নিষাদ – মিসির আলি

০১. মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছেন

মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছেন। রোগী লম্বা এক জন মানুষ। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কারণ লোকটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই গরমেও ফুল হাতা ফ্লানেলের শার্ট, ফুলপ্যান্টটি চকচকে কাপড়ের তৈরী; ছাঁটের ধরন দেখে মনে হয় সেকেণ্ডহ্যাণ্ড মার্কেট থেকে কেনা। এ ধরনের ছাঁটের প্যান্ট ঢাকায়...

০২. আমার ডাক নাম টুলু

আমার ডাক নাম টুলু। আমার একটা ছোট্ট বোন ছিল, ওর নাম ছিল নুন্টু টুনু উলটো করলে হয় নুটু। বাবা এই নাম রাখলেন। কারণ ওর স্বভাব ছিল আমার একেবারে উলটো। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব শান্ত প্ৰকৃতির। কারো সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলতাম না! কেউ ধমক দিয়ে কিছু বললে সঙ্গে-সঙ্গে কেঁদে ফেলতাম।...

০৩. মিসির আলি ভেবেছিলেন

মিসির আলি ভেবেছিলেন পরদিনই আবার আসবে। সন্ধ্যাবেল তাঁর একটা বিয়ের দাওয়াত ছিল। সেখানে গেলেন না। কিছু খাবার আনিয়ে রাখলেন। অভূক্ত একটি মানুষকে শুধু এক কাপ চা যেন দিতে না হয়। সে এল না। তার পরদিনও না। দেখতে- দেখতে এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল। মিসির আলির বিশ্বয়ের সীমা রইল না।...

০৪. আষাঢ় মাস

আষাঢ় মাস। জলবায়ুর নিয়মকানুন পাল্টে গেছে। এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই। সারাদিন ঝাঁঝা রোদ থাকে। রাতে ভ্যাপসা গরম। জীবন অতিষ্ঠ। আজ এই প্রথম বৃষ্টি-বৃষ্টি ভাব দেখা দিয়েছে। আকাশ মেঘূলা। রাজ্যের ব্যাঙ গলা ফুলিয়ে ডাকাডাকি করছে।–তাদের উৎসাহ দেখে মনে হয় বৃষ্টি নামতে দেরি নেই।...

০৫. প্যাডে ডাক্তার সাহেবের নাম লেখা

প্যাডে ডাক্তার সাহেবের নাম লেখা। এ মল্লিক এমবিবিএস (অ্যাপার) মেডিকেল অফিসার, নেত্রকোণা সদর। কোনো তারিখ নেই। চিঠি লেখা হয়েছে ইংরেজি ও বাংলা মিশিয়ে। মিহিরবাবুর নাম ইংরেজিতে। বাকি অংশ বাংলায়। মিহিরবাবু, জরুরিভিত্তিতে একটা অপারেশন করতে হচ্ছে। কামরুদ্দিন সাহেবের...

০৬. মুনিরের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা

মুনিরের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তবে ব্যক্তিগত বিদ্রোহের কারণেও সে এটা করতে পারে। হয়ত সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসগুলো তার পছন্দ নয়। তার অপছন্দের ব্যাপারগুলো সে অন্যদের জানাতে চায়। মিসির আলিকে দিয়ে তার শুরু। পরে অন্যদের কাছে যাবে। মিসির আলি ঠিক করলেন, যে করেই হোক,...

০৭. মতিঝিল পাড়ার অফিস

মতিঝিল পাড়ার অফিস। নাম আলফা ট্রান্সপোর্ট। নাম থেকে কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তবে কাজকর্ম পাঁচমিশালি–অটোমোবাইল ইন্সুরেন্স, ট্রাভেল এজেন্সি এবং ইণ্ডেনটিং। বৃহস্পতিবার অর্ধেক দিন অফিস। মুনিরের হাতে তেমন কোজ নেই। সে বসেছে এ্যাসিসটেন্ট ক্যাশিয়ার নিজামুদ্দিন সাহেবের পাশে।...

০৮. মিসির আলি হাসিমুখে বললেন

মিসির আলি হাসিমুখে বললেন, কি ব্যাপার, আজ খালি হাতে যে! আমার সিগারেট কোথায়? মুনির লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল। মিসির আলি বললেন, আজকালের মধ্যে না এলে আমি নিজেই উপস্থিত হতাম তোমার ওখানে। আমি কোথায় থাকি তা তো আপনি জানেন না। আগে জানতাম না। এখন জানি। শার্লক হোমসের মতো বুদ্ধি খাটিয়ে...

০৯. নিউরোলজিস্ট প্রফেসর আসগর

নিউরোলজিস্ট প্রফেসর আসগর বিশালদেহী মানুষ। গোলগোল মুখ। মাথাভর্তি টাক–তীক্ষ্ণ চোখ। শিশুরা ভয় পেয়ে যাবার মতো চেহারা, কিন্তু মানুষটি হাসিখুশি। কারণে অকারণে রোগীকে ধমক দেয়ার বাজে অভ্যাসটি এখনো অর্জন করেন নি। ভদ্রলোক অনেক ঝামেলা করলেন। প্রথম বারের স্ক্যানিং ভালো হয়...

১০. কে যেন কড়া নাড়ছে

অনেকক্ষণ ধরে কে যেন কড়া নাড়ছে। কড়া নাড়ার ধরনটা অদ্ভুত। দুটি টোকা দিয়ে থেমে যাচ্ছে, আবার দুটি টোকা দিচ্ছে। জানালার পর্দা সরিয়ে বিনু উঁকি দিল। অপরিচিত এক জন মানুষ। রোগা, মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। এর মাঝে দুটি চোখ জ্বলজ্বল করছে। বিনু ভয় পাওয়া গলায় বলল, কে? লোকটি...

১১. এখন রাত প্রায় এগারটা

এখন রাত প্রায় এগারটা। আন্দাজে বলছি, কারণ আমার ঘড়ি নেই। রাতের বেলা আন্দাজে সময় ঠিক করি। দিনের বেলা এই অসুবিধা হয় না। বেশির ভাগ মানুষের হাতেই ঘড়ি থাকে। জিজ্ঞেস করলেই সময় জানা যায়। যে আমার এই লেখা পড়বে, সে বুদ্ধিমান হলে ধরে ফেলবে যে আমি আজেবাজে কথা লিখে সময় নষ্ট করছি।...

১২. বিনু বলল

বিনু বলল, বাবা, তুমি ঐ ভদ্রলোককে আর তো আনলে না। নিজাম সাহেব বললেন, মুনিরের কথা বলছিস? হ্যাঁ। তাঁর সঙ্গে দেখা হয় না? হবে না কেন? রোজই তো হচ্ছে। আজ একবার তাঁকে নিয়ে আসতে পারবে? কেন? একটা দরকার আছে বাবা। কি দরকার? আছে একটা দরকার। তুমি অবশ্যি আজ তাঁকে সঙ্গে করে আনবে। রাতে...

১৩. দরজায় খুব আলতো করে

দরজায় খুব আলতো করে কে যেন হাত রাখল। মিসির আলি কেরোসিনের চুলোয় চা বসিয়েছেন। সেখান থেকেই বললেন, কে? কোনোরকম জবাব পাওয়া গেল না। কেউ দরজার কড়াও নাড়ছে না। মিসির আলি উঠে এলেন। দরজার ও-পাশে একজন— কেউ আছে কড়া না-নাড়লেও তা বোঝা যাচ্ছে। মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় খুব দুর্বল নয়, অনেক...

১৪. বিনু অবাক হয়ে বলল

বিনু অবাক হয়ে বলল, আপনি? মুনির অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসল। নিচু গলায় বলল, স্যার কি বাসায় নেই? বাসায় থাকবেন কেন? এখন তো ওঁর অফিসে থাকবায় কথা। তাই না? ও, আচ্ছা–হ্যাঁ। আপনি অফিসে যান নি? না। আমি তাহলে যাই। বসতে চাইলে বসুন! মুনির বারান্দায় চেয়ারটায় বসে পড়ে রুমাল বের করে...

১৫. মিসির আলি একটা থিওরি দাঁড় করিয়েছেন

মিসির আলি একটা থিওরি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি গত কয়েক দিন ধরেই চেষ্টা করছেন তাঁর সেই থিওরি গুছিয়ে ফেলতে পারছেন না। লিখতে গিয়ে সব আরো কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে মনে মনে যা ভাবছেন, তা লিখতে পারছেন না। সারা দুপুর বসে বসে তিনি তাঁর থিওরির পয়েন্টগুলো লিখলেন। সেগুলো কেটে ফেলে আবার...

১৬. মুনির অফিসে আসছে না

মুনির গত তিন দিন ধরে অফিসে আসছে না। আজ এক তারিখ। বেতনের ডেট। যারা অসুস্থ, তারাও এই দিনে উপস্থিত থাকে—বেতন নিয়ে চলে যায়। মুনির আজও এল না। নিজাম সাহেব সত্যি-সত্যি চিন্তিত বোধ করলেন। আজ অফিসে আসবার পথে বিনু বলেছে, বাবা, ওঁকে নিয়ে আসবে? মুনির সাহেবকে। তিনি হাঁ-সূচক মাথা...

১৭. একটি চিঠি এসেছে

মিসির আলির কাছে একটি চিঠি এসেছে। এই কারণে তিনি অসম্ভব বিরক্ত। চিঠি না-খুলেই তিনি একপাশে ফেলে রেখেছেন। এখন বিরক্তি কমানের চেষ্টায় সুন্দর কিছু কল্পনা করার চেষ্টা করছেন। সুন্দর কোনো কল্পনাও মাথায় আসছে না। তাঁর বিরক্তির মূল কারণ হচ্ছে, জটিল একটি বিষয় নিয়ে তিনি ভাবছিলেন।...

১৮. মুনির মারা গেল

মুনির মারা গেল শ্রাবণ মাসের কুড়ি তারিখে। দিন-তারিখ মিসির আলির মনে থাকে না। এই তারিখটা মনে আছে, কারণ এর দু দিন পরই ছিল ২২শে শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন। মৃত্যুর আগে-আগে মুনির বেশ সহজ ও স্বাভাবিক আচরণ করছিল। রসিকতা করছিল। তবে মিসির আলি বুঝতে পারছিলেন যে, সে যে-কোনো...