পারাপার (১৯৯৩)

পারাপার (১৯৯৩) - হিমু সিরিজের ৪র্থ উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ।

পারাপার – ০১

ঢাকা শহরে ঘুঘুর ডাক শোনার কথা না। কেউ কোনোদিন শুনেছে বলেও শুনি নি।ঘুঘু শহর পছন্দ করে না, লোকজন পছন্দ করে না।তাদের পছন্দ গ্রামের শান্ত দুপুর।তারপরেও কী যে হয়েছে—আমি ঘুঘুর ডাক শুনছি।বাংলাবাজার যাচ্ছিলাম, গুলিস্তানে ট্রাফিক জ্যামে পড়লাম।রিকশা, টেম্পো, বাস, ঠেলাগাড়ি...

পারাপার – ০২

এ দেশের বিত্তবান সম্প্রদায় বাস করেন গুলশান, বনানী এবং বারিধারায়।এই প্রচলিত ধারণা ঠিক নয়।পুরনো ঢাকার গলি তস্য-গলি করতে করতে যেখানে এসে দাঁড়ালাম সেখানে দু-তিন বিঘার মতো জায়গা নিয়ে এক ‍দুর্গ দাঁড়িয়ে আছে।চারদিকে জেলখানার মতো উঁচু এবং ভারি দেয়াল।দেয়ালের মাথায়...

পারাপার – ০৩

কাল সারারাত ঘুম হয় নি। ঘুম না হবার কোনো কারণ ছিল না। কারণ ছাড়াই এই পৃথিবীতে অনেক কিছু ঘটে। দিনের আলো ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ঘুমোতে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে চোখভর্তি ঘুম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। ঘুম ভাঙল স্বপ্ন দেখে। আমার বাবাকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি আমার গা ঝাঁকাতে...

পারাপার – ০৪

ছোট্ট একটা ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে এর মাপ দু-তিনের বেশি হবে না। পরপর দুবার সামান্য ঝাঁকুনি। এতেই হইচই, ছোটাছুটি। আমার পাশের ঘরে তাসখেলা হচ্ছিল। গতকাল রাত এগারটায় শুরু হয়েছিল, এখান সকাল আটটা। এখনো চলছে। ছুটির দিনে পয়সা দিয়ে খেলা হয়। ম্যারাথন চলে। তাসুড়েরা তাস...

পারাপার – ০৫

ইয়াকুব আলী সাহেবের ম্যানেজার মইন খান আজ স্যুট পরেছেন। আজ তাঁকে আরো সুন্দর লাগছে। বয়স কম লাগছে। গলায় লাল রঙের টাই। লাল টাইয়ে ভদ্রলোককে খুব মানিয়েছে। যারা কোনোদিন টাই পরে না তারাও এই ভদ্রলোককে দেখলে টাইয়ের দরদাম করবে। স্লামালিকুম মইন সাহেব। ওয়ালাইকুম সালাম। আপনি...

পারাপার – ০৬

রূপা ঘুম-ঘুম গলায় বলল, হ্যালো। আমি বললাম,কেমন আছ রূপা? সে জবাব দিল না। চুপ করে রইল। আমি আবার বললাম, কেমন আছ রূপা? রূপার ছোট্ট একটা শ্বাস নেবার শব্দ শুনলাম। তারপর পরিষ্কার গলায় বলল, ভালো আছি। ঘুম-ঘুম গলায় কথা বলছ কেন? ঘুমোচ্ছিলাম। ঘুম ভেঙে টেলিফোন ধরছি, এই জন্যেই...

পারাপার – ০৭

আকাশ মেঘলা হয়েছিল। শীতকালে আকাশে মেঘ মানায় না। শীতের আকাশে থাকবে ঝকঝকে রোদ। আমি হাইকোর্টের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছি বলেই একজনের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমি লজ্জিত হয়ে কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, মাফ করে দিয়েছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে যে মন-খারাপ...

পারাপার – ০৮

আপনার নাম কি মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদার? জি। ভালো আছেন? মুনশি বদরুদ্দিন জবাব দিলেন না, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়ার তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। আমার সঙ্গে কথাবার্তাও চালাতে চাচ্ছেন না। তালগাছের মতো লম্বা একজন মানুষ। রোগা। ক্লান্ত চেহারা। নামের...

পারাপার – ০৯

মোহাম্মদ রজব খোন্দকার থানায় ছিলেন না। থানার ভেতরেই তাঁর কোয়াটার। গেলাম কোয়র্টারে। আশঙ্কা ছিল তিনি আমাকে চিনতে পারবেন না। অল্প কিছুক্ষণের পরিচয়। না পাবারই কথা। পুলিশদের স্মৃতি দুর্বল হয়। কিন্তু তিনি আমাকে চিনলেন, আনন্দিত গলায় বললেন—আরে দি গ্রেট হিমবাবু। চিনতে পেরেছেন?...

পারাপার – ১০

বড় খালা সাধারণত দশটা বাজার আগেই ঘুমিয়ে পড়েন। এখন সাড়ে এগারটা বাজে। এত রাত পর্যন্ত তিনি কখনোই জাগেন না।আজ জেগে ছিলেন। কলিংবেল বাজতেই নিজে দরজা খুললেন। আমি বললাম, তুমি দোতলা থেকে নামলে কেন? আর লোকজন কোথায়? বড় খালা কাঁদো-কাঁদো গলায় বললেন, তোর খালুজান সেই যে গিয়েছে আর...

পারাপার – ১১ (শেষ)

ইয়াকুব সাহেবের অবস্থা শোচনীয়। তাঁর চোখ বন্ধ। হাত থরথর করে কাঁপছে। ঠোঁটে ফেনা জমছে। একজন নার্স রুমাল দিয়ে ঠোঁট মুছিয়ে দিচ্ছে। নার্স মেয়েটি খুব ভয় পেয়েছে। তবে যে দুজন ডাক্তার উনার দুপাশে দাঁড়িয়ে তারা শান্ত। তাঁদের চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ নেই। মিতু বাবার হাত ধরে বসে আছে।কী...