কবি (১৯৯৬)- হুমায়ূন আহমেদ

কবি (১৯৯৬) - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. আতাহারের পরনে পাঞ্জাবি

[সিলেটের মীরাবাজারের পুরানো শ্যাওলা ধরা দালানের একটা ঘর। মধ্যরাত্রি। পাঁচ-ছ বছর বয়েসী একটি শিশু বাবা-মার পাশে ঘুমুচ্ছে। বাইরে উথালি পাথাল জোছনা। সেই জোছনা বাড়ির ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরে ঢুকেছে, পড়েছে শিশুটির মশারির ছাদে। মনে হচ্ছে আলোর ফুল ফুটে আছে। হঠাৎ শিশুটির ঘুম ভেঙে...

০২. আতাহারের মা সালমা বানু

আতাহারের মা সালমা বানু গত এক মাস হল হাসপাতালে। তাঁর অসুখটা যে কি ডাক্তাররা ধরতে পারছেন না। শুরুতে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা হল। এখন সেই চিকিৎসা বন্ধ করে নানান ধরনের টেস্ট করানো হচ্ছে। একই টেস্ট কয়েক জায়গা থেকে করানো হচ্ছে। রেজাল্ট একেক জায়গা থেকে একেক রকম আসছে। ডাক্তাররা...

০৩. রশীদ সাহেব বললেন

রশীদ সাহেব বললেন, তুই যাচ্ছিস কোথায়? বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আতাহার সত্যি সত্যি ভুলে গেল সে কোথায় যাচ্ছে। কিছুতেই মনে করতে পারল না–অথচ সে একটা বিশেষ কাজেই বেরুচ্ছিল। কাজটা কি তা বাবাকে দেখার আগ পর্যন্ত মনে ছিল–এখন আর মনে নেই। একটা বিশেষ বয়সের পর বাবা-ছেলের...

০৪. সাজ্জাদ ভূতের গলির এক বাসায়

গত চার দিন ধরে সাজ্জাদ ভূতের গলির এক বাসায় আছে। এই চার দিন দাড়ি-গোঁফ কামায়নি। তার মুখ ভর্তি খোচা খোচা দাড়ি। ব্রাশের অভাবে মাজা হয় নি বলে–হলুদ দীত। ঘুম মোটেই ভাল হচ্ছে না। ঘুমের অভাবে চোখের নিচে কালি পড়েছে। তিন কামরার এই বাড়িটি হাফ বিলিডিং ছাদ টিনের। দিনের বেলা...

০৫. সাজ্জাদ ইন্টারভ্যু দিতে ঘরে ঢুকেছে

সাজ্জাদ ইন্টারভ্যু দিতে ঘরে ঢুকেছে। প্রায় হলঘরের মত বড় ঘর। নিশ্চয়ই ছোটখাট কনফারেন্স টিনফারেনাস হয়। ঘরের মাঝখানে কনফারেন্স টেবিলের মত গোল টেবিল। একটা পাশ বুড়ো এবং আধাবুড়োরা দখল করে আছেন। এঁরাই ইন্টারভ্যু নেবেন। সাজ্জাদ চট করে গুণে ফেলল–সাতজন। একটা করে প্রশ্ন...

০৬. পাক্ষিক সুবৰ্ণ

পাক্ষিক সুবৰ্ণ বের হয়েছে। চার রঙের ঝকঝকে কভার। সাত টাকা দাম। এই সংখ্যাতেই আতাহারের কবিতা থাকার কথা। গনি সাহেব সে রকমই বলেছেন। কাজেই সাত টাকা খরচ করে পত্রিকা কেনার মানে হয় না। সৌজন্য সংখ্যা হিসেবে দুকপি সে পাবে। পত্রিকার তৃতীয় পাতায় বড় বড় করে লেখা–প্রকাশিত...

০৭. গনি সাহেব

গনি সাহেব অফিসেই ছিলেন। পান খাচ্ছিলেন। তিনি এমিতে পান খান না, কোন কারণে মেজাজ অত্যন্ত ভাল হলে জর্দা দিয়ে একসঙ্গে দুটা পান মুখে দেন। আজ তাঁর মেজাজ ভাল। শুধু ভাল না–অত্যন্ত ভাল, বিটিসির ফুল পেজ বিজ্ঞাপন পেয়েছেন। ছমাসের কনট্রাক্ট। সরকারি বিজ্ঞাপন বেশ কিছুদিন বন্ধ...

০৮. অফিসে সাজ্জাদের প্রথম দিন

অফিসে আজ সাজ্জাদের প্রথম দিন। সে সারা জীবন শুনে এসেছে। দশটা-পাঁচটা অফিস। এখানে এসে দেখছে আটটা-চারটা। প্রথম দিনেই দু ঘন্টা লেট। প্রথম দিনে অনেক কিছু র চোখে দেখা হয়। দুঘণ্টা দেরিও নিশ্চয় ক্ষমার চোখে দেখা হবে। অফিসে পা দিয়ে কি করতে হবে না করতে হবে হোসেন সাহেব ছেলেকে...

০৯. বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে

বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে। আতাহারের হাতে ছাতা। লাল-নীল ফুল আঁকা বাহারি ছাতা। মিলির কাছ থেকে নেয়া। মিলি বিশ্চিমত গলায় বলেছে, মেয়েদের ছাতা নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে পারবি? হাতে হাঁটতে অসুবিধা কি। বৃষ্টি নামবে কি না সেটাই হল বিবেচ্য। হারাবি না ভাইয়া। না, হারাবো না। মেয়েদের রঙিন...

১০. সালমা বানু

সালমা বানু লজ্জা লজ্জা চোখে স্বামীর দিকে তাকাচ্ছেন। কেন এমন লজ্জা লাগছে নিজেও বুঝতে পারছেন না। ত্রিশ বছর বিবাহিত জীবন যাপনের পর স্বামীকে দেখে তরুণী বয়সের লজ্জা পাবার কোন অর্থ হয় না। অসুখের পর অনেক অর্থহীন ব্যাপার তাঁর মধ্যে ঘটছে। গল্প করার মত কেউ থাকলে এইসব নিয়ে তার...

১১. সুবর্ণের বর্ষা সংখ্যা

সুবর্ণের বর্ষা সংখ্যা বের হয়েছে। প্রচ্ছদে কদম গাছের ছবি। ফটোগ্রাফকে কি কায়দা করেছে, দেখে মনে হয় জলরঙে আঁকা ছবি। আতাহারের মনে হল, লোকজন প্রচ্ছদ দেখেই পত্রিকা কিনে ফেলবে। হু হু করে সুবর্ণ বিক্রি হয়ে যাবে। আতাহার সূচিপত্রে চোখ বুলাল— আবু কায়সার : রবীন্দ্রনাথের বর্ষা।...

১২. মানুষের নানা রকম পরিচয়

একজন মানুষের নানা রকম পরিচয় থাকে। রশীদ আলি সাহেবের ব্যাপারে এটা খুবই সত্যি। ঘরে তিনি এক মানুষ, বাইরে সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। অতি ভদ্র, অতি বিনয়ী। কেউ তাকে উঁচু গলায় একটা কথা বলতেও শুনেনি। একবার ফার্মগেটের সামনে এক রিকশাওয়ালা তার পয়ে রিকশার চাকা তুলে দিল। তিনি প্রচণ্ড...

১৩. রশীদ আলী সাহেব

রশীদ আলী সাহেব অসীম ধৈর্যে বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সকালে নাশতা খেয়ে বের হন, ফিরেন দুপুর দুটা-আড়াইটায়। গোসল করে ভাত খান। ভাত খেয়েই ঘুমুতে যান। তার প্রথম ব্যাচ ছাত্রীরা এসে পড়লে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়। তিন ব্যাচ পড়ানোর ঝামেলা শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে আবার ঘুমুতে যান।...

১৪. লীলাবতীদের বাড়ি

লীলাবতীদের বাড়ি ওয়ারীতে। বাড়ি না বলে দুর্গ বললেও খুব ভুল হবে না। জেলখানার মত উঁচু পাচিলে বাড়ি ঘেরা। গেট নিশ্চিছন্দ্ৰ লোহার। ফাঁক-ফোকর নেই যে ভেতরের কোন দৃশ্য হঠাৎ চোখে পড়বে। এই জাতীয় বাড়ির ভেতরটা সাধারণত অন্য রকম হয়ে থাকে। গেট পেরিয়ে ভেতরে পা দিলেই আধুনিক কেতার বাংলো...

১৫. কণা না-সূচক মাথা নাড়ল

সাজ্জাদ বলল, তুমি আমাকে চিনতে পারছ? কণা না-সূচক মাথা নাড়ল। কিন্তু তার চোখে চাপা হাসি। মনে হচ্ছে সে বেশিক্ষণ হাসি চেপে রাখতে পারবে না। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়বে। আমাকে চিনতে পারছি না? জ্বি না। সাজ্জাদ বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, ও আচ্ছা। কণা শাড়ির আঁচল গায়ে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,...

১৬. হোসেন সাহেব লক্ষ্য করেছেন

হোসেন সাহেব লক্ষ্য করেছেন তিনি যখন খুব আনন্দে থাকেন তখনই বড় বড় নিরানন্দের ব্যাপারগুলি ঘটতে থাকে। মনে করা যাক, তিনি খুব আগ্রহের সঙ্গে তাঁর প্রিয় খাবার কই মাছের ঝোল খাচ্ছেন, হঠাৎ দেখা গেল ঝোলের ভেতর মরা একটা মাছি। মাছিটা শুরুতেই দেখেছিলেন, তখন ভেবেছেন পেয়াজের খোসা।...

১৭. মদিনা নীতুদের নতুন কাজের মেয়ে

মদিনা বলল, আফা, উনি আইছে। মদিনা নীতুদের নতুন কাজের মেয়ে। আঠারো-উনিশ বছর বয়স। বিয়ে হয়েছিল, স্বামী তাড়িয়ে দিয়েছে। এত সুন্দর একটা মেয়েকে স্বামী তাড়িয়ে দিল কেন নীতু বুঝতে পারে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে সুন্দর একটা মুখ দেখলেই তো মনটা ভাল হয়ে যাবার কথা। মদিনা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে...

১৮. সালমা বানু চোখ মেলে

সালমা বানু চোখ মেলে একজন অপরিচিত মানুষকে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। আজকাল প্রায়ই অপরিচিত লোকজন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বললে এরা কথার জবাব দেয় না। কিছু কিছু মানুষের চেহারা থাকে বিকৃত। এদের দেখলে ভয় ভয় লাগে। এরা বোধহয় মানুষ না–পৃথিবীতে মানুষের বেশ ধরে...

১৯. কণা আজ অবেলায় গোসল করেছে

কণা আজ অবেলায় গোসল করেছে। দুপুরে খুব খিদে লেগেছিল। বাজার হয়নি বলে রান্না হয়নি। চা বানিয়ে চা খেল। খিদে নষ্ট করার জন্যে অতিরিক্ত চিনি দেয়া চা খুব ভাল। এক কাপ চা খেলেই খিদে নষ্ট হয়ে যায়। সে পুরো এক গ্লাস খেয়ে ফেলল। এতে তার খিদে নষ্ট হয়ে গেলো ঠিকই কিন্তু গা গুলাতে শুরু...

২০. ইডিয়ট বলে গালি

হোসেন সাহেব নিজেকে মনে মনে ইডিয়ট বলে গালি দিলেন। এরচেয়েও কোন খারাপ গালি দিতে পারলে ভাল হত। খারাপ গালি মাথায় আসছে না। আতাহার তার সামনে বিনীত ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে আছে। তাকে সান্তনা দেবার জন্যে যে সব কথাবার্তা তিনি ভেবে রেখেছিলেন তার একটাও মনে পড়ছে না। মাথা পুরোপুরি শূন্য।...