। সে ফাইল নিয়ে চলে আসবে। সে জায়গায় সময় লাগল এক ঘন্টা দশ মিনিট। বড় সাহেবের টেলিফোন চলে এল। তিনি একটা সিগনেচার দিয়ে টেলিফোন ধরলেন এবং কাঁটায় কাঁটায় এক ঘণ্টা কথা বললেন। এই এক ঘণ্টা...

০৬. নায়লা চোখ বড় বড় করে বলল

নায়লা চোখ বড় বড় করে বলল, আপনি এত বড় গাড়ি নিয়ে এসেছেন? আমরা যাব পুরানো ঢাকায়। এত বড় গাড়ি তো গলি দিয়ে চকুবে না। আলম বলল, যতদূর যাওয়া যায় চল যাই, তারপর না হয় রিকশা নিয়ে নেব। জামান যাচ্ছে না? না। ও বাবুকে ডাক্তারের কাছে নিয়েছে। বাবুর কাশি হয়েছে। কাল রাতে খুব কেশেছে।...

০৭. যেদিন তাড়া থাকে

যেদিন তাড়া থাকে সেদিনই একের পর এক সমস্যা দেখা দেয়। আজ জামানের সকাল সকাল অফিসে যাবার কথা। বছর শেষের এই দিনটি জামানদের অফিসের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। এইদিন অফিসে কাজকর্ম তেমন কিছু হয় না। কয়েকটা মিটিং হয়। মিটিংএর বিষয়বস্তু হল–বিগত বছরে কোম্পানী কি করেছে তার পর্যালোচনা।...

০৮. বাবু মাটির ঘোড়ার উপর বসে আছে

বাবু মাটির ঘোড়ার উপর বসে আছে। তার এখন খাবার সময়। ভাত-ডাল মেখে একটা বাটিতে করে আনা হয়েছে। খাওয়ানোর জন্যে তাকে ঘোড়া থেকে নামানো দরকার। সে নামবে না। ঘোড়াতে বসে খেলেও হয়–তাও খাবে না। অনুনয়, গল্প বলা, গান গাওয়া অনেক কিছুই হল–বাবু মুখ খুলবে না। ফিরুর মা বলল,...

০৯. আজ বাবুর জন্মদিন

আজ বাবুর জন্মদিন। নায়লা এই সাতসকালে বাবুকে গরম পানিতে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে দিয়েছে। পায়জামা, পাঞ্জাবি, নাগরা জুতা। কি সুন্দর যে বাবুকে লাগছে! ঘরে কোন ক্যামেরা নেই। ক্যামেরা থাকলে ছবি তুলে রাখা যেত। একটা টুপি কেনা দরকার ছিল– টুপি পরিয়ে দিলেই একেবারে ষোল আনা...

১০. নায়লার অসম্ভব মাথা ধরল

সন্ধ্যার আগে আগে নায়লার অসম্ভব মাথা ধরল। মাথা তো ধরবেই–একের পর এক সমস্যা হচ্ছে। নুরু টাকা নিয়ে গেছে কিন্তু, শাড়ি দিয়ে যায়নি। অথচ এই শাড়ি পরার জন্যে সে রেডিমেড় ব্লাউজ কিনে এনেছে। ইস্ত্রি করিয়ে রেখেছে। চোখে কাজল দেবে, কাজলদানি খুঁজে পাচ্ছে না। ফিরুর মাকে জিজ্ঞেস...

১১. জামান অফিসে ঢুকল লজ্জিত ভঙ্গিতে

জামান অফিসে ঢুকল লজ্জিত ভঙ্গিতে। যেন অপরিচিত কারো বাড়িতে সে ঢুকতে যাচ্ছে। এক্ষুণি বাড়ির দারোয়ান বলবে, কাকে চান? কি প্রয়োজন? জামান এই মুহূর্তে কাউকে চাচ্ছে না। তার তেমন কিছু প্রয়োজনও নেই। তিন মাসের বেতন তাকে মাসের এক তারিখেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্যাশিয়ার বজলুর রহমান...

১২. নায়লা বিকেল থেকেই নিউমার্কেটে ঘুরছে

নায়লা বিকেল থেকেই নিউমার্কেটে ঘুরছে। অন্যদিন যা দেখে সবই কিনে ফেলতে ইচ্ছা করে। আজ আর কিছুই কিনতে ইচ্ছা করছে না। বাবুর জন্যে লাল টুকটুকে একটা বল শুধু কেনা হয়েছে। ছটা চিনামাটির প্লেট কেনার জন্যে এলিফেন্ট রোডের দোকানগুলিতে অনেক হাঁটাহাঁটি করল। পছন্দও করল। শেষ পর্যন্ত...

১৩. দুটা স্যুটকেস, একটা বড় ঝুড়ি

দুটা স্যুটকেস, একটা বড় ঝুড়ি ভর্তি বাবুর জিনিসপত্র নিয়ে নায়লা তার মার বাসায় উপস্থিত হল। ফিরুর মা সঙ্গে এসেছে। বাবু তার কোলে বসে আছে। জামান আসেনি। সে ১০ টার ট্রেনে দেশের বাড়িতে চলে যাবে। মোর্তজা সাহেব মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, ব্যাপার কি কে? নায়লা বলল, কোন ব্যাপার না।...

১৪. বাসায় পৌঁছে নায়লার সঙ্গে প্রথম দেখা

বাসায় পৌঁছে নায়লার সঙ্গে প্রথম দেখা হল বাবুর। এই শীতের মধ্যে তার গায়ে পাতলা একটা গেঞ্জি। তার বগলে একটা কুকুরছানা ঘেউ ঘেউ করছে। মানুষের ভালবাসার অত্যাচারের কষ্টে তার জীবন বের হবার জোগাড়। বাবু বলল, মাম্মাট কুকুল। নায়লা বিরক্ত গলায় বলল, কুকুর কে দিয়েছে? ছোটমামা। ফেলো...

১৫. মায়াময় কোন ছায়াবীথির দিকে

আলম অবাক হয়ে বলল, আরে তুমি! নায়লা হাসতে হাসতে বলল, আমাকে কেমন লাগছে আগে বলুন। সুন্দর! অসম্ভব সুন্দর! শাদী শাড়ি পরে আছি, বিধবার মত লাগছে না তো? তোমাকে শ্বেতপরীর মত লাগছে। এত সুন্দর সাজ করা কোন মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি। আর কোনদিন দেখবেনও না। আমি চলে যাচ্ছি। কোথায় চলে...