হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম (১৯৯৬)

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম (১৯৯৬)

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০১

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০১ আজকের দিনটা এত সুন্দর কেন? সকালবেলা জানালা খুলে আমি হতভম্ব। এ কী! আকাশ এত নীল! আকাশের তো এত নীল হবার কথা না। ভূমধ্যসাগরীয় আকাশ হলেও একটা কথা ছিল। এ হচ্ছে খাটি বঙ্গদেশীয় আকাশ, বেশিরভাগ সময় ঘোলা থাকার কথা। আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতেই...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০২

‘আপনার নাম কী?’ আমি ইতস্তত করছি, নাম বলব কি বলব না ভাবছি। কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে আমরা সাধারণত খুব আগ্রহের সঙ্গে নাম বলি। জিজ্ঞেস না করলেও বলি। হয়তো বাসে করে যাচ্ছি- পাশে অপরিচিত এক ভদ্রলোক। দুএকটা টুকটাক কথার পরই হাসিমুখে বলি, ভাইসাহেব, আমার নাম হচ্ছে...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৩

পুলিশের গাড়ি আমাকে কাওরান বাজার নামিয়ে দিয়ে গেল। ড্রাইভারের গায়েও খাকি পোশাক । সে বেশ আদবের সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে আমাকে নামতে সাহায্য করল। তার পরই এক স্যালুট। আমি অস্বস্তির সঙ্গে চারদিকে তাকালাম- কেউ দেখে ফেলছে না তো? পুলিশ আদবের সঙ্গে গাড়ি থেকে নামাচ্ছে,...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৪

হিরোস ওয়েলকাম’ বলে একটি বাক্য আছে। মহান বীর যুদ্ধজয়ের পর দেশে ফিরলে যা হয়— আনন্দ-উল্লাস, আতশবাজি পোড়ানো, গণসংগীত। থানায় পা দেয়া মাত্র হিরোস ওয়েলকাম বাক্যটি আমার মাথায় এল। আমাকে নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেল। সেন্ট্রির সেপাই একটা বিকট চিৎকার দিল- “আরে হিমু ভাইয়া!”...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৫

গল্প-উপন্যাসে “পাখি-ডাকা ভোর” বাক্যটা প্রায়ই পাওয়া যায় । যারা ভোরবেলা পাখির ডাক শোনেন না তাদের কাছে ‘পাখি-ডাকা ভোরের” রোমান্টিক আবেদন আছে। লেখকরা কিন্তু পাঠকদের বিভ্রান্ত করেন- তারা পাখি-ডাকা ভোর বাক্যটায় পাখির নাম বলেন না। ভোরবেলা যে-পাখি ডাকে তার নাম কাক ।...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৬

ফুপা টেলিগ্রামের ভাষায় চিঠি পাঠিয়েছেন– Emergency come sharp. চিঠি নিয়ে এসেছে তার অফিসের পিওন। সে যাচ্ছে না, চিঠি হাতে দিয়ে চোখমুখ শক্ত করে দাড়িয়ে আছে। আমি বললাম, কী ব্যাপার? সে শুকনা গলায় বলল, বখশিশ । ‘বখশিশ কিসের? তুমি ভয়ংকর দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছ।...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৭

মারিয়ার বাবা আসাদুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় বলাকা সিনেমা হলের সামনের পুরানো বইয়ের দোকানে। আমি দূর থেকে লক্ষ্য করলাম এক ভদ্রলোক পুরানো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে চামড়ায় বাঁধানো মোটা একটা বই। তিনি খুবই অসহায় ভঙ্গিতে চারদিকে তাকাচ্ছেন, যেন জনতার ভেতর...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৮

‘কেমন আছেন আসগর সাহেব?’ ‘জি ভালো ।’ ‘কীরকম ভালো?’ আসগর সাহেব হাসলেন। তার হাঁসি দেখে মনে হলো না তিনি ভালো। মৃত্যুর ছায়া যাদের চোখে পড়ে তারা এক বিশেষ ধরনের হাসি হাসে । উনি সেই হাসি হাসছেন। আমি একবার ময়মনসিংহ সেন্ট্রাল জেলে এক ফাঁসির...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৯

অনেকদিন পর বাবাকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি খুব চিন্তিত মুখে আমার বিছানায় বসে আছেন। গায়ে খন্দরের চাদর । হাত দুটা কোলের উপরে ফেলে রাখা । চোখে চশমা । চশমার মোটা কাচের ভেতর থেকে তার জ্বলজ্বল্লেংচোখ দেখা যাচ্ছে। আমি বাবাকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসলাম । বাবা বললেন, কেমন আছিস...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ১০

ফুপার বাড়িতে আজ উৎসব। বাদল তার কেরোসিন টিন ব্যবহার করতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাশ হয়েছে। খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেছেন। দুই দলের মর্যাদা বহাল আছে। দু’দলই দাবি করছে তারা জিতেছে। দু’দলই বিজয়-মিছিল বের করেছে। সব খেলায় একজন জয়ী হন, অন্যজন পরাজিত হন।...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ১১

‘আসগর সাহেব কেমন আছেন?’ আসগর সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টি। আমাকে চিনতে পারছেন বলে মনে হলো না। ‘দেশ তে ঠিকঠাক হয়ে গেছে। আপনার অপারেশন কবে হবে?’ ‘আজ সন্ধ্যায় ।’ ‘ভালো খুব ভালো।’ ‘হিমু ভাই!’...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ১২

মারিয়াদের বাড়ির নাম- চিত্ৰলেখা । আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর পর চিত্ৰলেখার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মানুষ তাদের বাড়ির নাম কেন রাখে? তাদের কাছে কি মনে হয় বাড়িগুলিও জীবন্ত? বাড়িদের প্রাণ আছে- তাদেরও অদৃশ্য হৃৎপিণ্ড ধকধক করে? কলিংবেল টিপে অপেক্ষা করছি। কেউ এসে গেট খুলছে না।...

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ১৩ (শেষ)

মারিয়া বলল, বসুন। তার চোখমুখ কঠিন, তবু মনে হলো সেই কাঠিন্যের আড়ালে চাপা হাসি ঝিকমিক করছে। সে সুন্দর একটা শাড়ি পরেছে। চাপা রঙের শাড়ি । রঙটা এমন যে মনে হচ্ছে ঘরে চাপাফুলের গন্ধ পাচ্ছি। গলায় লাল পাথর। চুনি নিশ্চয় না। চুনি এত বড় হয় না। ‘রকিং-চেয়ারে আরাম করে...