০৯. পনেরো দিনের একটি ট্যুর প্রোগ্রাম

পনেরো দিনের একটি ট্যুর প্রোগ্রামের শেষে লেখক সম্মেলনের ইতি। টুর প্রোগ্রামটি চমৎকার। এই পনেরো দিনে লেখকরা যে যেখানে যেতে চান সেই ব্যবস্থা আমেরিকান ইনফরমেশন সার্ভিস করবে। টিকিট কেটে দেবে, আগেভাগে হোটেলের ব্যবস্থা করে রাখবে। মোটামুটি রাজকীয় ব্যবস্থা বলা যেতে পারে।

আমি যেসব জায়গায় যেতে চেয়েছি সেগুলি হচ্ছে সানফ্রান্সিসকো, নিউ অর্লিপ এবং নিউইয়র্ক। সানফ্রান্সিসকো পছন্দ করার কারণ ঔপন্যাসিক স্টেইনবেক সানফ্রান্সিসকোর মানুষ। তার বেশিরভাগ উপন্যাসের পটভূমি সেলিনাস ভেলি। নিউ অর্লিঙ্গ পছন্দ করার কারণ সেখানকার ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার। ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারে উইলিয়াম ফকনার প্রথম উপন্যাস লেখা শুরু করেন। ও হেনরির লেখক জীবনও শুরু হয় এইখানে। টেনেসি উইলিয়মসের বিখ্যাত লেখা A street car named desire লেখা হয় নিউ অর্লিন্সের ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারে। এই ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারেই আংকেল টমস কেবিন উপন্যাসটির অকসান হয়। কাজেই অতি বিখ্যাত এই জায়গাটি সম্পর্কে আমার কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক।

মুশকিল হলো গুলতেকিনকে নিয়ে। তার টিকিট কাটতে হবে আমাকে। সেটা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো টিকিট পাওয়া নিয়ে। অনেক কষ্টে আইওয়া থেকে সানফ্রান্সিসকোর ট্রেনের টিকিট পাওয়া গেল। ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়। আমেরিকানরা ট্রেনের ভক্ত নয়। সমস্যা হলো বিমানের টিকিট নিয়ে তার জন্যে বাকি টিকিট পাওয়া গেল না। ঠিক করলাম সে সানফ্রান্সিসকোয় পাঁচ দিন থেকে চলে যাবে নিউজার্সিতে ওখানকার টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। সে সেখানেই আমার জন্যে অপেক্ষা করবে। আমি আমার প্রোগ্রাম শেষ করে তার সঙ্গে যোগ দেব এবং তাকে নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে বেড়াতে যাব।

এই পরিকল্পনা তার যে খুব পছন্দ হলো তা না কিন্তু এর বেশি তো কিছু করার নেই।

আমার ভ্রমণ পরিকল্পনা শুধু তার না অনেকেরই পছন্দ হলো না। যেই শুনে সেই বলে তুমি দু’হাজার মাইল রাস্তা যাবে ট্রেনে করে? তোমার কি মাথাটা খারাপ হলো? আমেরিকান ট্রেনের সেই রমরমা এখন নেই। এমট্রেকের নাভিশ্বাস উঠেছে। দু’দিন দু’রাত ট্রেনে থেকে বিরক্তিতেই তুমি মারা যাবে। খুবই অব্যবস্থা।

সবার কথা শুনে শুনে আমারও ধারণা হলো ভুলই বুঝি করলাম। দুদিন দু’রাত ট্রেনে কাটানো সহজ কথা না। অথচ শুরুতে ভেবেছি চারপাশের দৃশা দেখতে দেখতে যাব। ট্রেনের কামরা থেকে আমেরিকার একটা বড় অংশ দেখা হয়ে যাবে। গুলতেকিন বলল, আমেরিকান ট্রেনের জানালা খুলা যায়?

আমি বললাম, মনে হয় না। শীতের সময় জানালা খুলবে কি ভাবে?

তাহলে আমরা শুধু শুধু ট্রেনে যাচ্ছি কেন? বন্ধু জানালার ভেতর দিয়ে কি দেখব? কাচের ভেতর দিয়ে কিছু দেখতে আমার ভালো লাগে না।

আমারও ভালো লাগে না। কিন্তু উপায় নেই, টিকিট কাটা হয়ে গেছে।

দয়া করে স্বীকার করো যে আবার একটা ভুল করেছ। তোমার কি উচিত এইসব পরিকল্পনা করার আগে দশ জনের সঙ্গে কথা বলে জেনে নেয়া?

খুবই উচিত?

যথা সময়ে আমরা ট্রেনে উঠলাম। গুলতেকিনের গম্ভীর মুখ ট্রেনে উঠেই পাল্টে গেল। সে পরপর তিন বার বলল–চমৎকার!

এ্যামট্রেক দোতলা ট্রেন। একতলায় টয়লেট, মালপত্র রাখার জায়গা। দু’তলায় বসার ব্যবস্থা। ট্রেনের দুটি বিশাল কামরা হলো অবজারভেশন ডেক। পুরো দেয়াল কাচের। ভেতরে রিভলবিং চেয়ার। এখানে বসে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাওয়া যায়।

জোসনা রাত। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। আমরা দুজন অবজারভেশন ডেকে বসে আছি। প্রেইরি প্রান্তর ভেদ করে ট্রেন ছুটে চলছে। তিনটি ইঞ্জিন ট্রেনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। গুলতেকিন বলল, আমার মনে হচ্ছে এ জীবনে মনে রাখার মতো যা কিছু অভিজ্ঞতা আমার আছে–এই ট্রেন ভ্রমণ হবে তার একটি।

আমি বললাম, আমারো তাই ধারণা।

সে লাজুক স্বরে বলল–আমি লক্ষ্য করেছি মাঝে মাঝে তুমি কোনো রকম চিন্তাভাবনা না করে একটা কাণ্ড করে বসে। যার ফল আবার কি করে কি করে যেন খুব ভালো হয়ে যায়। ভাগ্যিস তুমি কারো কথা না শুনে ট্রেনের টিকিট কেটেছিলে।

ট্রেন ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে। কামরায় গাড়ি ভরা ঘুম রজনী নিঝুম। আমরা দুজনে চুপচাপ বসে আছি। চোখের সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। মাঠের উপর ফিনিক ফোটা জোছনা।

ভোরবেলা দৃশ্যটাই বদলে গেল। ট্রেন ঢুকল রকি পর্বতমালায়। পাহাড় কেটে কেটে ট্রেন লাইন বসানো হয়েছে। কখনো ট্রেন ঢুকছে সুরঙ্গে কখনো ট্রেন গভীর গিরিপর্বত পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। নিচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। পাহাড়গুলিরইবা কি শোভা। মাথায় বরফের চাদর। পাহাড়ের শরীরে পাইন গাছের চাদর।

ট্রেন লাইনের পাশে পাশেই আছে পাহাড়ি কলারাডো নদী। সে দু’শ সত্তর মাইল আমাদের পাশে পাশে রইল। কি স্বচ্ছ তার পানি। ঘন নীল আকাশের ছায়া পড়েছে তার গায়ে। পাহাড় ভেঙে নদী চলছে আপন গতিতে। আমার কেবলি মনে হতে লাগল, ইস যদি ঐ পানি ছুঁয়ে দেখতে পারতাম।

মাঝে মাঝে পাহাড়ের গায়ে বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। একটা লাল ইটের বাড়ি দেখলাম। ছবির বাড়িও এত সুন্দর থাকে না। আকাশের মেঘ ঐ বাড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাড়ির উঠোনে কালো রঙের একটা ঘোড়া। লাল স্কার্ফ মাথায় জড়িয়ে বাচ্চা একটা মেয়ে দৌড়াচ্ছে। আহা তারা কি সুখেই না আছে! যদি এমন একটা বাড়ি আমার থাকত!

অন্ধকার গুহা থেকে বের হয়ে ট্রেন একবার চলে এল ফুলে ফুলে ভরা এক ভ্যালিতে–খুব পরিচিত ফুল, কাশ ফুল। চেনা ফুল অচেনা জায়গায়। কিছু নাম না জানা ফুলও আছে! কি ভালোই না লাগছে দেখতে।

I offen see flowers from a passing car
That are gone before I can tell what they are.
I want to get out of the train and go back
To see what they were beside the track…
Heaven gives its glimses only to those
Not in position to look too close
(Robert Frost)

সানফ্রান্সিসকোতে আমাদের থাকার জায়গা ডাউন টাউনের বড় একটা হোটেলে। হোটেল বেডফোর্ড। চায়না টাউনের পাশে আকাশ ছোঁয়া বাড়ি। ঘুরে বেড়ানোয় গুলতেকিনের খুব আগ্রহ। সে ট্যুরিস্টদের কাগজপত্র ঘেঁটে নানান জায়গা বের করছে যা আমরা দেখব।

ফিশারম্যান ওয়ারফ
গোল্ডেন গেট
মুর উডস
নাপা ভ্যালি
কুঁকেড স্ট্রিট

ফিশারম্যান ওয়ারফ প্রথম দেখতে গেলাম। আমেরিকান জেলে পল্লী। আহামরি কিছু নয়–বাংলাদেশের সদরঘাট। অসংখ্য ছোট ছোট মাছ ধরার বোট। খাবারের দোকান-এর বেশি কিছু না। ট্যুরিস্টরা মহানন্দে তাই দেখছে এবং পটাপট ছবি তুলছে। আমি মুগ্ধ এবং বিস্মিত হবার কিছুই পাচ্ছি না। অবশ্যি দুটি সিল মাছ কিছুক্ষণ পরপর মাথা তুলে বিকট শব্দ করছে। এই দৃশ্যটি খানিকটা আকৃষ্ট করল।

একটি ছবি তোলার পর সেই দৃশ্যের আবেদনও ফুরিয়ে গেল। আমি বললাম, গুলতেকিন হোটেলে ফিরে গেলে কেমন হয়? সে অত্যন্ত আহত হলো বলে মনে হলো। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, হোটেলে ফিরে যাব মানে? হোটেলেই যদি বসে থাকবে তাহলে বেড়াতে আসার মানে কি?।

আমি তো আর দেখার মতো কিছু পাচ্ছি না।

তুমি দেখার মতো কিছু পাচ্ছ না তাহলে হাজার হাজার ট্যুরিস্ট কি দেখছে?

টুরিস্টরা কি দেখছে সেও এক রহস্য। হাজার হাজার টুরিস্ট ক্যামেরা কাঁধে মুগ্ধ চোখে ঘুরছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে বিস্ময় ও আনন্দে তারা অভিভূত। আমি অবাক হয়ে ভাবছি আনন্দ পাবার চমৎকার অভিনয় তারা কার জন্য করছে? নিজের জন্যে? কেন করছে?

গুলতেকিনকে খুশি করার জন্যে একটা ওয়াক্স মিউজিয়ামে ঢুকলাম। লন্ডনের মাদাম তুষোর ওয়াক্স মিউজিয়ামের নামডাক শুনেছি দেখি এদেরটা কেমন। টিকিটের দাম ষোল ডলার খুব খারাপ হবার কথা না। মাবুদে এলাহী, কিছুই নেই ভেতরে। ক্লিওপেট্রা নাম দিয়ে যে মূর্তি বানিয়ে রেখেছে তাকে দেখাচ্ছে ফর্সা বাঁদরের মতো। এক জায়গায় দেখলাম প্রেসিডেন্ট বুশকে বানিয়েছে, দেখাচ্ছে কংকালের মতো। হাঁ করে আছে। মনে হচ্ছে কামড় দিতে আসছে। আমি মিউজিয়ামের একজন কর্মকর্তাকে বিনীত ভঙ্গিতে বললাম–এটা কি প্রেসিডেন্ট বুশের কংকাল?

সে খুব আহত হলো বলে মনে হলো না। তার মানে আমার মতো আরো অনেকেই তাকে এই প্রশ্ন করেছে।

বিকেলে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে হোটেলে ফিরলাম। গুলতেকিন বলল, এখন কি করা যায়? আমি বললাম, খানিকক্ষণ ঝগড়া করলে কেমন হয়?

তার মানে?

বাসায় বাচ্চারা থাকে প্রাণখুলে ঝগড়া করা যায় না। এখানে চমৎকার নিরিবিলি। এসো দরজা বন্ধ করে প্রাণ খুলে ঝগড়া করে নেই।

পরদিন ভোরবেলা একজন এসকর্ট এসে উপস্থিত। দ্রলোক বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। বিদেশী অতিথিদের নিজের সাথেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সানফ্রান্সিসকো দেখান। তাকে নাকি ওয়াশিংটন থেকে বলা হয়েছে আমাদের সঙ্গ দেবার জন্যে। বেশ উৎসাহ নিয়েই আমরা তার সঙ্গে বের হলাম। তিনি বিশাল গাড়ি নিয়ে এসেছেন। বেশ হাসি-খুশি ধরনের মানুষ। সানফ্রান্সিসকোর নাড়ি নক্ষত্র জানেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম ভদ্রলোক কথা না বলে থাকতে পারেন না। অনর্গল কথা বলেন। গলার স্বরে কোনো উঠানামা নেই। কথা বলার সময় অন্যরা কি ভাবছে কি বলছে কিছুই লক্ষ করেন না। প্রথম শ্রেণীর একজন রবট। আমার মাথা ধরে গেল। এ কি যন্ত্রণা!

সবচে’ বিরক্তিকর ব্যাপার হলো ভদ্রলোক এমন ভঙ্গিতে কথা বলছেন যেন আমি আফ্রিকার গহিন অরণ্য থেকে এই প্রথম শার্ট-প্যান্ট গায়ে দিয়ে সভ্য সমাজে এসেছি। আমি এক ফাঁকে গুলতেকিনকে বললাম–এই ব্যাটাকে তো আর সহ্য করা যাচ্ছে না, কি করা যায় বলো তো?

সে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মাথার যন্ত্রণায় আমি মরে যাচ্ছি, কিছু একটা করো। আর পারছি না।

আমি এই বিপদ থেকে কি করে উদ্ধার পাওয়া যায় কিছুতেই বুঝতে পারছি। ভদ্রলোক এর মধ্যে কয়েক বারই বলেছেন তিনি আমাদের নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরবেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে থাকলে বিরক্তিতেই মৃত্যু হওয়া বিচিত্র না। মুক্তির সুযোগ ভদ্রলোক নিজেই করে দিলেন। এক সময় বললেন, ভিয়েতনামের যুদ্ধে

আমি বি ফিফটি টু বিমান চালাতাম। দুবার আমাকে প্যারাস্যুট দিয়ে জাম্প করতে হয়েছিল। হোয়াট এন এক্সপেরিয়েন্স।

আমি বললাম, বি ফিফটি টু বিমান। তার মানে বোমারু বিমান?

ভিয়েতনামে ভারী ভারী বোমার বেশ কিছু তাহলে তুমি ফেলেছ।

হ্যাঁ। এটা হচ্ছে পার্ট অব দি গেম।

তাহলে তো একটা সমস্যা হলো।

কি সমস্যা?

তুমি অনেক নিরীহ মানুষের মৃত্যুর জন্যে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। আর এদিকে আমি একজন অনুভূতি প্রবণ লেখক। তোমার সঙ্গে থাকা তো আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার মনের ওপর চাপ পড়ছে। তুমি কি দয়া করে আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে হোটেলে পৌঁছে দেবে?

ভদ্রলোক চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে বললেন, তুমি হোটেলে ফিরে যেতে চাচ্ছ?

আমি সহজ গলায় বললাম, যা। আমাদের হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে তোমার যদি অসুবিধা থাকে এখানেই নামিয়ে দাও। আমরা ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে যাব।

না অসুবিধা নেই। চলো হোটেলে পৌঁছে দিচ্ছি।

গুলতেকিন বলল, তুমি এমন একটা কথা এ রকম কঠিনভাবে কি করে বললে?

আমি বললাম, আমেরিকানরা সরাসরি কথা বলা পছন্দ করে। ওরা যা বলার সরাসরি বলে। আমিও তাই করলাম।

সানফ্রান্সিসকো ঘুরে দেখার কাজ দু’জনে হাত ধরাধরি করে হেঁটে হেঁটেই সারলাম। খুব মজা লাগল চায়না টাউন দেখে। শহরের বিরাট একটা অংশ–সব চৈনিক। দোকানের সাইনবোর্ডগুলি পর্যন্ত চীনা ভাষায় লেখা। হাজার হাজার নাক চাপা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবস্থা অনেকটা আমাদের দেশের হাটের মতো। দরদাম হচ্ছে। যার দাম শুরুতে কুড়ি ডলার হাঁকা হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে সাত ডলারে। আমেরিকায় এই ব্যাপারটি অকল্পনীয়। দরদাম করার ব্যবস্থা আছে দেখে গুলতেকিন খুবই উৎসাহ পেয়ে গেল। তার এই উৎসাহের কারণে এক গাদা অপ্রয়োজনীয় জিনিস আমরা চায়না টাউন থেকে কিনে ফেললাম।

চায়না টাউনের এক অংশে আছে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা। ভেতরে কি হয় না হয় জানি না। বাইরে কিছু সাইন বোর্ড থেকে কিছুটা আঁট করা যায়। নমুনা দিচ্ছি

রেজিস প্লেস, অনিন্দ্য সুন্দরী নর্তকীরা নগ্ন গায়ে নৃত্য করবে। উপস্থিত অতিথিদের সবার টেবিলের উপরও তারা নাচবে।

মাত্র দশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পূর্ণ নগ্ন তরুণীর সঙ্গে একান্ত কথা বলার সুযোগ। প্রতি মিনিট কথা বলার জন্যে এক ডলার পঞ্চাশ সেন্ট।

এই ব্যাপার আমেরিকার অনেক শহরে দেখেছি। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো বাধা-নিষেধ হয়তো নেই। ফ্রি কান্ট্রিযার যা ইচ্ছা করতে পারে। যতদূর জানতাম নেভাদা স্ট্রেট ছাড়া অন্য কোনো স্ট্রেটে বেশ্যাবৃত্তির আইন সিদ্ধ নয় সানফ্রান্সিসকোতে সন্ধ্যার পর পথে অনেক নিশিকন্যাকেই দেখা গেল। উগ্র প্রসাধন, তার চেয়ে উগ্র পোশাক। একেক জনের চেহারা এত সুন্দর যে ইচ্ছা করে কাছে গিয়ে আশা ও আনন্দের দু’একটা কথা বলি। ওদের বুলি, পৃথিবীকে এই মুহূর্তে তাদের যত খারাপ লাগছে আসলে তত খারাপ নয়। এইসব নিশিকন্যাদের দেখলেই আমি নিজের ভেতর এক ধরনের বিষণ্ণতা অনুভব করি। এই বিষণ্ণতার জন্ম কোথায় আমি জানি না।

এই বিরাট শহরে প্রচুর গৃহহীন মানুষ দেখলাম। সাইন বোর্ড নিয়ে রাস্তায় মোড়ে মোড়ে বসে আছে।

আমি গৃহহীন আমাকে সাহায্য দাও।

আমাদের দেশের মতো দরিদ্র কৃষক যেমন ভূমিহীন হচ্ছে এখানকার হতদরিদ্র আমেরিকানরা হচ্ছে গৃহহীন। একটি বাড়ি (নিজের বা ভাড়) এ দেশে টিকিয়ে রাখা কষ্টকর। গত নভেম্বর (৯০) নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা বলি। নিউইয়র্কবাসী বৃদ্ধ এক আমেরিকানের স্বপ্নের কথা এই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে। এই আমেরিকান বৃদ্ধ বয়সে সোস্যাল সিকিউরিটি থেকে চারশত সত্তর ডলার পান। চারশ’ উলার চলে যায় তার এক রুমের কামরার ভাড়া বাবদ। সত্তর ডলারে বাকি মাস টেনে নিতে হয়। রাত এবং দুপুরে খাবারের জন্যে একটা রেস্টুরেন্টে যান। রেস্টুরেন্টে খদ্দেরের উচ্ছিষ্ট খাবার তাকে দেয়া হয়। সেই ব্যবস্থা করা আছে। কাজেই দু’বেলা খাবারের খরচ বেঁচে যায়। তার একটা কফি মেশিন আছে। মাঝে মাঝে সেই কফি মেশিনে কফি বানিয়ে খান। ছেলে-মেয়েরা বড় হয়েছে। তাদের অনেকেরই ছেলেপুলে আছে। কারো সঙ্গেই এই বৃদ্ধের যোগাযোগ নেই। কারণ যোগাযোগ থাকলেই বিভিন্ন উপলক্ষে গিফট পাঠাতে হবে। সেই সামর্থ্য তার নেই। এই বৃদ্ধ তার বর্তমান জীবন নিয়ে সুখী কারণ তিনি গৃহহীন নন। একটা ছোট্টঘর তার আছে। শীতের রাতে যে ঘরে তিনি আরাম করে ঘুমুতে পারেন। পার্কের বেঞ্চিতে, বসে তাঁকে রাত কাটাতে হয় না। কাজেই তিনি ভাগ্যবান।

এক রাতে গুলতেকিনকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটছি। গ্রামোফোন রেকর্ডের দোকান দেখলেই থামছি, যদি ভালো এলপি পাই কিনে নেব। পাচ্ছি না। এলপি উঠে গেছে, তার জায়গায় এসেছে CD প্লেয়ার। এক দোকানে আমার পছন্দের কিছু ক্যাসেট পেলাম। কিংস্টোন ট্রায়ের Where have all the flowers gone… মন খারাপ করা গান। দু’জনে হাত ধরাধরি করে বাসায় ফিরছি। মনের ভেতরে গান বাজছে। শহরটা হয়ে গেছে অন্য রকম। এই রহস্যময় সময়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হলো–অত্যন্ত রূপবতী এক তরুণী তার শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে রাস্তার পাশে বসে আছে। তাদের সামনে কাঠ বোর্ডের একটি কাগজে লেখা–আমি এবং আমার শিশুপুত্র গৃহহীন। আপনার থলেতে কি কিছু ভাংতি পয়সা আছে?

মেয়েটির বয়স খুব বেশি হলে আঠারো-উনিশ। চোখ ধাঁধানো রূপ। তার ঘুমন্ত শিশুটিও মায়ের রূপের সবটুকু নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। গুলতেকিন বিষ গলায় বলল, এ কি। সে পঁচ ডলারের একটি নোট নিয়ে এগিয়ে গেল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। এমন রূপবতী একজনকে কেউ ভিক্ষা দিচ্ছে এই কষ্ট আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। কি দেখছি আজকের আমেরিকায় Where have all the flowers gone…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *