এইসব দিনরাত্রি (১৯৯০)

এইসব দিনরাত্রি উপন্যাসটি অনেকটাই বড়। একবারে শেষ করা যাবে না। চেষ্টা করব একটু একটু করে আপডেট দেয়ার।

০১. নীলুর কেমন যেন লাগতে লাগল

সন্ধ্যার পর থেকে নীলুর কেমন যেন লাগতে লাগল। কেমন এক ধরনের অস্বস্তি। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে যে—রকম লাগে সে-রকম। সমস্ত শরীর ঝিম ধরে আছে। মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা। নীলু বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এ বাড়ির বারান্দাটা সুন্দর। কল্যাণপুরের দিকে শহর তেমন বাড়তে শুরু করে নি। গ্রাম গ্রাম একটা...

০২. বাবু হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে

বাবু হাত-পাছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেই কী কারণে যেন তার নিচের ঠোঁট বেঁকে গেল। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল নীলু। কী অপূর্ব দৃশ্য! এমন মায়া লাগে! চোখে পানি এসে যায়, বুকের কাছটায় ব্যথা-ব্যথা করে। নীলুমৃদুস্বরে ডাকল, এই বাবু এই! বাবুর বাঁকা ঠোঁট আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে। আঁহ কেন এত...

০৩. পুরানো ঢাকার ঘিঞ্জির মধ্যে

পুরানো ঢাকার ঘিঞ্জির মধ্যে যে এমন একটি বিশাল এবং আধুনিক ধরনের বাড়ি থাকতে পারে, সেটা রফিকের কল্পনাতেও আসে নি। সে গেটের ভেতরে পা দেবে কি দেবে না, বুঝতে পারল না। এ জাতীয় বাড়িতে কুকুর থাকবেই। এসব কুকুররা আবার কোনো একটা বিশেষ ইন্দ্ৰিয়ের কারণেই বোধহয় মানুষদের মধ্যে যে...

০৪. শাহানার স্যার

শাহানার স্যার এসেছেন। শাহানা অনেকক্ষণ ধরেই উশখুশ করছে। ভাবীর এসে কাছেই কোথাও বসবার কথা। কিন্তু ভাবী আসছে না। স্যার ভারি গলায় বললেন, এত ছটফট করছ, কেন, কি হয়েছে? কিছু হয়নি স্যার। তাহলে মন দিয়ে শোনা কি বলছি। এ কিউব প্লাস বি কিউব… স্যার, আমি একটু আসছি। শাহানা উঠে...

০৫. রফিকের মনে ক্ষীণ আশা

রফিকের মনে ক্ষীণ আশা ছিল, শারমিনের আচার-আচরণে একটি পরিবর্তন লক্ষ করবে। বড়ো ধরনের কিছু না হলেও চোখে পড়বার মতো। পরিচিত ভঙ্গিতে একটু হাসবে কিংবা করিডোরে দেখা হয়ে গেলে বলবে।–কী, কেমন আছেন? অথচ শারমিন আগে যেমন ছিল এখনো তেমন। গম্ভীর হয়ে ক্লাসে আসে। লেকচার শেষ...

০৬. কেনাকাটা করতে নীলু

কেনাকাটা করতে নীলু কখনো একা একা আসে না। তার সঙ্গে থাকে শাহানা কিংবা রফিক। আজ সে এসেছে একা। এবং আসার সময় সারা পথেই মনে হয়েছে গিয়ে দেখবে নিউ মার্কেট বন্ধ। সে লক্ষ করেছে, যেদিনই কোনো একটা বিশেষ কিছু কেনাকাটার থাকে, সেদিনই নিউমার্কেট থাকে বন্ধ। হয় সোমবার পড়ে যায়, কিংবা...

০৭. বুধবারটা রফিকের জন্যে খুব লাকি

বুধবারটা রফিকের জন্যে খুব লাকি। বুধবারে সে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরুতে পারে। এইদিন কোনো অঘটন ঘটবে না। কারে সঙ্গে দেখা করতে গেলে দেখা হবে। বাসে উঠলে জানালার পাশে বসার সিট পাওয়া যাবে। বাসের কণ্ডাকটার ভাংতি হিসেবে তাকে দেবে চকচকে নতুন নোট। আজ বুধবার, কিন্তু তবু অঘটন...

০৮. টুনির বয়স এখন ন মাস

টুনির বয়স এখন ন মাস। ন মাস বয়েসী বাচ্চারা বাবা, মা, দুদু এই জাতীয় কথা বলতে শেখে, কিন্তু টুনির ব্যাপারটা হয়েছে এই রকম, সে শুধু শিখেছে একটি শব্দ–জেজে। যাই দেখে উল্লসিত হয়ে ওঠে এবং হাত নেড়ে বলে ওঠে, জেজে। তাকে কথা শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছে শাহানা। শাহানার পরীক্ষা হয়ে...

০৯. এয়ারপোর্টে সাব্বিরকে রিসিভ

এয়ারপোর্টে সাব্বিরকে রিসিভ করবার জন্যে শারমিন একা এসেছে। রহমান সাহেবের সঙ্গে আসার কথা, শেষ মুহূর্তে তিনি মত বদলানে, তুমি একাই যাও মা। ড্রাইভারকে বলে দাও একটা ফুলের তোড়া নিয়ে আসতে। সাব্বির পছন্দ করবে। ফুলের তোড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে শারমিনের লজ্জা করছিল। ফুলটুল নিয়ে আর...

১০. মনোয়ারার গাল ফুলে

মনোয়ারার গাল ফুলে একটা বিশ্ৰী কাণ্ড হয়েছে। সারা দিন কিছুই মুখে দেন নি। ব্যথায় ছটফট করেছেন। ব্যথা কমানোর কোনো ওষুধ কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। সবচে মুশকিল হয়েছে হোসেন সাহেবের। তাঁকে দেখামাত্র মনোয়ারার রাগ চড়ে যাচ্ছে। যা মনে আসছে, তাই বলছেন। হোসেন সাহেব অনেকক্ষণ সহ্য...

১১. কবির সাহেব

কবির সাহেব সাধারণত অন্ধকার থাকতে ঘুম থেকে ওঠেন। হাত-মুখ ধুয়ে হারিকেন জ্বলিয়ে তাঁর পড়ার টেবিলে বসেন। জরুরি লেখালেখির কাজগুলি সূর্য ওঠার আগেই সেরে ফেলা হয়। আজ তেমন কোনো জরুরি লেখালেখির ব্যাপার নেই। অভ্যাস-বশে লেখার টেবিলে বসেছেন। শুধু শুধু বসে থাকার কোনো মানে হয় না,...

১২. দুপুরবেলা পিওন

দুপুরবেলা পিওন একটি রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়ে গেছে। খামের উপর লেখা-নীলুফার ইয়াসমিন। ইংরেজিতে টাইপ করা ঠিকানা। নীলু খুবই অবাক হল। কে তাকে রেজিস্ট্রি চিঠি দেবো? বিয়ের আগে এরকম চিঠি আসত। আজেবাজে সব কথার চিঠি–তোমাকে আজ দেখলাম কলেজে যাচ্ছ যেন কোনো রাজকন্যা পথ ভুলে এসেছে।...

১৩. মনোয়ারা গম্ভীর মুখে বললেন

মনোয়ারা গম্ভীর মুখে বললেন, বৌমা, আজ অফিসে যাবে না? নীলু হাসিমুখে বলল, আজ টুনীর জন্মদিন, অফিসে যাব না। মনোয়ারী কিছু বললেন না। আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন। নীলুর খুব ইচ্ছা, টুনীর দ্বিতীয় জন্মদিনটি খুব ভালো মতো করে। প্রথমটি করা হয় নি। শফিক কোনো রকম উৎসাহ দেখায় নি। বিরক্ত মুখে...

১৪. রহমান সাহেব খেতে এসে দেখেন

রাত ন টা। রহমান সাহেব খেতে এসে দেখেন শারমিন দোতলা থেকে নিচে নামে নি। জমিলার মা বলল, আফা ভাত খাইবেন না। কেন? কিছুকন নাই? শরীর খারাপ মনে হয়। রহমান সাহেব বিস্মিত হলেন। শরীর ভালো থাকুক না-থাকুক, খাবার সময় শারমিন উপস্থিত থাকে। কিছুদিন থেকে তিনি তার ব্যতিক্রম লক্ষ করছেন।...

১৫. সন্ধ্যা মিলিয়ে গেল

সন্ধ্যা মিলিয়ে গেল, তবু নীলু জানত্বে পারল না, ভালো খবরটি কি? ম্যারাথন বোর্ড মীটিং হচ্ছে। চারটার পর তিন বার চা দেওয়া হয়েছে ভেতরে। ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, শেষ বারের চা আনতে হল বাইরে থেকে। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে মীটিং চলবে রাত নটা-দশটা পৰ্যন্ত। নীলু অস্বস্তি বোধ...

১৬. একটা সই লাগবে

শফিক অফিসে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। নীলু এসে বলল, এখানে তোমার একটা সই লাগবে। কিসের সাই? লাগে, কিন্তু স্বামীর দরখাস্তে স্ত্রীর কোনো সিগনেচার লাগে না-অদ্ভুত निহাभ-दकानूনা! শফিক গম্ভীর স্বরে বলল, তোমার সুইডেনের ব্যাপোর? হ্যাঁ। আমাদের অফিসের এক জন কলিগ দশ দিনের মধ্যে...

১৭. শফিক অফিসে এসে শুনল

শফিক অফিসে এসে শুনল, বড়োসাহেব সকাল আটটায় এসেছেন, কয়েক বার শফিকের খোঁজ করেছেন। তাঁর মেজাজ অবশ্যি ভালো। অন্য দিনের মতো চেঁচামেচি করছেন না। শফিক ঘড়ি দেখল, দশটা চল্লিশ। আজ তার অফিসে আসতে দেরি হল। এটা সে কখনো করে না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, যে দিন সে দেরি করে আসে, বেছে...

১৮. বৈশাখ মাস

বৈশাখ মাস। আকাশে মেঘা জমতে শুরু করেছে। ধরন দেখে মনে হয় কালবৈশাখী হবে। পাখিরা অস্থির হয়ে ওড়াউড়ি করছে। ওরা টের পায়। কবির মাস্টার দ্রুত পা চালাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আছে শওকত। শওকতের মাথায় বিছানার চাদর দিয়ে বাঁধা গাদাখানেক বই। বইগুলি যোগাড় হয়েছে নীলগঞ্জ পারলিক লাইব্রেরির...

১৯. নীলু খুব লজ্জিত

তিনি অবাক হয়ে নীলুর দিকে তাকালেন। যেন নীলুর কথা ঠিক বুঝতে পারছেন না। নীলু বলল, স্যার, আমি খুব লজ্জিত। শেষ মুহূর্তে জানালাম। বড়ো সাহেব বললেন, লজ্জিত হওয়াই উচিত। অন্তত এক মাস আগে জানলেও আমরা অন্য কাউকে পাঠাতে পারতাম। নীলু মাথা নিচু করে বসে রইল। বড়োসাহেব বললেন, আপনার...

২০. দীর্ঘদিন পর উত্তেজনা

রহমান সাহেব দীর্ঘদিন পর উত্তেজনা অনুভব করছেন। মেয়ের বিয়েতে তিনি বড়ো রকমের একটা হৈচৈ করতে চান। সব ধরনের সামাজিকতা, উৎসব অনুষ্ঠান। তিনি মনেপ্ৰাণে অপছন্দ করতেন। এখনো করেন, কিন্তু শারমিনের বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা মনে হলেই মনে হয় ঢাকা শহরের সবাইকে আনন্দ অনুষ্ঠানে ডাকা যায় না?...