অন্ধকারের গান (১৯৯৭)

অন্ধকারের গান - উপন্যাস - অন্ধকারের গান

০১. বুলুদের এই বাড়ির মতো বাড়ি

বুলুদের এই বাড়ির মতো বাড়ি বোধহয় ঢাকা শহরে খুব বেশি নেই। পুরানো আমলের হিন্দু বাড়ি। তুলসি মঞ্চ আছে। ছোট্ট একটা ঠাকুর ঘর আছে। ঠাকুর ঘরের দক্ষিণে গহীন একটা কুয়া। বাড়ির গেটে সিংহের দুটি মূর্তি। প্রায় ত্রিশ বছর আগে, ১৯৫৮ সনে বাড়ির মালিক নিত্যরঞ্জন বাবুর কাছ থেকে। বুলুর বাবা...

০২. ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর

ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর অলিকের একটা বিশ্রী অভ্যাস হয়েছে—দুপুরে ঘুমানো। তাদের সব ক্লাস দেড়টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। একটা সাবসিডিয়ারি ক্লাস আছে তিনটায়। সপ্তাহে একদিন। সাবসিডিয়ারির স্যার একদিন আসেন তো তিন দিন আসেন না। পড়ানোরও কোনো আগা মাথা নেই, একদিন যেটা পড়ালেন পরদিন...

০৩. ওসমান গনির অফিস ঘর

ওসমান গনির অফিস ঘরটি ছোট। তাঁর সামনে একটি মাত্র চেয়ার। তিনি একসঙ্গে বেশি মানুষের সাথে কথা বলতে পারেন না। এক জনের সঙ্গে কথা বলেন। আজ মিজান সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু মিজান সাহেব এখনো এসে পৌঁছান নি। গনি সাহেব হাতে ঘড়ি পরেন না। তাঁর এই ঘরে কোন ঘড়িও নেই। তবু...

০৪. সপ্তাহে একদিন মিজান সাহেব

সপ্তাহে একদিন মিজান সাহেব লীনা ও বাবলুকে নিয়ে পড়াতে বসেন। দিনটা হচ্ছে বৃহস্পতিবার। গত সপ্তাহে তিনি পড়ানোর কাজটি করেন নি। বাবলুর মনে ক্ষীণ আশা—হয়ত আজও পড়াবেন না। বাসার পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। ভাইয়া এখনো ফেরে নি। তার কোনোরকম খোঁজও নেই। বড় আপা ঐ রাতের ঘটনার পর কারো সঙ্গে...

০৫. অলিকের ক্লাস ছিল এগারটায়

অলিকের ক্লাস ছিল এগারটায়-পোয়েট্রি ক্লাস। আজ পড়ানো হবে টেড হিউজের থট ফক্স। রাতের বেলা সে একবার পড়ল। পড়ে মনে হল—বাহ বেশ তো। সুন্দর কবিতা। Till with a sudden hot stink of fox It enters the dark hole of the head. The window is starless still: the clock ticks, The page is...

০৬. মাথা নিচু করে চা খাচ্ছে

এটা কে? বুলু না? মাথা নিচু করে চা খাচ্ছে। গায়ে চেক হাওয়াই শার্ট। হাতে একটা সিগারেটও আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। পেছনটা দেখা যাচ্ছে। মিজান সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। কল্যাণপুর বাস ডিপোর সঙ্গের রেস্টুরেন্ট। বখা ছেলেদের আড্ডা। এদের মধ্যে এক জন আছে—অতি বদ। স্কুল ড্রেস পরা কোনো...

০৭. চারদিক কেমন নিঝুম

দুপুর বেলা চারদিক কেমন নিঝুম হয়ে থাকে। ফরিদা বারান্দায় পাটি পেতে শুয়ে থাকেন। বাবলু, লীনা স্কুলে। বীণা সারা দুপুর কুয়াতলায় বসে কি সব বইপত্র পড়ে। সুনসান নীরবতার মধ্যে একমাত্র সরব ব্যক্তি বীণার দাদী। যদিও দুপুর বেলায় তার গলা খাদে নেমে যায়। একঘেয়ে স্বরে তিনি বিড়বিড় করেন।...

০৮. ডারমাটোলজিস্ট প্রফেসর বড়ুয়া

ডারমাটোলজিস্ট প্রফেসর বড়ুয়া হাসতে হাসতে বললেন, এটা তো কিছুই না। এক ধরনের ফাংগাস। নিম্নশ্রেণীর এককোষী উদ্ভিদ। বোরহান সাহেব বললেন, ভাই ভালো করে দেখুন। ভালো করেই দেখেছি। এইসব ফাংগাসরা অনেক জায়গায় বংশ বিস্তার করতে পারে। মানুষের চামড়া তাদের বংশ বিস্তারের জন্যে ভালো জায়গা।...

০৯. বুলুর পা কিছুতেই সারছে না

বুলুর পা কিছুতেই সারছে না। আজ পায়ের যন্ত্রণায় তার জ্বর এসে গেল। গ্রিন ফার্মেসির ডাক্তার এক গাদা এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন—ভেতরে কাঁটা রয়ে গেছে। বোধ হয়। কেটে বের করতে হবে। আপনি বরং কোন একটা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান। বুলু অবাক হয়ে বলল, সামান্য কাঁটা ফুটার জন্য...

১০. গনি সাহেব বললেন

গনি সাহেব বললেন, কী মিজান সাহেব, আপনাকে এ রকম দেখাচ্ছে কেন? শরীর খারাপ? জ্বি না। শরীর খারাপ হলে বাসায় চলে যান। সবারই বিশ্রাম দরকার। মিজান সাহেব বললেন, আমার স্যার শরীর ঠিক আছে। তাহলে কি মন খারাপ? মন খারাপ হবার তো কোনো কারণ নেই, ছেলে ফিরে এসেছে। মিজান সাহেব...

১১. বারটার সময় বাবার সঙ্গে দেখা

বারটার সময় বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাবার কথা। বুলু যেতে পারে নি। সকাল থেকেই তার গা আগুনে গরম। পায়ে অসহ্য ব্যথা। পায়ের নিচটা কেমন নীল হয়ে গেছে। বীণা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকে একটা ধাক্কা খেল। গোঙানীর শব্দ হচ্ছে। বুলুর মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। চোখ ঘোর রক্তবর্ণ। বীণা বলল, কি...

১২. চমৎকার একটা নীল শাড়ি

অলিক আজ চমৎকার একটা নীল শাড়ি পরেছে। সেজেছেও খুব যত্ন করে। তাকে জলপরীর মতো লাগছে। ডারমাটোলজিস্ট প্রফেসর বড়ুয়া বললেন, কেমন আছ মা? অলিক বলল, আমি ভালো আছি। আপনি সাত দিন পর আসতে বলেছিলেন, আমি এসেছি। দেখি, তোমার দাগের কি অবস্থা। দেখুন। প্রফেসর বড়ুয়া দেখলেন। দাগ আরো...

১৩. বিয়ের কথা

মিজান সাহেব ফরিদাকে বিয়ের কথা ভেঙে কিছুই বলেন নি। তবু ফরিদা সবই জেনে গেলেন। ছেলের এক ফুপু এসে সব রহস্য ফাঁক করে দিলেন। ছেলে দেশে থাকে না থাকে নিউ অরলিন্সে। ডাক্তারী পাশ করেছে জন সেন্ট লুক থেকে। বয়স একত্রিশ। আমেরিকার রেসিডেন্সশিপ গত বছর পেয়েছে। সে বড় হয়েছে আমেরিকাতে।...

১৪. বুলুর পায়ে গ্যাংগ্রিন

বুলুর পায়ে গ্যাংগ্রিন ধরা পড়েছে। দুবার অপারেশন হল। তৃতীয় বারও সম্ভবত হবে। দুজন ডাক্তারের এক জন কিছুতেই পা এম্পুট করতে রাজি না। সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যেতে চান। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচারী মেদিনীর মতো অবস্থা। এই ডাক্তারটির বয়স অল্প। হৃদয় কঠিন হতে শুরু করে নি। তিনি...

১৫. খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে

গনি সাহেবকে আজ খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। অফিসে এসেই তিনি নিয়মের বাইরে একটা কাজ করেছেন। তাঁর সেক্রেটারিকে ধমক দিয়েছেন। অবশ্য ধমক দেয়ার পরপরই নিজেকে সামলে নিয়ে হাসি মুখে বলেছেন, কাজ কর্ম কেমন চলছে? সেক্রেটারি শুকনো গলায় বলল, জ্বি স্যার ভালো। তিন অক্ষরের সুন্দর একটা নাম বের...

১৬. ফরিদা আবার ঐ মেয়েটিকে দেখলেন

অনেকদিন পর ফরিদা আবার ঐ মেয়েটিকে দেখলেন। ঘোমটা দেয়া মেয়েটা, কুয়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা মাত্র মিলিয়েছে। আকাশ মেঘে ঢাকা বলে একটু বেশি অন্ধকার। তবু তার মধ্যেও মেয়েটিকে পরিষ্কার দেখা গেল। তিনি প্রথমে ভাবলেন বীণা। পর মুহূর্তেই মনে হল—না এতো বীণা না। তিনি তীক্ষ্ণ গলায়...

১৭. মৃত রোগীর আত্মীয়

ডাক্তাররা মৃত রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে সাধারণত কোনো কথা বলতে চান না। কিন্তু এই ডাক্তার বললেন। অপারেশন থিয়েটারের বাইরের কাঠের বেঞ্চিতে বসে থাকা মিজান সাহেবের সামনে এসে স্পষ্ট গলায় বললেন, আমি খুবই লজ্জিত। মিজান সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, লজ্জিত হবার কী আছে। চেষ্টার ত্রুটি যদি...

১৮. সুন্দর একটা চিঠি

অলিক আমেরিকা থেকে সুন্দর একটা চিঠি লিখেছে। চিঠিতে জীবনের চমৎকার সব ঘটনা এত সুন্দর করে লেখা। বার-বার পড়তে ইচ্ছা করে। চিঠি শেষ করবার আগে বুলুর কথা লিখল। বীণার কথা লিখল। কি সুন্দর করেই না লিখল— বীণা, তোর ভাইটা খুব ভালমানুষ ধরনের ছিল। ভাগ্যিস তার সঙ্গে আমার বেশি দেখা টেখা...