১৬. ঢাকা শহর বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল

রঞ্জু সুলতানার ফ্ল্যাটে এসেছে। তার হাতে ব্যান্ডেজ, চোখের নিচে ব্যান্ডেজ। রঞ্জর ভাবভঙ্গিতে প্ৰবল অস্থিরতা। সুলতানা বললেন, তোকে আবার বিড়াল কামড়েছে?

হুঁ।

কখন কামড়েছে?

রাতে। চোখে আঁচড় দিতে চেয়েছিল। নখ দিয়ে থাবা দিতে গিয়েছে। আমি খপ করে পা চেপে ধরায় রক্ষা। অনিকা কোথায়?

স্কুলে।

তার বিড়ালটা আছে না?

আছে।

গুড ভেরি গুড। পুফি পুফি। কাম হিয়ার লিটল ডার্লিং।

পুফি ঘরে ঢুকল। সুলতানার পায়ের কাছে বসল। রঞ্জ বলল, বিড়ালটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে লক্ষ করেছ?

হ্যাঁ।

রঞ্জ বলল, এতদিন ধারণা ছিল দুলাভাইয়ের বিড়াল আমাকে কামড়ায়। ঘটনা তা না। কাল রাতে বুঝতে পেরেছি। পুফি আমাকে কামড়ায়। পুফিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে কনফার্ম হলাম। গত রাতে তার একটা পা ভেঙে দিয়েছি।

সুলতানা বললেন, পাগলের মত কথা বলছিস বিড়াল কেন? এই বিড়াল রাতে গুলশানে যায় তোকে কামড়ে ফিরে আসে?

রঞ্জু বলল, হ্যাঁ। বিড়াল কি ভাবে যায় কি ভাবে ফিরে আসে তা আমি জানি না। বিড়াল যে এই পুফি সে ব্যাপারে। আমি নিশ্চিত। তাকিয়ে দেখ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাচ্ছে! কি ভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছে দেখা। মনে হচ্ছে না। এক্ষুনি আমার উপর ঝাপ দিয়ে পড়বে?

তোর ভাবভঙ্গি আমার কাছে ভাল লাগছে না। তুই করতে চাস কি?

খুন করতে চাই। মানুষ খুন না, বিড়াল খুন। বুরু বাসায় হাতুড়ি আছে? আমাকে একটা হাতুড়ি দাও।

তুই চুপ করে বোস। মাথা ঠাণ্ডা কর।

রঞ্জু বলল, মাথা ঠাণ্ডা করে তুমি বসে থাক। আমাকে আমার কাজ করতে দাও। আজ এই বিড়ালটা না মারলে সে আমার দুই চোখ তুলে নিবা। এটা কি ভাল হবে?

রঞ্জু খাবার ঘরে ঢুকল। তার হাতে মাংস কাটার বড় ছুরি। রঞ্জু মধুর গলায় ডাকল, পুফি পুফি! কাম হিয়ার লিটল ডার্লিং।

 

সন্ধ্যা থেকে ঢাকা শহরে বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া। বঙ্গোপসাগরে ডিপ্রেসন হয়েছে। মানুষ তার ডিপ্রেসন্ন অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে না, সাগর পাড়ে। সাগর তার ডিপ্রেসন্ন স্থলভূমিতে ছড়িয়ে দেয়।

নিশ্চয়ই কোথাও বড় ধরণের ঝড় হচ্ছে ন্যাশনাল গ্রিড ফেল করেছে। ঢাকা শহর অন্ধকারে ডুবে আছে।

শায়লা এই ঝড় বৃষ্টির রাতে জোয়ার্দারের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে কাল ইংল্যান্ড চলে যাবে। আজ এসেছে বিদায় নিতে। এখন মনস্বীর করতে পারছে না। ফ্ল্যাট বাড়িতে ঢুকবে কি ঢুকবে না।

কিছুক্ষণ আগেও জেনারেটর চলছিল। এখন জেনারেটর বন্ধ। চারদিকে ঘোর অন্ধকার। শায়লা দরজায় ধাক্কা দিল। মোমবাতি হাতে দরজা খুললেন জোয়ার্দার। বিস্মিত গলায় বললেন, আরো তুমি!

শায়লা বলল, আসব?

আসব মানে। অবশ্যই আসবে। ঝড়বৃষ্টির রাতে তোমাকে দেখে এত অবাক হয়েছি। আমার মন ভয়ংকর খারাপ ছিল এখন মন ভাল হতে শুরু করেছে।

মন খারাপ ছিল কেন?

আজ অফিস থেকে ফিরে দেখি আমার বিড়ালটা রান্নাঘরে ময়ে পড়ে আছে। কেউ একজন তাকে মেরে ফেলেছে।

মেরে ফেলেছে মানে?

একটা ছুরি দিয়ে পেটের নড়িতুড়ি বের করে দিয়েছে। বিড়ালটার পাশে রক্তমাখা ছুরি পড়ে আছে।

এই কাজটা কে করেছে?

জোয়ার্দার বললেন, আমিও তাই ভাবছি। আমি একা মানুষ। কেউ যে ঘরে ঢুকবে সেটা সম্ভব না। আমি নিজের হাতে ঘরে তালা দিয়ে গিয়েছি অফিস থেকে ফিরে তালা খুলেছি।

বাতাসের ব্যাপটায় মোমবাতি নিভে গেছে। জোয়ার্দার দেয়াশলাই খুঁজে পাচ্ছেন না। শায়লা বলল, দেশলাই পরে খুঁজবেন। আগে আমাকে কোথাও বসার ব্যবস্থা করে দিন। আমার খারাপ। ভার্টিগো সমস্যা। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা।।

জোয়ার্দার বললেন, হাত ধরে তোমাকে নিয়ে গেলে কি কোন সমস্যা হবে?

শায়লা বলল, না। সমস্যা হবে না। আপনি আমার হাত ধরুন।

 

বসার ঘরে জোয়ার্দার এবং শায়লা মুখোমুখি বসে আছে। ঘর অন্ধকার। তুমুল ঝড় শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিদ্যুতের আলোয় শায়লার করুণ হতাশ চেহারা মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে।

জোয়ার্দার বললেন, তোমার শরীর এত খারাপ করেছে কেন?

শায়লা বলল, আপনার বিড়ালটার জন্যে। বিড়াল গেছে এখন সব ঠিক হয়ে যাবে।

জোয়ার্দার বললেন, তোমার কথা বুঝতে পারছি না।

শায়লা বলল, আমিও বুঝতে পারছি না।

জোয়ার্দার বললেন, তোমার গায়ে যে অনেক জ্বর এটা জান?

জানি।

এত জ্বর নিয়ে ঝড় বৃষ্টির মধ্যে ফিরবে কি ভাবে? গাড়ি এনেছ?

না। আমি এখানেই থাকব। আপনাকে আর চোখের আড়াল করব না। চোখের আড়াল করলে যদি অন্য রিয়েলিটিতে চলে যাই।

জোয়ার্দার বললেন, শায়লা! তোমার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না।

শায়লা বলল, জ্বরের ঘোরে। আমি ভুল বকছি। এই জন্যে আমার কথা বুঝতে পারছেন না। দয়া করে আপনি আমার হাত ধরে পাশে বসে থাকুন। আর আপনার যদি আমার হাত ধরতে লজ্জা লাগে তাহলে আমি হাত ধরে বসে থাকব। লজ্জা করার বিলাসিতা এখন আমার আর নেই।

জোয়ার্দারশায়লার পাশে এসে বসলেন। ঢাকা শহর বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *