০৭. সন্ধ্যা এখনো হয় নি

সন্ধ্যা এখনো হয় নি

সন্ধ্যা এখনো হয় নি। কিন্তু ঘরের ভেতর অন্ধকার। দরজা-জানালা বন্ধ। ভেতরে বাতি জ্বালানো হয় নি। বাতাস ভারি হয়ে আছে। বাতাসে সিগারেটের কটু গন্ধ। সিগারেটের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে বমির গন্ধ। খালি পেটে হুইঙ্কি খাওয়ার ফল ফলেছে–সাখাওয়াত বমি করে ঘর ভাসিয়েছে। সাখাওয়াতের মদ্যপানের অভ্যাস নেই। গত কয়েক দিন খুব খাচ্ছে–আজ বেশি খেয়ে ফেলেছে। বমি করেও তার উৎসাহ কমে নি–হানড্রেড পাইপারের বোতল উঁচু করে বলল, আর মাত্র তিন আঙ্গুল আছে। আয় সবাই এক আঙ্গুল করে খেয়ে বোতল ফেলে দিই।

রকিব জবাব দিল না। সিগারেট ধরাল। তার প্যাকেটের শেষ সিগারেট। ঘরে আর কারো কাছেই সিগারেট নেই। রাত ন’টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কয়েক প্যাকেট সিগারেট এনে রাখা দরকার ছিল। এখন ঘর থেকে বের হয়ে সিগারেট আনা ঠিক হবে না। রাত ন’টায় এক সঙ্গে বের হতে হবে।

সাখাওয়াত চারটা গ্রাসে হুইঙ্কি ঢালছে। মাপমতো ঢালার চেষ্টা করছে। তার হাত কাঁপছে। বদরুল বলল, এই সাখাওয়াত তোর মুখে বমি লেগে আছে। মুখ ধুয়ে আয় না!

সাখাওয়াত হাসিমুখে বলল, আর মুখ ধোয়াধুয়ি। আগে মাল খেয়ে নি।

রকিব বলল, তিন গ্লাসে ঢাল। আমি খাব না।

খাবি না কেন?

তোর কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে? খেতে ইচ্ছা করছে না, খাব না।

শালা তোর বাপ খাবে।

রকিব ক্রুদ্ধচোখে তাকাল। তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেছে। সাখাওয়াত ভীত গলায় বলল, এ রকম করে তাকাচ্ছিস কেন?

রকিব বলল, বাপ তুলে আর যদি কথা বলিস তোর নিজের বমি তোকে চেটে খাইয়ে দেব।

ঠাট্টা করছিলাম রে দোস্ত। থাক তোর খেতে হবে না–তোরটা আমি খাব। এই দেখ খাচ্ছি।

রকিব মুখ ফিরিয়ে সিগারেট টানছে। ঘড়িতে মাত্র ছাঁটা বাজে। ন’টা বাজতে এখনো তিন ঘণ্টা। এই দীর্ঘ সময় শুধু শুধু বসে থাকতে হবে ভাবতেই তার মাথা ধরে যাচ্ছে। তার ওপর সিগারেট শেষ হয়ে গেছে।

ঘরের এক কোণায় বিড়ি ব্যবসায়ী হাজি মুসাদেক পাটোয়ারী বসে আছেন। তার হাত পেছন দিক করে বাধা। তিনি ভয়ে অস্থির হয়ে আছেন। যদিও এখন তার ভয় থাকার কথা না। তার পরিবার থেকে তিন লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। রাত ন’টার সময় তাকে একটা বেবিট্যাক্সিতে তুলে দেয়া হবে। সেই বেবিট্যাক্সি নিয়ে তিনি যেখানে ইচ্ছা! সেখানে যেতে পারেন।

হাজি মুসাদেক পাটোয়ারী বিড়বিড় করে বললেন, বাবা আপনাদের দয়ার কথা কোনোদিন ভুলব না। আমি খাস দিলে আপনাদের জন্য দেয়া করি।

হাজি সাহেব কথাগুলো আন্তরিকভাবেই বললেন। তিনি বেঁচে আছেন এবং তাকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে এই আনন্দেই তিনি অভিভূত।

