১৬. বিদায়ের আয়োজন

নিচে জরীর বিদায়ের আয়োজন চলছে। রাত হয়েছে। দশটা। বরযাত্রীরা আর এক মিনিটও দেরি করতে চায় না। কিন্তু ক্রমাগতই দেরি হচ্ছে। কনে—বিদায় উপলক্ষে খুব কান্নাকাটি হচ্ছে। জরীর মা দু বার ফিট হয়েছেন। জরীকে ধরে রেখেছেন।

বর-কনেকে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হবে। জরী শেষ বারের মতো বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে–তার ছবি! ভাড়া-করা ফটোগ্রাফার ক্যামেরা স্ট্যাণ্ডে লাগিয়ে অধৈৰ্য হয়ে অপেক্ষা করছে। বর এসে দাঁড়িয়ে আছে কখন থেকে। কনের দেখা নেই। জরীকে বার বার ডাকা হচ্ছে।

ঘরের সব ঝামেলা চুকিয়ে জরী যখন বারান্দায় ছবি তোেলবার জন্যে রওয়ানা হয়েছে, তখনি হোসেন সাহেব বললেন, জরী, আনিসের সঙ্গে দেখা করে যাও। তার সঙ্গে আর দেখা নাও হতে পারে।

জরী থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হোসেন সাহেব বরকে বললেন, তুমি আর দু মিনিট অপেক্ষা কর। এ বাড়ির একটি ছেলে খুবই অসুস্থ, জরী তার সাথে দেখা করে যাক।

যদি বলেন, তবে আমিও যাব আপনাদের সঙ্গে।

না, তোমার কষ্ট করতে হবে না। তুমি একটু অপেক্ষা কর। এস জারী।

জরীর সঙ্গে অনেকেই উঠে আসতে চাইছিল। কিন্তু হোসেন সাহেব বারণ করলেন, দল-বল নিয়ে রোগীর ঘরে গিয়ে কাজ নেই।

আনিসের ঘর অন্ধকার। বাইরে বিয়েবাড়ির ঝলমলে আলো। সে-আলোয় আনিসের ঘরের ভেতরটা আবছা আলোকিত। জারী ভেতরে এসে দাঁড়াল। হালকা একটি সৌরভ ছড়িয়ে পড়ল। চারদিকে। জরী কী সেন্ট মেখেছে কে জানে। সে খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে মৃদু স্বরে ডাকল, আনিস ভাই, আনিস ভাই।

কেউ সাড়া দিল না। হোসেন সাহেব বললেন, বাতি জ্বালাব, জরী?

না, না দুলাভাই।

জরী নিচু হয়ে আনিসের কপাল স্পর্শ করল। ভালোবাসার কোমল স্পর্শ, যার জন্যে একটি পুরুষ আজীবন তৃষিত হয়ে থাকে। হোসেন সাহেব বললেন, ছিঃ জরী, কাঁদে না! এস আমরা যাই!

ঘরের বাইরে বড়োচাচা দাঁড়িয়ে ছিলেন। জরী তাঁকে জড়িয়ে ধরল। তিনি বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে মা। ফি আমানুল্লাহ, ফি আমানুল্লাহ।

নিচে তুমুল হৈচৈ হচ্ছিল। জরী নামতেই তাকে বরের পাশে দাঁড় করিয়ে দিল। ক্যামেরাম্যান বলল, একটু হাসুন!

সবই বলল হাস জরী, হাস, ছবি উঠবে।

জরীর চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু সে হাসল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *