০৭. মাওলানা সাহেবের স্ত্রী আফিয়া

মাওলানা সাহেবের স্ত্রী আফিয়ার ৩৫ সপ্তাহ মাত্র চলছে। শিশু চল্লিশ সপ্তাহ মায়ের পেটে থেকে বড় হবে। এই চল্লিশ সপ্তাহ সে তার জগতে নিজের মত বড় হবে। সব শেষে তৈরী হবে তার ফুসফুস। ফুসফুস তৈরী হয়ে যাবার পর শিশু সিগন্যাল পাঠাবে মায়ের শরীরে—আমি এখন তৈরি। পৃথিবী দেখব। আমাকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দাও। মায়ের শরীর ব্যবস্থা নেবেন।

এখানে কোনো একটা সমস্যা হচ্ছে। সময়ের আগেই শিশু বন্দিদশা থেকে মুক্তি চাচ্ছে। আফিয়া বলল, পানি ভাঙছে। পানি।

মাওলানা বললেন, আল্লাহর নাম নাও।

আফিয়া বলল, ডাক্তার লাগবে ডাক্তার।

মাওলানা বললেন, আমি খোঁজ নিয়েছি ট্রেনে লেডি ডাক্তার নেই।

আমি মরে যাব না-কি?

আহারে চিৎকার করছ কেন। মেয়েদের গলার স্বর বাইরের পুরুষের শোনা ঠিক না। পর্দার বরখেলাফ হয়।

আফিয়া গোংগাতে গোংগাতে বলল, মরে গেলাম। আমি মরে গেলাম। মাগো আমি মরে গেলাম।

মাওলানা বিরক্ত গলায় বললেন, আল্লাহর নাম নাও, মা মা করছ কেন? এখানে যা করার আল্লাহপাক করবেন। তোমার মা কি করবেন?

আপনি সামনে থেকে যান। কোনো একজন মহিলাকে ডাকেন। যে কোনো মহিলা। আমার সন্তান বের হয়ে আসতেছে। আমি বুঝতেছি। মাগো তুমি কোথায় মা।

মাওলানা দরজা খুলে বের হয়েই দেখলেন দরজার বাইরে চিত্রা এবং রশীদ সাহেব। মাওলানা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিত্রাকে বললেন, আপনি কি একটু ভেতরে যাবেন?

চিত্রা বলল, আমি ভেতরে গিয়ে কি করব? উনার দরকার একজন ডাক্তার। আমাদের সঙ্গে ডাক্তার আছে। উনাকে ডেকে নিয়ে আসি?

মাওলানা বললেন, পুরুষ ডাক্তার আমি দেখাব না। অসম্ভব। কোনদিনও না।

চিত্রা বলল, আমি ভেতরে যাচ্ছি। বোকার মতো বসে থাকা ছাড়া আমি কিছু করতে পারব না।

চিত্রা ঢুকে গেল। রশীদ উদ্দিন সিগারেটের প্যাকেট বের করে বললেন, সিগারেট খাবেন। এতে টেনশান কিছু কমবে। নিকোটিনের নার্ভ সুদিং ক্ষমতা আছে।

আমি ধুমপান করি না।

গুড। ভেরি গুড। আমি আপনার দুই মিনিট সময় নিতে পারি? দুই মিনিটে আমি আপনাকে একটা গল্প বলব। গল্প শেষ করে আমি চলে যাব। আপনাকে আর বিরক্ত করব না। আমার হাত থেকে বাঁচার জন্যে আপনি আমাকে দুই মিনিট সময় দিন।

মাওলানা কঠিন গলায় বললেন, আপনাকে দুই মিনিট সময় দিলাম।

রশীদ সাহেব গল্প শুরু করলেন, দেশে একবার বন্যা শুরু হয়েছে। ঘরবাড়ি সব ড়ুবে যাচ্ছে। উদ্ধারকারী লোকজন নৌকা নিয়ে এসেছে। সবাই নৌকায় উঠে আশ্রয় কেন্দ্রে চলে গেলেন। এক মাওলানা শুধু গেলেন না। উনি আল্লাহ ভক্ত মানুষ। উনি বললেন আল্লাহর উপর আমার ভরসা। আল্লাহপাক ব্যবস্থা করবেন।

বন্যার পানি ঘরের চাল পর্যন্ত উঠল। মাওলানা চালে উঠে বসলেন। তখন উদ্ধারকারী লঞ্চ এল। মাওলানা লঞ্চে উঠলেন না। উনার এক কথা, আল্লাহপাক ব্যবস্থা করবেন। বন্যার পানি আরো বাড়ল। মাওলানার বুক পর্যন্ত উঠল। এল উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। মাওলানা তাতেও উঠলেন না। হেলিকপ্টার ফিরে গেল।

পানিতে ড়ুবে মাওলানা মারা গেলেন। মৃত্যুর পর আল্লাহকে গভীর আফসোসের সঙ্গে বললেন, আমি সারাজীবন একনিষ্ঠভাবে আপনাকে ডেকেছি আপনার উপর ভরসা করেছি আর আজ আমাকে কিনা ড়ুবে মরতে হল। কোনো সাহায্য আপনার কাছ থেকে এল না।

আল্লাহ বললেন, তোমাকে সাহায্য করার জন্যে আমি তিনবার ব্যবস্থা নিয়েছি। একবার নৌকা পাঠানো হয়েছে। তারপর গেল লঞ্চ। সর্বশেষে হেলিকপ্টারও পাঠালাম। বল আর কি করতে পারতাম?

আমার গল্প শেষ। আমি এখন বিদায় নেব।

মাওলানা বললেন, আপনার গল্পটা সুন্দর। গল্প কিন্তু গল্পই। আল্লাহপাক ইচ্ছা করলেই বন্যার পানি নামিয়ে দিতে পারতেন।

রশীদ উদ্দিন বললেন, তা অবশ্যই পারতেন। তিনি আপনার সন্তানের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারেন কিন্তু মাওলানা সাহেব আপনি কি একটা হাদিস জানেন? এই হাদিস অনুযায়ী আল্লাহপাক বলেছেন, তুমি যখন রোগগ্রস্ত হবে তখন একজন ভাল চিকিৎসকের কাছে যাবে সেই সঙ্গে রোগমুক্তির প্রার্থনা করবে।

মাওলানা বললেন, আমি এই হাদিসের কথা জানি না।

রশীদ উদ্দিন বললেন, আমি জানি। আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন। আমার প্রাথমিক পড়াশোনা মাদ্রাসায়। আপনি আমার কথা শুনুন, আমি ডাক্তার ছেলেটিকে ডাকি। সে আপনার স্ত্রীকে মা সম্বোধন করে কামরায় ঢুকুক।

মা ডাকলেই মা হয় না।

রশীদ উদ্দিন বললেন, তাও ঠিক। কোরান শরীফেই আছে পালক পুত্র পুত্র নয়। তারপরেও এই ডাক্তারের কল্যাণে হয়ত আপনার সন্তান। তার মাকে মা ডাকবে। জগতের মধুরতম শব্দ আপনার স্ত্রী শুনবে।

মাওলানা বললেন, ঐ ডাক্তার ছেলে গলাপর্যন্ত মদ খেয়েছে। তার মুখ দিয়ে ভক ভক করে মদের গন্ধ, আসছে। ঐ গন্ধ আমি চিনি। কিছু মনে করবেন না জনাব আপনিও মদ খেয়েছেন।

রশীদ উদ্দিন হতাশ গলায় বললেন, কথা সত্য। মদ খাওয়ায় ডাক্তারের শরীর এবং মন হয়ত অশুচি হয়েছে। তার বিদ্যা কিন্তু হয় নি।

রশীদ উদ্দিনের কথা শেষ হবার আগেই চিত্রা কামরা থেকে বের হল। উত্তেজিত গলায় বলল, ডাক্তার কোথায়? বাচ্চা বের হচ্ছে। মাথা বের হচ্ছে।

চিত্রা ছুটে চলে গেল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হতভম্ব মাওলানার সামনেই ডাক্তারের হাত ধরে টানতে টানতে কেবিনে ঢুকে গেল।

মাওলানা বললেন, কাজটা কি ঠিক হয়েছে?

রশীদ সাহেব বললেন, যদি আমার মতামত জানতে চান তাহলে বলব কাজ উত্তম হয়েছে। এখন আপনি নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহপাককে ডাকতে পারেন।

 

চিত্রা ভয়ে কাঁদছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। আশহাব বলল, আপনি ঘাবড়াবেন না। মহিলার হাত ধরুন। ডেলিভারি নরম্যাল হবে। আমার ফুটন্ত পানি দরকার। ব্লেড দরকার, সূতা দরকার।

ব্লেড দিয়ে কি করবেন?

বাচ্চার নাড়ি কাটতে হবে না।

আফিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আপনি কি ডাক্তার?

আশহাব বলল, আমি ডাক্তার, এবং খুব ভাল ডাক্তার। গাইনি আমার বিষয় না, তারপরেও কোনো সমস্যা নেই। আপনাকে যা করতে বলব করবেন আমাকে সাহায্য করবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় চাপ আসবে তার জন্যে প্রস্তুত হোন। যখন নিঃশ্বাস চেপে রাখতে বলব তখন নিঃশ্বাস চাপবেন।

আফিয়া গোংগাতে গোংগাতে বলল, আমি পারব না। আমি পারব না।

 

রশীদ সাহেব মাওলানাকে বললেন, আপনি কি একটা ম্যাজিক দেখবেন?

হতভম্ব মাওলানা বললেন, ম্যাজিক?

পয়সা অদৃশ্য করার খেলা দেখাব। মজা পাবেন।

আপনার কি মাথা টাথা খারাপ এখন ম্যাজিক দেখাবেন?

মূল ম্যাজিক আল্লাহপাক কিছুক্ষণের মধ্যে দেখাবেন এখন আমারটা দেখুন। আমার ডান হাতে কি? পাঁচ টাকার একটা কয়েন না। কয়েনটা এখন নিলাম বাম হাতে। এখন দেখুন বাম হাত শূন্য। ডান হাতও শূন্য। বলুন কয়েনটা কোথায়?

জাহান্নামে।

খারাপ বলেন নি। From here to etenity.

চিত্রা দরজা খুলে বলল, ফুটন্ত পানি লাগবে, ব্লেড লাগবে, সূতা লাগবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেলিভারি হবে।

মাওলানা তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে চিত্রার কথা বুঝতে পারছে না। চিত্রা তাঁকে কঠিন ধমক দিল, হাদার মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ব্যবস্থা করুন।

 

সেলুন কারে বাতি জ্বলা নেভার খেলা চলছে। এই বাতি জ্বলছে এই নেই। সেলুন কারের যাত্রীরা আতংকে অস্থির। সবচেয়ে ভয় পেয়েছে যমুনা এবং তার স্বামী। যতবার বাতি নিভছে ততবার সে আতংকে অস্থির হয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরছে। ভয় সংক্রামক। যমুনার আতংক ছড়িয়ে পড়েছে সবার মধ্যে। বদরুলের কর্মকাণ্ডও সবাইকে ঘাবড়ে দিচ্ছে। তার মেন্টাল ব্রেক ডাউনের মত হয়েছে। সে যেসব কথাবার্তা বলছে তার কোনো অর্থই বুঝা যাচ্ছে না তবে মাঝে মাঝে যখন বলছে— মেরে ফেলবে। সবাইকে মেরে ফেলবে তখন সবাই আঁৎকে উঠছে। মেরে ফেলবে বাক্যের অর্থ না বুঝার কিছু না। খায়ের সাহেবের মন্ত্রীত্ব নেই এই খবর এখন সবাই জানে। মূল আতংক এখানেই।

খায়ের সাহেব পূর্ত প্রতিমন্ত্রী হেলাল উদ্দিনকে টেলিফোন করছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হেলাল টেলিফোন ধরেছেন এবং ধরেই বলেছেন, আপনার ব্যাপারটা শুনেছি। ভেরি স্যাড। দলের মধ্যে কান ভাঙানির লোক হয়েছে বেশি এরাই কাজটা করেছে। আপনি একজন সিনসিয়ার ওয়ার্কার। দলের জন্যে আপনার সেক্রিফাইস আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সবাই একদিন ভুল বুঝতে পারবে।

আবুল খায়ের সাহেব বললেন, আমি এখন এক বিপদে আছি। তুমি কাউকে বলে কিছু করতে পারবে?

হেলাল উদ্দিন বললেন, কি বিপদ?

আবুল খায়ের বিপদটা মোটামুটি গুছিয়েই বললেন। বাতি জ্বালানো নিভানো অংশও বাদ দিলেন না।

হেলাল উদ্দিন বললেন, কি সর্বনাশ। এদের এটিচুডতে মোটেই ভাল মনে হচ্ছে না।

আবুল খায়ের বললেন, আমারো ভাল মনে হচ্ছে না।

হেলাল উদ্দিন বললেন, আপনাদেরটা কি সব শেষের কামরা?

হ্যাঁ।

বলেন কি। আরো বিপদ।

আরো বিপদ কেন?

হেলাল উদ্দিন বললেন, বদগুলা বগিটা খুলে দিতে পারে। মূল ট্রেন থেকে আলাদা করে দিতে পারে। পরে যখন ইনভেসটিগেসন হবে তখন বলবে একসিডেন্ট। আপনা আপনি খুলে গেছে।

তুমি তো আরো ভয় ধরিয়ে দিলে।

খায়ের ভাই এটাই বাস্তবতা।

এখন করব কি বল।

ঐ পার্টির কাউকে টাকা পয়সা দিয়ে হাত করতে হবে। বিপদ থেকে উদ্ধারের একটাই পথ।

তুমি রেলের কাউকে কিছু বলতে পার না?

আচ্ছা দেখি। কি করতে পারি আপনাকে জানাব।

দশ মিনিট পর আমি টেলিফোন করি?

হেলাল উদ্দিন বললেন, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি জানাব।

আবুল খায়ের সাহেব চাপা নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি নিশ্চিত হেলাল উদ্দিন আর টেলিফোন করবে না। নিজের মোবাইলও অফ করে রেখে দেবে। হেলালকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তিনি নিজে অসংখ্যবার এই কাজ করেছেন। অন্যদের করতে দোষ কি? মহা বিপদে পড়ে কতবার লোকজন তাকে টেলিফোন করেছে তিনি বলেছেন, দেখি কি করা যায়। কিছু করতে পারলে জানাব আমাকে টেলিফোন করার দরকার নেই। বলেই লাইন কেটে দিয়েছেন।

ব্যান্ডদলের পরিচালকের নাম কাউসার। সে নিজের নাম লেখে ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে—Cowসার। নামের অর্থ জিজ্ঞেস করলে বলে গরুর সার অর্থাৎ গোবর। Cowসার ডাকতে যদি সমস্যা হয় আমাকে গোবর ডাকতে পারেন, গোবর ভাইয়া ডাকতে পারেন কোনো অসুবিধা নেই।

কাউসারের রসবোধে তার ব্যান্ডের লোক যেমন মোহিত, বাইরের লোকজনও মোহিত। এই মুহূর্তে তার মধ্যে রসবোধের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সে ঘন ঘন বাথরুমে যাচ্ছে। টেনশানে তার পেট নেমে গেছে। কাউসার আবুল খায়েরের দিকে এগিয়ে এল। খায়ের সাহেব বললেন, কিছু বলবে?

কাউসার বলল, বিনাকারণে আমরা ক্যাচালের মধ্যে পড়েছি। আমরা ঠিক করেছি সামনের স্টেশনে নেমে যাব। সঙ্গে অনেক টাকার ইনস্ট্রমেন্ট। নষ্ট হলে পথে বসব।

খায়ের সাহেব বললেন, সামনের ষ্টেশনে নামবে কি ভাবে? ট্রেন তো আর কোথাও থামবে না। ময়মনসিংহ থামবে।

তাহলে স্যার আমরা চেইন টেনে ট্রেন থামায়ে নেমে পড়ব।

জঙ্গলের মধ্যে কোথায় নামবে? ভাওয়ালের জঙ্গল।

কাউসার বলল, ভাওয়ালের জঙ্গলেই নামব। আপনি তো এখন কোনো প্রটেকশান দিতে পারবেন না। কোন ভরসায় থাকব?

যমুনার স্বামী ফয়সল বলল, আমি কাউসার সাহেবের সঙ্গে একমত। আমার মতে আমাদের সবারই নেমে যাওয়া উচিত।

খায়ের সাহেব বললেন, জঙ্গলে নেমে যে আরো বড় বিপদে পড়বে না কে বলল?

সুরমা রাগী গলায় বললেন, বোকার মতো কথা বলবে না। জঙ্গলে কিসের বিপদ? জঙ্গলে কি সিংহ আছে যে আমাদের খেয়ে ফেলবে?

কাউসার বলল, তাহলে ডিসিসান কি হল? আমরা চেইন টেনে ট্রেন থামাব?

খায়ের সাহেব কিছু বলার আগেই ফয়সল বলল, অবশ্যই। এখন দেখা যাবে চেইন টেনেও ট্রেন থামানো যাবে না। টানতে টানতে চেইন ছিঁড়ে ফেললাম ট্রেইন থামল না।

ফয়সলের কথা শেষ হবার আগেই বাতি আবার নিভে গেল। কাউসার চেইন ধরে ঝুলে পড়ল।

ঝাঁকুনি খেতে খেতে ট্রেন থেমে গেল। অস্বাভাবিক দক্ষতায় কাউসার দলবল নিয়ে নেমে পড়ল। ফয়সল নামল যমুনাকে নিয়ে। সুরমা স্বামীর হাত ধরে কিছুক্ষণ টানাটানি করে নিজেও ঝাপ দিয়ে পড়ে পা মচকে ফেললেন।

ট্রেনের ভিতর ছোটাছুটি ব্যস্ততা। অনেকেই চিৎকার করছে ডাকাত ডাকাত। রেল পুলিশ ঘন ঘন হুইসেল দিচ্ছে। ট্রেনের কয়েকটা কামরা থেকে টর্চের আলো দুপাশের জঙ্গলে ফেলা হচ্ছে। একদল যাত্রী চেঁচাচ্ছে ঐ যে জঙ্গলে ঢুকে। জঙ্গলে ঢুকে। মেয়েছেলে নিয়ে পালায়ে যাচ্ছে। রেল পুলিশ দুবার রাইফেলে ফাঁকা আওয়াজ করল।

 

রেল পুলিশের রাইফেলের গুলির আওয়াজের সঙ্গে নবজাত শিশুর কান্না মিশল। আশহাব বাচ্চাটাকে পা ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। বাচ্চা একেকবার ফুসফুস ভর্তি করে বাতাস নিচ্ছে এবং চিৎকার করে কাঁদছে। অসময়ে চলে এলেও এই শিশু প্রাণশক্তিতে ভরপুর। সে তার উপস্থিতি সবাইকে জানান দেবেই।

চিত্রা বলল, ছেলে না মেয়ে?

আশহাব বলল, ছেলেই হোক মেয়েই হোক একটি শয়তানই যথেষ্ট।

আহা বলুন না। ছেলে না মেয়ে?

আশহাব বলল, মেয়ে হয়েছে।

চিত্রা দরজা খুলে বের হল আনন্দে সে ঝলমল করছে। মনে হল সে তার জীবনের সবচে আনন্দের সংবাদটা দিচ্ছে।

মাওলানা সাহেব! আপনার একটা পরীর মতো সুন্দর মেয়ে হয়েছে।

মাওলানা কিছু বলার আগেই রশীদ উদ্দিন বললেন, অতি সুসংবাদ। নবী এ করিম বলেছেন যার প্রথম সন্তান কন্যা সে মহা সৌভাগ্যভান। আজান দেয়া প্রয়োজন। মেয়েটার কানে আল্লাহর নাম ঢুকুক।

মাওলানা বললেন, মেয়েটার চেহারা দেখে তারপর আজান দেই?

রশীদ উদ্দিন বললেন, আগে আজান তারপর চেহারা।

মাওলানা আজান দিলেন।

আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার…

শিশুটিকে শাড়ি দিয়ে জড়িয়ে মায়ের বুকের কাছে দেয়া হয়েছে। মা এই হাসছেন, এই কাঁদছেন। হঠাৎ তিনি চমকে উঠে বললেন, ডাক্তার আপনি না বললেন মেয়ে। এতো ছেলে।

আশহাব হাসতে হাসতে বলল, একটু ঠাট্টা করলাম।

ছেলের মা আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসে বললেন, ডাক্তার তুমি এত দুষ্ট কেন?

মাওলানাকে আসল খবর দেয়ার পর তিনি আনন্দে অভিভূত হয়ে রশীদ উদ্দিনকে জড়িয়ে ধরলেন। মনে হচ্ছে কন্যা সন্তানের আনা ভাগ্যের তাঁর প্রয়োজন নেই। তার জন্যে ছেলেই যথেষ্ট।

 

ট্রেন চলতে শুরু করেছে। সেলুন কারে বাতি এসেছে। আবুল খায়ের সাহেব একা বসে আছেন। তাকে ফেলে সবাই নেমে গেছে এই ধাক্কা থেকে তিনি এখনো মুক্ত হতে পারছেন না। তিনি সিগারেট ধরিয়েছেন। গলার টক ভাবটা চলে গেছে। সিগারেট টানতে তার খারাপ লাগছে না। ব্লাডি মেরি একটা খেলে মন্দ হত না।

স্যার!

আবুল খায়ের চমকে তাকালেন। তার পেছনে সবুর দাঁড়িয়ে। যার কানে ধরে উঠবোস করাতেই নাটকের শুরু।

স্যার সবাই কই?

নেমে গেছে।

কই নেমে গেছে?

জঙ্গলে।

কেন স্যার?

খায়ের সাহেব স্বাভাবিক গলায় বললেন, তোমরা একজনকে মেরে আধমরা করেছ, নেংটো করে পাঠিয়েছ এতে সবাই গেছে ভড়কে।

সবুর দুঃখিত গলায় বলল, কাজটা ঘটেছে মূসা ভাইয়ের কারণে। উনি ইউনিয়ন সেক্রেটারি। আমি উনার হাতে পায়ে ধরতে বাকি রাখছি।

মূসা সাহেবের এখনকার পরিকল্পনা কি?

কোনো পরিকল্পনা নাই স্যার। মূসা ভাই আপনার সঙ্গে দেখা করবে। ক্ষমা চাবে। তাকে নিয়ে আসি স্যার? আপনাকে চা দেব। চা খাবেন?

খাব।

ডিনার কখন দেব স্যার?

ভেবে দেখি।

খায়ের সাহেবের মোবাইল টেলিফোন বাজছে। সুরমা টেলিফোন করেছেন। মোবাইল বিপ্লবের ফসল। জঙ্গল থেকেও কথা বলা যাচ্ছে।

সুরমা বললেন, এই আমার মনে হয় পা ভেঙে গেছে। ট্রেন থেকে যখন পুলিশ আমাদের উপর গুলি করল তখন দৌড় দিতে গিয়ে খাদে পড়ে গেছি। এখন পা নড়াতে পারছি না।

সরি টু হিয়ার দ্যাট।

বার হাজার টাকা দামের শাড়ি। ছিঁড়ে কুটি কুটি।

সরি টু হিয়ার দ্যাট।

তোমার অবস্থা কি?

এখনো বেঁচে আছি। রাখি কেমন?

রাখি রাখি করছ কেন?

রাখি রাখি করছি কারণ মূসা সাহেবের সঙ্গে আমার এপয়েন্টমেন্ট। উনি যে কোনো সময় চলে আসবেন।

মূসা সাহেব কে?

আমাদের শাস্তি দেয়ার মূল পরিকল্পনা উনার। উনি রেল ইউনিয়নের লোক।

কি সর্বনাশ!

খায়ের সাহেব লাইন কেটে দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার কাছে অতি জরুরি একটা টেলিফোন এল। তাঁকে জানানো হল মন্ত্রীত্ব চলে যাওয়া বিষয়ে যে কথা প্রাইম মিনিস্টারের অফিসের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে তা পুরোপুরিই গুজব। এ ধরনের গুজব রটনায় প্রাইম মিনিস্টার নিজে অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন। গুজবের পেছনে কারা আছে বের করতে বলেছেন। প্রাইম মিনিস্টার নিজেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন।

আবুল খায়ের সাহেবের চা চলে এসেছে। তিনি চায়ে চুমুক দেয়া মাত্র প্রাইম মিনিস্টারের টেলিফোন এল। তিনি তিন চার মিনিট কথা বললেন।

সবুর বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়ানো। টেলিফোন শেষ হওয়া মাত্র বলল, স্যার মূসা ভাইকে কি আনব?

এখন না।

চা কেমন হয়েছে স্যার?

চা ভালো হয়েছে। তুমি সামনে থেকে যাও। আমি কিছুক্ষণ একা থাকব।

সবুর চলে গেল। আবুল খায়ের টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি নিশ্চিত অন্ধকার কেটে গেছে এখন একের পর এক টেলিফোন আসতে থাকবে। সবার আগে রেলমন্ত্রীর টেলিফোন আসার কথা। এত দেরি হচ্ছে কেন?

টেলিফোন বাজছে। মন্ত্রী মহোদয় টেলিফোন ধরলেন না। কারণ সুরমা টেলিফোন করেছে। সুরমার টেলিফোন ধরার কিছু নেই। এখন হয়ত জানা যাবে যে সে এক পাটি স্যান্ডেল খুঁজে পাচ্ছে না। তিনি বিড় বিড় করে বললেন, I have no business with you.

 

রেল মন্ত্রী না, প্রথম টেলিফোন করলেন পূর্ত প্রতিমন্ত্রী হেলালউদ্দিন, তাঁর গলায় আনন্দ।

খায়ের ভাই।

হুঁ।

মাঝখানে মোবাইল অফ রেখেছিলেন? কল করি লাইন যায় না।

অফ থাকতে পারে।

আরে গ্রেট খায়ের ভাই! আপনার ব্যাপারটা তো পুরো রিউমার। খবর পেয়েছেন না?

হুঁ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *