০৭. সেতু আয়নার সামনে বসেছে

সেতু আয়নার সামনে বসেছে। চুল আঁচড়াচ্ছে। তার হাতে কাঠের চিরুণি। চিরুণির বড় বড় দাঁত। এই চিরুণিতে চুল আঁচড়ানো যায় না। বড় আয়নার সামনে বসে চিরুণি দিয়ে চুল ঘষতে ভালো লাগে। রবিন হকের গেস্ট হাউস ওয়েসিসের আয়নাগুলি ছোট ছোট। তবে এই বিশেষ ডিলাক্স স্যুটের আয়নাটা প্রকাণ্ড। সেতু লক্ষ করল, আয়নায় রবিনকে দেখা যাচ্ছে। তার হাতে সিগারেট। ঘনঘন সিগারেটে টান দিচ্ছে। সিগারেট হাতে মানুষকে সব সময় চিন্তিত দেখায়। রবিনকেও চিন্তিত দেখাচ্ছে।

রবিন বলল, তুমি আজ থাকবে, না চলে যাবে?

সেতু বলল, জানি না।

ডিসিশান নিয়ে নিলে আমার জন্যে সুবিধা।

কী সুবিধা?

তুমি যদি থেকে যাও, তাহলে আমার এক ধরনের পরিকল্পনা হবে। না থাকলে অন্যরকম।

যদি না থাকি তাহলে তোমার পরিকল্পনা কী?

রবিন বিরক্তি মুখে বলল, সেতু! তুমি অকারণে কথা চালাচালি করছ। স্টপ ইট।

সেতু বলল, Ok.

তুমি যদি আজ থেকে যাও তাহলে ওয়ালেদকে আসতে বলি।

ওয়ালেটা কে?

ফিল্ম ডিরেক্টর। আমি টাকা ঢালব, সে ছবি বানাবে।

সেতু বলল, তাকে এখানে আসতে বলার দরকার কী? এই ঘরে তো ছবি বানাবে না।

রবিন হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে নতুন আরেকটা ধরাতে ধরাতে বলল, বোকার মতো কথা বলবে না। ছবির গল্প তোমাকে বুঝতে হবে না? ওয়ালেদ বুঝিয়ে দেবে।

সেতু বলল, ছবির গল্পটা কী?

রবিন বলল, কাছে আসো গল্পটা বুঝিয়ে বলি। চা খেতে খেতে বলি। চা দিতে বলব?

সেতু বলল, আমি যেখানে আছি সেখান থেকেই গল্প শুনব। কটা বাজে বলো তো?

দশটা।

সেতু বলল, রাত দশটা না দিন দশটা?

রবিন বলল, তার মানে? তুমি জানো না রাত না দিন?

সেতু বলল, তোমার এই বিশেষ স্যুটের দরজা-জানালা সব সময় বন্ধ থাকে। রাত-দিন কিভাবে বুঝব? কিছু কিছু জায়গা থাকে স্মোক ফ্রি’। তোমার এই জায়গাটা ডে-নাইট ফ্রি।

রবিন বলল, রাত দশটা। গল্পটা বলি?

সেতু বলল, গল্প বলার ব্যাপারে তোমার এত আগ্রহ কেন? ছবির গল্প কি তোমার লেখা?

আইডিয়া আমার। এখন কি গল্পটা শুনবে, না বকবক করেই যাবে?

শুনব।

তাহলে আয়নার দিকে তাকিয়ে না থেকে আমার দিকে ফেরো।

সেতু বলল, আয়নায় তোমাকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। আয়নার কারণে দু’জন মুখোমুখি না বসেও মুখোমুখি। গল্প শুরু করো।

রবিন এসে সেতুর পাশে বসল। হাতের সিগারটে ফেলে দিয়ে গল্প শুরু 09

শহরের একটা মেয়ে অর্থাৎ তুমি। ছবিতে তোমার নাম বৃষ্টি। তুমি প্রথম গ্রাম দেখতে বের হয়েছ। তোমার গায়ে হালকা আকাশী রঙের শাড়ি। মাথায় গাঢ় নীল রঙের স্কার্ফ। তুমি আপন মনে হাঁটছ। হঠাৎ একটা সাপ এসে তোমাকে ছোবল দিল। হাঁটুর কাছে ছোবল।

আমি শাড়ি পরে আছি, আমাকে হাঁটুর কাছে ছোবল কীভাবে দেবে? আমি কি শাড়ি হাঁটু পর্যন্ত তুলে হাঁটছি?

ডিরেক্টর শট কীভাবে নেবেন আমি জানি না। পুরো গল্পটা আগে শোন, তারপর সমালোচনায় যাবে।

যে সাপ আমাকে কাটল সেটা কী সাপ?

কী সাপ মানে?

সাপের একটা নাম থাকবে না? কেউটে, দাড়াস, শঙ্খচুড়।

বরিন বলল, আমাকে কি গল্পটা শেষ করতে দেবে প্লিজ?

Ok.

একটা কথাও না। তুমি শুধু শুনে যাবে।

আমাকে আধঘণ্টা সময় দাও। আধঘণ্টা পর শুনব।

আধঘণ্টা কী করবে?

বাসায় টেলিফোন করব। হেদায়েতের সঙ্গে কথা বলব। আমার কেমন জানি অস্থির লাগছে। তার সঙ্গে কথা বললে অস্থিরতাটা কমবে।

রবিন বলল, তুমি বাস করছ আমার সঙ্গে। অস্থিরতা কমাবার জন্যে স্বামীকে টেলিফোন করছ। পুরো ব্যাপারটা কতটা হাস্যকর, বুঝতে পারছ?

পারছি।

আমি তোমাকে একটা উপদেশ দেই?

দাও।

তোমার স্বামী অসম্মানের ভেতর বাস করছে। তাকে ডিভোর্স দিয়ে অসম্মানের হাত থেকে বাঁচানো উচিত। আর আমাদের ছবির জন্যও ব্যাপারটা ভালো।

কেন?

বিবাহিতা মেয়েকে ছবির নায়িকা হিসেবে পাবলিক একসেপ্ট করে না।

ডিভোর্সি মেয়ে একসেপ্ট করে?

কুমারী মেয়ে হলে সবচেয়ে ভালো হয়। ডিভোর্সি হলো সেকেন্ড চয়েস।

তুমি কিন্তু মন দিয়ে আমার কথা শুনছ না। চুল আঁচড়েই যাচ্ছে।

চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে শুনছি। ঠিক আছে যাও চুল আঁচড়ানো বন্ধ করলাম।

সেতু উঠে দাঁড়ালো। রবিন বলল, কোথায় যাচ্ছ?

সেতু বলল, হেদায়েতকে টেলিফোন করতে যাচ্ছি।

টেলিফোন একটু পরে করো, গল্পটা আগে শুনে নাও।

উঁহু। এখনই টেলিফোন করব।

রবিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আরেকটা সিগারেট ধরালো।

হলো।

কে সেতু?

হুঁ। কী করছ?

কান্ডি ফ্লস বানাচ্ছি।

কী বানাচ্ছ?

হাওয়াই মেঠাই। ভাইজান একটা যন্ত্র কিনে দিয়েছেন, এটা দিয়ে বানাচ্ছি।

হচ্ছে?

হ্যাঁ হচ্ছে। নানান রকম ফুড কালার দিয়ে Experiment করছি। সুন্দর সুন্দর রঙ হচ্ছে।

বাহ ভালো তো!

তুমি কি রাতে ফিরবে?

না। ফিল্মের ডিরেক্টর সাহেব আসবেন। তিনি ফিল্মের গল্প শোনাবেন। আড়াই ঘণ্টার গল্প ব্যাখ্যা করে শোনাবেন তো। গল্প শুনতে শুনতেই রাত কাভার হয়ে যাবে।

হবারই কথা।

খানিকটা গল্প, মানে গুরুটা আমি শুনেছি, আমাকে সাপে কাটবে।

সত্যি কাটবে?

