নিশীথিনী – মিসির আলি

০১. মিসির আলির ধারণা

মিসির আলির ধারণা ছিল, তিনি সহজে বিরক্ত হন না। এই ধারণাটা আজ ভেঙে যেতে শুরু করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে তিনি অসম্ভব বিরক্ত। যে-রিকশায় তিনি উঠেছেন, তার সীটটা ঢালু। বসে থাকা কষ্ট্রের ব্যাপার। তার চেয়েও বড় কথা, দু মিনিট পরপর রিকশার চেইন পড়ে যাচ্ছে। এখন বাজছে দশটা তেইশ। সাড়ে...

০২. ফিরোজ মিসির আলির কাছে আসে

গত দু মাস ধরে ফিরোজ প্রতি সোমবারে মিসির আলির কাছে আসে। পাঁচটার সময় আসে, থাকে সাতটা পর্যন্ত। আজ কী মনে করে তিনটার সময় চলে এসেছে। মিসির আলি তখনো ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরেন নি। তাঁর কাজের মেয়ে হানিফা দরজা খুলে দিল। সে দরজা খুলল ভয়ে-ভয়ে। ফিরোজের দিকে তাকালেই তার বুক টিপটপ...

০৩. নীলুদের বাড়ি

বহু খোঁজাখুঁজি করেও মিসির আলি নীলুদের বাড়ি বের করতে পারলেন না। তাঁর কাছে কোনো ঠিকানা নেই। তিনি ইচ্ছা করেই ঠিকানা রাখেন নি। না-রাখাটা বোকামি হয়েছে। কাঁঠালবাগানের যে-অঞ্চলে লাল রঙের দোতলা বাড়ি থাকার কথা, সেখানে লাল রঙের কোনো বাড়িই নেই। কয়েকটি পান-বিড়ির দোকানদারকে তিনি...

০৪. সাইকোলজি বিভাগের সভাপতি

সাইকোলজি বিভাগের সভাপতি ডঃ সাইদুর রহমানের মেজাজ সকাল থেকেই খারাপ। মেজাজ খারাপের প্রধান দুটি কারণের একটি হচ্ছে–সুইডেনে একটি কনফারেন্সে তাঁর যাবার খুব শখ ছিল, কিন্তু আমন্ত্রণ আসেনি। তিনি চেষ্টা তদবিরের তেমন কোনো ত্রুটি করেন নি। যেখানে একটা চিঠি দেয়া দরকার, সেখানে...

০৫. নীলুর বাবা জাহিদ সাহেব

বছরখানেক হল নীলুর বাবা জাহিদ সাহেবের স্বাস্থ্য দ্রুত ভাঙতে শুরু করেছে। এমন কিছু অসুখ তাঁকে ধরেছে, যা শুধু কষ্টকর নয়, অত্যন্ত বিরক্তিকর। কিছুই হজম হয় না। পানি মেশান দুধ, লেবুর রস দিয়ে বার্লি, এক স্নাইস রুটি বা শিং মাছের মশলাবিহীন ঝোল–কিছুই না। ডাক্তার প্রায় সবই...

০৬. হানিফাকে পিজিতে ভর্তি

মিসির আলি হানিফাকে পিজিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, মেয়েটি এক-একা থাকতে ভয় পাবে। কিন্তু হানিফা ভয় পেল না। থাকতে পারবি তো? হুঁ। অনেক রকম পরীক্ষা-টরীক্ষা করবে। ডাক্তাররা। ভয়ের কিছু নেই। আমি ভয় পাই না। তিনি ভেবে দেখলেন, মেয়েটির ভয় না পাওয়ারই কথা। যে জীবন শুরু...

০৭. বাড়ি না বলে রাজপ্রাসাদ

ফিরোজরা ধানমণ্ডির যে বাড়িটিতে থাকে, তাকে বাড়ি না বলে রাজপ্রাসাদ বলা যেতে পারে। বিশাল একটি দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশে জেলের মত উচু পাঁচল। গেটে বড় বড় করে লেখা কুকুর হইতে সাবধান। গেটটি চব্বিশ ঘন্টাই বন্ধ থাকে। বন্ধ গেট ডিঙিয়ে ভেতরে ঢোকা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কারণ, দারোয়ান এক...

০৮. মোহনগঞ্জ স্টেশনে মিসির আলি

মোহনগঞ্জ স্টেশনে মিসির আলি নামলেন রাত সাড়ে সাতটায়। গায়ে প্রবল জ্বর। মাথায় অসম্ভব যন্ত্রণা! চোখ মেলতে পারছেন না, এ-রকম অবস্থা। তাঁর নিজের বোকামির জন্যে এটা হয়েছে। শ্যামগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। কামরায় লেখা পাঁচশ জন বসিবেন।– বসেছে পঞ্চাশ জন। আরো পঞ্চাশ...

০৯. পুরানা পল্টনে আতঙ্ক

নীলু পত্রিকার খবরটা চারবার পড়ল। একটা লাল কলম দিয়ে বক্স করা খবরটির প্রতিটি লাইন দাগাল, তারপর কাগজটা তার বাবাকে দিয়ে এল। খবরটা এ-রকম— পুরানা পল্টনে আতঙ্ক (স্টাফ রিপোর্টার) শুক্রবার রাত একটার দিকে পুরানা পল্টন এলাকায় মধ্যযুগীয় নাটকের অবতারণা হয়েছে। লোহার রড হাতে এক যুবক...

১০. পুলিশ কমিশনার

পুলিশ কমিশনার রাত এগারটায় পুরানা পল্টন এলাকায় এলেন। থমথম করছে চারদিক। একটি ভিখিরিকেও দেখা গেল না। দোকানপাট পর্যন্ত বন্ধ। তিনি লক্ষ করলেন, একতলার বাসিন্দাদের প্রায় সবাই এই প্ৰচণ্ড গরমেও জানালা বন্ধ করে শুয়েছে। আতঙ্কের মতো ভয়াবহ কিছুই নেই। এবং পুলিশের শাস্ত্ৰে...

১১. মিসির আলি ঢাকা পৌঁছলেন

মিসির আলি ঢাকা পৌঁছলেন। রবিবার ভোরে। দরজা নীলুর চিঠিভর্তি খাম পেলেন। চিঠিতে একটিমাত্র লাইন–স্যার, আপনার বড় বিপদ কিসের বিপদ–কী সমাচার, কিছুই লেখা নেই। মেয়েদের নিয়ে এই সমস্যা। তাদের সব চিঠিতেই অপ্রয়োজনীয় কথার ছড়াছড়ি। শুধু প্ৰয়োজনীয় কথাগুলোর বেলায় তারা...

১২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন অধ্যাপক

মিসির আলি নরম স্বরে বললেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন অধ্যাপক। আমার এক ছাত্রী কি এ বাড়িতে–। বুড়ো ভদ্রলোক বললেন, আসুন, আমি নীলুর বাবা। আমার নাম জাহিদুল ইসলাম। স্লামালিকুম। ওয়ালাইকুম সালাম। বসুন আপনি, নীলু এসে পড়বে। ওকে খবর দিন। আর বেশিক্ষণ থাকব না, আকাশের...

১৩. ওসমান সাহেব

সন্ধ্যাবেলা ওসমান সাহেব নিজে গিয়ে পরীক্ষা করলেন, গেট বন্ধ করা হয়েছে কি না। তালা টেনে- টেনে দেখলেন। দারোয়ানকে বললেন, ভোর হবার আগে গেট খুলবে না। কেউ ঢুকতে চাইলে বলবে, বাড়িতে কেউ নেই। জ্বি আচ্ছা। গেটের তালার চাবি কাউকে দেবে না। এমন কি ফিরোজ যদি চায়, তাকেও দেবে না। জি...

১৪. থার্ড ইয়ার ফাইনালের ডেট

থার্ড ইয়ার ফাইনালের ডেট দিয়ে দিয়েছে। মেডিকেলের ছাত্রদের কারোর দম ফেলার সময় নেই। ক্লাস এখন সাসপেণ্ডেড। আজমল ঠিক করে রেখেছে, সে এখন থেকে নাশতা খেয়ে পড়তে বসবে এবং একটানা পড়বে লাঞ্চ টাইম পর্যন্ত। এক ঘন্টার ব্রেক নেবে লাঞ্চে, তারপর আবার পড়া। তা ছাড়া পাস করার উপায় নেই।...

১৫. সাইদুর রহমান সাহেব

সাইদুর রহমান সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনার কী হয়েছে। মিসির আলি বললেন, শরীরটা খারাপ স্যার। শরীর তো আপনার সবসময়ই খারাপ। এর বাইরে কিছু হয়েছে কি না বলেন। আপনাকে হ্যাগার্ডের মতো দেখাচ্ছে! গত পরশু রাতে কে যেন তালা ভেঙে আমার ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র ভেঙেচুরে তছনছ করেছে। আপনি বাসায়...

১৬. সাজ্জাদ হোসেন

রাত আটটা। সাজ্জাদ হোসেন অফিসের টেবিলেই মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেবার চেষ্টা করছেন। গত রাতে এক ফোঁটাও ঘুমোন নি। দিনের বেলায়ও ঘন্টাখানেকের মতো শোবার সময় পাওয়া যায় নি। এবং খুব সম্ভব আজ রাতটাও তাঁর জেগেই কাটবে। লোহার রড হাতের সেই নগ্নগাত্ৰ আগন্তক তাঁর সর্বনাশ করে...

১৭. ওসমান সাহেবের বসার ঘর

ওসমান সাহেবের বসার ঘর। রাত প্ৰায় এগারটা একটি কম পাওয়ারের টেবিলল্যাম্প ছাড়া ঘরে কোনো আলো নেই। আবছা অন্ধকার। এই আবছা অন্ধকার ঘরে তিন জন মানুষ মুখোমুখি বসে ছিলেন। এক জন উঠে চলে গেলেন। ফরিদা। তিনি নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। যে আলোচনা চলছিল, তা তাঁর সহ্য না হওয়ায় উঠে গেছেন। এখন...

১৮. নাজনীন

নাজনীন একটি ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নটি দেখেছে ছাড়া-ছাড়াভাবে। তবু সব মিলিয়ে একটা অর্থ দাঁড় করানো যায়। এবং অর্থটি ভয়াবহ। নাজনীন দেখেছে–একটা ছোট ঘরের এক প্রান্তে একটি বিছানা। বিছানাটিতে সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে এক জন লোক শুয়ে আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ আরেক...

১৯. এ এক অচেনা নীলু

নিজের মেয়েকে চিনতে না পারার মতো কষ্টের কি কিছু আছে? জাহিদ সাহেব বসেবসে তাই ভাবেন। তাঁর বড় অস্থির লাগে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কেমন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। এ-রকম হবে, জানতেন। দুই মেয়ে বড় হবে–এদের বিয়ে হবে, আলাদা জীবন হবে। তিনি পড়ে থাকবেন একা। এ-অবস্থা তিনি স্বীকার...

২০. কাজের মেয়ে

বুধবার। সময় সাতটা দশ। সন্ধ্যার ঠিক পরপর মিসির আলি নিউ ইস্কাটন রোড়ের যে তিনতলা দালানের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তার নাম–নিকুঞ্জ। লোকজন বিশাল প্রাসাদ তৈরি করে নাম দেয়–কুটির। এ-রকম বাড়ির নাম কেউ কুটির রাখে? বাড়ির সামনে ফুটবলের মাঠের মতো বড় লন। লনের ঘাস...