বাবারা একটা কথা।

মোজাম্মেল কঠিন গলায় বলল, অকারণে কথা বলবেন না। চুপচাপ থাকেন। ন’টা বাজুক ছেড়ে দিব।

বাবারা একটু পিশাব করব।

পিশাব ন’টার পরে করবেন। বাড়িতে গিয়ে আরাম করে পিশাব করবেন। কমোডে বসে করবেন।

জ্বি আচ্ছা।

সাখাওয়াত বলল, হাজি সাহেবকে একটু মাল খাইয়ে দিব? আমি আর খেতে পারছি না।

কেউ কোনো জবাব দিল না। সাখাওয়াত উৎসাহের সঙ্গে বলল, কি হাজি সাহেব, হুইঙ্কি খাবেন?

বাবারা আপনারা বললে অবশ্যই খাব।

সাখাওয়াত আনন্দিত স্বরে বলল, হাজি সাহেব হুইস্কি খেতে চায়।

রকিব বলল, সাখাওয়াত তুই বাড়াবাড়ি করছিস।

সাখাওয়াত সাথে সাথে বলল, ঠাট্টা করছি রে দোস্ত। আমি কি আর সত্যি খাওয়াতাম! তোরা আমাকে ভাবিস কী?

ছড় ছড় শব্দ হচ্ছে।

সবাই হাজি সাহেবের দিকে তাকাল। হাজি সাহেব বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, পিশাব হয়ে গেছে। বাবারা। বয়স হয়েছে, ডায়াবেটিস আছে। বাবারা কিছু মনে করবেন না। আপনাদের দয়ার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। আমি খাস দিলে আপনাদের জন্যে দোয়া করি।

ঘ্যানঘ্যান করবেন না। চুপ থাকেন।

বাবারা একটু পানি খাব।

রকিব বলল, সাখাওয়াত দেখ তো পানি আছে কি না।

সাখাওয়াত অপ্ৰসন্ন মুখে উঠে দাঁড়াল। এটা সাখাওয়াতের বোনের বাড়ি। বোন মিডল ইষ্টে তার স্বামীর কাছে গিয়েছে। বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সাখাওয়াতের কাছে দেয়া। মাঝে মধ্যে সাখাওয়াত বন্ধুদের নিয়ে আসর বসােত। নিরিবিলিতে বাড়ি। রাতভর হইচই করে আডডা দিলেও কেউ কিছু বুঝবে না। দুদিন দু রাত হাজি সাহেবকে এ বাড়িতে রাখা হয়েছে। তাকে ছেড়ে দিলেও তিনি এই বাড়ি চিনে বের করতে পারবে না। তাকে আনা হয়েছে গভীর রাতে–কম্বল দিয়ে মুড়ে। তাকে ছাড়াও হবে এই ভাবে। সাখাওয়াত পানির বোতল এনে দিল। রকিব বলল, গ্লাস দে। হাত বাধা, পানি খাবে কীভাবে? হাতের বাঁধন খুলে দে।

হাজি সাহেব অনবরত নিচু গলায় বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। সাখাওয়াত বলল, বিড়বিড় করে কী বলেন?

বাবারা দুরুদ শরিফ পড়তেছি। আপনাদের ডিসটার্ব হলে পড়ব না।

পাকসাফ হয়ে দুরুদ পড়বেন। পেশাব করে ঘর ভাসিয়ে দুরুদ শরীফ।

বাবারা আমি খুবই শরমিন্দা। আমি পায়ে ধরে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই।

হাজি সাহেব রকিবের পায়ে ধরার জন্যে এগোলেন। রকিব কঠিন গলায় বলল, যেখানে বসে আছেন বসে থাকুন। খবরদার নড়বেন না।

জ্বি আচ্ছা বাবা।

সাখাওয়াত বাঁধন খুলতে পারছে না। সাহায্য করার জন্য বদরুল এগিয়ে গেল। সে বিরক্ত গলায় বলল, হাজি সাহেবর গা তো পুড়ে যাচ্ছে। হাজি সাহেব বললেন, সামান্য জ্বর হয়েছে বাবারা। বাড়িতে গেলে ইনশাল্লাহ আরোগ্য হব।

পুলিশের কাছে বা অন্য কারো কাছে আমাদের নাম বলবেন না তো?

জ্বি না বাবারা। পাক কোরআনের দোহাই, নবীজীর দোহাই, কাউরে কিছু বলব না। কোরআন মজিদ নিয়া আসেন কোরআন মজিদে হাত রেখে প্ৰতিজ্ঞা করব।

রকিব ঘড়ি দেখল। ছটা পয়ত্রিশ। মাত্র পয়ত্ৰিশ মিনিট পার হয়েছে। আরো দুই ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট পার করতে হবে। সর্বনাশ! এত সময় পার করবে। কীভাবে। সাখাওয়াত বলল, দোস্ত সিগারেট দে।

সিগারেট নাই।

সর্বনাশ! সিাগরেট ছাড়া চলবে কীভাবে? প্যাকেট খুলে দেখ না ফাঁকেফুকে থাকতেও পারে।

সাখাওয়াত তুই কথা বেশি বলছিস। চুপ থাক।

তুই ঝিম ধরে বসে আছিস কেন? তোর কী হয়েছে?

চুপ থাক।

শালা তুই চুপ থাক।

রকিব উঠে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড চড় কষাল। সাখাওয়াত উল্টে পড়ল তার নিজের বমিতে।

হাজি সাহেব বিড়বিড় করে আবারো দুরুদ শরীফ পড়ছেন। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। এরা কি তাকে সত্যি ছাড়বে?

রাত ন’টায় হাজি সাহেবকে বেবিট্যাক্সিতে তুলে দেয়া হলো। তিনি বসেছেন মাঝখানে, একপাশে বদরুল অন্য পাশে সাখাওয়াত। বদরুল হাজি সাহেবের মাথা চেপে ধরে আছে। যাতে তিনি কিছু দেখতে না পান। তারা কিছুদূর গিয়ে নেমে পড়বে। হাজি সাহেব এক এক যাবেন। হাজি সাহেব বিড়বিড় করে আবারো বললেন, বাবারা আপনাদের দয়ার কথা কোনোদিন ভুলব না। আমি আপনাদের জন্যে খাস দিলে দোয়া করি।

রকিব এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট কিনল। চমানবাহার দেয়া মিষ্টি পান কিনল এক খিলি।

তিন লাখ টাকার ভাগাভাগিতে তার অংশে পড়েছে এক লাখ তিরিশ। সে আরো বেশি নিতে পারত, নেয় নি। এক লাখ টাকা আলাদা করে রাখতে হবে। কিছুদিনের জন্যে গা ঢাকা দেয়াও দরকার। পাসপোর্ট করে ইন্ডিয়া ঘুরে এলে হয়। তিন হাজার টাকা ফিস দিলে চব্বিশ ঘণ্টায় পাসপোর্ট হয়। ইন্ডিয়ায় দেখার অনেক কিছু আছে। কোনারকের সূর্যমন্দিরটা নাকি দেখার মতো। কোনারক কোথায় কে জানে? খোঁজ নিতে হবে। পাসপোর্ট করতে ছবি লাগে। ছবিটা আজকে তুলে ফেললে কাল পাসপোর্টের টাকা জমা দেয়া যায়। এত রাতে কি কোনো স্টুডিও খোলা আছে? আছে নিশ্চয়ই। রাত ন’টা এমন কিছু রাত না। রকিব স্টুডিওর খোজে রওনা হলো। আকাশ পরিষ্কার। চাঁদ উঠেছে। সুন্দর জোছনা। জোছনায় হাঁটতে রকিবের বেশ ভালো লাগছে। নতুন প্যাকেট খুলে সিগারেট ধরাল। নতুন প্যাকেটের প্রথম সিগারেটের স্বাদ আলাদা।

ক্ষিধে লেগেছে। প্ৰচণ্ড ক্ষিধের সময় সিগারেট ধরালে ধোয়াটা চট করে মাথায় গিয়ে লাগে। এখনো তাই হচ্ছে। ক্ষিধের দোষ নেই–দুপুরে কিছু খাওয়া হয় নি। শিঙাড়াবাদাম, এখন বাজে রাত সাড়ে ন’টা, ক্ষিধের দোষ কী? কোনো একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকে চাইনিজ ফাইনিজ খেয়ে নিলে হয়। রেস্টুরেন্টে একা খেতে ইচ্ছে করে না। রেক্টরেন্টে একা খেতে যাবার অর্থ–এই মানুষটার সংসার নেই, বন্ধুবান্ধব নেই। বয় বেয়ারার চোখে করুণা চলে আসে। সে করুণার ধার ধারে না।

বাসায় চলে গেলে কেমন হয়। বাসায় সবাই সকাল সকাল খেয়ে ফেলে। ভাত তরকারি কিছুই হয়তো নেই। তাতে কী, রীনা ভাবি চোখের নিমিষে চাল ফুটিয়ে একটা ডিম ভেজে দেবে। ভাপ ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে ডিমভাজা–এই তো যথেষ্ট। রীনা ভাবির কাছ থেকে টাকাটা নেয়া হয়েছিল, টাকাটা ফেরত দেয়া দরকার। টগর এবং পলাশের জন্য কিছু গিফটও কেনা দরকার। খেলনার দোকান কি খোলা আছে? গরমের সময় রাত দশটা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকার কথা। টগর এবং পলাশের পছন্দের খেলনা একটাই’বল’। যখনই জিজ্ঞেস করা হয়–কী খেলনা চাই ওরা বলবে, ‘বল’। সে নিজেই ওদের চার-পাঁচটা ‘বল’ দিয়েছে। ঠিক আছে–পুরনো বলের সঙ্গে যুক্ত হোক আরো দুটা ‘বল’। বলে বলে ধুলপরিমাণ।

রকিব দুটা ‘বল’ কিনল।

দোকানদার বলল, স্যার রঙ পেন্সিল কিনবেন? চাইনিজ পেন্সিলের সেট আছে, দাম খুব সস্তা, আশি টাকা করে।

রকিব দুই সেট পেন্সিলও কিনে ফেলল। সুন্দর সুন্দর কলম বিক্রি হচ্ছে। দেখে মনে হয়। ফাউন্টেন পেন, খুললে দেখা যায় বল পয়েন্ট। কালির কলম বোধহয় পৃথিবী থেকে উঠে যাচ্ছে। একবার রীনা ভাবি বলছিল–কালির কলমে লিখতে তার সবচে’ ভালো লাগে। একটা কালির কলম কিনে ফেললে হয়। রকিব দেখে শুনে কালির কলমও একটা কিনল। দাম বেশি নিল না পাঁচ শ টাকা। নিক রীনা ভাবিকে কখনো কোনো গিফট দেয়া হয় না।

সবার জন্যে একটা করে গিফট কিনলে কেমন হয়? কত আর টাকা লাগবে? দোকানটা ছোট। সবার পছন্দসই জিনিস। এখানে পাওয়া যাবে না। গুলশানের দিকে গেলে হয়। গুলশানের দোকানগুলো জিনিসপত্রে ঠাসা থাকে। লায়লার জন্যে একটা ঘড়ি কিনতে হবে। লায়লার হাতঘড়ি চুরি হয়ে গেছে আর কেনা হয় নি।

রকিব দোকান থেকে বেরোল। তার কেমন যেন মাথা ঘুরছে। শরীর মনে হয় ভেঙে আসছে। সাততলা দালানে দ্রুত উঠে এলে যেমন লাগে তেমন লাগছে, অথচ আজ সে কোনো পরিশ্রমই করে নি। বলতে গেলে সারাদিনই সাখাওয়াতের বোনের বাসায় বসা। রকিব রিকশা নিল। বাসায় যাবার পরিকল্পনা বাদ দিল। তার মুখ দিয়ে নিশ্চয়ই ভক ভক করে গন্ধ বেরোচ্ছে। ভাড়া ঠিক করার সময় রিকশাওয়ালা অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছিল। কথাও বলছিল উঁচু গলায়। মাতালদের সঙ্গে মানুষ সব সময় উঁচু গলায় কথা বলে। সবাই ধরেই নেয় নিচু গলায় কিছু বললে মাতালরা শুনতে পায় না।

সে মাতাল না। তার মাথা ঠিক আছে। খুব ঠিক আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *