১২. বিপ্লবী জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়

ভয়ঙ্কর বিপ্লবী জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়কে ধরিয়ে দেবার পুরস্কার হিসেবে ধনু শেখ ‘খান সাহেব’ উপাধি পেয়েছেন। জীবনলাল আছেন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে। বিচার শুরু হয়ে যাবে। জীবনলালের ফাঁসি হবে, এ বিষয়টা মোটামুটি নিশ্চিত।

খান সাহেব ধনু শেখ বসে আছেন। হরিচরণের বাড়ির উঠানে। মাঘ মাস। শীত পড়েছে প্রচণ্ড। তার হাতে কাচের বড় গ্লাসভর্তি খেজুরের রস। খেজুরের রস খেতে হয়। সূৰ্য উঠার আগে। বেলা হয়ে গেছে। রস খানিকটা টকে গেছে, তবে খান সাহেব ধনু শেখ টিকে যাওয়া রস খেয়ে যথেষ্টই আনন্দ পাচ্ছেন। ইদানীং সবকিছুতেই তিনি আনন্দ পান। বেদানা নামের তের বছর বয়সি এক বালিকাকে সম্প্রতি বিবাহ করেছেন। মেয়েটি রূপবতী না। গাত্রবর্ণ কালো। মাথার চুল পিঙ্গল। তারপরেও তার সঙ্গে গল্পগুজব করেও তিনি আনন্দ পাচ্ছেন। কেন এরকম হচ্ছে তিনি জানেন না। তাঁর প্রথম স্ত্রী কমলার ধারণা, বেদানা জাদুটোনা করেছে। সম্ভাবনা যে একেবারেই নেই, তা-না।

হরিচরণের বিষয়সম্পত্তির দখল ধনু শেখ নিয়ে নিয়েছেন। তেমন কোনো সমস্যা হয় নি। হরিচরণ নাকি মৃত্যুর আগে আগে কোম্পানির স্ট্যাম্পে সব দিয়ে গেছেন ধনু শেখকে। স্ট্যাম্পে তিনি দস্তখত করেছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে দস্তখত সামান্য আঁকাবঁকা হয়েছে। সে-কারণেই তিনি বুড়ো আঙুলের ছাপও দিয়েছেন। দু’জন সাক্ষীর দস্তখতও আছে। একজন প্রাক্তন জমিদার শশাংক পাল। অন্যজন অম্বিকা ভট্টাচার্য। মুসলমান হবার পর যার নাম সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর।

ধনু শেখের কারণে জানা গেছে, হরিচরণ মৃত্যুর আগে আগে কলেমা তৈয়ব পাঠ করে মুসলমান হয়েছেন। তাঁকে দাহ করা হয় নি। মসজিদের পাশের গোরস্তানে তার কবর হয়েছে। ধনু শেখ নিজ খরচায় কবর বাঁধিয়ে দিয়েছেন। কবরে লেখা— বিশিষ্ট দানবীর, সমাজসেবক মোহাম্মদ আহম্মদ। যারা শেষ সময়ে মুসলমান হয়, আকিকা করে নাম রাখার সুযোগ হয় না, তাদের নাম মোহাম্মদ আহম্মদ রাখাই না-কি বিধান। কবরের ভেতর একটা স্বর্ণচাঁপা গাছ লাগানো হয়েছে। অল্পদিনেই গাছ তরতাজা হয়েছে। মাওলানা ইদরিস গাছটার যত্ন নেন। অজুর শেষে পানি ছিটিয়ে দেন। কবরের উপর গাছ থাকা রহমতের ব্যাপার। গাছ আল্লাহপাকের নাম জিগির করে, তার সোয়াবের কিছু অংশ কবরবাসী পায়। আল্লাহপাক তার বান্দাদের উদ্ধারের নানান ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

মাঝে মাঝে কবরের পাশে একজন তরুণীকে ঘোমটায় মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার চোখে থাকে বিস্ময়।

একদিন মাওলানা ইদরিস অবাক হয়ে দেখলেন, মেয়েটি বাঁধানো কবরের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এমনভাবে হাত বুলাচ্ছে যেন সে ঘুমন্ত মানুষের গায়ে হাত বুলাচ্ছে। মাওলানা কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, মাগো আপনি কে?

তরুণী চমকে উঠে। ভীত গলায় বলল, আমার নাম যমুনা।

এখানে কী করেন?

কিছু না।

মেয়েছেলের উচিত না পুরুষের কবরে হাত রাখা।

আর রাখব না।

অনেকবার আপনারে এই কবরের কাছে আসতে দেখেছি। কেন আসেন?

যমুনা ক্ষীণ গলায় বলল, আর আসব না।

 

মাঘ মাসের শীতের সকালে ধনু শেখের সঙ্গে সাক্ষী দুজনও উপস্থিত। সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর বসেছেন টুলে। তিনি দাড়ি রেখেছেন। মুখভর্তি চাপদাড়িতে তাকে খুব মানিয়েছে। ধনু শেখ তাকে স্থায়ী চাকরি দিয়েছেন। এখন মাসে পঁচিশ টাকা করে পান। বিনিময়ে হরিচরণের বাড়িঘর দেখাশোনা করেন।

শশাংক পাল হরিচরণের টিনের ঘরে থাকেন। তার অরুচি রোগ হয়েছে। কোনোকিছুই হজম করতে পারেন না। তাঁকে লবণ দিয়ে সাগু জ্বাল দিয়ে দেয়া হয়। সকালবেলা চামচ দিয়ে তাই খানিকটা খান। কিছুক্ষণ পর পুরোটাই বমি করে দেন। ধনু শেখ কথা দিয়েছেন তাকে কোলকাতায় নিয়ে চিকিৎসা করাবেন। কোলকাতায় ধন্বন্তরী আয়ুৰ্বেদশাস্ত্রী আছেন। আয়ুৰ্বেদশাস্ত্রে অরুচির ভালো চিকিৎসা আছে।

শশাংক পাল বললেন, খান সাহেব, আমরা যাব কবে?

ধনু শেখ বললেন, সময় হলেই যাব। সময় এখনো হয় নাই।

সময় কবে হবে?

ধনু শেখ বিরক্ত গলায় বললেন, ঢাকার কমিশনার সাহেব পাখি শিকারে আসবেন। পাখি শিকারের পরে যাব।

শশাংক পাল বললেন, ততদিন আমি বাঁচব না।

ধনু শেখ নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, মরে গেলে খাঁটি ঘি দিয়ে দাহর ব্যবস্থা করব। চিন্তার কিছু নাই।

শশাংক পাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। কঠিন কিছু কথা তাঁর ঠোঁটে এসে গেছে। অনেক কষ্টে কথাগুলি আটকালেন। ধনু শেখ এখন এমন ব্যক্তি যার সঙ্গে কঠিন কথা বলা যায় না। সামলে কথা বলতে হয়।

ধনু শেখ গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, সিরাজ ঠাকুর?

সিরাজ ঠাকুর ব্যস্ত হয়ে বললেন, জে খান সাব।

এইবারের কোরবানির ঈদে মসজিদের সামনে আমি কোরবানি দিব বলে মনস্থ করেছি।

মনস্থ করেছি।

হিন্দুরা লাফালাফি ঝাপঝাঁপি করতে পারে। করলে করবে। আপনি কী বলেন?

অবশ্যই। তারা ধর্মকর্ম করবে, আমরা করব না— এটা কেমন কথা? আমাদেরও ধর্মকর্মের হক আছে।

ধনু শেখ বললেন, মাগরিবের নামাজের সময় এরা মন্দিরে ঘণ্টা বাজায়। মুসুল্লিদের নামাজের অসুবিধা হয়। এরও একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘণ্টা বাজাইতে দোষ নাই। নামাজের সময় বাদ দিয়ে।

সিরাজ ঠাকুর জোরের সঙ্গেই বললেন, অবশ্যই।

ধনু শেখ বললেন, ভালো দেখে একটা ঘোড়া খরিদ করা দরকার। ঘোড়া বিনা বিশিষ্ট মানুষের ইজ্জত রক্ষা হয় না।

সিরাজ ঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে বললেন, অবশ্যই। শাদা রঙের ঘোড়া, যেন দূর থেকে নজরে আসে।

শশাংক পাল বললেন, উ ছ। ঘোড়াতে কোনো ইজ্জত নাই। থানার ওসি ঘোড়ায় চড়ে। ইজ্জত হাতিতে। হাতি খরিদ করেন।

ধনু শেখ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তার হাতি-ভাগ্য ভালো না। হরিচরণ বেকুবের মতো তার হাতি আসামের জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন। সেই হাতি ফিরে আসে নি। ধনু শেখ শাল্লার দশআনি জমিদার নেয়ামত হোসেনের কাছে হাতি কিনতে গিয়ে অপদস্ত হয়েছেন। নেয়ামত হোসেন ধনু শেখকে ‘তুমি তুমি’ করে বলেছেন, যেন ধনু শেখ তার অধস্তন কর্মচারী।

হাতি কিনতে চাও?

জি। শুনেছি আপনি আপনার হাতি বিক্রি করবেন। খরিদার অনুসন্ধান করছেন।

হাতি দিয়া তুমি করবা কী?

বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া আসা করতে হয়।

পালকিতে যাওয়া আসা করব। হাতি একটা ইজ্জতের প্রাণী। তার ইজ্জতের দিকে আমাদের লক্ষ রাখা দরকার। যে মুচি, জুতা সেলাই করে, তার বাড়িতে হাতি দেওয়া যায় না। এতে হাতির ইজ্জতের হানি হয়।

ধনু শেখ আহত হয়ে বলেছেন, আমি কি মুচি?

নেয়ামত হোসেন হাই তুলতে তুলতে বলেছেন, কথার কথা বলেছি। নিজের ঘাড়ে টান দিয়া নিবা না। ছোটলোকের স্বভাব কি জানো? সবকথা নিজের ঘাড়ে টান দিয়া নেয়। সে ভাবে সবাই তাকে অপমান করতে নামছে। তুমি বড় মানুষ হওয়ার চেষ্টায় আছ— এইসব শিখবা না?

ধনু বিড় বিড় করে বলেছেন, অবশ্যই। অবশ্যই।

নেয়ামত হোসেন ইকোয় টান দিয়ে উপদেশের ভঙ্গিতে বলেছেন, হাতির চিন্তা বাদ দাও। আমার কথা শোন, হাঁটাহাঁটির মধ্যে থাক। এতে শরীর স্বাস্থ্যু ভালো থাকে। শরীর ঠিক রাখা প্রয়োজন না?

ধনু শেখ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমি উঠি।

নেয়ামত হোসেন দরাজ গলায় বললেন, আরো এখনই কি উঠাবা? শরবত খাও, মিষ্টি খাও। মিষ্টি মুখে না দিয়া আমার বাড়ি থেকে কেউ যায় না। তোমার সঙ্গে আমার বিশেষ জরুরি কিছু কথাও ছিল।

কী কথা?

দুষ্ট লোকে বলে, তুমি নাকি মরা। হরিচরণের আঙুলের ছাপ দিয়া দলিল বানিয়েছ— এটা কি সত্য?

দুষ্ট লোকটা কে?

দুষ্ট লোকের আলাদা পরিচয় থাকে না। তারা গলায় সাইনবোর্ড বুলিয়ে ঘুরে না। কথা সত্য কিনা বলো।

নেয়ামত হোসেন চেয়ারে গা এলিয়ে গড়গড়া টানছেন। তার চোখ বন্ধ। ধনু শেখকে আচমকা এই প্রশ্ন করে ‘তবদা’ বানিয়ে দিতে পারার আনন্দেই তিনি আত্মহারা। তবে ধনু শেখ জবাব দিলেন। এই জবাব শোনার জন্যে নেয়ামত হোসেন প্রস্তুত ছিলেন না। নেয়ামত হোসেন মনে মনে ধনু শেখের সাহসের প্ৰশংসা করলেন।

ধনু শেখ বললেন, দুষ্ট লোক বা শিষ্ট লোক আমার বিষয়ে কী কথা বলেছে আমি জানি না, তবে আপনার কাছে স্বীকার করছি— ঘটনা সত্য!

নেয়ামত হোসেন বললেন, ঘটনা সত্য?

জি জনাব সত্য। হরিচণের না আছে কোনো ওয়ারিশান না আছে কিছু। তার বিষয়সম্পত্তি সাত ভূতে লুটে খাবে, এটা কেমন কথা!। এইসব বিবেচনা করে দখল নিয়েছি। জনাব, উঠি?

হাতি বিষয়ক এইসব কথাবার্তা যখন হয়েছে তখনো ধনু শেখ খান সাহেব হন নাই। জমিদার নেয়ামত হোসেন তাকে অপমান করতে পারে। ধনু শেখ অপমান গায়ে মাখেন নাই। হাসিখুশি অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেন। বালিকা বধূর সাথে লুড়ু খেলেছেন। তিন দান খেলা হয়েছে। দুইবারই তিনি জিতেছেন। বেদান লুড়ুতে হারার অপমান নিতে না পেরে কান্নাকাটি করেছে। তাকে শান্ত করতে ধনু শেখের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে।

বেদানাকে ধনু শেখ বড়ই পিয়ার করেন। তাঁর এই বালিকা বধূ ভাগ্যবতী। তাকে বিয়ে করার পরই আচমকা ‘খান সাহেব’ টাইটেল। ইংরেজ জাতি হিসেবে ভালো, তারা উপকারীর উপকার ভোলে না।

ধনু শেখ ধরেই নিয়েছিলেন টাইটেল পাওয়ার পর নেয়ামত হোসেনের বাড়িতে তার দাওয়াত হবে। তা হয় নি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তিনবার লোক মারফত খবর পাঠিয়েছেন। নেয়ামত হোসেন কথা বলতে চান। বিশেষ জরুরি।

প্রথমবার খবর পাঠালেন তার নিজ বাড়িতে ডাকাতি হবার পর। দ্বিতীয়বার খবর পাঠালেন, তার বজরায় ডাকাত দলের গোলাগুলির ঘটনার দিনে। তৃতীয় দফায় খবর পাঠিয়েছেন কিছুদিন আগে। ধনু শেখ ঠিক করে রেখেছেন, যাবেন। সদর খাজনা দেবার তারিখ হবার আগে আগে। নেয়ামত হোসেন যেন সদর খাজনা দিতে না পারেন এই ব্যবস্থা তিনি নিয়ে রেখেছেন। টাকা নিয়ে যারা যাবে তারা ডাকাতের হাতে পড়বে। দুই চারজনের প্রাণহানী ঘটবে। কী আর করা। সবই উপরের হুকুম। জগত চলে উপরের হুকুমে, মানুষের করার কিছু নাই। ভালো ব্যবস্থা। তবে সব ব্যবস্থা সবসময় কাজ করে না।

 

মাওলানা ইদরিস হাফেজ টাইটেলের পরীক্ষায় ফেল করেছেন। দেওবন্দে চারজন হাফেজের সামনে পরীক্ষা দিতে বসে পদে পদে ভুল করেছেন। চারজন হাফেজই বিরক্ত হয়েছেন, যদিও তাঁরা মনের ভাব প্রকাশ করেন নি।

একজন মাওলানা ইদরিসের কাঁধে হাত রেখে বলেছেন, সবাই হাফেজ হতে পারে না। হওয়ার প্রয়োজনও নাই। আপনি এই পথ ছেড়ে দেন। আল্লাপাকের কালাম ভুলভাল বলে আপনি মহাপাপী হচ্ছেন। প্রয়োজন কী?

মাওলানা বললেন, এক দুই বৎসর পরে আবার আসি? আপনাদের চারজনকে একসঙ্গে দেখে ভয় পেয়েছি বিধায় সব আউলা ঝাউলা হয়েছে।

এক বৎসর পর যখন আসবেন তখনো তো আমরা চারজনই থাকব। তখন কি মাথা আউলা হবে না?

মাওলানা ইদরিস এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন নি। বিষণ্ণ হৃদয়ে বান্ধবপুরে ফিরে এসেছেন। হাফেজ টাইটেল পাওয়ার পর বিবাহ করবেন। এরকম বাসনা ছিল। সেই বাসনা এখন তার আর নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোরান মজিদ আবারো ভালোমতো মুখস্থ করবেন। আবারো দেওবন্দ যাবেন। শুদ্ধ নিয়তের প্রতি আল্লাহপাকের মমতা আছে। তার নিয়ত শুদ্ধ।

বৈশাখ মাসের এক রাত। মসজিদে এশার নামাজ শেষ করে মাওলানা বাড়ি ফিরে দেখেন ভেতর বাড়িতে হারিকেন জুলছে। তিনি খুবই বিস্মিত হলেন। তার বাড়ি থাকে অন্ধকার। তিনি এসে হারিকেন জ্বালান। কে এসে বাড়িতে হারিকেন জ্বালাবে? তাঁর ক্ষীণ সন্দেহ হলো, জহির হয়তো ফিরে এসেছে। জহিরের নিরুদ্দেশের খবর তিনি উকিল মুনসির মাধ্যমে পেয়েছেন।

মাওলানা উঠানে দাঁড়িয়ে বললেন, কে?

ভেতর থেকে নারীকণ্ঠে কেউ একজন বলল, আমি।

মাওলানা বললেন, আপনার পরিচয়?

আমার নাম জুলেখা, আমি জহিরের মা। মাওলানা সাহেব, আপনাকে আসসালাম।

মাওলানার শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। কী সর্বনাশের কথা! রঙিলা বাড়ির অতি পাপিষ্ঠ নারীদের একজন তার ঘরে। জানাজানি হলে বিরাট সর্বনাশ হবে। জানাজানি না হলেও ঘরদুয়ার অপবিত্র হয়েছে। কুকুর যে ঘরে ঢুকে সেই ঘর নাপাক হয়ে যায়। সেখানে নামাজ হয় না। এরা তারও অধম।

জুলেখা বলল, মাওলানা সাহেব, ভেতরে আসবেন? আপনার সঙ্গে দুইটা কথা বলব।

মাওলানা বললেন, আপনি আমার বাড়িতে এসে বিরাট অন্যায় করেছেন।

অন্যায়ের জন্যে ক্ষমা চাই। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা ছিল বলে এসেছি। কথা শেষ করে চলে যাব।

মাওলানা বললেন, আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নাই। আপনি চলে গেলেন।

বাড়ির ভেতর থেকে মৃদু হাসির শব্দ পাওয়া গেল। এই পরিস্থিতিতে কোনো মেয়ে হাসতে পারে তা মাওলানার কল্পনাতেও নেই। মাওলানা বললেন, আপনাকে আল্লাহর দোহাই লাগে আপনি চলে যান।

জুলেখা বলল, আমি যে আপনার স্ত্রী এইটা কি জানেন?

মাওলানা হতভম্ব গলায় বললেন, তুমি কী বললা?

মাওলানা এতক্ষণ আপনি করে বলছিলেন, হঠাৎ তুমি সম্বোধনে চলে গেলেন।

জুলেখা শান্ত গলায় বলল, পুরান কথা মনে কইরা দেখেন। আপনের কলেরা হয়েছিল। আপনি মরুতে বসেছিলেন। আমি ছিলাম। আপনার সাথে। আপনার সেবা করেছিলাম। মনে আছে?

মাওলানা চাপা গলায় বললেন, মনে আছে।

জুলেখা বলল, এক রাতে আপনি আমারে বললেন, কোনো অনাত্মীয় তরুণী পুরুষের সেবা করতে পারে না। দুইজনেরই বিরাট পাপ হয়। তখন আমি বললাম, এক কাজ করেন, আমাকে বিবাহ করেন। আপনার কি মনে আছে?

মাওলানা চুপ করে রইলেন। তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। এই মেয়েটা ভয়ঙ্কর কথা বলছে। মেয়েটা মিথ্যাও বলছে না। তার আবছা আবছা মনে পড়ছে।

জুলেখা বলল, আপনার মনে না থাকলেও আমি আপনাকে দোষ দিব না। আপনি তখন মরতে বসেছিলেন। মৃত্যুর সময় মানুষ অনেক কিছু করে। আপনি কি উঠানে দাঁড়ায়ে থাকবেন? ভেতরে আসবেন না?

মাওলানা এই প্রশ্নেরও জবাব দিলেন না। তিনি হঠাৎ লক্ষ করলেন, তাঁর কথা বলার শক্তি চলে গেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ইবলিশ শয়তান আশেপাশে আছে এটা বোঝা যাচ্ছে। সে মজা দেখার জন্যে অপেক্ষা করছে। মাওলানা বিড়বিড় করে বললেন, আল্লাহপাক আমাকে ইবলিশের হাত থেকে বাঁচাও।

জুলেখা ঘরের ভেতর থেকে উঠানে এসে দাঁড়াল। তার সমস্ত শরীর বোরকায় ঢাকা। চিকের পর্দার আড়ালে চোখ। অন্ধকারের কারণে সেই চোখও দেখা যাচ্ছে না। জুলেখা বলল, তখন আপনি আমারে কবুল বলতে বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম। আপনার হাত ধরে তিনবার বলেছি- কবুল, কবুল, কবুল।

মাওলানা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, তুমি বলেছিলে, আমি বলি নাই।

আপনি বলেছিলেন। ইয়াদ করে দেখেন।

আমার ইয়াদ নাই।

আমি আপনারে ফেলে চলে যেতাম না। আমি ভেবেছিলাম আপনার মৃত্যু হয়েছে। চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো পথ ছিল না।

মাওলানা বললেন, এইটাই কি তোমার জরুরি কথা?

জুলেখা বলল, এইটা কোনো জরুরি কথা না। রোগের যন্ত্রণায় আপনি কী করেছেন না করেছেন সেটা কিছু না। আমার কথাবার্তা শুনে আপনি বড়ই অস্থির হয়েছেন। মন শান্ত করেন। মন শান্ত করার জন্য তিনবার তালাক বলে দেন। আমাদের ধর্মে বিবাহ যেমন সোজা তালাকও তেমন সোজা।

ধর্ম নিয়া কথা বলব না।

গোস্তাকি হয়েছে। আর বলব না।

জরুরি কথাটা বলো।

আমার কাছে একটা কাগজ আছে। দানপত্র। জীবনলাল নামের এক লোক পাঠায়েছে। সেখানে আপনার দস্তখত আছে।

মাওলানা দ্বিতীয়বার চমকালেন।

জুলেখা বলল, ধনু শেখ এতবড় অন্যায় করেছে, আপনি সব জেনেও কিছু বলেন নাই।

মাওলানা বিড় বিড় করে বললেন, আমি ছোট মানুষ।

জুলেখা বলল, আপনি আল্লাওলা মানুষ। আল্লাওলা মানুষ জানে মানুষের মধ্যে বড় ছোট নাই। সবাই সমান। আপনি জানেন না?

মাওলানা চুপ করে রইলেন। জুলেখা বলল, কাগজটা কি আপনার কাছে রেখে যাব?

মাওলানা বললেন, না। তুমি চলে যাও।

জুলেখা বলল, এক কথায় চলে যাব? আমি আপনার স্ত্রী। ভাব ভালোবাসার দুইটা কথা বলেন। শুইন্যা যাই।

তুমি চলে যাও।

জুলেখা বলল, আপনার কাছে একটা প্রস্তাব আছে। দোষ না নিলে প্রস্তাবটা দিব। দোষ ধরলেও দিব।

কী প্ৰস্তাব?

চলেন অনেক দূরের কোনো দেশে চইল্যা যাই। যেখানে আপনারে কেউ চিনে না। আমারেও না।

তুমি অতি পাপিষ্ঠ।

জুলেখা হাসতে হাসতে বলল, আপনার মতো এত বড় মাওলানা যার স্বামী তার চিন্তা কী? সে তওবা করায়া আমারে পবিত্র করব।

স্বামী নাম আর কোনোদিন মুখে আনবা না।

আচ্ছা আনব না।

এখন বিদায় হও। তোমার সাথে কথা বলাও পাপ।

জুলেখা বলল, অনেক পুণ্য তো সারাজীবন করেছেন। কিছু পাপ করলেন। এই বিষয়ে আমার ব্যাপজানের একটা গান আছে। শুনবেন?

চুপ বললাম। চুপ।

জুলেখা নিচু গলায় গান ধরল—

ভালো চিনতে মন্দ লাগে
মন্দ চিনতে ভালো।
শাদা কেউ চিনে না বান্ধব
না থাকিলে কালো।

মাওলানা উঁচু গলায় বললেন, বিদায় হও। বিদায়।

জুলেখা হাঁটা শুরু করল। মাওলানা তাকিয়ে আছেন। কালো বোরকার কারণে জুলেখা মুহুর্তের মধ্যেই অন্ধকারে ঢেকে গেল। মাওলানা অনেক রাত পর্যন্ত উঠানে বসে আল্লাহর নাম জপলেন। কিছুক্ষণ পর পর হাত উঠিয়ে মোনাজাত করলেন, হে আল্লাহপাক, তুমি আমাকে একটা ইশারা দাও। বলে দাও আমি কী করব।

মাওলানার শরীর দিয়ে ঘােম পড়ছে। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন পায়ের থপথপ শব্দ। তাকে ঘিরে কে যেন হাঁটছে। নাকে কটু গন্ধ আসছে। পশুদের গা থেকে যেমন গন্ধ আসে তেমন গন্ধ। আকাশে মেঘ করেছিল। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলি গরম। এরকম তো কখনো হয় না।

 

খান সাহেব ধনু শেখ শাল্লার জমিদার বাড়িতে এসেছেন। খান সাহেব হবার পর এটা তার প্রথম আসা। আয়োজন করে আসা উচিত। তা-না, তিনি একা এসেছেন, খালি পায়ে এসেছেন। তাঁর দুই পাভর্তি ধূলা। পায়ের ধূলা ধুয়ে ফেলার জন্যে তাকে রূপার বদনা ভর্তি করে পানি দেয়া হয়েছে। একজন খানসামা তাঁর পায়ে পানি ঢালছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছেন নেয়ামত হোসেন। তার চোখ তীক্ষ্ম। মুখ গভীর। নেয়ামত হোসেন বললেন, খান সাহেব মানুষ খালি পায়ে পথ চলে, এটা কেমন কথা?

ধনু শেখ বললেন, ঠিক করেছি। হাতি খরিদ না করা পর্যন্ত খালি পায়ে হাটব। এইটা আমার একটা জিদ।

খারাপ না। পুরুষমানুষের জিদ থাকা ভালো। আমার কাছে কী জন্যে এসেছেন?

ধনু শেখ মনে মনে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মানুষটা আপনি’ বলা শুরু করেছে। ধনু শেখ বললেন, আপনি কয়েকবার খবর পাঠিয়েছেন দেখা করার জন্য। নানান কাজকর্মে থাকি, সময় করতে পারি নাই। আজ আমি অবসর। ভাবলাম যাই। গফসফ করে আসি। আপনার মতো বিশিষ্ট মানুষ থাকতে আমার গফের মানুষ নাই। এটা আফসোসের বিষয়।

নেয়ামত হোসেন ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আপনি অবসর এই জন্যে এসেছেন এটা বিশ্বাস করা যায় না। কারণ ছাড়া আপনি আসেন নাই। কারণটা বলেন।

সদর খাজনার সময় হয়েছে। টাকার জোগাড় কি হয়েছে?

নেয়ামত হোসেন বললেন, খাজনার টাকা আছে। যদিও কয়েকবার আমার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতরা কিছু নিতে পারে নাই— এই খবর আপনার জানার কথা।

ধনু শেখ বললেন, আমি কী করে জানিব? আমি তো ডাকাতের দলে ছিলাম না। না-কি আপনার ধারণা আমিও ছিলাম?

নেয়ামত কিছু বললেন না। ধনু শেখের এ বাড়িতে আসার উদ্দেশ্য এখনো পরিষ্কার হচ্ছে না। খারাপ কোনো মতলব আছে। এটা বোঝা যাচ্ছে।

ধনু শেখ বললেন, জমিদার সাব। আপনাকে অত্যধিক চিন্তাযুক্ত মনে হইতেছে। আমি কী কারণে আসছি। বুঝতে পারতেছেন না বইলা চিন্তিত। আমি আসছি আপনাৱে সাবধান করতে।

আমাকে সাবধান করতে এসেছেন?

ধরেন সদর খাজনা নিয়া আপনার ম্যানেজার রওনা হইল। পথে পড়ল ডাকাতের হাতে। বিপদ না? খাজনা দিতে পারলেন না। জমিদারি উঠল। নিলামে। শশাংক পালের ঘটনা।

নেয়ামত হোসেনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি ‘তুমিতে ফিরে গেলেন। কঠিন গলায় বললেন, তুমি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছ? ডাকাতির ভয়?

ধনু শেখ বললেন, আপনি ব্যবস্থা ভালো নিয়েছেন। এমন এক পথে খাজনা যাবে যে পথে কেউ যায় না। খাজনা যাবে ঘোড়ার পিঠে। মিশাখালির বাজারের পথে। ঠিক বলেছি না? আপনার নিজের লোকই যদি সব বলে দেয়। তখন তো ভয় আপনাতেই আসে। তার উপরে দেশ ভর্তি হয়েছে স্বরাজের বোমাবাজাদের দিয়ে। টাকা লুটপাটে এরা ওস্তাদ। এরা পরিচয় দেয় স্বদেশী, বিপ্লবী। আসলে ডাকাত।

নেয়ামত হতভম্ব। সদর খাজনা মিশাখালি বাজার দিয়ে ঘোড়ার পিঠে যাবে। এটা সত্য। এই সত্য বাইরের মানুষের জানার কথা না।

ধনু শেখ উঠে দাঁড়ালেন। চলে যাবার প্রস্তুতি। নেয়ামত হোসেন বললেন, একটু বসেন।

জরুরি কাজ ছিল। একটু আগে বলেছেন। আজ আপনি অবসর। গফসফ করতে এসেছেন। ও আচ্ছা, আসলেই তো আজ কোনো কাজকর্ম নাই। দুপুরে আমার সঙ্গে খানা খান। ধনু শেখ বললেন, মন্দ না। আপনার বাবুর্চির সুনাম শুনেছি। তার হাতের রান্ধন চাখবার সৌভাগ্য হয় নাই। আমি বিরাট ভাগ্যবান।

নেয়ামত বললেন, আপনার সঙ্গে আমি কোনো বিবাদে যেতে চাই না। আপোস করতে চাই। আপনি বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়েছেন। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরে দেখবে এই নিয়ম। আপনি আমার স্বাৰ্থ দেখবেন, আমি আপনার স্বাৰ্থ দেখব।

ধনু শেখ বললেন, অবশ্যই। খাঁটি কথা বলেছেন। এই কথার দাম লাখ টাকার উপরে।

নেয়ামত বললেন, মাঝে মাঝে আমরা দুই ভাই মজলিশে বসব। গানবাজনা হবে। লখনৌ-এর এক বাইজি আমার এখানে আছে। শুনেছেন বোধহয়।

শুনেছি।

তার ঘাঘড়া নৃত্য দেখার মতো জিনিস। আজ রাতেই নাচের ব্যবস্থা করব, যদি মেয়েটার শরীর ভালো থাকে।

ধনু শেখ বললেন, আপনার বিরাট মেহেরবানি।

নিয়ামত বললেন, আমার খাজনা নিয়ে যখন যাবে তখন তাদের সাথে আপনার কয়েকজন বিশ্বাসী লোক দিয়ে দিবেন।

অবশ্যই।

নেয়ামত বললেন, এক কাজ করুন, রাত পর্যন্ত থাকেন। রাতে ভালো আয়োজন করি। সামান্য গানবাজনার আয়োজনও থাকল।

মন্দ না।

ধনু শেখ গিয়েছিলেন খালি পায়ে, ফিরলেন হাতিতে চড়ে। নেয়ামত হোসেন বন্ধুকে হাতিতে করে ফেরত পাঠালেন।

এত করেও শেষরক্ষা হলো না। নেয়ামত হোসেনের খাজনার দলে ডাকাত পড়ল। বন্দুকের গুলিতে নেয়ামত হোসেনের তহসিলদার এবং এক নায়েব মারা গেল। স্বদেশী ডাকাতদের কাজ। এদের জন্যে টাকা পয়সা নিয়ে বের হওয়াই মুশকিল। পুলিশের এসপি সাহেব স্বয়ং নিজে কয়েকবার এসে তদন্ত করে গেলেন। কোনো হদিস পাওয়া গেল না।

 

ধনু শেখের শরীর ভালো না। জ্বর জ্বর ভাব। সারাদিনই তিনি বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছেন। সন্ধ্যার পর বেদানার সঙ্গ সাপলুড়ু নিয়ে বসেছেন। সাপলুড়ু পুরোপুরি ভাগ্যের খেলা। বেদানার গুটি খাওয়ার পারদর্শীতা সাপলুড়ুতে কাজে লাগে না। তারপরেও এই খেলাতেও সে জেতে। ধনু শেখ ভালোই খেলছিলেন। তার গুটি তরতর করে উঠে যাচ্ছিল। নিরান্নব্বইতে এসে সাপের মুখে পড়ে দুইয়ের ঘরে চলে যেতে হলো। বেদানার মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। দু’জনেরই বড় সুখের সময়।

সুখের সময়ে বাধা পড়ল। সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর এসে খবর দিল, জুম্মাঘরের ইমাম এসেছেন। দেখা করতে চান।

ধনু শেখ বললেন, এখন ব্যস্ত আছি। পরে আসতে বলো। তিন দান লুড়ু খেলা হলো। তিনটিতেই বেদোনা জিতলা। ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, ঐ বান্দি, তোর সাথে পারা মুশকিল।

স্ত্রীর প্রতি অতিরিক্ত মমতা তৈরি হলে ধনু শেখ তাকে ‘বান্দি সম্বোধন করেন এবং তুই তোকারি করেন।

বেদানা বলল, আপনের শরীর কি এখনো খারাপ?

ধনু শেখ বললেন, হঁ। দুই দানা আফিং খাইলে মনে হয় শরীর ঠিক হইত। [সে-সময় আবগারী দোকানে আফিম বিক্রি হতো। যে-কেউ আফিম কিনে খেতে পারত।]

বেদানা বলল, আফিং খান। দুধ জ্বাল দিয়া দিতে বলি, দুধ দিয়া খান।

ধনু শেখ বললেন, শরাব খাইলেও চলে। শরাব শরীর ম্যাজমেজানির আসল ওষুধ।

বেদানা বলল, শরাব খাইতে চাইলে খান। গেলাস দিতে বলি?

বল।

শরাব আর আফিং একসাথে খাইলে কী হয়?

কিছুই হয় না। ‘নিশা’ ভালো হয়।

দুইটা একসাথে খান। আমিও আপনের সাথে খাব।

মেয়েছেলের এইসব খাওয়া ঠিক না।

ঠিক না হইলেও খাব। আপনের গেলাসে একটা চুমুক দিব।

ধনু শেখ দরাজ গলায় বললেন, আচ্ছা যাও দিও।

অতি আনন্দময় এই মুহূর্তে খবর পাওয়া গেল, মাওলানা ইদরিস যায় নি। এখনো বৈঠকখানায় বসে আছে। ধনু শেখের বিরক্তির সীমা রইল না। তিনি মাওলানাকে শোবার ঘরেই ডাকলেন। বেদানাকে কিছু সময়ের জন্যে বাইরে পাঠালেন। বেদোনা পুরোপুরি গেল না। দরজায় কান পেতে রাখল। পুরুষ মানুষদের জটিল কথা শুনতে তার বড় ভালো লাগে। মামলা মোকদ্দমার কথা, ব্যবসার কথা। এদের কথাবাতাঁর ধরনই অন্যরকম।

আসসালামু আলায়কুম।

ওয়ালাইকুম সালাম। মাওলানা, তোমার কী ব্যাপার? [ধনু শেখ আগে মাওলানাকে আপনি করে বলতেন। খান সাহেব হবার পর থেকে তুমি বলছেন।]

আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম। শরীরটা ভালো না। কথা শোনার মতো মনের অবস্থা না। তারপরেও বলো।

হরিচরণ বাবুর বিষয়সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা নিয়া একটা দলিল হয়েছিল, এই বিষয়ে কি আপনি জানেন?

ধনু শেখ বিরক্ত গলায় বললেন, জানব না কেন? দলিল আমার কাছে। আরেকটা কথা, তুমি হরিচরণ হরিচরণ করতেছ। কোন কামে? তার নাম মোহাম্মদ আহম্মদ।

মাওলানা বললেন, আপনার কাছে যে দলিল আছে তার বিষয়ে বলতেছি না। মূল দলিল।

গাধার মতো কথা বলব না। তুমি মাওলানা, গাধা না।

দলিলটা একজনের কাছে রক্ষিত আছে।

তোমার কথা কি শেষ হয়েছে? কথা শেষ হয়ে থাকলে বিদায় হও। লোকমুখে শুনেছি। তুমি হাফেজ পরীক্ষায় ফেল করেছ। এটা কি সত্য?

জি জনাব।

ফেলটুস মাওলানা দিয়ে তো আমাদের চলবে না। তুমি অন্য কোনোখানে কাজ দেখ। আমি পাশ করা ভালো মাওলানার সন্ধানে আছি। বুঝেছি কি বলেছি?

জি।

এখন বিদায় হও। জুমার নামাজের খুতবা ঠিকমতো পড়তে পার তো? নাকি তোমার পেছনে দাঁড়ায়ে আমরা সবাই গুনাগরি হইতেছি? দাঁড়ায়া থাকবা না, যাও বিদায়।

মাওলানা চলে গেলেন। ধনু শেখ শরাব নিয়ে বসলেন। বেদানার এক চুমুক খাওয়ার কথা, সে কয়েক চুমুক খেয়ে ফেলল। মুখ বিকৃত করে বলল, মজা পাইতেছি না তো।

ধনু শেখ বললেন, ঝিমভাব হয়, এইটাই মজা।

আমার তো ঝিমভাব হইতেছে না। আরো একটা চুমুক দিব?

ধনু শেখ দরাজ গলায় বললেন, দেও।

বেদানা বড় করে চুমুক দিয়ে শাড়ির আঁচলে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল, মূল দলিল কার কাছে খোঁজ নেয়া উচিত না?

ধনু শেখ বিস্মিত হয়ে বললেন, দলিলের বিষয়ে তুমি কি জানো?

আড়াল থাইক্যা শুনছি।

কাজটা ঠিক করা নাই।

আপনেরে এক নিমিষ না দেখলে অস্থির লাগে, এইজন্যে দরজার চিপা দিয়া দেখতে ছিলাম। ভুল হইলে মাফ চাই। এই আপনের পায়ে ধরলাম।

ভুল তো অবশ্যই হয়েছে।

বেদানা বললেন, মূল দলিল উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন।

ধনু শেখ বললেন, মূল দলিল বইল্যা কিছু নাই। আমি যখন হরিচরণের বাড়িতে উপস্থিত হইলাম তখন সে মইরা ‘চেগায়া’ পইড়া আছে। তার দলিল লেখনের সময় কই? আর দলিল কইরা সে কারে বিষয়সম্পত্তি দিবে? তার আছে কে?

বেদানা বলল, আমরার মাওলানা সাব কিন্তু মিথ্যা কথা বলে না।

মিথ্যা বলে না। এইটা ঠিক আছে, তবে ভুলভাল কথা বলে। তার মাথাতে সামান্য দোষও আছে। ঐদিন আমারে বলতেছিল। সে না-কি ইবলিশ শয়তানরে দেখছে। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এইসব মাথা খারাপ লোকের কথা।

বেদান আগ্রহের সঙ্গে বলল, ইবলিশ শয়তান দেখতে কেমন? জিজ্ঞাস করছিলেন?

না।

আমার জানতে ইচ্ছা করতেছে। উনারে খবর পাঠায়া আনাই?

ঝামেলা করব না। আমি ঝামেলা পছন্দ করি না। গ্লাস শেষ হইছে। গ্রাসে জিনিস চাও।

বেদানা গ্লাস ভর্তি করে দিল।

 

পরের বছর নেয়ামত হোসেনের জমিদারি নিলামে উঠল। খান সাহেব ধনু শেখ জমিদারি কিনে নিলেন। জমিদারি কেনা উপলক্ষে তিনি বান্ধবপুরের সবার জন্যে মেহমানির আয়োজন করলেন। হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ নাই, সবাই খাবে। হিন্দুদের পাক ব্ৰাহ্মণ বাবুর্চি করবে। তাদের পাক এক জায়গায়, মুসলমানদের পাক আরেক জায়গায়। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা খাওয়ার শেষে এক টাকা করে পাবেন। মুসলমানদের ক্ষেত্রে শুধু সৈয়দ বংশীয়দের জন্যে এই ব্যবস্থা। খাওয়াদাওয়ার শেষে সারারাত যাত্ৰা পালা। পালার নাম ‘রাজা হরিশচন্দ্ৰ’। মেয়েরাও যেন যাত্রা দেখতে পারে সে ব্যবস্থা হয়েছে। চিক দিয়ে ঢেকে একটা অংশ আলাদা করা হয়েছে।

খান সাহেব ধনু শেখ রাত জেগে যাত্রা দেখলেন। রাজা হরিশচন্দ্রের দুঃখে বারবার তার চোখ পানিতে ভর্তি হয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *