০২. পাগলের ডাক্তারদের চেহারা

পাগলের ডাক্তারদের চেহারায় না-হোক, চোখে খানিকটা পাগল-পাগল ভাব থাকে। তারা সহজভাবে আলাপ-আলোচনা করতে-করতে দুম করে কঠিন কোনো কথা বলে সরু চোখে রুগীর দিকে তাকিয়ে থাকে। কথাবার্তা বলতে হয় বিছানায় শুয়ে। একটা ছবি চোখের সামনে ধরেজিজ্ঞেস করে, ছবি দেখে আপনার মনে যা আসছে বলুন তো! কী দেখছেন ছবিতো? পাগলের ডাক্তার বা সাইকিয়াটিস্ট সম্পর্কে আফসার সাহেবের এই ছিল ধারণা। তিনি এমন একজন লোকের সঙ্গে দেখা করবেন, এ-জাতীয় মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ঘর থেকে বেরুলেন। যাঁর সঙ্গে দেখা হল তাকে দেখে মোটামুটি হতাশই হলেন। লুঙ্গি-পরা আধাবুড়ো একজন লোক, যে দরজা খুলেছে খালি গায়ে এবং তাঁদের দেখেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে শার্ট খুঁজতে শুরু করেছে। আলনায় বেশ কয়েকটা শার্ট এক জায়গায় রাখা। একটা নিতে গিয়ে ভদ্ৰলোক সব কটা ফেলে দিলেন। যে—শার্ট গায়ে দিলেন তার সবগুলি বোতাম সাদা রঙের, কিন্তু মাঝখানের একটা বোতাম কালো।

ভদ্রলোক বিব্রত গলায় বললেন, আসুন, আসুন। আপনাদের সাতটার সময় আসার কথা ছিল না?

মীরা বললেন, একটু আগে এসে পড়েছি। বাসা খুঁজে পাব কি না বুঝতে পারছিলাম না, এই জন্যে সকল—সকাল রওনা হয়েছিলাম। আগে এসে আপনাকে অসুবিধায় ফেলি নি তো?

জ্বি-না, কোনো অসুবিধা নেই। বসুন, আমি চায়ের ব্যবস্থা করি।

ভদ্রলোক তাঁদের কিছু বলার সুযোগ না-দিয়ে ছোটো একটা কেতলি হাতে বের হয়ে গেলেন। পায়ে স্পঞ্জের স্যাণ্ডেল, পরনে লুঙ্গি। সেই লুঙ্গিও যে খুব ভদ্রভাবে পরা, তা নয়। মনে হচ্ছে যে-কোনো সময় কোমর থেকে খুলে আসবে।

আফসার সাহেব বললেন, এই তোমার সাইকিয়াটিস্ট?

মীরা বললেন, হ্যাঁ। তাঁর পোশাক-আশাক দেখে বিভ্রান্ত হয়ে না। উনি বিখ্যাত ব্যক্তি। নাম বললেই চিনবে–উনি মিসির আলি।

মিসির আলি আবার কে?

মানসিক সমস্যার বিশ্লেষণের ব্যাপারে তাঁর মতো মানুষ এখনো জন্মায় নি। অতি বিখ্যাত ব্যক্তি।

অতি বিখ্যাত ব্যক্তির হল তো দেখছি ফকিরের মতো! ঘরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে—খেতে পান না।

উনি কখনো কারও কাছ থেকে কোনো টাকা পয়সা নেন না।

চলে কী করে? আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যারাসাইকোলজি পড়াতেন। এখন চাকরি চলে গেছে। শুনেছি টিউশনি করেন।

আফসার সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, তুমি কিছু মনে করো না। যত বিখ্যাত ব্যক্তিই হোন, আমার কিন্তু তাঁর উপর বিন্দুমাত্র ভক্তি-শ্রদ্ধা হচ্ছে না।

ভক্তি-শ্রদ্ধার তো কোনো ব্যাপার নেই। তুমি তোমার সমস্যার কথা বলবে– ফুরিয়ে গেল।

আমি এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কোনো কথাই বলব না। উনি চা আনতে গেছেন। চা এলে চা খাব। চলে যাব।

আচ্ছা, এখন বস।

কোথায় বসব? বসার জায়গা কোথায়?

ঘরে বসার জায়গা আসলেই নেই। দুটি চেয়ারের একটার ওপর কেরোসিন কুকার। অন্যটির ওপর গাদাখানিক বই। বিছানায় বসা যায়। তবে সেই বিছানায় চাদরের ওপর কি কারণে জানি খবরের কাগজ বিছানো। বসতে হলে খবরের কাগজের ওপর বসতে হয়।

আফসার সাহেব বিরক্ত মুখে খবরের কাগজের ওপর বসলেন। মীরা বসলেন স্বামীর পাশে। মিসির আলির নামের সঙ্গে মীরার পরিচয় আছে। মুখোমুখি এই প্রথম দেখলেন। মীরার ভাই মহসিন ঠিকানা দিয়েছে। এবং বলেছে-এই লোকের চেহারায় বিভ্ৰান্ত না-হতে। মীরা নিজেও এখন খানিকটা বিভ্ৰান্ত বোধ করছেন। প্রফেশনাল কোনো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাওয়াই ভালো ছিল। অ্যামেচারীদের ওপর খুব ভরসা। করা যায় না।

মিসির আলি চায়ের কেতলি এবং তিনটা কাপ হাতে ঢুকলেন। কাপে চা ঢালতেঢালতে বললেন, আফসার সাহেব, আপনি কেমন আছেন?

ভালো। আমার নাম জানলেন। কী করে?

আপনার শ্যালক মহসিন সাহেব, উনিই আপনার নাম বলেছেন। আপনার সমস্যা কি, তার আভাসও দিয়েছেন। এখন আপনি বলুন, সমস্যাটা আপনার মুখ থেকে শুনি।

ও যা বলেছে তাই। নতুন করে আমার কিছু বলার নেই।

আপনি কি কিছু বলতে চাচ্ছেন না?

জ্বি-না।

কেন বলুন তো?

আফসার সাহেব উত্তর না।

মিসির আলি হাসিমুখে বললেন, যে-কোনো কারণেই হোক, আপনি আমাকে পছন্দ করছেন না। সাইকিয়াটিস্ট হিসেবে আমি সম্ভবত আপনাকে ইমপ্রেস করতে পারি নি! এটা নতুন কিছু না। সবার ক্ষেত্রে ঘটে। তখন আমি কী করি জানেন? এমন কিছু করি, যাতে আমার ওপর বিশ্বাস ফিরে আসে। কারণ পুরোপুরি বিশ্বাস না-আসা পর্যন্ত আমি কোনো সাহায্য করতে পারি না। যেই মুহূর্তে আমার ওপর আপনার পরিপূর্ণ আস্থা আসবে, সেই মুহূর্ত থেকে আপনি আমার কথা মন দিয়ে শুনবেন। আমার যুক্তি গ্রহণ করবেন।

আফসার সাহেব বললেন, তাহলে বিশ্বাস অর্জনের জন্য কিছু করুন।

পারছি না। সবসময় পারি না।

আফসার সাহেব চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে—রাখতে বললেন, মীরা, চল যাই।

মীরা দুঃখিত গলায় বললেন, তুমি ওঁকে কিছুই বলবে না?

না।

সমস্যাটা নিজের মুখে বলতে অসুবিধা কী?

আফসার সাহেব কঠিন দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, চল যাই। আমার শরীর ভালো লাগছে না। বাসায় গিয়ে শুয়ে থাকব। তা ছাড়া আমার কোনো সমস্যাও নেই।

মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। সহজ গলায় বললেন, চলুন, আপনাদের রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

তার প্রয়োজন হবে না।

অনেক অপ্রয়োজনীয় কাজ আমি করি আপনাদের জন্যে চা আনার কোনো প্রয়োজন ছিল না, তবু এনেছি। চা অনেক দূর থেকে আনতে হয়েছে। চা-টা যেন গরম থাকে এ—জন্যে ছুটতে-ছুটিতে এসেছি। চা গরম ছিল না?

আফসার সাহেব একটু বিব্রত বোধ করলেন। মীরা আবার বললেন, বস না। কিছু বলতে না-চাইলে বলবে না। দু মিনিটের জন্যে বস।

আফসার সাহেব বসলেন।

মিসির আলি বললেন, আমার ধারণা, অফিসে চাকরি সম্পর্কিত বড় রকমের সমস্যায় আপনি আছেন। সম্ভবত আপনার চাকরি চলে গেছে। এটা কি ঠিক?

মীরা ভয়ংকরীভাবে চমকে উঠলেন।

আফসার সাহেব চমকালেন না। স্থির দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ মিসির আলির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। তবে চাকরি এখনো যায় নি। হয়তো শিগগিরই চলে যাবে। অফিসের মালিকপক্ষের সঙ্গে অনেক দিন থেকেই বনিবন্যা হচ্ছিল না। গত দু মাসে তা চরম আকার নিয়েছে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, হয় ওরা আমাকে ছাড়িয়ে দেবে, নয়তো আমিই রিজাইন করব।

মীরা ক্ষীণ গলায় বললেন, এইসব কিছুই তো তুমি আমাকে বল নি।

আফসার সাহেব বললেন, তোমাকে বলার সময় হয় নি বলেই বলি নি। সময় হলে নিশ্চয়ই বলতাম।

এত বড় একটা ব্যাপার তুমি গোপন করে রাখবে?

হ্যাঁ, রাখব।

আফসার সাহেব পকেট থেকে সিগারেট বের করতে—করতে মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার এই ব্যাপার আপনি কী করে অনুমান করলেন?

খুব সহজেই অনুমান করেছি। কোনো মানসিক সমস্যা যখন হয় তখন তার পিছনে কিছু-না-কিছু কারণ থাকে। পারিবারিক অশান্তি, চাকরির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ইত্যাদি। একটা ছোটো বাচ্চা যখন পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায় না, যখন সে দেখে বাবা-মা সারাক্ষণ ঝগড়া করছেন-তখন সে কথা বলা শুরু করে টবের ফুলগাছের সঙ্গে। এমনভাবে কথা বলে, যেন ফুলগাছটা তার কথা শুনছে, কথার জবাব দিচ্ছে। আসলে এ-রকম কিছু ঘটছে না।

আপনার ধারণা আমি বিড়ালের কথা বুঝতে পারি না? আমি যা বলছি বানিয়ে— বানিয়ে বলছি?

না, আমি তেমন কিছু ধারণা করছি না। আপনি যা বলছেন তা-ই বিশ্বাস করছি। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি এগোব।

এবং একসময় আপনি প্রমাণ করতে চেষ্টা করবেন যে আমি যা বলছি তা ভুল।

তা-ও না। আমি সত্য যা তা-ই প্রমাণ করতে চেষ্টা করব। আপনি সহজ হয়ে। সহজভাবে আমার কথার জবাব দিন। সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাকে সাহায্য করুন। আপনার ব্যাপারে খুবই আগ্ৰহ বোধ করছি।

কেন?

কারণ আপনি যা বলছেন, তা আগে কেউ বলে নি। কিছু-কিছু পীর-দরবেশের কথা আমরা বইপত্রে পাই, যাঁরা দাবি করতেন পশু-পাখির কথা বুঝতে পারেন, কিন্তু সেই দাবির পক্ষে তেমন কোনো প্ৰমাণ পাই না। একজন অতি বিখ্যাত ভারতীয় চিকিৎসকের কাহিনী আছে, যিনি গাছপালা থেকে অষুধ তৈরি করতেন। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত গল্প হচ্ছে-তিনি গাছের কথা বুঝতে পারতেন। তিনি পথ দিয়ে যখন হেঁটে যেতেন, গাছ তাঁকে ডেকে বলত।–তুমি আমার পাতা ছিঁড়ে নিয়ে যাও। পাতার ব্লস বের করে শ্বাসকষ্টের রুগীকে মধু মাখিয়ে খেতে দাও। রোগ আরোগ্য হবে। প্রাচীন ভারতের ঐ চিকিৎসকের নাম গল্পে আছে–মহাদেব একবার রাগে অন্ধ হয়ে ব্ৰহ্মার মাথা কেটে ফেলেছিলেন। কোনো উপায় না দেখে পৃথিবী থেকে অশ্বিনীকুমারকে দেবলোকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি সেই ছিন্ন মস্তক জোড়া লাগান।

আফসার সাহেব বললেন, আমি কি একটা সিগারেট খেতে পারি?

অবশ্যই পারেন। ইচ্ছা করলে আমাকে একটা দিতেও পারেন।

আফসার সাহেব সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন। তবে মিসির আলিকে সিগারেট দিলেন না। একজন সিগারেট চেয়েছে, তার পরেও তাকে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু।

মিসির আলি বললেন, কী ব্যাপার, সিগারেট দেবেন না? কেড়ে নিতে হবে?

আফসার সাহেব বললেন, সরি। এই নিন। বলেই হেসে ফেললেন।

মীরা লক্ষ করলেন, আফসার সাহেব অনেকটা সহজ হয়ে এসেছেন। মুখের কাঠিন্য কমে গেছে। মীরা মিসির আলি নামের লোকটির প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করলেন। এই লোক আর কিছু পারুন না-পরুিন, তাঁর স্বামীর প্রাথমিক কাঠিন্য ভেঙে দিয়েছেন। এটি কম কথা নয়। তা ছাড়া লোকটির কথা বলার ভঙ্গিও তাঁর ভালো লাগল। কথাবার্তায় কোনো সবজান্তা ভঙ্গি নেই। পা উঠিয়ে ছেলেমানুষের মতো বসে আছেন। কথা বলার সময় হাত নাড়ছেন। তাঁর সামনে রাখা চায়ের কাপে এক ফোঁট চাও নেই। অনেক আগেই চায়ের শেষ বিন্দুটিও তিনি শেষ করেছেন। অথচ বেচারার সেটা খেয়াল নেই। খালি চায়ের কাপেই ক্রমাগত চুমুক দিচ্ছেন। মাঝে-মাঝে চুমুক দেবার আগে চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছেন। ভাবটা এমন যে, গরম চা ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে খেতে হচ্ছে।

মিসির আলি খাট থেকে নামতে-নামতে বললেন, আফসার সাহেব, আমি ছোট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার জোগাড় করেছি। সেখানে বিড়ালের কথা টেপ করা আছে। আপনাকে তা শোনাব এবং আপনি বলবেন-বিড়াল কী বলছে। পারবেন না?

অবশ্যই পারব।

আজ শুধু এই পরীক্ষাটাই করব, তারপর অন্য পরীক্ষা অন্য সময়ে করা হবে। আফসার সাহেব বললেন, আমি টেপ শুনে যদি বলি বিড়াল এই কথা বলছে তাহলে তা আপনার বোঝার উপায় নেই। আমি ভুল বলছি না। সত্যি বলছি।

বোঝার উপায় আছে।

কী উপায়? আপনি নিশ্চয়ই বিড়ালের কথা বোঝেন না!

তা বুঝি না। তার পরেও উপায় আছে- আচ্ছা এখন মন দিয়ে শুনুন—

টেপ খানিকক্ষণ বাজানো হল। একটা বিড়ালের ম্যায়াও মর্য্যায়াও শোনা যাচ্ছে। আফসার সাহেব তাঁর সমস্ত ইন্দ্ৰিয় তীক্ষ্ণ করে শুনলেন। টেপ বাজান শেষ হল। মিসির আলি বললেন, বলুন, বিড়ালটা কী বলল।

বুঝতে পারিনি।

কিছুই বুঝতে পারেন নি?

জ্বি-না।

ভালো কথা।—এখন অন্য একটা শুনুন। খুব মন দিয়ে শুনুন। একই বিড়ালের কথা।–ভিন্ন সময়ে ভিন্ন পরিস্থিতিতে।

আফসার সাহেব শুনলেন। তাঁর মুখে হতাশার ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কারণ এবারও তিনি কিছু বুঝতে পারছেন না। কিছুই না। বিড়ালের সাধারণ ম্যাঁয়াও।

কিছু বুঝলেন?

জ্বি-না।

কিছুই না?

না।

আরো একটি অংশ শোনাচ্ছি। দেখুন, এটা বুঝতে পারেন কি না। এবার অন্য বিড়াল, আগেরটা না।

আফসার সাহেব হতাশ গলায় বললেন, আমার মনে হয়না কিছু বুঝতে পারব। এ— রকম হচ্ছে কোন কে জানে!

খুব মন দিয়ে শুনুন।

মন দিয়েই শুনছি।

আরো মন দিন। চোখ বন্ধ করে শুনুন।

তিনি শুনলেন। কিছুই বুঝলেন না। মিসির আলি বললেন, তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিড়ালের কথা টেপ করা হয়েছে। প্রথম বার বিড়ালকে দুধ খেতে দিয়ে গায়ে-মাথায় হাত বোলান হয়েছে। সে যখন শব্দ করেছে তখন তা টেপ করা হল। দ্বিতীয় বার তাকে একটা সূচালো কাঠি দিয়ে খোঁচা দেওয়া হচ্ছিল। তৃতীয় বারে অন্য একটা বিড়ালকে ভয় দেখানো হচ্ছিল।

আফসার সাহেব বিষণ্ণ গলায় বললেন, আপনি নিশ্চয়ই আমার কথা পুরোপুরি অবিশ্বাস করছেন। ধরেই নিয়েছেন আমি মিথ্যা করে বলেছি-বিড়ালের কথা বুঝতে পারি।

আমি এত দ্রুত এবং এত সহজে কোনো সিদ্ধান্তে আসি না। আমি এখনো ধরে নিচ্ছি। আপনি বিড়ালের সব কথা বুঝতে পারেন। এই হয়তো পারছেন না। আপনাকে আমি যা করতে বলব তা হচ্ছে, সহজ- জীবন-যাপনের চেষ্টা করবেন! বিড়াল নিয়ে খুব বেশি ভাববেন না, আবার খুব কমও ভাববেন না। খাওয়াদাওয়া করবেন! নিয়মিত অফিসে যাবেন। অফিসের সমস্যা মেটাতে চেষ্টা করবেন। যদি না-মেটে তাতেও ক্ষতি নেই। সব পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা আপনাকে করতে হবে।

মীরা বললেন, ওকে নিয়ে বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়? যেমন ধরুন, কক্সবাজারে কিছুদিন কাটিয়ে এলাম।

মিসির আলি বললেন, আমি তার প্রয়োজন দেখছি না। সমস্যা থেকে দূরে সরে যাওয়া সমস্যা সমাধানের কোনো পথ নয়। সমস্যাকে মোকাবেলা করতে হয়। সমস্যার ভেতরে থেকে।

আফসার সাহেব বললেন, আমরা কি এখন উঠব?

জ্বি, নিশ্চয়ই উঠবেন। আর শুনুন আফসার সাহেব, আপনি এখন এক ধরনের ঘোরের মধ্যে আছেন। এই ঘোর-ঘোর ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে না।

আমি ঘোরের মধ্যে আছি, এটা কেন বলছেন?

এটা বলছি, কারণ আপনার চারপাশে কী ঘটছে তা আপনি দেখছেন না। তাকিয়ে আছেন, কিন্তু কিছুই আপনার চোখে পড়ছে না। আমি দীর্ঘ সময় ধরে একটা খালি কাপে চুমুক দিচ্ছি। মাঝে-মাঝে এমন ভাব করছি যে গরম চা ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে নিচ্ছি। ব্যাপারটা আপনার চোখেও পড়ে নি। অথচ আপনার স্ত্রী ঠিকই ধরেছেন। খালি কাপে চুমুক দেওয়ার ব্যাপারটা ছিল ইচ্ছাকৃত। আপনার বর্তমান মানসিক অবস্থা বোঝার জন্যে এটা করতে হয়েছে।

এই প্রথম বারের মতো অফিসার সাহেবের মনে হল- তাঁর সামনে বসে থাকা রোগা এবং মোটামুটি কুদর্শন মানুষটি অসম্ভব বুদ্ধিমান। এই মানুষটা খুব ঠাণ্ডা মাথায় পুরো পরিস্থিতি হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে পারে। এ-জাতীয় মানুষের সঙ্গে এর আগে তাঁর পরিচয় হয় নি। তিনি বললেন, উঠি মিসির আলি সাহেব?

মিসির আলি বললেন, চলুন, আমিও আপনাদের সঙ্গে যাই-এগিয়ে দিয়ে আসি।

এগিয়ে দিতে হবে না।

আমি এমনিতেও বেরুব। বিসমিল্লাহ্ হোটেল বলে একটা রেস্টুরেন্ট আছে–আমি রাত নটায় সেখানে ভাত খেতে যাই।

মীরা বললেন, আপনি কি একা থাকেন?

হ্যাঁ।

আপনাকে কি কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?

মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, না। বিখ্যাত মানুষদের লোকজন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বিরক্ত করে। আমি বিখ্যাত কেউ নই। আমার ব্যক্তিগত জীবন এতই সাধারণ যে প্রশ্ন করার কিছুই নেই।

আফসার সাহেব হঠাৎ করে প্রায় সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন,–আমাকে একটু সাহায্য করুন। প্লীজ। আমি জানি আপনি পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *