যমুনা বেতঝোঁপের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। ঝোঁপের কাটায় তার শাড়ি আটকে গেছে। হাত এবং গাল কেটেছে। তার মুখে নোনতা ভাব। কাটা গালের রক্ত গড়িয়ে ঠোঁট পর্যন্ত এসেছে। যমুনা অবাক হয়ে লক্ষ করল, রক্তের নোনতা স্বাদ তার খারাপ লাগছে না। সে ঝোঁপের পাশে বসে বেতকাটা থেকে শাড়ি ছাড়াবার চেষ্টা করছে। কাজটা সে করছে যত্ন নিয়ে এবং এই কাজটা করতেও তার ভালো লাগছে। কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা।

জঙ্গলের অন্ধকার তার চোখে সয়ে এসেছে। আবছা আবছা ভাবে অনেক কিছুই চোখে আসছে। জোনাকি পোকার দল বের হয়েছে। অনেকগুলি ছোট ছোট দল। তারা মাঝে মাঝে একত্র হচ্ছে, আবার ছড়িয়ে পড়ছে। তাকে কে যেন বলেছিল জোনাকি পোকার দলের সঙ্গে মা লক্ষ্মী থাকেন। ঘরের বন্দিজীবন যখন তাঁর অসহ্য বোধ হয় তখন তিনি খোলা মাঠে বা জংলায় বেড়াতে বের হন। জোনাকি পোকরা হয় তার খেলার সাথি। জোনাকিদের পেছনে পেছনে তিনি মনের আনন্দে নাচতে নাচতে ছুটেন।

যমুনা জোনাকির ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করে বলল, মা লক্ষ্মী! আমি মহাবিপদে পড়েছি, আমাকে উদ্ধার করা।

যমুনার ঠিক মাথার উপরে একটা ডাল নড়েচড়ে উঠল। কিচকিচি শব্দ হলো। গাছের দিকে না তাকিয়েই যমুনা বুঝল বাঁেদর। এই বনে বাঁেদর আছে। হনুমানও আছে। এরা মানুষ ভয় পায় না। হনুমানও দেবতা। তার কাছেও প্রার্থনা করা যায়। যমুনা গাছের দিকে তাকিয়ে আবারো হাতজোড় করল।

আকাশে সন্ধ্যা থেকেই মেঘের আনাগোনা ছিল। এখন বিজলি চমকাতে লাগল। একেকবার বিজলি চমকায় বন আলোয় ঝিলমিল করে উঠে। বানর এবং হনুমানের দল ঝাপাঝাপি শুরু করে। বজ্ৰপাতের সময় বনে থাকতে নেই। তখন চলে আসতে হয় খোলা প্রান্তরে। তা না করে যমুনা খুঁজে পেতে লম্বা একটা তাল গাছের নিচে দাঁড়াল। তার মন চাচ্ছে এই গাছে একটা বজ্ৰপাত হোক। আকাশের বাজ যখন নেমে আসবে তখন সে তালগাছ দুহাতে জড়িয়ে ধরবে।

পুরো আকাশ ছিন্নভিন্ন করে বিদ্যুৎ চমকাল, আর তখনি যমুনা স্পষ্ট দেখল বেতঝোঁপের উল্টোদিকে কুজো হয়ে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। শুধু যে দাঁড়িয়ে আছে তা-না, হাত ইশারায় যমুনাকে ডাকছে। কুজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সারা শরীর চাদরে ঢাকা। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মানুষটা যে হরিচরণ এই বিষয়ে যমুনার কোনো সন্দেহ নেই। যমুনা অবাক হয়ে ডাকল, হরিকাকু!

ছায়ামূর্তি জবাব দিল না। আবারো হাত ইশারা করল। যমুনার মনে রইল না, মানুষটা জীবিত না। একজন মৃত মানুষ গভীর বনে উপস্থিত হতে পারে না। যমুনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগুচ্ছে। ছায়ামূর্তি সরে সরে যাচ্ছে। যতবার যমুনা থমকে দাঁড়াচ্ছে ততবার ছায়ামূর্তিও দাঁড়াচ্ছে। তাকে কি ভুলোয় ধরেছে? ভুলো ভয়াবহ জিনিস। সে প্রিয় মানুষের রূপ ধরে কাছে আসে। নাম ধরে ডাকে। তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছনে পেছনে যেতে হয়। একসময় ভুলো তার শিকারকে জলে ড়ুবিয়ে মারে।

যমুনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, হরিকাকু আমার ভয় লাগছে। ছায়ামূর্তি জবাব দিল না। আবারো হাত ইশারায় ডাকল। বিদ্যুৎ চমকানোর সময় ছায়ামূর্তি স্পষ্টই দেখতে পাওয়ার কথা। তখন কিন্তু দেখা যায় না। তখন ছায়ামূর্তি বড় কোনো গাছের আড়ালে চলে যায়।

যমুনা ছায়ামূর্তি অনুসরণ করতে করতে জঙ্গলের শেষ সীমানায় চলে এলো। ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে পড়েছে। এখন সে আর যমুনাকে ইশারায় কাছে ডাকছে না। বরং আঙুলের ইশারায় বিশেষ এক দিকে যেতে বলছে। যমুনা ভীত গলায় বলল, হরিকাকু ভয় পাচ্ছি। ছায়ামূর্তি নড়ল না। জঙ্গলের উত্তর সীমানার দিকে আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাস দিচ্ছে, ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। যমুনা পায়ে পায়ে উত্তর দিকে এগুচ্ছে। হঠাৎ তার কাছে মনে হচ্ছে, যেদিকে সে যাচ্ছে সেদিকে শুভ কিছু তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বনের বাইরে পা দিয়েই সে মাওলানা ইদরিসকে পেল। মাওলানার মাথায় ছাতা। হাতে হারিকেন। সারা শরীর কাদায় পানিতে মাখামাখি।

মাওলানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এত সহজে তোমারে পাব ভাবি নাই। আল্লাহপাকের মেহেরবানি পেয়ে গেছি। এত বড় জঙ্গল, কোথায় খুঁজব? চল যাই।

যমুনা বলল, কই যাব?

মাওলানা বললেন, আমার বাড়িতে যাবা। তোমার ভাবি সাব, আমার স্ত্রী আমারে পাঠায়েছে। সে তোমার ঘটনা শুনে মিজাজ খারাপ করেছে। যে জীবনে কোনোদিন উচা গলায় কথা বলে নাই সে আমাকে দিয়েছে ধমক। চিন্তা করেছ অবস্থা?

যমুনা অবাক হয়ে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বিচিত্ৰ মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষটা এমনভাবে কথা বলছে যেন যমুনা তার অনেক দিনের চেনা।

মাওলানা বললেন, দাঁড়ায়া আছ কেন? চল রওনা দেই। তোমার ভাবি চিন্তাযুক্ত আছে। মেয়েছেলেরে বেশি সময় চিন্তার মধ্যে রাখা ঠিক না। পুরুষমানুষ দীর্ঘ সময় চিন্তায় থাকতে পারে। মেয়েরা পারে না। তোমার কি ভুখ লেগেছে?

হুঁ।

ঘরে যাবা। গরম পানি দিয়া গোসল দিবা, তারপরে গরম গরম খিচুড়ি খাবা। অমৃতের মতো লাগবে।

যমুনা বলল, আমাকে যে বাড়িতে নিতেছেন। আপনার অসুবিধা হবে না?

মাওলানা বললেন, অসুবিধা হলে হবে। কী আর করা! তোমারে জঙ্গলে ফালায়া গেলে তোমার ভাবি কী পরিমাণ বেজার হবে তুমি বুঝতেই পারবে না। আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিতে পারে। চল চল হাঁটা দাও। নাও ছাতিটা মাথার উপর ধর।

ছাতি লাগবে না।

তোমার কি গাল কেটেছে? রক্ত পড়তেছে।

হুঁ।

কোনো চিন্তা নেই। তোমার ভাবি দূর্বা পিষে মলম বানায়ে দিবে। গালে দিলেই আরাম। এইসব টোটকা সে ভালো জানে। বুদ্ধিমতী মেয়ে, যেখানে যা দেখে শিখে রাখে। পরে কাজে লাগে।

যমুনা রওনা হলো। অনেক দুঃখের পর তার এখন হাসি পাচ্ছে। পাগল একজন মানুষের পেছনে পেছনে সে যাচ্ছে যার ধারণা ঘরে তার মমতাময়ী স্ত্রী। তাদের ভালোবাসা সুখের সংসার। আহারে!

 

যমুনা অনেক সময় নিয়ে সাবান ডলে গরম পানিতে গোসল করল। নতুন সুতির শাড়ি পরল। সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাওলানার সঙ্গে খেতে বসল। যমুনা বলল, আপনি যে অচেনা মেয়েমানুষের সঙ্গে খেতে বসেছেন। আপনার পাপ হবে না? আপনাদের ধর্মে মেয়েছেলের মুখের দিকে তাকানো নিষেধ। ঠিক না?

মাওলানা বললেন, তা ঠিক। তবে রোজ কেয়ামতের সময় পুরুষ রমণীতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। তোমার এখন রোজ কেয়ামত।

আপনার স্ত্রী খাবেন না?

মাওলানা হতাশ গলায় বললেন, এই তার এক অভ্যাস। একা খাবে। আমার সামনে খেতে লজ্জা পায়। কতবার তাকে বলেছি— বউ, আমি তোমার স্বামী। স্বামীর সামনে কিসের লজ্জা? শোনে না।

যমুনা বলল, খিচুড়ি খুব স্বাদ হয়েছে। কে রোধেছে? আপনি না বৌদি?

তোমার ভাবি জোগাড়যন্ত্র করে দিয়েছে। আমি রেঁধেছি। যমুনা বলল, যে দয়া আপনি আমাকে করেছেন তারচেয়ে অনেক বেশি দয়া ভগবান যেন আপনাকে করেন।

মাওলানা ব্যস্ত হয়ে বললেন, আমি কিছুই করি নাই। যা করার তোমার ভাবি করেছে। অতি আচানক মেয়ে। কেউ বিপদে পড়েছে শুনলে অস্থির হয়ে যায়।

যমুনা অনেক রাতে ঘুমাতে গেল। পরিপাটি বিছানা। গায়ে দেয়ার ধোয়া চান্দর। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। হঠাৎ করেই যমুনার মনে হলো, তার মতো সুখী মেয়ে এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ঘুমের মধ্যে অতি আনন্দের একটা স্বপ্নও দেখল। স্বপ্নে সে এবং সুরেন বনে বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গে চার-পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে। মেয়েটা তাদেরই। সে বড় দুষ্টুমি করছে। এই এক গাছের আড়ালে চলে গেল। ধরতে গেলে অন্য এক গাছের আড়ালে। সুরেন কপট বিরক্ত ভাব করে বলল, মেয়েটাকে এত দুষ্ট বানায়েছ। কীভাবে? যমুনা বলল, একা একা মেয়ে মানুষ করছি, দুষ্ট তো হবেই। তুমি থাক কলিকাতায়, আমি মেয়ে নিয়ে জঙ্গলে বাস করি।

জঙ্গলে বাস কর কেন?

কেউ আমাকে বাড়িতে জায়গা দেয় না। জঙ্গলে বাস না করে করব কী? মাওলানা সাহেব তো তোমাকে জায়গা দিয়েছেন। টেলিগ্রামে খবর পেয়েছি।

ভুল খবর পেয়েছ। মাওলানা সাহেব এবং তার স্ত্রীকেও লোকজন তাড়িয়ে দিয়েছে। তিনিও এখন আমাদের সঙ্গে জঙ্গলে থাকেন। জঙ্গলে আমরা ঘর বানিয়েছি। কী যে সুন্দর ঘর। চল তোমারে দেখায়ে নিয়ে আসি।

আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের করা। আমরা মেয়েটাকে ফেলে ঘর দেখতে যাব, সে যাবে হারিয়ে। আরেক যন্ত্রণা হবে।

 

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যমুনা মাওলানা ইদরিসের বাড়িতে থাকছে। এ নিয়ে বাহ্মণপুরে কোনো সমস্যা হলো না। মনে হলো মেয়েটার গতি হয়েছে এই ভেবে সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এক গভীর রাতে দেখা গেল মাওলানার বাড়ির উঠানে টিনের এক ট্রাংক। ট্রাংকভর্তি যমুনার জিনিসপত্র। শাড়ি, চুড়ি, গায়ের চাদর। স্যান্ডেল। তবে মাওলানা সামান্য বিপদে পড়ল। মুসুল্লিরা ঠিক করল তার পেছনে কেউ নামাজে দাঁড়াবে না। পাগল মানুষ ইমামতি করতে পারে না। তার পেছনে নামাজে দাড়ানো নাজায়েজ।

বান্ধবপুর জুম্মা মসজিদের জন্যে নতুন ইমাম এসেছেন। আব্দুল করিম কাশেমপুরী। তাঁর জন্মস্থান কাশেমপুরে বলেই কাশেমপুরী টাইটেল। তাঁর বয়স অল্প। তবে ভাবে ভঙ্গিতে অত্যন্ত কঠিন। প্রথম জুম্মার দিনেই তিনি মাওলানা ইদরিসকে নামাজ পড়তে দিলেন না। মাওলানা ইদরিসের অপরাধ, তিনি বাড়িতে যুবতী মেয়েমানুষ পুষছেন। এত বড় গুনার কাজ যে করে সে আমজনতার সঙ্গে নামাজে শরিক হতে পারে না। যুবতী বিদায় করে তওবা করতে হবে, তারপর বিবেচনা। খুতবা শেষ করে মাওলানা আব্দুল করিম কাশেমপুরী প্রথম ফতোয়া দিলেন–

যে মুসলমানের স্ত্রীর চেহারা পরপুরুষ দিনে তিনবারের অধিক দেখে ফেলে তার বিবাহ বাতিল। তার সন্তানরা জারজ বলে গণ্য হবে।

মুসুল্লিরা হতভম্ব হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন। মাওলানা আব্দুল করিম বললেন, বিধর্মীদের বিষয়ে সাবধান। তারা সাক্ষাৎ শয়তানের অংশ। শয়তানকে যেমন বিনষ্ট করা প্রয়োজন তাদেরও বিনষ্ট করা প্রয়োজন। কাফেরের বিষয়ে এছলাম ধর্ম কোনো ছাড় দেয় নাই। কাফের বিনদ্ষ্টে যে মুসলমান মৃত্যুবরণ করবেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে শহীদের দরজা পাবেন। তাদের স্থান হবে জান্নাতুল ফেরদৌসে। তারা পরীকালে নজিবী (দঃ)-র আশেপাশে থাকার পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন। বলেন আল্লাহু আকবার।

মুসুল্লিরা আল্লাহ আকবর বললেন, তবে তাদের গলায় তেমন জোর পাওয়া গেল না।

মাওলানা আব্দুল করিম বললেন, যারা আমাদের ধর্মে থেকেও কাফেরদের মতো কাজ কারবার করেন, তারা অতি বড় কাফের এবং মোনাফেক। মোনাফেকদের জন্যে আছে কঠিন শাস্তি। আমাদের মধ্যে যারা মোনাফেক। তারা সাবধান হয়ে যান’। মোনাফেককে কেউ সাহায্য করবেন না। সমাজ থেকে তাকে আলাদা করে রাখবেন। যেমন মাওলানা ইদরিস। তাকে যে চাল-ডাল টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করবেন। তিনি তার নিজের বিপদ ডেকে আনবেন। সবাই বলেন আল্লাহু আকবর।

মাওলানা ইদরিস মহাবিপদে পড়লেন। তাঁর বেতন বন্ধ। গ্রাম থেকে খরচের চাল-ডাল আসা বন্ধ। এক রাতে ঘরে রান্না হলো না। মাওলানা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি সন্তুষ্ট যে আজ আমার ঘরে খানা নাই।

যমুনা বলল, আপনি সন্তুষ্ট কেন?

মাওলানা বললেন, আমাদের নবিজির জীবনে কতবার এরকম ঘটেছে। ঘরে নাই খানা। এটা আল্লাহপাকের এক পরীক্ষা। সবেরে আল্লাহপাক এই পরীক্ষায় ফেলেন না। শুধু তাঁর পেয়ারা বান্দাদের এই পরীক্ষার ভেতর যেতে হয়।

যমুনা বলল, আমার চারগাছি স্বর্ণের চুড়ি আছে। বাজারে নিয়া বিক্রি করেন। চাল ডাল কিনেন।

মাওলানা হতভম্ভ হয়ে বললেন, এইটা তুমি কী বললা?

যা বলেছি ঠিক বলেছি। একবেলা না খেয়ে থাকতে পারবেন, তারপরে কী হবে?

রহমানুর রহিম ব্যবস্থা নিবেন। দেখবা সকালের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়েছে।

কীভাবে?

কীভাবে জানি না। তবে সমস্যার সমাধান যে হবে এটা জানি।

যমুনা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনার মতো মানুষ যে দুনিয়াতে আছে এইটাই জানতাম না। আমি বড় কোনো পুণ্যের কাজ করেছি বলেই আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।

মাওলানার সমস্যার সমাধান হলো পরদিন দুপুরের আগেই। বিচিত্ৰ ভাবেই হলো। মাওলানা একশ এক টাকার একটা মনি অর্ডার পেলেন। টাকাটা পাঠিয়েছেন কোলকাতা থেকে ধনু শেখ। তিনি মনি অর্ডারের কুপনে লিখেছেন–

মাওলানা ইদরিস,

আসসালামু আলায়কুম। আমি যে মহাবিপদে পতিত হইয়াছি তাহার কোনো কুল কিনারা নাই। বিপদ হইতে উদ্ধারের কোনো আশা দেখিতেছি না। আমার পা যে কাটা গিয়াছে এই সংবাদ নিশ্চয়ই পাইয়াছেন। কাটা পায়ে পচন ধরিবার কারণে আধ হাত উপরে আবার কাটিতে হইয়াছে। সেই স্থানেও পচন ধরিয়াছে। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়াছেন আবার পা কাটিবেন। যে মহাযন্ত্রণায় আছি তার কোনো সীমা নেই। সৰ্বক্ষণ মনে হয় আমার কাটা পা কড়াইয়ের জ্বলন্ত তেলে ফুটিতেছে।

মাওলানা, আপনি সুফি মানুষ। আপনি আমার জন্যে কোরান খতম করিবেন এবং আমার রোগমুক্তির জন্যে খাস দিলে দোয়া করিবেন। মৃত্যু হইলে আমি রক্ষা পাই। কিন্তু আমার মরিতে ইচ্ছা করে না।

ইতি
ধনু শেখ (খান সাহেব)

পুনশ্চ : লোকমুখে শুনিতেছি আমাকে খান বাহাদুর টাইটেল দিবার জন্যে সুপারিশ গিয়াছে। এই বিষয়েও পৃথকভাবে দোয়া করিবেন। মিলাদের আয়োজন করিবেন।

 

শশাংক পালের শারীরিক অবস্থাও ভয়াবহ। পায়ে পানি এসে ফুলে ঢোল হয়েছে। একেকবার তিনি নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেন। বিড়বিড় করে বলেন, হাতির পা নাকি? এ্যাঁ হাতির পা?

উদ্ভট উদ্ভট সব চিকিৎসার ভেতর দিয়ে তিনি এখন যাচ্ছেন। ফোলা পায়ে মৌমাছি হুল ফোঁটালে আরাম হবে। তিনি মৌমাছির সন্ধানে লোক পাঠিয়েছেন। কাচের বোয়মে কয়েকটা মৌমাছি ধরে আনাও হয়েছে। তিনি বোয়ামের খোলা মুখ পায়ে অনেকবার চেপে ধরেছেন। কোনো মৌমাছি হল ফুটায় নি। হতাশ হয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন— বদ মৌমাছি! এইগুলারে পানিতে চুবায়া মারো। বোয়ামে পানি ঢেলে মৌমাছি চুবিয়ে মারা হয়েছে, তাতে তাঁর পায়ের সমস্যার কোনো সমাধান হয় নি।

মুখ থেকে রুচি সম্পূর্ণ চলে গেছে। জাউ ভাত হজম হয় না। টক ঢেকুর উঠে। বুক জ্বালাপোড়া করে। এর মধ্যে খবর পেয়েছেন মুসলমান বাড়ির বেশি করে তেল মশলা দেয়া মাংস খেলে রুচি ফিরবে। সেই চেষ্টাও করা হয়েছে। তার ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। ক্রমাগত দাস্ত হচ্ছে। সেবাযত্নের চূড়ান্ত করছে সুলেমান। দাস্ত পরিষ্কার করানো, গোসল করানো, পাখা দিয়ে বাতাস- সব একা করছে। এর মধ্যে সবচে’ কষ্টকর কাজ হলো বাতাস করা। কোনো এক বিচিত্র কারণে শশাংক পালের গায়ে সারাক্ষণ মাছি বসে। মাছি তাড়ানোর জন্যেই বাতাসের আয়োজন। সুলেমান শশাংক পালকে মশারির ভেতর রাখার প্ৰস্তাব দিয়েছিল। শশাংক পাল রাজি হন নি। তাঁর নাকি দমবন্ধ লাগে। সুলেমান ক্লান্তিহীন বাতাস করে যায়, শশাংক পাল ক্লান্তিহীন কথা বলতে থাকেন। রোগের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বেশি কথা বলার সমস্যা শুরু হয়েছে। তাঁর সব কথাই রোগব্যাধি নিয়ে।

সুলেমান!

জি কর্তা?

আমার মরণ তাহলে ঘনায়ে আসছে। কী বলো?

সেই রকমই মনে হয়।

গঙ্গাতে পা ড়ুবায়ে মরতে পারলে ভালো হইত। মৃত্যুর সাথে সাথে স্বর্গ। তোমাদের ধর্মে এই রকম কিছু আছে?

না। তবে তওবা করলে কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে। তওবা করলে সব গুনা মাফ হয়ে যায়। এই জন্যেই আমাদের ধর্মে মৃত্যুর আগে আগে সবেই তওবা করে।

তোমাদের ব্যবস্থাও তো খারাপ না। শরীরে রোগ নিয়া গলায় পা ড়ুবায়া শুয়ে থাকার চেয়ে বিছানায় চাদর গায়ে দিয়ে তওবা কর।

কথা ঠিক।

তবে সুলেমান, আমি কিন্তু আরো কিছুদিন আছি। কীভাবে বুঝলাম শুনতে চাও?

চাই।

মৃত্যুর আগে কিছুদিনের জন্যে মুখে রুচি ফিরে আসা। রোগী তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া খাদ্য করে। আমার রুচি এখনো ফিরে নাই। কাজেই আছি আরো কিছুদিন।

ভালো বলেছেন কর্তা।

তোমার পুত্ৰ যে নিরুদেশ হয়েছে তার কোনো সন্ধান পেয়েছ?

না।

মনে হয় না। সন্ধান পাবা। অল্পবয়সে যারা গৃহত্যাগী হয় তারা আর ফিরে না। মধ্যবয়সে যারা ঘর ছাড়ে তারা কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে। কী জন্যে জানো?

জি-না।

মধ্যবয়সে ভোগের জন্যে মায়া জন্মে। বুঝেছ এখন?

জি।

তোমার ছেলের নামটা যেন কী?

জহির।

সে ফিরে আসলে তার জন্যে সুসংবাদ ছিল। কিন্তু সে ফিরবে না, এটা একটা আফসোস।

অবশ্যই আফসোস।

দুটা নীল রঙের মাছি শশাংক পালের মুখের উপর ভোঁ ভো করছে। বাতাসের ঝাপ্টায় তাদের কিছু হচ্ছে না। শশাংক পাল হতাশ চোখে মাছি দুটিার দিকে তাকিয়ে আছেন।

 

লাবুসের মা চরম হতাশা এবং বিরক্তি নিয়ে রান্নাঘরে বসে আছেন। কে একজন বিশাল আকারের এক বোয়াল মাছ দিয়ে গেছে। মাছ খাওয়ার মানুষ নেই— শূন্য বাড়ি। উকিল মুনসি গিয়েছেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া। তাঁর শিষ্য জালাল খাঁর বাড়িতে। শিষ্য গুরুকে অতি আদরে নিয়ে গেছেন। গানবাজনার ফাঁকে গৃঢ় তথ্য নিয়ে গোপনে আলাপ হবে। আলাপের বিষয় হাবলঙ্গের বাজার। সাধক বাউলরা ‘হাবলঙ্গের বাজার’ কথাটা মাঝে মাঝেই তাদের গানে ব্যবহার করেন। শ্রোতারা আর দশটা বাজারের মতোই হাবলঙ্গের বাজারকে দেখে। এর গূঢ় অর্থ জানে না। গৃঢ় অর্থ সাধকরা জানেন। তাঁরা প্রকাশ করেন। না। বাতেনি বিষয় সাধারণের কাছে প্ৰকাশ করতে নেই। জালাল খাঁ বিশেষ একটা গানের অর্থ নিয়ে অস্থিরতার মধ্যে আছেন। তিনি একভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যাখ্যা সঠিক কি-না ধরতে পারছেন না। গুরুর সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করবেন। গানটা হলো–

‘হাবলঙ্গের বাজারে গিয়া
এক টেকা জমা দিয়া
আনিও কন্যা কিনিয়া মনে যদি লয়’

হাবলঙ্গের বাজার যদি হয় শেষ বিচারের হাশরের মাঠ তাহলে সেখানে এক টাকা জমা দিয়ে কন্যা কেনার অর্থ কী? ‘কন্যা’ মানে কি পুণ্য? পুণ্য তো হাশরের মাঠে কেনা যাবে না। পাপ পুণ্যের বাজার তার আগেই শেষ।

 

লাবুসের মা কাঁচা টাকার মতো ঝকঝকে জীবন্ত বোয়াল মাছ থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না। মাছটা দেখলে যে দু’জন সবচে’ খুশি হতো সে দু’জন নেই। একজন ফিরে আসবে, অন্যজন মনে হয় না ফিরবে।

মা।

লাবুসের মা চমকে পেছনে তাকালেন। কয়েক মুহুর্তের জন্যে মনে হলো তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়েছে। কারণ তাঁর ঠিক পেছনে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লাবুস দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখভর্তি ফিনফিনে দাড়ি গোঁফ। চুল লম্বা হয়েছে। তার গায়ে হলুদ রঙের চাদর। চাদরটা পরিষ্কার। লাবুসের মুখ হাসি হাসি।

লাবুস বলল, বঁটিতে সরিষার তেল দাও মা, সিনান করব। ঘরে সাবান আছে?

লাবুসের মা’র হতভম্ব ভোব কাটছে না। কত স্বাভাবিকভাবেই না। এই ছেলে কথা বলছে। যেন সে কখনো বাড়ি ছেড়ে পালায় নি। আজ সকালে কাজে গিয়েছিল, দুপুরে খেতে এসেছে।

লাবুসের মা প্রাণপণ চেষ্টা করলেন নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে। ছেলে যেমন আচরণ করছে তিনিও সে রকমই করবেন। তিনিও ভাব করলেন যেন এই ছেলে ঘরেই ছিল। কখনো পালিয়ে যায় নি। লাবুসের মা স্বাভাবিক গলায় বললেন, উঠানে জলচৌকির উপর বোস। আমি গোসল দিব। গামছা সাবান নিয়ে যা। গরম পানি লাগবে?

না। মা, বোয়ালটায় বেশি করে কাঁচামরিচ দিও। তরকারিতে কাঁচামরিচের গন্ধ এত ভালো লাগে। কাগজি লেবুর গাছটা কি আছে মা?

আছে।

তরকারিতে লেবুর কয়েকটা পাতা দিয়ে দিও, আলাদা ঘ্রাণ হবে। আর কিছু?

ধনিয়া পাতা দিও।

 

লাবুসের মা ফোড়ল দিয়ে ছেলের গায়ে সাবান ডলছেন। ছেলে চোখ বন্ধ করে মূর্তির মতো বসে আছে। লাবুসের মা’র মনে হচ্ছে, রোদে বৃষ্টিতে ছেলের গায়ের রঙের কোনো সমস্যা হয় নি। রঙ যেন ফুটে বেরুচ্ছে।

মনে করে দাড়ি কামাবি।

আচ্ছা। এতদিন পরে কী মনে করে ফিরলি?

স্বপ্ন দেখে মন অস্থির হয়েছে, এইজন্যে ফিরেছি।

কী স্বপ্ন দেখলি?

হরিকাকাকে দেখলাম। উনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, এক্ষণ বাড়ি যা। এক্ষণ বাড়ি না গেলে মায়ের দেখা পাবি না। আমি ভেবেছিলাম দেখব তুমি মৃত্যুশয্যায়।

লাবুসের মা বললেন, দেখলি তো আমি ভালোই আছি। এখন কী করবি, আবার চলে যাবি?

লাবুস শব্দ করে হাসল, যেন তার মা মজাদার কোনো কথা বলেছেন।

লাবুসের মা সেই দিন সন্ধ্যায়। লাবুসের কোলে মাথা রেখে হঠাৎ করেই সন্ন্যাস রোগে মারা গেলেন।

Share This