ইরিনা

০১. লোকটির মুখ লম্বাটে

লোকটির মুখ লম্বাটে। চোখ দুটি তক্ষকের চোখের মতো। কোটির থেকে অনেকখানি বেরিয়ে আছে। অত্যন্ত রোগা শরীর। সরু সরু হাত। হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা। কাঁধে ঝুলছে নীলরঙা চকচকে ব্যাগ। তার দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে একটি বিনীত ভঙ্গি আছে। নিশ্চয়ই কিছু-একটা গছাতে এসেছে। দুপুরের দিকে এ...

০২. ট্রেন ছুটে চলেছে

ট্রেন ছুটে চলেছে। গতি একশ কিলোমিটারের কাছাকাছি। আলট্রাভায়োলেট প্রতিরোধী স্বচ্ছ কাচের জানালার পাশে ইরিনা বসে আছে। বাইরের পৃথিবীর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অরচ লীওন বললেন, তুমি বোধ হয় এই জীবনের প্রথম ট্রেনে চড়লে। হ্যাঁ। আমি প্রথম শহরের মানুষ। ট্রেনে চড়ার সৌভাগ্য আমার হবে...

০৩. ছেলেটি হাবাগোবার মতো

ছেলেটি হাবাগোবার মতো। কিছু কিছু বয়স্ক মানুষ আছে, যাদের দেখলেই মনে হয় এরা কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা হাস্যকর কিছু করবে। এবং এটা যে হাস্যকর, তা বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে তাকাবে। একেও সে রকম লাগছে। মোটা ফ্রেমের চশমা। সেই চশমা নাকের ডগায় চলে এসেছে। দেখতে অস্বস্তি...

০৪. চমৎকার সকাল

চমৎকার সকাল। সূর্যের আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। আকাশের রঙ ঘন নীল। ছবির মতো সুন্দর একটি শহরে ট্রেন এসে থেমেছে। ট্রেন থেকে নেমে তারা একটি ছোট্ট কাচের ঘরে ঢুকল। এখান থেকে চারদিক দেখা যায়। ইরিনা মুগ্ধ হয়ে গেল। কেউ তাকে বলে দেয় নি, কিন্তু সে বুঝতে পারছে এটা হচ্ছে তৃতীয় শহর।...

০৫. ইরিনা জেগে উঠে দেখল

ইরিনা জেগে উঠে দেখল একটি প্রকাণ্ড গােলাকৃতি ঘরের ঠিক মাঝখানে সে শুয়ে আছে। ঘরটি অদ্ভুত। চারদিকের দেয়াল থেকে অস্পষ্ট নীলাভ আলো ছড়িয়ে পড়ছে, তাকালেই মন শান্ত হয়ে আসে। হালকা, প্ৰায় অস্পষ্ট সুর ভেসে আসছে। খুব করুণ কোনো সুর। ইরিনার মনে হল সে বোধ হয়। স্বপ্ন দেখছে। মাঝে মাঝে...

০৬. মীর মহাসুখী

মীর মহাসুখী। বছরের পর বছর তাকে এই ঘরে কাটাতে হতে পারে এই সম্ভাবনায় সে। রীতিমতো উল্লাসিত। সে হাসিমুখে রোবটকে বলল, সময় কাটান নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হবে না? না, তা হবে না। পড়াশোনার জন্য প্রচুর বইপত্র নিশ্চয়ই আছে? তা আছে। পড়াশোনার বিষয়ের ওপর কি কোনো বিধিনিষেধ আছে? না, নেই।...

০৭. দাবা সেটের সামনে

তিনি বসে আছেন একটি দাবা সেটের সামনে। দাবা সেটটি অন্যগুলোর মতো নয়। এখানে স্কয়ারের সংখ্যা একাশিটি। তিনটি নতুন পিস যুক্ত করা হয়েছে। এই পিসগুলোর কর্মপদ্ধতি কী হলে খেলােটাকে যথেষ্ট জটিল করা যায়, তা-ই তিনি ভাবছিলেন। মাঝে মাঝে কথা বলছেন সিডিসির সঙ্গে। সিডিসি হচ্ছে নিষিদ্ধ...

০৮. অধিবেশন শুরু হয়েছে

অধিবেশন শুরু হয়েছে। হলঘরের মতো একটি গোলাকার কক্ষ। চক্রাকারে চল্লিশটি গদি,আটা চেয়ার সাজান। একটা সময় ছিল যখন চল্লিশ জন বৃত্তের মতো বসতেন। আজ এসেছেন ন জন। এদের একসময় একটা করে নাম ছিল। এখন এদের কোনো নাম নেই কারণ দীর্ঘ জীবনের এঘেয়েমি কাটাতে তাঁরা নাম বদল করতেন। কুড়ি-পঁচিশ...

০৯. আজ তুমি কেমন আছ

আজ তুমি কেমন আছ, ইরিনা? ভালো। মনের অস্থির ভাব কিছুটা কি কমেছে? হ্যাঁ। মানুষদের সঙ্গে রোবটদের একটা মিল আছে। এরা সব অবস্থায়, সব পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আমি কি ঠিক বলি নি? হয়তো ঠিক বলেছ। তবে মানুষদের মধ্যে হয়তো ব্যাপারটা খুব বেশি। নিশ্চিতভাবে এরা কোনো...

১০. তাঁর মন খুবই খারাপ

তাঁর মন খুবই খারাপ। প্ৰায় এক ঘণ্টা তিনি তার ঘরের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত হাঁটলেন। তার স্বভাব হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর সিডিসিকে ডেকে তার সঙ্গে কথা বলা। এই এক ঘণ্টায় তিনি এক বার সিডিসিকে ডাকেন নি। দুপুরের খাবার খান নি। সবচে বড় কথা, একবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মুগ্ধ...

১১. ইরিনার ভয় লাগছে না

ইরিনার ভয় লাগছে না। সে বেশ সহজ ভঙ্গিতেই হাঁটছে। জায়গাটাকে প্ৰকাণ্ড গুহার মতো মনে হচ্ছে, যে গুহার ভেতর মাকড়সার জালের মতো অসংখ্য টানেল। কোনো একটি টানেল ধরে কিছুদূর যাবার পরই টানেলটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। কোনো কোনো জায়গায় তিন ভাগ হয়। কিছু টানেল অন্ধ গলির মতো। কোথাও যাবার...

১২. তিনি হাত বাড়িয়ে

তিনি হাত বাড়িয়ে মাথার কাছে চৌকো ধরনের সুইচ টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে পি পি করে দুবার শব্দ হল। একটি লাল আলো জ্বলে উঠল। তিনি মূল কম্পিউটার সিডিসির সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। এখন এই ঘরে কী হবে না হবে তা তিনি ছাড়া কেউ জানবে না। তবু নিশ্চিত হবার জন্যে তিনি পরপর তিনবার...

১৩. অরচ লীওন থরথর করে কাঁপছেন

অরচ লীওন থরথর করে কাঁপছেন। তার সামনে অমর মানুষদের একজন বসে আছে। মহাশক্তিধর, মহাক্ষমতাবানদের একজন। পৃথিবীর নিয়ন্তা। পুরনো কালের ঈশ্বরের মতোই একজন। কী অপূর্ব রূপবান একটি যুবক! বস, অরচ লীওন। তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছ? জ্বি পাচ্ছি। আমাকে দেখে কি ভয়াবহ মনে হচ্ছে? জ্বি না।...

১৪. গোলকধাঁধার ভেতর

গোলকধাঁধার ভেতর একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখা গেল। ইরিনা মীরের বা হাত শক্ত করে ধরে ছোট ছোট পা ফেলছে। দুজনের পাশাপাশি পা ফেলা মুশকিল। কষ্ট করে হাঁটতে হচ্ছে, তবু তারা হাসিখুশি। মীর বলল, সময়টা আমাদের ভালোই কাটছে, কি বল? হ্যাঁ ভালোই। খিদে লাগছে না? উঁহু। বুঝলে ইরিনা, আমি...

১৫. অরচ লীওন রেডিয়েশন গান দিয়ে

অরচ লীওন রেডিয়েশন গান দিয়ে সিডিসির ক্ষুদ্র একটি অংশ উড়িয়ে দিলেন। ছোটখাট একটি বিস্ফোরণ হল। তীব্ৰ নীলচে আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। একটি প্রহরী রোবট ছুটে এল। কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল, আপনার হাতে এটা কি একটি রেডিয়েশন গান? অরচ লীওন বললেন, তাই তো মনে হচ্ছে। আপনার কি মনে হচ্ছে না,...

১৬. সিডিসি আর কাজ করছে না

সিডিসি আর কাজ করছে না, এটি তিনি জানেন। তবু কি মনে করে তিনি তাঁর অভ্যাসমতো ডাকলেন, সিডিসি। কোনো জবাব পাওয়া গেল না। তিনি জবাবের আশাও করেন নি, তবু কেন জানি মনে হচ্ছিল কোনো একটা জবাব পাওয়া যাবে। দীর্ঘদিন জবাব পেয়ে পেয়ে তাঁর অভ্যাস হয়ে গেছে। এক দিন দুদিনের ব্যাপার নয়, পাঁচ...

১৭. ইরিনার চোখে গভীর বিস্ময়

ইরিনা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ইরিনার চোখে গভীর বিস্ময়। ইনি এক জন অমর মানুষ। পাঁচ শ বছর ধরে বেঁচে আছেন, অথচ কী চমৎকার চেহারা!! কী সুন্দর স্বপ্নময় চোখ! কি মধুর করেই না। তিনি হাসছেন! গভীর মমতা ঝরে পড়ছে তার হাসিতে। তুমি ইরিনা? জ্বি। সিডিসি অনেক ঝামেলা করে তোমাকে এখানে...