আরে না। ফিল্ম পুরাটাই মিথ্যা। দেখা যাবে রাবারের সাপ। তুমি কি ভাত খেয়েছ?

না।

দেরি করছ কেন? খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।

আচ্ছা।

ঘুমের ওষুধ খেতে ভুলে যেও না।

ভুলব না।

আচ্ছা শোন, ঐ মেয়েটা কি আরো এসেছিল?

কোন মেয়েটা?

তোমার হাত ধরাধরি করে টানাটানি করে যে মেয়েটা।

এসেছিল।

পরেরবার যখন আসবে, তুমি অবশ্যই তার নাম জিজ্ঞেস করবে।

আচ্ছা। টেলিফোন রেখে দেই।

এক মিনিট ধরে রাখ। ফিল্ম লাইনের অদ্ভুত একটা ঘটনা শোন। কোনো বিবাহিত মেয়ে যদি ফিলো হিরোইনের পার্ট করে, তাহলে কেউ সেই ছবি দেখে না। ছবি ফ্লপ হয়।

তাহলে তো তোমার খুব সমস্যা হবে।

সমস্যা তো হবেই।

কী করা যায় বলো তো?

একটা কিছু ব্যবস্থা হবে, তুমি টেনশন করো না। আর শোন, আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি। কয়েকটা হাওয়াই মেঠাই পাঠিয়ে দাও, খেয়ে দেখি।

আচ্ছা।

সেতু টেলিফোন রেখে বাথরুমে ঢুকে চোখ-মুখে পানি দিয়ে বের হলো। রবিনের দিকে তাকিয়ে বলল, গল্প শুরু করো।

রবিন বলল, তুমি এবং তোমার হাসব্যান্ডের কনভারসেশন আমি পাশের ঘরের লাইন থেকে শুনেছি। সরি ফর দ্যাট।

সরি হবার কিছু নেই। আমরা তো প্রেমালাপ করছিলাম না।

রবিন বলল, আমার কাছে প্রেমালাপের মতোই মনে হয়েছে। কী সহজস্বাভাবিক কথাবার্তা! একটু হিংসাও বোধ করলাম।

হিংসা কেন?

এত সহজভাবে তুমি কখনো আমার সঙ্গে কথা বলো না।

তুমি তো সহজ মানুষ না। তোমার সঙ্গে সহজ কথা কেন বলব? ভালো কথা, গাড়িটা আমার বাসায় পাঠাও। কয়েকটা ক্যান্ডি ফ্লস নিয়ে আসবে।

গাড়ি পাঠাতে হবে?

অবশ্যই।

 

হেদায়েত শুয়ে পড়েছে। সে সামান্য চিন্তিত। ভুল করে ঘুমের ওষুধ দুটা খেয়ে ফেলেছে। ভাত খাওয়ার পর পর যে একটা খেয়েছিল সেটা মনে ছিল না বলে কিছুক্ষণ আগে আরেকটা খেয়ে ফেলেছে। এতক্ষণে ঘুমে চোখ-মুখ বন্ধ। হয়ে যাবার কথা। মজার ব্যাপার, ঘুম আসছে না। মাথার ভেতর টেলিফোন বাজার মতো শব্দ হচ্ছে। খুবই হালকা শব্দ। ঘরের ভেতর হালকা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সেন্টের গন্ধ না, টাটকা কোনো ফুলের গন্ধ। অপরিচিত ফুল। মেয়েটা কি চলে এসছে লা-কি? হেদায়েত চারদিকে তাকালো কাউকে দেখা গেল না। মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করতে হবে।

একবারেই ঘুম আসছে না। হেদায়েতের আরেকটা সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। বিছানায় শুয়ে সিগারেট খাওয়া যাবে না। এক্সিডেন্ট হয়। এক্সিডেন্টে অনেকে মারাও যায়। বিছানা থেকে নেমে সিগারেট খেতে হবে। হেদায়েত সিগারেটের জন্য বালিশের নিচে হাত বাড়াতেই নরম একটা হাতের উপর তার হাত পড়ল। হেদায়েত চোখ বন্ধ করে ফেলল। ফুলের গন্ধ তীব্র হয়েছে। এখন হেদায়েত ফুলের গন্ধটা চিনতে পারছে। কদম ফুলের গন্ধ। হেদায়েত বিড়বিড় করে বলল তোমার নাম কী?

মিষ্টি গলায় থেমে থেমে একটি মেয়ে উত্তর দিল, আমার কোনো নাম নেই। আপনি আমার একটা নাম দিন।

আমি তোমার নাম দিলাম সেতু।

সেতু নাম কেন দেবেন? সেতু আপনার স্ত্রীর নাম। ভালো কোনো নাম দিন।

আমার মাথায় কোনো নাম আসছে না। তুমি নিজেই তোমার একটা নাম দাও।

আচ্ছা। আমি দিলাম।

কী নাম দিয়েছ? মাহজাবিন?

আমাকে জড়িয়ে ধরুন তারপর বলছি।

হেদায়েত মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেল। ফুলের গন্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো।

 

সেতুর ঘুম আসছে না। সে নিজেও একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। তাতে লাভ হচ্ছে না। মনে হয় দুটা খাওয়ার দরকার ছিল। খাবার জিনিস কম করে হলেও দু’বার নিতে হয়। তা না হলে খালে পড়ে। সেতু এপাশ-ওপাশ করছে। তারপাশে হেদায়েত থাকলে বলতে পারত— এই আমাকে এক গ্লাস পানি আরেকটা ওষুধ এনে দাও। রবিন ভাইকে সেটা বলা যায় না।

রবিন বলল, ঘুমাচ্ছ?

না।

কোনো কিছু নিয়ে টেনশন?

না।

গরম এক কাপ কফি খাবে?

ঘুম আসছে না, এর মধ্যে কফি খাব কেন?

মাঝে মাঝে ক্যাফিন ঘুম আনতে সাহায্য করে। বিষে বিষক্ষয় টাইপ ব্যাপার। এসো কফি খেতে খেতে কিছুক্ষণ গল্প করি। আমার নিজের ঘুম আসছে না। শুয়ে শুয়ে হেদায়েত সাহেব নামের অদ্ভুত মানুষটার কথা ভাবছিলাম।

সেতু উঠে বসতে বসতে বলল, সবাই অদ্ভুত। তুমি নিজেও অদ্ভুত। আমি অদ্ভুতেরও বেশি। আমি কিস্তুত।

হেদায়েত সাহেবের সঙ্গে তোমার বিয়েটা কিভাবে হলো। এরেনজড মারেজ তো বটেই। এরেনজটা কে করল?

সেতু হাই তুলতে তুলতে বলল, আমি করেছি।

তার মানে?

আমি অংকে খুব কাঁচা ছিলাম। এসএসসি পরীক্ষার আগে আগে আমার বড় মামা অংকের জন্যে একজন প্রাইভেট টিচার ঠিক করলেন।

হেদায়েত সাহেব সেই টিচার?

হুঁ।

খুব ভালো টিচার?

হুঁ। অংকে আমি নব্বই পেয়েছিলাম।

একজন লোক ভালো অংক শেখায় বলে তুমি তার প্রেমে পড়ে গেলে?

তার কথাবার্তা আচার-আচরণে আমার মনে হয়েছিল সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ।

এখন মনে হয় না?

এখনও মনে হয়।

সেতু বিছানা থেকে নামল। ওয়ার ড্রবের দিকে তাকাল। রবিন বলল, কোথায় যাচ্ছ?

সেতু বলল, আমার এখন ঘুম পাচ্ছে। আমি বাসায় গিয়ে ঘুমাব।

রবিন বলল, তার মানে?

সেতু বলল, চোখ বন্ধ কর। আমি কাপড় চেঞ্জ করব।

রবিন বলল, রাত কটা বাজে জানো?

জানি। দুটা দশ। ঢাকা শহরে এমন কোনো রাত নয়। রাস্তায় ট্রাফিক আছে।

তুমি আশা করছ রাত দু’টা দশ মিনিটে আমি তোমাকে তোমার বাসায় নামিয়ে দেব?

সেতু বলল, তুমি নামিয়ে না দিলেও তোমার ড্রাইভার নামিয়ে দেবে। সে একতলায় ড্রাইভারের ঘরে ঘুমুচ্ছে।

রবিন সিগারেট ধরতে ধারাতে বলল, তুমি যদি এখন চলে যাও আর কোনোদিন কিন্তু আমার এখানে আসতে পারবে না।

আসতে না পারলে আসব না।

রবিন বলল, আমি পাগলামী প্রশ্রয় দেই না।

সেতু বলল, পাগলামী প্রশ্রয় না দেয়াই ভালো। পাগলদের কাজকর্মের কোনো ঠিক নেই হঠাৎ দেখা গেল ঘুমের মধ্যেও তোমার মুখে আমি বালিশ চাপা দিলাম।

তুমি সত্যি সত্যি চলে যাবে?

হুঁ।

একটা ভালো সাজেশন দেই?

দাও।

যে-কোনো কারণেই হোক তোমার মন অস্থির হয়েছে। তুমি তোমার স্বামীর সঙ্গে টেলিফোনে কিছুক্ষণ কথা বলো। তারপরেও যদি বাসায় যেতে চাও আমি নিজে তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসব। It is a deal.

কিছুক্ষণ চিন্তা করে সেতু বলল, ঠিক আছে।

তুমি নিরিবিলি কথা বললো, আমি পাশের ঘরে যাচ্ছি।

তোমাকে পাশের ঘরে যেতে হবে না। আমি এমন কোনো কথা বলব না। যে তুমি শুনতে পারবে না। আমি রাধা না, আমার স্বামীও কৃষ্ণ না।

পাশের ঘরে যাচ্ছি কফি বানাতে। আমার কফি খেতে ইচ্ছা করছে। মনে হয় আমার জ্বর আসবে। জ্বর আসার আগে আগে আমার খুব কফির তৃষ্ণা হয়। ব্যাপারটা অদ্ভুত।

অনেকক্ষণ রিং বাজার পর হেদায়েত টেলিফোন ধরে ক্লান্ত গলায় বলল, কে সেতু?

হুঁ। ঘুমিয়ে পড়েছিলে?

হুঁ।

তোমার পাঠানো হাওয়াই মেঠাই খেয়েছি। খুব ভালো হয়েছে। এটা বলার জন্যে টেলিফোন করেছি।

ক্যান্ডিফ্লস তো আমি পাঠাই নি। তুমি গাড়ি করে নিয়ে গেছ।

একই কথা।

না একই কথা না। দুটা দুরকম কথা।

আচ্ছা ঠিক আছে দু’টা দু’রকম কথা। তোমার হাওয়াই মেঠাই খেতে। ভালো হয়েছে এটাই মূল বিষয়।

থ্যাংক য়্যু!

ঘুম কি ভালো হচ্ছে?

হুঁ।

যেভাবে হুঁ বললে তাতে মনে হচ্ছে ঘুম ভালো হচ্ছে না। দুঃস্বপ্ন দেখছ?

ঠিক দুঃস্বপ্ন না, মেয়েটাকে দেখছি।

কোন মেয়েটা? যে হাত ধরাধরি করে টানাটানি করে?

হুঁ। তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। প্রায়ই একটা মেয়েকে দেখি যে। বিছানায় আমার সঙ্গে ঘুমিয়ে থাকে।

কী সর্বনাশ!

সর্বনাশের কিছু না। সে ভালো মেয়ে। কিছুই করে না।

কথাও বলে না।

একটা দুটা কথা বলে।

মেয়েটা দেখতে কেমন?

সুন্দর।

সুন্দর তো বুঝলাম। দেখতে কার মতো?

আমার ক্লাসের একজন ছাত্রীর চেহারার সঙ্গে কিছু মিল আছে। রোল নাইনটিন।

মেয়েটা কি এখনও আছে?

এখন নেই। তুমি টেলিফোন করলে, টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে দেখি সে নেই।

তোমাকে তার নাম জিজ্ঞেস করতে বলেছিলাম। নাম জিজ্ঞেস করেছিলে?

না।

ঠিক আছে ঘুমাও।

আচ্ছা।

সেতু টেলিফোন নামিয়ে রাখতেই রবিন দু’মগ কফি হাতে ঘরে ঢুকল। সে সেতুর দিকে কফির মগ এগিয়ে দিল। সেতু মগ নিয়ে কফিতে চুমুক দিল।

রবিন বলল, বাসায় যাবার পরিকল্পনা কি এখনও আছে, না বাদ দিয়েছ?

বাদ দিয়েছি।

ভেরি গুড।

রবিন সিগারেট ধরিয়েছে। আরাম করে ধোয়া ছাড়ছে। সেতু বলল, আমাকে একটা সিগারেট দাও। রবিন আগ্রহের সঙ্গে সিগারেট এগিয়ে দিল। রবিন বলল, মেয়েরা সিগারেট খাচ্ছে এই দৃশ্যটা দেখতে আমার কেন জানি খুব ভালো লাগে।

সেতু বলল, এইজন্যেই তো খাচ্ছি। আমার মাথা ঘুরছে। বমি বমি লাগছে, তারপরেও টানছি।

রবিন বলল, সত্যি করে বলো তো সেতু, আমাকে কি তুমি ভালোবাস?

হুঁ।

হেদায়েত সাহেবের চেয়ে বেশি না কম?

সমান সমান।

অংক ঠিকমতো শিখতে পারলে আমার পাল্লা সামান্য ভারী হতো! ঠেক খেয়ে গেছি অংকে। আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি জানতে চাও?

না।

জানতে না চাইলেও শোন। আমার প্রায়ই ইচ্ছা করে প্রফেশনাল কোনো কিলারকে দিয়ে হেদায়েত সাহেবকে খুন করে ঝামেলা শেষ করে দেই। ভিলেন মঞ্চ থেকে প্রস্থান করবে, আমরা রূপকথার এল্ডিং এর মতো সুখে ঘর সংসার করতে থাকব।

তুমি কি সত্যি আমাকে বিয়ে করবে?

Yes, Yes এবং Yes, আমার কথা কি বিশ্বাস হচ্ছে?

বুঝতে পারছি না।

রবিন বলল, মানুষ মিথ্যা কথাগুলি সহজেই বিশ্বাস করে। সত্যিটা বিশ্বাস করতে চায় না। বল তো কার কথা?

জানি না কার কথা। যারই হোক কথা সত্যি না। তবে তুমি বিয়ে করতে চাইলে আমি তোমাকে বিয়ে করব। হেদায়েতকে সব জানিয়েই বিয়ে করব। সে পুরো বিষয়টা সহজভাবে নেবে। যে-কোনো জটিল বিষয় সহজ ভাবে গ্রহন করার ক্ষমতা তার আছে।

রবিন বলল, এমন কি হতে পারে যে জীবনের জটিলতা বুঝার ক্ষমতাই মানুষটার নেই?

হতে পারে। মানুষটা মানসিকভাবে অসুস্থ। তুমি তাকে সুস্থ করার ব্যবস্থা কর, তারপর তোমার সব কথা আমি শুনব। সিনেমা করতে বললে সিনেমা করব। সিগারেট খেতে বললে সিগারেট খাব। তোমার সামনে নেংটো হয়ে নাচানাচি করতে বললে নেংটো হয়ে নাচানাচি করব। Free pass, শুধু একটাই শর্ত।

রবিন বলল, আরেকটা সিগারেট ধরাও। তুমি অদ্ভুত করে ধোয়া ছাড়, দেখতে ভালো লাগে।

সেতু দ্বিতীয় সিগারেট ধরাল। ঠোঁট গোল করে ধোয়া ছাড়তে লাগল।

রবিন বললেন, তোমার স্বামীকে তোমাদের বাসার কেউ পছন্দ করেন না। তাদের কথাবার্তায় এ রকম মনে হলো।

সেতু বলল, কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। কথা বললে পছন্দ করত। তার বড়ভাই একজন আছেন। তিনিও ভালো মানুষ। তাঁর নাম বেলায়েত। সরি তার নাম মুখে নিলাম। ভাসুরের নাম মুখে নেয়া ঠিক না। এতে তাকে অপমান করা হয়।

তুমি এসব মান?

আমি খুবই খারাপ মেয়ে কিন্তু মানি।

বেলায়েত সাহেব কি তোমার হাসবেন্ডের মতো একসেনট্রিক?

জানি না।

তোমার মা ঐদিন খরগোশ খরগোশ বলছিলেন। বেলায়েত সাহেবকে কি খরগোশ ডাকা হয়।

আমাদের বাসায় ডাকা হয়।

কেন?

জানি না কেন। প্লিজ এই প্রসঙ্গ অফ।

ঠিক আছে অফ।

আমি উনাকে অত্যন্ত পছন্দ করি।

 

বেলায়েত জেগে আছে। রেস্টুরেন্টের হিসাব দেখছে। তাঁর সামনে পরিমল বাবু বসে আছেন। পরিমল বাবুর সামনে কাগজ কলম। হিসাব মেলানো হচ্ছে।

হঠাৎ পরিমল বাবু উঠে দাঁড়ালেন। বেলায়েত বলল, কী ব্যাপার?

পরিমল বাবু বললেন, আরো কিছুক্ষণ থাকলে আপনাকে অসম্মান করা হবে। এই জন্যে উঠে পড়লাম।

অসম্মান হবে কেন?

ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আপনার সামনে ঘুমানোর অর্থ আপনাকে অসম্মান করা।

যান ঘুমান।

পরিমল বাবু বেলায়েতের বাড়ির একতলায় একটা ঘরে থাকেন। নিজে বেঁধে খান। একা মানুষ। তার কোনো অসুবিধা হয় না। এই বাড়িতে তিনি সুখেই আছেন।

হেনা দরজা ধরে দাঁড়িয়েছে। বেলায়েত বলল, কিছু বলবে?

হেনা বলল, ঘুমাবে না?

হিসাব শেষ করে তারপর ঘুমাব।

বুড়াটাকে হিসাব করতে দাও। অনেক রাত হয়েছে।

বেলায়েত বলল, হোক রাত। হিসাব শেষ না করে উঠব না। আরেকটা কথা, পরিমল বাবুকে বুড়া বুড়া বলবে না। বৃদ্ধ হওয়া কোনো অপরাধ না। তুমি ঘুমাতে যাও।

হেনা গেল না। দরজা ধরেই দাঁড়িয়ে থাকল। বেলায়েত বলল, আর কিছু বলার বাকি আছে?

সেতুর বিষয়ে একটা কথা ছিল। অনেক আজেবাজে কথা তার বিষয়ে শুনা যাচ্ছে। মুখে বলা যায় না এমন সব কথা।

বেলায়েত বলল, মানুষের মধ্যে ভালো আছে মন্দ আছে। হেদায়েতের স্ত্রীর বিষয়ে ভালো কিছু যদি শুনে থাক সেটা বল আমি শুনব। মন্দটা শুনব না। ভালো কিছু শুনেছ?

না।

তাহলে ঘুমাতে যাও। আমার দেরি হবে। এমনও হতে পারে আজ রাতে ঘুমাবই না।

বেলায়েত হিসাবে মন দিল। তার কাছে মনে হচ্ছে হেদায়েত আশেপাশে থাকলে ভালো হতো, ফটাফট যোগ-বিয়োগ করে ফেলত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *