৬৯. ডিসেম্বরের ছয় তারিখ

ডিসেম্বরের ছয় তারিখ। ভারত স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মুক্তিবাহিনী-ভারতীয় বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকার দিকে। ঢাকার বাইরের পাকিস্তানি ঘাঁটিগুলি একে একে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে; বাংলাদেশের আকাশে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য।

শরণার্থী শিবিরেব মানুষরা অস্থির হয়ে পড়েছেন দেশে ফেরার জন্যে; দুই পক্ষের ভয়াবহ গোলাগুলির মধ্যেই তারা দেশে ঢুকতে শুরু করেছেন। স্বাধীন হবার আনন্দ তারা নিজ দেশে বসে পেতে চান।

এমনই এক অস্থির সময়ে (সন্ধ্যার ঠিক পর পর) শাহেদকে বারাসতের গ্রামের একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে দেখা গেল। তার হাতে নাইমুলের দেযা ঠিকানা। সে অনেক কষ্টে এই পর্যন্ত এসেছে। কাগজে লেখা ঠিকানা শেষ পর্যন্ত খুঁজে বের করেছে। এখন আর তার সাহসে কুলাচ্ছে না; বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিয়ে সে যে জানতে চাইবে–এখানে আসমানী নামের কেউ আছে, এই সহজ কাজটা কালতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে তাকে বলা হবে, না। এই নামে তো কেউ থাকে না,। কিংবা বলা হবে–হ্যাঁ এই নামে একটি মেয়ে ছিল, তারা এখন নেই। কোথায় আছে তাও বলতে পারছি না।

হঠাৎ শাহেদের মনে হলো, তার কৃষ্ণা পেয়েছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। আসমানীর খোঁজ না করে তার এখন উচিত ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি খেতে চাওয়া।

দরজার কড়া নাড়তে হলো না, দরজা খুলে গেল। এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ বিস্মিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন। শাহেদকে বললেন, কাকে চান?

শাহেদ আমতা আমতা করে বলল, পানি খাব, এক গ্রাস পানি খাব। আসুন ভেতরে এসে বসুন। জল এনে দিচ্ছি। শাহেদ বিড়বিড় করে বলল, এই বাড়িতে কি আসমানী নামের কেউ থাকে? আর একটি ছোট্ট মেয়ে রুনি।

আপনি তাদেব কে হন?

রুনি আমার মেয়ে।

শাহেদের শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। বৃদ্ধ এগিয়ে এসে শাহেদের হাত ধরলেন। কোমল গলায় বললেন, আপনার স্ত্রী এবং কন্যা আমার এখানেই আছে। তারা ভালো আছে। আসমানী বাড়ির পেছনে পুকুর ঘাটে আছে। মেয়েটা বেশিরভাগ সময় সেখানেই থাকে। আপনি কি আগে তার কাছে যাবেন, না জল খাবেন?

শাহেদ বিড়বিড় করে বলল, পুকুরঘাট কোন দিকে?

বৃদ্ধ ঘাট দেখিয়ে দিলেন। শাহেদ এলোমেলো পা ফেলে এগুচ্ছে। সে নিশ্চিত ঘাট পর্যন্ত যেতে পারবে না। তার আগেই মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। এখন সে নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

 

তারো কিছুক্ষণ পরে রুনি মায়ের খোঁজে পুকুরঘাটে এসে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। মা অচেনা অজানা দাড়ি গোফওয়ালা এক লোককে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে। কী ভয়ঙ্কর লজ্জার ব্যাপার!

রুনি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, এসব কী হচ্ছে মা? কী হচ্ছে এসব?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *