২৮. সালেহ ইমরান কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন

সালেহ ইমরান কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার ভঙ্গি শান্ত। মতিনের কাছে মনে হচ্ছে, কলেজের প্রফেসর কালো কোট পরে ডায়াসে উঠছেন। বক্তৃতা দেবেন। বক্তৃতার বিষয়বস্তু সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা। কিংবা প্রেমের কবিতায় রূপকের ব্যবহার।

নিশুর একপাশে মতিন বসে আছে। অন্যপাশে মৃন্ময়ী। মতিনের পাশে কঠিন গাধা আশরাফ। নিশুকে অস্থির মনে হচ্ছে। মৃন্ময়ী নিশুর হাত ধরে আছে। মৃন্ময়ীর চোখ স্থির। সে পলক পর্যন্ত ফেলছে না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

সালেহ ইমরান শান্তভঙ্গিতে বললেন, আপনার নাম খলিল?

প্রধান আসামি খলিল বলল, জি স্যার, ডাকনাম চুন্ন।

আসামিকে মোটেই নার্ভাস মনে হচ্ছে না। তার মাথার চুল আঁচড়ানো। মুখ ক্লিনড শেভড। তবে নতুন উকিল দেখেই হয়তো সরু চোখে তাকাচ্ছে।

আপনি জবানবন্দিতে বলেছেন, নিশু আপনাকে আপোসের প্রস্তাব দিয়েছে?

জি স্যার।

প্রস্তাব কোথায় দিয়েছে?

হোটেলে। বাড়ির সামনেই হোটেল আছে। বিসমিল্লাহ হোটেল।

হোটেলে আপনি কী করছিলেন?

খানা খাচ্ছিলাম।

বাড়ির সামনেই হোটেল। বাড়িতে খানা না খেয়ে হোটেলে খাচ্ছিলেন কেন?

সাথে আমার দুই বন্ধু ছিল। এদের নিয়ে একসঙ্গে খানা খেলাম। বন্ধুবান্ধব নিয়ে সবসময় বাড়িতে যাওয়া যায় না।

কী দিয়ে খানা খাচ্ছিলেন? আইটেম কী কী ছিল?

আইটেম স্যার মনে নাই।

আপনার প্রতিটি ঘটনা মনে আছে। নিশু কী কী প্রস্তাব দিল মনে আছে, আইটেম মনে নাই কেন?

স্যার এখন মনে পড়েছে। ঝাল চিকেন ফ্রাই। বিফ ভুনা, ডাল।

মাছের কোনো আইটেম ছিল না?

জি-না।

পেট ভরে খেয়েছেন?

জি।

রানা ভালো ছিল?

ঐ হোটেলের রান্না স্যার ভালো।

সালেহ ইমরানের ঠোঁটের কোনায় সামান্য হাসির আভাস দেখা দিল। সেই হাসি তিনি দ্রুত মুছে ফেলে বললেন, আপনি জবানবন্দি দিয়েছেন যে, নিশুর ঘরে তিন বন্ধু নিয়ে ঢুকেছেন। খাওয়া-দাওয়া করেছেন। আপনি কিছুক্ষণ আগে বিসমিল্লাহ হোটেলে ঝাল চিকেন ফ্রাই, বিফ ভুনা এবং ডাল দিয়ে ভরপেট খেয়েছেন। আবার খেতে বসে গেলেন? আধাঘণ্টার ভেতর দুইবার লাঞ্চ!

খলিল সামান্য হকচকিয়ে গেল।

মতিন নিশুর কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা গলায় বলল, বাঘের বাচ্চার হাতে পড়েছে। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, ইমরান সাহেব এই হারামজাদাকে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলবেন। হারামজাদার রক্ত চেটে খাবেন।

খলিল নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, নিয়ম রক্ষার মতো দুই এক লোকমা মুখে দিলাম। দাওয়াত করে এনেছে, না খেলে খারাপ দেখায়।

তারপর আপনার জবানবন্দিতে যা দেখলাম, আপনার ভাষাতেই বলছি, আপনি সেক্স করলেন।

জি স্যার। উনি চেয়েছেন বলে করেছি। স্বইচ্ছায় না।

আপনার বাকি দুই বন্ধুও করেছেন?

জি।

আপনারা তিনবন্ধুই তো এইসব কাজের ঘোর বিরোধী। সমাজে এধরনের অনাচার হোক চান না। অথচ নিজেরা কাজটা করলেন?

বললাম না স্যার জোরাজুরি।

তারপর ঘর থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে গেলেন, কারণ তখনো জানেন না যে নিশু পুরো ঘটনা সাজিয়ে রেখেছে।

জি স্যার। শান্তিমতো বের হয়ে গেছি।

নিশু বলে নাই যে, আবার আসবেন?

মুখে কিছু বলে নাই, তবে ভাব সেরকমই ছিল।

কখন টের পেলেন ফরিয়াদি নিশুর মনে ছিল এই দুষ্টুবুদ্ধি?

মামলা করার পর টের পেয়েছি।

আপনাকে দুপুরে খেতে ডেকেছে। আপনি সঙ্গে আরো দুই বন্ধু নিয়ে গেছেন। পকেটে ক্ষুর। ক্ষুর নিয়ে গেলেন কেন?

পকেটে ক্ষুর ছিল না স্যার।

ছিল না?

জি-না। ক্ষুর ঐ হারামি মেয়ে যোগাড় করেছে। নিজের শরীর কাটাকুটি করে মামলা সাজায়েছে।

সালেহ ইমরান জাজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ইওর অনার, এই আসামি ক্ষুরসহ ছিনতাই করার সময় পুলিশের হাতে একবার ধরা পড়েছিল। লালবাগ থানায় তার রেকর্ড আছে। আর ক্ষুরে তার হাতের ছাপও আছে। পুলিশের ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্ট আছে। আমরা আদালতে জমা দিয়েছি।

মতিন বলল, বলেছিলাম না ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলবে? নিশু, অবস্থা দেখেছিস? পড়েছে রক্তচাটার হাতে। ছিঁড়ে কুটিকুটি করে রক্ত চাটবে।

আশরাফ বলল, চুপ করে থাক তো। মনে হচ্ছে তুই এখনই রক্ত চেটে খেতে চাচ্ছিস।

খলিলের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ এখন স্পষ্ট। সে জিভ দিয়ে কয়েকবার ঠোঁট চাটল। গলা খাকারি দিল। কিছুটা হতাশ ভঙ্গিতে বলল, স্যার, এখন মনে পড়েছে। আমার পকেটে একটা ক্ষুর ছিল।

ক্ষুর সঙ্গে নিয়ে ঘুরেন?

লাইফের প্রটেকশানের জন্যে সঙ্গে সেই দিন ছিল। আমার অনেক শত্রু আছে। শহরের অবস্থা ভালো না। প্রটেকশান লাগে।

আপনার জুতার সাইজ কত? কত নম্বর জুতা পরেন?

জুতার নাম্বার দিয়ে কী করবেন স্যার?

জানতে চাচ্ছি। জুতার সাইজটা দরকার।

আমি জুতা পরি না স্যার। সবসময় স্যান্ডেল। বাটা কোম্পানির স্যান্ডেল।

ঐদিন ফরিয়াদি নিশুর ঘর থেকে আপনাদের তিনবন্ধুর নিশ্চিন্ত মনে বের হবার কথা। আপোসের ঘটনা ঘটেছে। চিন্তিত হবার মতো কিছু ঘটে নি। কিন্তু আপনি স্যান্ডেল ফেলে বের হয়ে গেছেন। তিনজনের মধ্যে দুজনই স্যান্ডেল ফেলে গেছেন। পুলিশ আলামত হিসেবে দুজোড়া স্যান্ডেল জব্দ করেছে। এই স্যান্ডেল জোড়া আপনার না?

খলিল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

সালেহ ইমরান বললেন, ইওর অনার, এই আসামিকে আর জেরা করার কিছু নাই। পরেরজনকে জিজ্ঞেস করব।

জাজ সাহেব সেই দিনের মতো কোর্ট অ্যাডজনৰ্ড করে দিলেন। সালেহ ইমরান নিশুর দিকে এগিয়ে এলেন। নিশু উঠে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে পানি। সালেহ ইমরান বললেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। কনভিকশন হবে। সর্বোচ্চ সাজা হবে। এদের একজনকে আমি রাজসাক্ষী করার ব্যবস্থা করব।

নিশু বলল, সর্বোচ্চ শাস্তিটা কী?

নারী নির্যাতন আইনের দণ্ডবিধি ৯-এ যাবজ্জীবন। Please dont cry. আপনি সাহসী মেয়ে। সাহসী মেয়েরা কাঁদে না।

 

মতিন সালেহ ইমরানকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছে। তার ইচ্ছা গাড়িতে উঠার আগমুহূর্তে সে ধন্যবাদ-সূচক সুন্দর কিছু কথা বলবে। সুন্দর কথা গোছাতে পারছে না। তার চোখের সামনে এখনো আদালতের দৃশ্য ভাসছে। একটা নেকড়ে বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একটার পর একটা কথা সাজিয়ে নেকড়েটাকে খাঁচায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। নেকড়ে কিছু বুঝতেই পারে নি।

সালেহ ইমরান গাড়ির দরজা খুলে বললেন, কিছু বলবে? থ্যাংকস দিতে চাও?

চাই স্যার।

থ্যাংকস কমলের মাকে দাও। আমি তার কথাতেই মামলা হাতে নিয়েছি।

উনাকেও থ্যাংকস দেব।

সালেহ ইমরান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আজকের দিনটা আমার জন্যে অশুভ।

কেন স্যার?

কমলের মা আমাকে ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়েছে। ঘটনাটা ঘটবে আমি জানতাম। নিজেকে তৈরিও করে রেখেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, যতটা প্রস্তুতি আমার মধ্যে ছিল বলে ভেবেছি ততটা ছিল না।

স্যার, খবরটা কি কমল জানে?

না, জানে না। তাকে জানাতে হবে। যা ঘটেছে যেভাবে ঘটেছে সবই বলতে হবে। তার কাছে কিছুই লুকানো যাবে না। তোমাকে এত কিছু বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কমলের যদি কোনো মানসিক সাপোর্টের প্রয়োজন হয় তাকে তা দেবে।

জি স্যার।

তোমার পরিচিত একটি মেয়ে যে হারিয়ে গিয়েছিল, তাকে কি পাওয়া, গেছে?

জি-না স্যার।

ব্রোথেলে খোঁজ করো। হারিয়ে যাওয়া তরুণীদের শেষ আশ্রয় ব্রোথেল।

সালেহ ইমরান গাড়িতে উঠে পড়লেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *