১৬. নিজাম সরকার কল্পনাও করেন নি

নিজাম সরকার কল্পনাও করেন নি ব্যাপারটা এত দূর গড়াবে। একটা আধাপাগলা লোক বাড়ির সামনে ছাতা মাথায় দিয়ে বসে থাকলে, কার কী যায় আসে?

কিন্তু নিজাম সরকার ফজরের নামাজ শেষ করে বারান্দায় এসে দেখেন, আমবাগানে দশ-বার জন লোক জটলা পাকাচ্ছে। আমিন ডাক্তারের গা ঘেঁষে বসে আছে নইম মাঝি। নইম মাঝি নিজাম সরকারকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, স্লামালিকুম সরকার সাব।

নিজাম সরকার গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। নামাজের পর তিনি উঠোনে বসে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোরআন শরিফ পড়েন। আজ পড়তে পারলেন না। হনহন। করে এগিয়ে গেলেন আমিন ডাক্তারের দিকে।

নইম মাঝি সরকার সাহেবকে দেখে দাঁড়াল, কিন্তু আমিন ডাক্তার বসে রইল। বহু কষ্টে রাগ সামলালেন নিজাম সরকার। থমথমে গলায় বললেন, তুমি এইখানে কী কর নইম? বেহুদা ঝামেলা করছ নোমরা। আমি থানাত খবব দিয়াম। যাও, বাড়িত যাও।

আইচ্ছা।

নইম মাঝি কিন্তু বাড়ি গেল না। আমিন ডাক্তারের পাশে বসে একটা বিড়ি ধরাল।

জলমহালে গিয়ে সরকার সাহেবের মাথায় রক্ত উঠে গেল। মাছ মারার কোনো আয়োজন নেই। জেলেরা ছেলেমেয়ে নিয়ে রোদ পাচ্ছে।

এই, বিষয় কী? আইজ কাজকাম নাই?

কৈবর্তদের মুরব্বি ধীরেন্দ্র হাত জোড় করে এগিয়ে এল।

এই ধীরেন, কী হইছে?

আমরারে কইছে, আইজ মাছ মারা হইত না।

কে কইছে?

ধীরেন্দ্র নিরুত্তর।

বল কে কইছে।

হাশেম সাব কইছেন।

হাশেম সাব! ডাক তো হাশেম সাবরে। দেখি বিষয় কী?

হাশেম সাব আমিন ডাক্তারের সঙ্গে মাছের হিসাব রাখে। লোকটি মহা ধুরন্ধর। এসেই অবাক হয়ে বলল আমি আবার কোন সময় কইলাম। ফাইজামির জায়গা পাও না? যত ছোটলোকের দল। যাও, কামে যাও।

কার্তিক মাসের শেষাশেষি জমি তৈরীর কাজে সবার ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু সোহাগীর লোকজন সেদিন কেউ কাজে গেল না। সরকারবাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। দুপুরবেলা এলেন চৌধুরী সাহেব।

গম্ভীর হয়ে বললেন, ঝামেলাটা মিটাইয়া ফেল নিজাম। লোকটা না খাইয়া আছে।

কী করতে কন আমারে?

মহাল থাইক্যা একটা বড় মাছ ধইরা মতি মিয়ার বাড়িত পাঠাইয়া দেও। একটা মাছে তোমার কিছু যাইত-আইত না।

চৌধুরী শাব, নরম হইলে গাঁও-গেরামে থাকন যায় না। আইজ একটা মাছ দিলে, কাইল দেওন লাগব দশটা।

লোকটা না খাইয়া থাকব?

আমি কি কইম তার? আমি কি তারে কইছি না খাইয়া থাকতে?

চৌধুরী সাহেব গেলেন আমিন ডাক্তারের কাছে। গায়ে হাত দিয়ে বললেন, ডাক্তার আইও আমার সাথে, চাইরডা ডাইল-ভাত খাও। আও দেখি আমার সাথে।

একটা মীমাংসা না হইলে কেমনে খাই চৌধুরী সাব?

কয় দিন থাকবা এই বায়? ধর যদি মীমাংসা না হয়?

যত দিন না হয় তত দিন থাকবাম।

বিকালের দিকে আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টি নামল। কার্তিক মাসে এরকম বৃষ্টি হয় না কখনো। ছাতা মাথায় দিয়ে আমিন ডাক্তার উবু হয়ে বসে-বসে ভিজতে লাগল। নিজাম সরকারের বিরক্তির সীমা রইল না। রাতের বেলা তাঁর জামাই আসার কথা, সে এসে যদি দেখে এমন একটা অবস্থা–সেটা মোটেই ভালো হবে না। অবশ্যি মোহনগঞ্জ থানায় খবর পাঠান হয়েছে। সন্ধ্যার মধ্যে থানাওয়ালাদের আসবার কথা। এলে ঝামেলাটা চোকে। নিজাম সরকার তামাক টানতে লাগলেন।

সন্ধ্যার আগে আগে ধীরেন্দ্র এসে হাজির। সে নাকি কী বলতে চায়। নিজাম সরকার গম্ভীর মুখে বললেন, কী কইতে চাও?

ধীরেন্দ্ৰ হাত কচলাতে লাগল। সে একটি বিশেষ কথা বলতে এসেছে। চুক্তি অনুযায়ী যে ত্রিশ ভাগ মাছ ওদের প্রাপ্য, সেখানে থেকে সে পাঁচটা বড়ো বড়ো মাছ মতি মিয়ার কাছে পাঠাতে চায়। নিজাম সরকার গলা ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মাছ দিতে চাও?

আজ্ঞে চাই।

ক্যান? কারণটা আমারে কও।

কোনো কারণ নাই, ঝামেলাটা মিটাইতে চাই।

ঝামেলা কী? আর ঝামেলা থাকেই, তুমি সেইটা মিটাইবার কে? তুমি কোন মাতবর?

ধীরেন্দ্ৰ তবু যায় না। উসখুস করে।

যাও এখন তুমি বিদাও হও।

 

সন্ধ্যাবেলা বহু লোকজন আবার সামনে এসে জড়ো হল। বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। পশ্চিম আকাশে অল্প অল্প আলো থাকায় অস্পষ্টভাবে সব কিছু নজরে আসে। থানাওয়ালাদের এসে পড়া উচিত, কেন এখনো আসছে না কে জানে? জামাই রাত নটার মধ্যে এসে পড়বে। কী কুৎসিত ঝামেলা!

নিজাম সরকার হঠাৎ করে ঠিক করলেন, আমিন ডাক্তারকে ডেকে পাঠাবেন। আর ঠিক তখনি মাছের খোনার একটি দিক আলো হয়ে উঠল। প্ৰচণ্ড হৈচৈ শোনা যেতে লাগল। নিজাম সরকার দোনলা বন্দুক হাতে নিচে নেমে এসে শুনলেন, স্থানীয় কৈবৰ্তরা লাঠি-সড়কি নিয়ে মাছের খোলায় চড়াও হয়েছে। খুব কম হলেও দু জনের পেটে সড়কি বিধেছে।

রাত বারটায় মোহনগঞ্জ থানার সেকেণ্ড অফিসার এসে আমিন ডাক্তার, নিমাই মাঝি এবং আবু খাঁকে বেঁধে নিয়ে গেল। কৈবর্তপাড়ায় কোন পুরুষমানুষ, পাওয়া গেল না। সব পুরুষ রাতারাতি উধাও হয়েছে। কোমরে দড়ি বেঁধে আমিন ডাক্তারকে নৌকায় ভোলা হল। ঘাটে কোন জনমানব ছিল না।

ময়মনসিংহের সেসন জজ দুটি খুন এবং দাঙ্গাহাঙ্গামায় নেতৃত্ব দানের অভিযোগে আমিন ডাক্তার এবং নিমাই মাঝিকে দীর্ঘদিনের জন্যে জেলে পাঠিয়ে দিলেন।

সোহাগীর দিন কাটতে লাগল আগের মতোই। ঘুরেফিরে আবার বৈশাখ মাস এল। বাঘাই সিনির গান গেয়ে ছেলেমেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেঁচাতে লাগল–

আইলাম গো যাইলাম গো
বাঘাই সিনি চাইলাম গো।

আজরফ বিয়ে করল সুখানপুকুরে। জমিজমা করল। চৌধুরীদের আমবাগান কিনল।

ডাক্তার ফজলুল করিম সুখানপুকুরে এসে আবার শেখ ফার্মেসি খুললেন। আবার চলেও গেলেন।

সোহাগীতে প্রাইমারি স্কুল হল। ছাত্রের অভাবে সেই স্কুল চলল না।

সিরাজ মিয়া আবার আরেকটি বিয়ে করল। সে-বউ আবার কয়েক দিন পর মরেও গেল। সিরাজ মিয়ার অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগল। জমিজমা বিক্রি হতে লাগল। দিন কাটতে লাগল সোহাগীর। তারপর এক সময় আমিন ডাক্তারের কথা কারো মনেই রইল না। এগার বৎসর বড়ো দীর্ঘ সময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *