আকাশ জোড়া মেঘ

আকাশ জোড়া মেঘ - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. ফিরোজ বসে আছে

ছাপ্লান্ন মিনিট পার হল। ফিরোজ বসে আছে। কারো কোনো খোঁজ নেই। ঘুমন্ত রাজপুরীর মতো অবস্থা। কোনো শব্দটব্দও পাওয়া যাচ্ছে না, যা থেকে ধারণা করা যায় এ বাড়িতে জীবিত লোকজন আছে। সে যে এসেছে, এ-খবরটি ছাপ্পান্ন মিনিট আগে পাঠানো হয়েছে। বেঁটেখাটো একজন মহিলা বলে গোল আফা আসন্তাছে।...

০২. অনেকক্ষণ থেকেই টেলিফোন বাজছে

অনেকক্ষণ থেকেই টেলিফোন বাজছে। অপালা বারান্দায় ছিল, শুনতে পায়নি। ঘরের দিকে রওনা হওয়ামাত্র শুনল। টেলিফোন বেজেই যাচ্ছে, আহা না জানি কে! টেলিফোনের বিং হলেই আপালার কেন জানি মনে হয়, কেউ ব্যাকুল হয়ে ডাকছে। তার খুব একটা বড় সমস্যা। এই মুহুর্তেই তার কথা শোনা দরকার। এক বার...

০৩. অপলার মা হেলেনা

অপলার মা হেলেনা প্রথমে লন্ডনের সেন্ট লিউক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তাঁর হার্টের একটি ড্যামেজড ভালম্ব এখানেই রিপেয়ার করা হয়। রিপেয়ারের কাজটি তেমন ভাল হয়নি। ডাক্তাররা এক মাস পর আর একটি অপারেশন করতে চাইলেন। তবে এও বললেন যে, অপারেশন নাও লাগতে পারে। তবে এই মুহূর্তে বলা...

০৪. চোখ মেলতেই প্রিয় দৃশ্যটি দেখা গেল

চোখ মেলতেই প্রিয় দৃশ্যটি দেখা গেল। জানালার কাছে চায়ের কাপ। একটি চড়ুই পাখি কাঁপের কিনারায় বসে ঠোঁট ডুবিয়ে চা খাচ্ছে। মাঝে-মাঝে তাকাচ্ছে ফিরোজের দিকে। এই ব্যাপারটি প্রথম ঘটে ডিসেম্বর মাসের ১১ তারিখে। চায়ের দোকান থেকে যথারীতি জানালার পাশে গরম চা রেখে ডাক...

০৫. অপালা তার খাতা নিয়ে বসেছে

আজ অনেক দিন পর অপালা তার খাতা নিয়ে বসেছে। কোনো কিছু লেখার উদ্দেশ্যে নয়। পুরনো লেখায় চোখ বোলানোর জন্যে। রাজ-নর্তকী গল্পটি সে পড়েছিল। এ-রকম একটা অদ্ভুত গল্প। এত অল্প বয়সে সে কেন লিখেছিল ভাবতে-ভাবতে লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল। এই গল্পটি ছিঁড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু খাতা থেকে পাতা...

০৬. ফখরুদিন সাহেবের মেজাজ

ফখরুদিন সাহেবের মেজাজ অল্পতেই খারাপ হয়। দেশের মাটিতে সেই মেজাজ প্রকাশের যথেষ্ট পথ থাকলেও বিদেশে সম্ভব হয় না। আজ একের পর এক যে-সব কাণ্ড ঘটেছে, তাতে তার মাথা খারাপ হয়ে গেলেও দোষের ছিল না। তিন্তি তিনি মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে। প্লেনে তার পাশের সহযাত্ৰিণী অতিরিক্ত মদ্যপানের...

০৭. ফিরোজের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে

মনে হচ্ছে ফিরোজের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। বি. করিম সাহেবের বন্ধু তাকে সহকারী ডিজাইনার হিসেবে নিয়েছেন। ভদ্রলোক ছোটখাটো। মাগুর মাছের মত কালো রঙ। ফিটফাট বাবু সেজে থাকেন। তার কাছে গেলেই আফটার শেভ লোশনের কড়া গন্ধে মাথা ধরে যায়। তার নাম মন্তাজ মিয়া। ছবির লাইনে পনের বছর ধরে...

০৮. লোকটিকে এই বসার ঘরে ঠিক মানাচ্ছে না

লোকটিকে এই বসার ঘরে ঠিক মানাচ্ছে না। রোগা ধরনের অভাবী টাইপের একজন মানুষ। চোখে মোটা কাচের চশমা। স্যান্ডেল ঘরের বাইরে খুলে রেখে এসেছে। সেই স্যান্ডেলগুলির জরাজীর্ণ অবস্থা। অন্য কেউ হলে ফেলে দিত। এই লোক ফেলতে পারছে না। এই ঘরে যে লোকটিকে মানাচ্ছে না, তা সে নিজেও বুঝতে...

০৯. হেলেনা ভিজিটার্স রুমে

হেলেনা ভিজিটার্স রুমে ঢুকে একটু অবাক হলেন। ফখরুদিন সাহেব বসে আছেন। তার হাতে জ্বলন্ত চুরুট। হেলেনা অবশ্যি তার বিস্ময় গোপন করলেন। সহজ স্বরে বললেন, কেমন আছ? খুব ভাল। চুরুট টানছ? স্মোকিং এখানে নিষিদ্ধ। দেয়ালে লেখা চোখে পড়েনি? পড়েছে। দেয়ালে লেখা ধূমপান না করার জন্যে...

১০. ফিরোজের দুপুরে ঘুমানোর অভ্যেস নেই

ফিরোজের দুপুরে ঘুমানোর অভ্যেস নেই। তার ধারণা গৃহী টাইপের মহিলা এবং ডায়াবেটিক প্রৌঢ়রাই নিয়ম করে দুপুরে ঘুমায়। একজন ইয়ংম্যান, যার রক্তে উত্তেজনা টলমল করছে, তার দুপুরে ঘুমানোর প্রশ্নই উঠে না। ফিরোজের ধারণা, সে নিজে একজন ইয়াংম্যান এবং তার রক্তে উত্তেজনা। টলমল করছে।...

১১. রান্নাঘরে নিশানাথবাবুর স্ত্রী

রান্নাঘরে নিশানাথবাবুর স্ত্রী চারদিকে বাসনপত্র ছড়িয়ে কী-সব যেন করছেন। বাবুর্চি গোমেজ, চোখ-মুখ কুঁচকে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে। গোমেজ এই মহিলাটিকে পছন্দ করছে না। এই মহিলা সরাসরি তার সাম্রাজ্যে হস্তক্ষেপ করছে। যখন-তখন রান্নাঘরে ঢুকে জিনিসপত্র এলোমেলো করে দিচ্ছে। এখন আর কোনো...

১২. ফিরোজের জ্বর তৃতীয় দিনে নেমে গেল

ফিরোজের জ্বর তৃতীয় দিনে নেমে গেল। তার ধারণা হয়েছিল ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া এইসব কিছু একটা হয়েছে। তা নয়, ঠাণ্ডা লেগেছিল। তা তাকে তেমন কাবু করতে পারল না। এই তো আজ বেশ উঠতে বসতে পারছে। সিগারেটের তৃষ্ণা হচ্ছে। সিগারেটের তৃষ্ণা হবার মানে রোগ সেরে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নিচে...

১৩. নিশানাথবাবু দোতলায় উঠে এসে

রাত দশটা। নিশানাথবাবু দোতলায় উঠে এসে অপালার দরজায় ধাক্কা দিলেন। মা, একটু দরজা খুলবে? অপালা দরজা খুলল। তার চোখ লাল। দৃষ্টি এলোমেলো। নিশানাথবাবু মৃদু স্বরে বললেন, কী হয়েছে? কই, কিছু হয়নি তো। কী হবে? আজ তুমি কোথায় গিয়েছিলে? ম্যানেজার কাকু, আজ আমার কথা বলতে ভাল লাগছে না।...

১৪. অপালা বাসায় ফিরল

প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা নিয়ে অপালা বাসায় ফিরল। বাসায় অনেক মানুষ। ড্রয়িং রুমে আলো জ্বলছে। কিছু লোকজন বসে আছে সেখানে। বারান্দায় চিন্তিত মুখে ম্যানেজারবাবু এবং চিটাগাং ব্রাঞ্চের জি এম. হাঁটাহাঁটি করছেন। নিশানাথবাবু ছুটে এলেন, কোথায় ছিলে এতক্ষণ? অপালা তার জবাব দিল না।...

১৫. দরজা খুলল বড় মেয়েটি

দরজা খুলল বড় মেয়েটি। অপালা এর নাম জানে না। শুধু এর কেন, কারোরই নাম জানে না। আজও হয়ত জানা হবে না। অপালা ক্ষীণ স্বরে বলল, ভেতরে আসব? বড় মেয়েটি হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। শুধু দরজা ছেড়ে একটু সরে গেল। অপালা বলল, তোমার নাম কী? আমার নাম সোমা! তোমারই কী বিয়ে হচ্ছে? হ্যাঁ। বিয়েটা...

১৬. এখন দুপুর

এখন দুপুর। গরমের দুপুরে চারদিক ঝিম ধরে থাকে। ভূতে মারে ঢ়িল। কিন্তু শীতের দুপুরগুলো অন্য রকম। সকাল-সকাল একটা ভাব লেগে থাকে। রোদে পিঠ মেলে খবরের কাগজ হাতে বসে থাকতে চমৎকার লাগে। ফিরোজ বেশিক্ষণ রোদে বসে থাকতে পারল না। ছায়া এসে পড়ল। তার ঘুম-ঘুম পাচ্ছে। সমস্ত শরীর জুড়ে...

১৭. অপালা শান্ত ভঙ্গিতে হাঁটছে

অপালা শান্ত ভঙ্গিতে হাঁটছে। সোমাদের বাড়ি থেকে বের হয়েছে অনেক আগে, কিন্তু এখনো তার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। কত-কত জায়গায় সে গেল! একটি গলি ছাড়িয়ে অন্য একটি গলি, তারপর একটা বড় রাস্তা। আবার একটা গলি। একসময় সে একটা ফাঁকা মাঠের কাছে এসে পড়ল। চারদিক অন্ধকার হয়ে এলেও একদল...

১৮. অপালা নিচে নেমে এল

ওরা চলে যাবার পরপরই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অপালা নিচে নেমে এল। তাকে দেখে মনে হল, সে দীর্ঘ সময় নিয়ে সাজগোজ করেছে। গায়ে হালকা লাল রঙের শাড়ি। গলায় গাঢ় লাল রঙের রুবি-বসানো হার। কানের দুলের পাথর অবশ্যি রুবি নয়। স্বচ্ছ টোপাজ। লাল শাড়ির প্রতিফলনে সেগুলোও লালচে দেখাচ্ছে।...