০৭. সোমার কেমন যেন শীত শীত লাগছে

সোমার কেমন যেন শীত শীত লাগছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। ফ্যানের শো-শোঁ শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বিজু ফ্যানটা ভালো কেনে নি। এত শব্দ হবার তো কথা না।

সোমা উঠে বসল।

পাশের খাটে ঊর্মি। কেমন এলোমেলল ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। ঊর্মির জীবনটা কেমন হবে কে জানে! এই ব্যাপারটা আগেভাগে জানা থাকলে ভালো হত। নিজেকে প্রস্তুত করে রাখা যেত। পৃথিবী বড় রহস্যময় জায়গা। সব রহস্যে ঢাকা। আগে থেকে কিছুই জানা যায় না।

স্যান্ডেল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সোমা খালি পায়েই দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি পড়ছে ঠিকই। বিজু শুয়েছে বারান্দায়। বৃষ্টির ছাট লাগছে গায়ে। তবু ঘুম ভাঙছে না। সে এসে বিজুকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। নিজের ঘর ছেড়ে বেচারাকে ঘুমুতে হচ্ছে বারান্দায়।

সোমা ডাকল, এই বিজু।

বিজু সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিল, কি আপা?

জেগেছিলি নাকি?

হুঁ।

বৃষ্টিতে ভিজছিস তো, ভেতরে গিয়ে ঘুমো। আমি ঊর্মির সঙ্গে শোব।

দু এক ফোঁটা পানিতে আমার কিছু হয় না আপা।

বলতে বলতে বিজু মশারির ভেতর থেকে বের হয়ে এল। হাত বাড়িয়ে বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই বের করল। সোমা তাকিয়ে আছে। কত ছোট দেখেছে তাকে। ঘরময় হামাগুড়ি দিত। একটু পর পর বলত হাঁউ। এই ছেলে বয়স্ক লোকের ভঙ্গিতে মুহুর্তে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। কায়দা করে ধোঁয়া ছাড়ে।

আপা।

কি।

এ বাড়িতে রাতে তোমার ভালো ঘুম হচ্ছে না—তাই না?

হবে না কেন, হয়।

একটু পর-পর বিছানা থেকে ওঠে। পানি খাও। বারান্দায় হাঁটাহাঁটি কর। আবার গিয়ে শোও।

তুই এতসব দেখিস কখন? জেগে থাকিস?

হুঁ।

তোরও ঘুম হয় না?

হয়। তবে কম হয়। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে নানান চিন্তা করি।

কি চিন্তা-ভাবনা? দ্রুত কীভাবে বড়লোক হওয়া যায়।

এখনি মাথায় এই চিন্তা?

হুঁ। এখনি। এবং দেখবে আমি হয়ে ছাড়ব। পুতু-পুতু লাইফ অসহ্য। বি এ পাশ করে পড়াশোনা স্টপ করে দেব। তারপর..

তারপর কি?

এখন বলব না। আছে অনেক পরিকল্পনা। প্রথম পরিকল্পনা হচ্ছে—বড় চাচার উচ্ছেদ। কীরকম কায়দা করে এটা করি সেটাই শুধু দেখো।

ছিঃ বিজু ছিঃ।

বিজু কোনো উত্তর করল না। নিজের মনে হাসল। সোমা বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসল। বৃষ্টি দেখতে তার ভালো লাগছে।

চা খাবে নাকি আপা? ফ্লাস্কে চা আছে। খেতে পার। দেব?

দে।

বিজু উঠে চা ঢালল। আপার জন্যে এবং তার নিজের জন্যে।

আপা।

বল।

ঐখানে তুমি অনেক কষ্ট করেছ। আর তোমাকে কষ্ট করতে দেব না। তোমার ঝামেলাটা যখন হয় তখন আমি ছোট ছিলাম। আমার বয়স একটু বেশি হলে ঘটনা অন্যরকম হত।

তুই বিরাট দায়িত্ববান হয়েছিস মনে হয়।

হ্যাঁ হয়েছি। তোমাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক দায়িত্ববান কিন্তু হয়েছি। বিজু চুপ করে গেল। সে বৃষ্টি দেখছে। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। একটা ব্যাঙ লাফিয়ে বারান্দায় উঠেছে। এখন ঢুকতে চাচ্ছে। বিজু তা দেখেও চুপ করে আছে। সোমা মৃদু গলায় বলল, বিজু।

বল।

ঐ প্রফেসর সাহেব কি এখন আছেন? মানে ঐ যে……

জানি কার কথা বলছ। হ্যাঁ আছেন।

ঐ বাড়িতেই?

হুঁ।

কেমন আছেন—তুই কিছু জানিস?

ভালেই আছেন। খারাপ থাকবেন কেন। তবে বেচারার বৌ মারা গেছে।

কবে?

তা প্রায় দুই বছর। মারা যাবার আগে ভদ্রমহিলার পুরোপুরি মাথা খারাপ হয়ে গেল। গলায় মাইক লাগিয়ে রাতদিন চেঁচাত। কানে আঙুল দিতে হয় এমন সব গালাগালি। বিশ্রী অবস্থা।

সোমার খুব ইচ্ছে করছে জিজ্ঞেস করতে-ভদ্রলোক কি আবার বিয়ে করেছেন।

জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগছে। বিজু কি মনে করবে কে জানে।

ভদ্রলোক কি আবার বিয়ে করেছেন?

বিজু কঠিন স্বরে বলল, না।

ব্যাঙটা এখনো লাফালাফি করছে। বিজু তার চায়ের কাপের গরম চা ব্যাঙটার উপর ঢেলে দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *