১৩. ইদুল ফিতরের নামাজ শেষ হয়েছে

ইদুল ফিতরের নামাজ শেষ হয়েছে। কোলাকুলিপর্ব শুরু হবার আগে আগে মাওলানা ইদরিস বললেন, সুলেমান আপনাদের কিছু বলবে।

কাঠমিস্ত্রি সুলেমান মাওলানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার মুখ বিষণ্ণ। চোখে হতাশা ও লজ্জা। সে কারো দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে যে কথা বলল তার অর্থ— সে অনেকের কাছে দেনাগ্ৰস্ত। দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেবার পর দেনমোহরানার টাকা দিতে হওয়ায় বসতবাড়ি এবং সামান্য যে জমি ছিল বিক্রি করতে হয়েছে। উপায় না দেখে আজ থেকে সে নিজেকে ভিক্ষুক ঘোষণা করেছে। কাঠের কাজ সে আজ থেকে করবে না। বাকি জীবন ভিক্ষা করে কাটাবে। ভিক্ষার সুবিধার জন্যে সে একটা ঘোড়া কিনেছে। সে সবার দয়া এবং করুণা চায়।

ঘোষণা করে ভিক্ষুক হবার প্রচলন তখন ছিল। পাওনাদারদের হাত থেকে চিরমুক্তির একটাই পথ।

ঈদের দিন থেকেই সুলেমান ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষাবৃত্তির নতুন জীবন শুরু করল। ঘোড়ার পিঠে দুটা বস্তা বাধা। একটা চালের জন্যে, একটা ধানের জন্যে। ঘোড়া নিয়ে সে একেক বাড়ির সামনে দাঁড়াচ্ছে। ক্ষীণ গলায় বলছে‘ভিক্ষুক বিদায় করেন গো।’ ঘোড়ার গলায় ঘণ্টা বঁধা। মাথা নাড়লে ঘণ্টাও বেজে উঠছে। ভিক্ষুকের ঘোড়ার ঘণ্টাধ্বনিও গিরস্তজনের চেনা। কেউ চাল আনে, কেউ ধান। ঘোড়ায় চড়া ভিক্ষুকের সামাজিক অবস্থান খারাপ না। এরা ভিক্ষা পায়।

খান সাহেব ধনু শেখ দয়াপরবশ হয়ে সুলেমানকে থাকতে দিয়েছেন। তার স্থান হয়েছে হরিচরণের পুরনো বাড়িতে। শশাংক পালও সেখানেই থাকেন। তিনি এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। সারাদিন উঠানে পড়ে থাকেন, সন্ধ্যার পর তাকে ধরাধরি করে ঘরের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। ঘরে নিয়ে যাওয়া, পানি খাওয়ানো, এই কাজগুলি করে সুলেমান। কাজেই সুলেমানের সঙ্গে তাঁর একধরনের সখ্য হয়েছে। প্রায়ই দেখা যায় শশাংক পাল আগ্রহ নিয়ে গল্প করছেন সুলেমানের সঙ্গে। গল্পের ধরাবাঁধা কোনো বিষয়বস্তু নেই। একেকদিন একেকরকম। শশাংক পাল পছন্দ করেন। পুরনো দিনের শানশওকতের গল্প করতে। সুলেমানের পছন্দ তার বর্তমান জীবনের গল্প। ভিক্ষুক-জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প সে আনন্দের সঙ্গে করে। সে তার ঘোড়ার বুদ্ধিমত্তাতে মুগ্ধ। ইশারা ছাড়াই ঘোড়া যে সব বাড়িতে দাঁড়াচ্ছে এবং গলায় ঘণ্টা নেড়ে উপস্থিতি জানান দিচ্ছে এই গল্প বারবার করেও তার মন ভরে না। ভিক্ষা বিষয়ক গল্প তো আছেই।

বুঝলেন কর্তা, এক বাড়িতে গেলাম। ঘণ্টা বাজাইলাম। ভিতর থাইকা বলল, আইজ না। আইজ বুধবার।

আমি বললাম, বুধবারে বিষয় কী?

বুধবারে ভিক্ষা দেই না।

দেন না কেন?

বড়কর্তার নিষেধ।

কোনদিন নিষেধ নাই বলেন, সেই দিন আসব।

মঙ্গলবার।

গেলাম মঙ্গলবার। তখন কী হইছে শুনেন কর্তা। ভিতর থাইকা বলল, আইজ মঙ্গলবার। মঙ্গলবারে আমরা ভিক্ষা দেই না। সোমবারে আসেন।

শশাংক পাল উত্তেজিত গলায় বললেন, বিরাট বজাত তো!

সুলেমান উদাস গলায় বলে, ভিক্ষুকের সঙ্গে মিছা কথা। এখন চিন্তা করেন। সমাজ কই গেছে!

সমাজ রসাতলে গেছে।

দুজনেই সমাজের সাম্প্রতিক রসাতলে প্রবেশে দুঃখিত বোধ করে। তাদের ভেতর এক বিচিত্র সহমর্মিতা দেখা যায়। মাঝে মাঝে গভীর রাতেও তাদের গল্পের আসর বসে। আসরের কথক শশাংক পাল। শুরু হয় তার যৌবনের গল্প—

রায়নার ছোটবাবুর সঙ্গে একবার এক মুজরায় গিয়েছিলাম। রায়নার ছোটবাবু বিরাট জমিদার, সেই তুলনায় আমি নস্যি। মুজরার বাইজির নাম কুন্দন বাই। আহারে, গায়ের কী রঙ, যেন তুষের আগুন! আর কণ্ঠ? মধু! গানাবাজনা চলছে, আমার মন খারাপ। কিছুতেই মজা পাচ্ছি না।

কেন?

কুন্দন বাই আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। তার হাসি-তামাশা সবই রায়নার ছোটবাবুর সাথে। তাঁকে নিজের হাতে পান বানিয়ে দিচ্ছে। ফরাসীর নল এগিয়ে দিচ্ছে। আমি কেউ না। আমি ছোটবাবুর গোমস্তা।

সুলেমান বলল, আপনার উচিত ছিল উইঠা চাইলা আসা।

শশাংক পাল তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, শোন না ঘটনা। রাত একটার দিকে গানবাজনা কিছু সময়ের জন্যে থামল। রায়নার ছোটবাবু কুন্দন বাইকে একটা আশরাফি নজরানা দিলেন। কুন্দন বাই সালামের পর সালাম দিচ্ছে। আশরাফি পেয়ে তার দিলখোশ। তখন আমি নজরানা দিলাম।

কী দিলেন?

আমি দিলাম। তিনটা আশরাফি।

বলেন কী?

তখন টাকা ছিল, খরচ করেছি। পরে কী হবে চিন্তা করি নাই। তারপরের ঘটনা শোন— রায়নার ছোটবাবুর মুখ হয়ে গেল ছাইবৰ্ণ। তার জন্যে বিরাট অপমান। কুন্দন বাই-এর চোখে পলক পড়ে না। আমাকে বলল, বাবুজি আপকা তারিফ?

তারিফ মানে কী?

তারিফ মানে নাম। আমার নাম জানতে চাইল। নাম বললাম। পরের ঘটনা না বলাই ভালো। রাতে থেকে গেলাম। মধু মধু।

উনি বিরাট শিক্ষার মধ্যে পড়লেন। জন্মের শিক্ষা। জুরিগাড়ি নিয়া চলে গেলেন।

সুলেমান বলল, উচিত শিক্ষা হয়েছে। পাছায় লাখি খাইছে।

শশাংক পাল বললেন, জীবন নিয়া আমার কোনো আফসোস নাই, বুঝেছি। সুলেমান। মধুদিন কাটিয়েছি। এখন সামান্য বেকায়দায় আছি, তবে বেকায়দা যে-কোনো সময় কাটতে পারে। সুতা ভগবানের হাতে। উনি সুতা কীভাবে টান দিবেন। কে জানে। উনার সুতার এক টানে দেবী লক্ষ্মী এসে আমার পাশে বসতে পারেন। পারেন না?

অবশ্যই পারেন।

দেবী লক্ষ্মীর গল্প শুনবা?

শুনব।

লক্ষ্মী এবং তার স্বামী নারায়ণ বৈকুণ্ঠে বসে রসালাপ করছিলেন। এমন সময় তাদের সামনে দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। সূর্যপুত্র রোবন্ত। লক্ষ্মী তাঁর ঘোড়ার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন। সেই ঘোড়া তো আর তোমার ঘোড়ার মতো মরা ঘোড়া না। স্বর্গের ঘোড়া, নাম উচ্চশ্ৰবা। যাই হোক, নারায়ণ বললেন, লক্ষ্মী, তুমি চোখ বড় বড় করে কী দেখ? লক্ষ্মী ঘোড়া দেখে এতই মাজেছেন যে উত্তর দিলেন না। নারায়ণের উঠল রাগ। উনি বললেন, ঘোড়া দেখে তুমি মজেছ, তোমাকে অভিশাপ দিলাম। তুমি পৃথিবীতে ঘোড়ী হয়ে জন্মাবে। ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গম করবে এবং তোমার একটা ঘোড়াপুত্র হবে।

সুলেমান বলল, সর্বনাশ!

শশাংক পাল বললেন, দেবদেবীদের কাছে এইসব কোনো ব্যাপার না। তারা অভিশাপ দেওয়ার মধ্যেই থাকেন।

লক্ষ্মী কি ঘোড়া হয়ে জন্মেছিলেন?

অবশ্যই। তাঁর একটা ঘোড়াপুত্ৰও হয়েছিল। বিষ্ণুর আশীর্বাদে তার শাপমুক্তি ঘটে। ঘোড়াপুত্র মানুষ হয়। একবীর নামে সে দীর্ঘদিন পৃথিবী শাসন করে। নতুন এক বংশ স্থাপন করে। বংশের নাম ‘হৈহয়’ বংশ।

আজিব ব্যাপার।

দেবতাদের কাছে আজিব কোনো ব্যাপার নাই। তারা যদি ঘোড়া থেকে মানুষ বানাতে পারেন তাহলে আমাকে দুর্দশা থেকে কেন উদ্ধার করতে পারবেন না?

সুলেমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, অবশ্যই পারবেন।

নিশিরাতে শশাংক পালের সঙ্গে গল্প করতে সুলেমানের ভালো লাগে। জীবন আনন্দময় মনে হয়।

ভিক্ষুক জীবন যে এত সুখের হবে তা সুলেমানের কল্পনাতেও ছিল না। অল্পদিনেই ঘোড়ার পিঠে ঘুমিয়ে পড়ার দুর্লভ বিদ্যাও সে আয়ত্ত করেছে। ঘণ্টা বাজিয়ে হালকা চালে ঘোড়া চলে, সুলেমান লাগাম ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে শোনে— টুনটুনি টুনটুন। শান্তির আনন্দযাত্রা।

 

সুলেমান যতটুকু আনন্দে আছে ঠিক ততটাই কষ্টে আছেন মাওলানা ইদরিস। তিনি কষ্টে আছেন দুঃস্বপ্ন দেখে। দুঃস্বপ্নটা তিনি এই নিয়ে তিনবার দেখেছেন। একই স্বপ্ন- ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা। স্বপ্নে হরিচরণ এসে তাকে ডাকেন। মাওলানা আছ? মাওলানা! মাওলানা ব্যস্ত হয়ে বের হন। তখন হরিচরণ বলেন, কাজটা কি ঠিক করেছ মাওলানা? আমি মুসলমান হই নাই। তুমি জানাযা পড়িয়ে আমাকে কবর দিয়ে দিলে। আমাকে দাহ করা উচিত ছিল না?

প্রতিবারই মাওলানা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, ধনু শেখ যেটা বলেছেন। আমি সেটাই বিশ্বাস করেছি। আমি ভেবেছি মৃত্যুর আগে আপনি মুসলমান হয়েছেন।

হরিচরণ বলেন, উঁহু! তুমি বিশ্বাস কর নাই। তুমি আমার লেখা দানপত্রে দস্তখত করেছ। তুমি বিশ্বাস করবে। কেন? তুমি কাজটা করেছ ভয়ে। আমাকে মাটিচাপা দিয়েছ।

এখন কী করব সেটা বলে দেন।

আমার লাশটা কবর থেকে তোল। তারপর দাহ করার ব্যবস্থা কর। মুখাগ্নি তুমিই করবে।

আমি কী করে মুখাগ্নি করব? আমি মাওলানা মানুষ!

জহিরকে খবর দাও। সে আমার পুত্ৰসম। পুত্ৰই মুখাগ্নি করে।

তাকে কই পাব বলেন! সে নিরুদ্দেশ হয়েছে। কেউ তার খোঁজ জানে না।

খোঁজ বের কর। বেশি দেরি করলে মহাবিপদে পড়বা।

কী বিপদ? আমি নিজেই কবর থেকে বের হয়ে পড়ব। তখন বিরাট বিশৃঙ্খলা হবে।

কী বিশৃঙ্খলা?

বের হই, তারপর দেখা কী বিশৃঙ্খলা।

এই পর্যায়ে আতঙ্কে মাওলানার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জেগে উঠে দেখেন তার বুক ধড়ফড় করছে। সারা শরীর ঘামে ভেজা। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম।

স্বপ্লের বিষয়ে তিনি খান সাহেব ধনু শেখের সঙ্গে আলাপ করলেন। ধনু শেখ অতি বিশিষ্ট ব্যক্তি। লোকজন সবসময় তাকে ঘিরে রাখে। সরাসরি তিনি এখন কারো সঙ্গে কথাও বলেন না। আগে তাঁর মুনসির সঙ্গে কথা বলতে হয়। মুনসির অনুমতি পেলে তবেই খান সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত।

খান সাহেব মাওলানার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেন। মন দিয়ে স্বপ্ন শুনলেন। তারপর দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, স্বপ্ন নিয়া তুমি চিন্তিত? (খান সাহেব কিছুদিন হলো দাড়ি রেখেছেন। দাড়িতে চেহারার ক্রটি অনেকটাই ঢাকা পড়েছে।)

জি জনাব।

ভালো জিনিস নিয়া চিন্তা করা শিখো। স্বপ্ন কি কোনো বিষয়?

স্বপ্নটা কয়েকবার দেখলাম। এই কারণে মন অস্থির।

মাত্র কয়েকবার? একটা স্বপ্ন আমি এই নিয়া একশ’বার দেখেছি। স্বপ্নে আমি গেছি ছোটলাট সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে। খান বাহাদুর টাইটেল দেয়া হবে। আমার খান বাহাদুর টাইটেল পাওয়ার কথা। সেখানে আরো অনেক বিশিষ্টজনরা আছেন। অতি মনোহর তাদের পোশাক। একমাত্র আমার শরীরে কোনো কাপড়-চোপড় নাই। পুরা নেংটা। একটা সুতাও নাই। ছোটলাট এই অবস্থাতেই আমার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। তুমি বলো, খারাপ স্বপ্ন না?

জি।

এই স্বপ্ন আমি একশ’বার দেখেছি, তাতে কী হয়েছে? নাকি তুমি ভাবতেছ। হরিচরণ মৃত্যুর আগে কলেমা তৈয়ব বলে মুসলমান হয় নাই? আমি সবেরে মিথ্যা বানিয়ে বলেছি। একজন হিন্দুরে মুসলমান পরিচয় দিয়া কবর দেওয়ার মধ্যে আমার কোনো ফয়দা আছে? চুপ করে থাকবা না। বিলো ফয়দা আছে?

জি-না। স্বপ্নের তফসির জানলে মনের অস্থিরতা কমত। আল্লাহপাক স্বপ্নের মাধ্যমে আমাদের অনেক কিছু জানান দেন।

খান সাহেব বললেন, তফসির জানতে চাইলে জানো। বিশিষ্ট আলেমদের কাছে যাও। রাহাখরচ যদি চাও আমার দিতে আপত্তি নাই। মুনসির কাছে দস্তখত দিয়া কুড়ি টাকা রাহাখিরচ নেও।

মাওলানা বললেন, আপনার মেহেরবানি। আমি যেন খান বাহাদুর টাইটেল পাই এই জন্যে দোয়াখায়ের সর্বক্ষণ করবা। অঞ্চলে একজন খান বাহাদুর থাকলে সবের লাভ। এতে অঞ্চলের ইজ্জত বাড়ে। বুঝেছ?

জি।

তোমার বৃত্তি এই মাস থেকে পাঁচ টাকা বাড়াইলাম। আমি দরাজ হাতের লোক। সাল্লার নেয়ামত হোসেনের মতো কিরপিন’ না। নেয়ামত হোসেন কী করেছে শুনেছে?

জি না।

লখনৌ-এর যে বাইজি নিয়া আসছিল তারে ফালায়া থুইয়া ভাগছে। সেই মেয়েরে যেসব গয়না দিয়েছিল তাও শুনছি। নিয়া গেছে। মেয়ের না আছে টাকা পয়সা, না আছে কিছু। খাওয়া খাদ্যের ব্যবস্থাও করে নাই। বাধ্য হয়ে আমি ব্যবস্থা নিয়েছি।

ভালো করেছেন।

খান সাহেব হাই তুলতে তুলতে বললেন, কেউ বিপদে পড়লে তার জন্যে কিছু না করা পর্যন্ত অস্থির থাকি। এইটাই আমার সমস্যা।

লখনৌ-এর বাইজি পিয়ারীকে খান সাহেব ময়মনসিংহে ঘর ভাড়া করে। রেখেছেন। পিয়ারীর সঙ্গে আছে তবলচি এবং সারেঙ্গিবাদক। তাদের রান্নাবান্নার জন্যে একজন বাবুর্চি আছে। দেখাশোনার জন্যে দারোয়ান আছে।

খান সাহেবকে কাজেকর্মে প্রায়ই ময়মনসিংহ যেতে হয়। তিনি পিয়ারীর ভাড়া বাড়িতে উঠেন। অনেক রাত পর্যন্ত গানবাজনা হয়। পিয়ারীর সঙ্গ তাঁর বড় মধুর মনে হয়। রাতে সুনিদ্রা হয়। মাঝে মাঝে লাটসাহেবকে দেখা স্বপ্নটা তাকে বিরক্ত করে।

 

দেওবন্দের আলেমরা মাওলানা ইদরিসের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না। তবে দেওবন্দ যাওয়ায় মাওলানার একটা লাভ হলো, তিনি ‘হাফেজ’ টাইটেল পেয়ে গেলেন। নির্ভুল কোরান পাঠ করলেন। তাঁর ইচ্ছা করল তিনি দেওবন্দে থেকে যাবেন। আলেমদের সঙ্গে ধর্মালোচনা করে জীবন কেটে যাবে। বান্ধবপুরে ফিরে যাওয়া মানেই স্বপ্নে হরিচরণের সঙ্গে সাক্ষাত। এছাড়া রঙিলাবাড়ির বিষয়ও আছে। রঙিলাবাড়ির বিষয় তিনি চিন্তাও করতে চান না। তারপরেও হঠাৎ হঠাৎ চিন্তাটা আসে, তখন বড়ই অস্থির লাগে। শান্তির জীবন আল্লাহপাক তাকে দেন নাই। আল্লাহপাক দিয়েছেন ধারাবাহিক দুঃশ্চিন্তার জীবন।

হাফেজ মাওলানা ইদরিস বান্ধবপুরে ফিরেছেন। এখন আর কেউ তাঁকে মাওলানা ডাকছে না। সবই বলছে হাফেজ সাব’। সম্বোধনই বলে দিচ্ছে এই লোক কোরান মজিদ কণ্ঠস্থ করেছেন। ইনি সহজ কেউ না। শুনতে আনন্দ লাগছে। আনন্দের সঙ্গে গভীর শঙ্কাও জড়িত। মাওলানা জানেন। ইবলিশ শয়তান এখন সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গে থাকবে। তাঁকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করবে। একজন সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেয়ে কোরানে হাফেজকে বিভ্ৰান্ত করায় অনেক লাভ। ইবলিশ প্ৰাণপণে চেষ্টা করে যাবে তাকে দিয়ে মিথ্যা বলাতে। পাপ চিন্তা করাতে। পাপ কাজে যেমন গুনাহ, পাপ চিন্তাতেও একইরকম গুনাহ।

ইবলিশ যে এই বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রসরও হয়েছে সেটাও তিনি বুঝতে পারছেন। কয়েকদিন আগে এশার নামাজ শেষ করে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো বাড়িতে ঢুকেই দেখবেন জুলেখা উঠানে বসে আছে। (চিন্তাটা অবশ্যই ইবলিশ শয়তান তাঁর মাথায় ঢুকিয়েছে। তিনি নিজে কখনো এ ধরনের নাপাকি চিন্তা করবেন না। আস্তাগাফিরুল্লাহ।)

চিন্তাটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে দূর করে দেয়া প্রয়োজন, তা না করে তিনি চিন্তাকে প্রশ্ৰয় দিলেন (আবারো ইবলিশের কাজ)। তিনি কল্পনা করেই যেতে লাগলেন। কী ঘটছে তিনি চোখের সামনে দেখতেও পাচ্ছেন- এই তিনি উঠানে পা দিলেন। জুলেখা জলচৌকিতে বসেছিল। পরনে শাড়ি। মাথায় ঘোমটা নেই। মাথাভর্তি চুল। তাঁকে দেখে লজ্জা পেয়ে জুলেখা উঠে দাঁড়াল।

তিনি বললেন, এখানে কী চাও? তোমাকে না বলেছি। এ বাড়িতে আসবে না? আবার কেন আসছ?

আপনাকে দেখার জন্যে আসছি।

কেন?

আমি যত মন্দই হই, আপনি আমার স্বামী।

এরকম নাপাকি কথা বলব না।

আমি নাপাক, কিন্তু আপনি আমার স্বামী— এর মধ্যে নাপাকি। কী? আমি তাওবা করব। তওবা করে আপনার সঙ্গে সংসার করব।

চুপ।

ধমক দিয়েন না। অজুর পানি দেন। আমি অজু করে তওবা করব। বাকি জীবন বোরকা পরে থাকব। কেউ জানবে না। আমি কে!

এইখানে থাকলেই জানাজানি হবে।

তাইলে চলেন নাও নিয়া দূরে চইলা যাই। ভাটি অঞ্চলে যাইবেন? ভাটির শেষ সীমায়?

চুপ করব?

না, চুপ করব না।

উঠানে পা দিয়ে মাওলানার চিন্তা বন্ধ হলো। উঠানে কেউ নেই। জলচৌকি শূন্য। তাঁর মনটা খারাপ হলো। সব শয়তানের খেলা। মাওলানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। রাতে গোসল করে পবিত্র হলেন। শয়তানের হাত থেকে বাঁচার জন্যে তিনবার সূরা ইয়াসিন পাঠ করলেন। মন পবিত্র করার জন্যে এরচে’ ভালো সূরা নাই।

তার মন ততটা পবিত্র হলো না। রাতে খেতে বসার সময় মনে হলো— জুলেখাকে ভাত খাইয়ে দেয়া উচিত ছিল। না খাইয়ে তাকে বিদায় করেছেন, কাজটা ঠিক হয় নাই। আজকে আয়োজনও ভালো ছিল। কাঠালের বিচি দিয়ে মুরগির সালুন। হাফেজ সাহেবের জন্যে রান্না করে কেউ একজন পাঠিয়েছে। আজ ডালটাও ভালো হয়েছে। আমচুর দিয়ে টক ডাল, এর স্বাদই অন্যরকম। মেয়েরা টিক পছন্দ করে।

মাওলানার একবারও মনে হলো না— জুলেখা এ বাড়িতে আসে নি। পুরোটাই তাঁর কল্পনা। কিংবা তার ভাষায়— শয়তানের জটিল খেলা। মাওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতির সেটাই শুরু।

ফজরের নামাজ পড়ার জন্যে ঘুম ভাঙতেই মাওলানা শুনলেন পাশের ঘর থেকে জুলেখা মধুর স্বরে কোরান আবৃত্তি করছে। তিনি বললেন, জুলেখা, নিচু গলায় পড়। পরপুরুষ তোমার কণ্ঠস্বর শুনবে, এইটা ঠিক না।

জুলেখা বলল, জঙ্গলার মধ্যে বাড়ি। আপনি ছাড়া এইখানে তো কেউ নাই।

মাওলানা বললেন, এইটাও যুক্তির কথা। তারপরেও নিচু গলায় পড়া ভালো। ধর, জঙ্গলে কেউ লাকড়ির সন্ধানে যদি আসে। কিংবা হারানো গরু, যদি খুঁজতে খুঁজতে আসে।

জুলেখা মনে হয় যুক্তি মেনেছে। এখন তার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ।

 

রঙিলাবাড়ির ঘাটে মাঝারি আকৃতির বজরা এসে থেমেছে। বজরায় আছেন মোহনগঞ্জের বাম গ্রামের শৈলজারঞ্জন মজুমদার। রসায়নশাস্ত্ৰে M.Sc করা দারুণ পড়ুয়া মানুষ। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ডাক পেয়েছেন। শান্তিনিকেতনের বিজ্ঞান ভবনে যোগ দেবার চিঠি। মানুষটা গানপাগল। চান বিবি নামের অতি সুকণ্ঠী গায়িকার খবর পেয়ে এসেছেন। রঙিলাবাড়িতে উপস্থিত হতে তার রুচিতে বাঁধছে। তিনি চান বিবিকে খবর পাঠিয়েছেন। যদি সে বজরায় এসে কয়েকটা গান শোনায়। অপ্রচলিত গান সংগ্রহেও তার ঝোক আছে। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় (শ্রাবণ মাস এবং ভদ্র মাস) নৌকায় ঘুরে ঘুরে গান সংগ্রহের বাতিকও তাঁর আছে। তিনি শুধু যে গান লিখে রাখেন তা না, গানের সুরও আকার মাত্রিক স্বরলিপিতে লিখে ফেলেন। স্বরলিপি লেখার বিষয়ে তার দক্ষতা আছে।

চান বিবি সন্ধ্যাবেলায় বজরায় উপস্থিত হলো। তার সঙ্গে দুজন দাসি। একজনের হাতে কার্পেটের আসন। অন্যজনের হাতে রূপার পানদানিতে সাজানো পান। চান বিবি কর্পেটের আসনে বসতে বসতে বলল, কী গান শুনবেন গো?

শৈলজারঞ্জন মজুমদার বললেন, তুমি তোমার পছন্দের গান কর।

চান বিবি বলল, আমার পছন্দের গান আমি করি আমার জন্য। আপনের জন্য কোন করব?

শৈলজারঞ্জন বললেন, সেটাও তো কথা। তোমার যে গান গাইতে ইচ্ছা করে গাও।

ধামাইল শুনবেন?

শুনব।

নাকি আমিন পাশার পাগলা গান শুনবেন।

পাগলা গান কী?

পদে পদে তালফেরতা মজা আছে।

তোমার সঙ্গে তো তবলা নেই। তাল আসবে কোথেকে।

আমার গলায় তাল আছে।

শৈলজারঞ্জন তিনটি গান শুনেই বললেন, আর লাগবে না। চান বিবি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, আমার গান কি আপনার পছন্দ হয় নাই?

পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আর শুনব না। আমি অতি বিখ্যাত একজন মানুষকে তোমার গান শোনার ব্যবস্থা করে দেব। উনাকে গান শুনিও। উনি যদি খুশি হন তাহলে তোমার মানবজন্ম ধন্য হবে।

চান বিবি অবাক হয়ে বলল, এই মানুষ কে?

শৈলজারঞ্জন বললেন, উনি বাংলাগানের রাজার রাজা। তার নাম রবীন্দ্ৰনাথ ঠাকুর। তুমি নিশ্চয়ই তার গান কখনো শোন নি?

আমি উনাকে চিনেছি। উনার গানরে বলে রবিবাবুর গান। একটা গানের সুর পরিষ্কার মনে আছে। কথা মনে নাই। এক দুই পদ মনে আসে।

শৈলজারঞ্জন অবাক হয়ে বললেন, এক দুই পদ শোনাও তো।

চান বিবি শুদ্ধ সুরে গাইল–

চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে–
নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে।

শৈলজারঞ্জন আগ্রহের সঙ্গে বললেন, আমি গানটা ঠিক করে লিখে দেই? তুমি ভালোমতো শিখে রাখ। সত্যি যদি কোনোদিন সুযোগ হয়। রবীন্দ্রনাথকে গানটা শোনাবে।

চান বিবি হ্যাঁ-সূচক ঘাড় কাত করল।

 

মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নিমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছেন ময়মনসিংহে। তিনদিন থাকবেন। শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রমের উপর কয়েকটা বক্তৃতা দেবেন। ময়মনসিংহের ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চে থিয়েটার দেখবেন। তার জন্যে পাখি শিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তিনি শিকার পছন্দ করেন না বলে সেই প্রোগ্রাম বাতিল করা হয়েছে। তার বদলে ব্ৰহ্মপুত্র নদে বিহার এবং সঙ্গীতানুষ্ঠান।

রবীন্দ্ৰনাথ ময়মনসিংহে পৌঁছে জমিদারদের টানাটানিতে পড়ে গেলেন। কোথায় রাত কাটাবেন এই নিয়েও সমস্যা। শশীকান্ত আচার্য চাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন তাঁর বাড়ি শশীলজ’-এ। গৌরীপুরের মহারাজা ব্ৰজেন্দ্র রায়চৌধুরী চাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ রাত কাটাবেন ‘গৌরীপুর লজ’-এ। তাঁর ধারণা সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি এই দোতলা বাড়ি কবিগুরুর পছন্দ হবে। বাড়িটা তিনি চীনা মিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করেছেন। সুদূর বাৰ্মা থেকে আনা হয়েছে সেগুন কাঠ। এদিকে মুক্তাগাছার আরেক জমিদার রাজা জগত কিশোর আচাৰ্য চাচ্ছেন রবীন্দ্ৰনাথ থাকবেন তার নতুন বাড়ি ‘আলেকজান্দ্ৰা ক্যাসেল’-এ।

তিনদিনের ক্লান্তিকর ময়মনসিংহ ভ্রমণের শেষে রবীন্দ্ৰনাথ চলে এলেন কেন্দুয়ার আঠারোবাড়িতে। আঠারোবাড়ির জমিদার বাবু প্রমোদ রায়চৌধুরী মহাসমাদরে তাকে নিয়ে এলেন। যে বাড়িতে তাকে রাখা হলো সেই বাড়িটা কাঠের। বাড়ির দোতলায় বিশাল বারান্দা। বারান্দায় কবির জন্যে আরামদায়ক কেদারা পাতা। ভ্ৰমণে ক্লান্ত কবি আরাম কেদারায় শুয়ে সারা সন্ধ্যা বাংলাদেশের ঘন বর্ষণ দেখলেন। রাতে গান রচনা করলেন–

আজি ঝরে ঝরো মুখর বান্দরদিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।।
এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদভ্ৰান্ত মেঘে মন চায়
মন চায় ওই বিলাকার পথখানি নিতে চিনে।।
মেঘমাল্লারে সারা দিনমান
বাজে ঝরনার গান।
মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা— মন চায়
মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে।।

কবিকে আনন্দ দেবার জন্যে নৈশভোজের পর গানবাজনার আয়োজন করা হলো। একজন বংশীবাদক বাঁশি বাজাল। কবি মন দিয়ে শুনলেন না। হাই তুলতে তুলতে বললেন, শরীরটা ক্লান্ত লাগছে। আজ শুয়ে পড়ি।

মহারাজা বললেন, অবশ্যই। শোবার আগে একটা গান কি শুনবেন? আপনার রচিত গান। সুকণ্ঠী গায়িকা। মনে হয় আপনার ভালো লাগবে। বাবু শৈলজারঞ্জন মজুমদার আমাকে পত্র দিয়ে এই গায়িকার কথা বলেছেন। তাকে পালকি করে আনিয়েছি। অবশ্য সামান্য কিন্তু আছে। রবীন্দ্রনাথ বললেন, কিন্তু আছে মানে কী?

মেয়েটির বাস ভদ্রঘরে না। তার বাস পঙ্কে।

পঙ্কে বাস তো পদ্ম’র। শুনি পদ্ম’র গান।

মহারাজা ইশারা করতেই পর্দার আড়াল থেকে জুলেখা বের হলো। জড়সড় হয়ে বসল। পায়ের কাছে। মহারাজা বললেন, এর উচ্চারণ শুদ্ধ হবে না, কিন্তু কণ্ঠ মধুর।

জুলেখা খালি গলায় গাইল, চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে—

কবি চোখ বন্ধ করে গান শুনলেন। গান শেষ হবার পর চোখ মেলে। বললেন, কণ্ঠের মাধুর্যে উচ্চারণের ত্রুটি ঢাকা পড়েছে। তোমার নাম কী?

জুলেখা বিড়বিড় করে বলল, চান বিবি। তুমি তাহলে চন্দ্রের স্ত্রী? ভালো তো। তুমি শান্তিনিকেতনে আসবে? গান শিখবে?

কোনোকিছু না বুঝেই জুলেখা ঘাড় কাত করল। রবীন্দ্রনাথ মহারাজার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার এই গান পূজাপর্বের। কিন্তু মেয়েটির গলায় গানটা শোনার পর মনে হচ্ছে গানটা প্রেমের। মানব-মানবীর প্ৰেম। কথা শেষ করেই তিনি জুলেখার দিকে তাকিয়ে বললেন, চন্দ্র-স্ত্রী, কাছে এসো, আশীৰ্বাদ করে দেই।

জুলেখা এগিয়ে এলো। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মাথায় হাত রাখলেন। জুলেখা কি টের পেল যে আজ তার পঙ্কের জীবন ধন্য হলো?*

১৯২৬ ইংরেজি।

————-

* গানের উপর অসাধারণ দখল দেখে শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিজ্ঞান ভবন থেকে কলা ভবনে নিয়ে আসেন। শৈলজারঞ্জনের প্রধান কাজ হয় রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি তৈরি করা। -লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *