০৭. আঁখিতারা বাসায় ফিরেছে

আঁখিতারা বাসায় ফিরেছে। তার গলায় দুটা তাবিজ। মিসির আলি কাকরাইল মসজিদের সামনের ফুটপাতের দোকান থেকে তাবিজ দুটা কিনেছেন। আঁখিতারা খুবই আগ্রহের সঙ্গে গলায় তাবিজ পরে ঘুরছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে অনেক দিন পর বাবার বাড়িতে ফিরে আনন্দে আত্মহারা। মেয়েটাের আনন্দ দেখে মিসির আলির ভালো লাগছে।

আঁখিতারা বলল, বড় বাবা, চা বানায়ে দিব?

মিসির আলি বললেন, দাও।

দুপুরে রান্ধা কী হইব? ঘরে বাজার নাই।

ডাল-ভাত করে। ঘন ঘন বাজারে যেতে আমার ভালো লাগে না।

রসুন ভর্তা করব? রসুন ভর্তা খাইবেন? রসুন আর শুকনা করিচ পুড়াইয়া ভর্তা বানাইতে হয়। খাইবেন?

হুঁ, খাব।

মিসির আলির মনে হলো হাসপাতাল থেকে ফিরে আঁখিতারার মুখে বুলি ফুটেছে। মেয়েটা ফটফট করে কথা বলছে। ‘পোস্টমাস্টার’-এর রতনের সঙ্গে এই মেয়ের ভালোই মিল আছে। রতনও ছিল ফটফটানি মেয়ে।

চা বানিয়ে মিসির আলির সামনে রাখতে রাখতে আঁখিতারা বলল, বড় বাবা, চাইরটা ঘর-বন্ধন তাবিজ ঘরের চাইর কোনায় লটকাইয়া দিলে ঘরে কিছু ঢুকব না।

ঘর-বন্ধন তাবিজ কোথায় পাওয়া যায়?

আমরার দেশের মৌলানা সাব ঘর-বন্ধন তাবিজ দেন।

তুমি যখন দেশে যাবে, তখন আমার জন্য ঘর-বন্ধন তাবিজ নিয়ে এসো।

আইচ্ছা।

আঁখিতারা, শোনো, আজ তোমার এত কাজকর্ম করার দরকার নেই। হাসপাতাল থেকে এসেছি। বিশ্রাম করো। খাবার আমি হোটেল থেকে আনিয়ে নেব।

আমার অন্ত বিশ্রামের দরকার নাই। অনেক বিশ্রাম হইছে।

মিসির আলি চায়ের কাপ নিয়ে বসার ঘরে বেতের চেয়ারে বসলেন। তিনি সেখান থেকেই আঁখিতারার প্রবল বেগে ঘর বাট দেবার শব্দ শুনলেন। মেয়েটার কাণ্ডকারখানায় তিনি বেশ আনন্দ পাচ্ছেন।

মিসির আলির আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর ভ্ৰ কুঁচকে গেল। সিগারেটে টান দিয়ে আনাড়ি সিগারেটখোরদের মতো খকখক করে কাশতে লাগলেন। কোনো কারণে তার মনে যদি খটকা তৈরি হয়, তখন এই ব্যাপারটা ঘটে। সিগারেটে টান দিয়ে কাশতে শুরু করেন। আজকের এই খটকা তৈরি হয়েছে মনসুরের চিঠির কারণে। মনসুর এই চিঠি ডাকে পাঠায়নি। খামে বন্ধ করে দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে।

পরম শ্ৰদ্ধেয় স্যার
জনাব মিসির আলি।
স্যার, আমি আপনার সঙ্গে পরপর কয়েকটি অন্যায় করেছি। অন্যায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার কারণে আপনাকে লিখছি। হয়তোবা আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।

আমার প্রথম অন্যায় থার্মোমিটার আনার কথা বলে আমি চলে গিয়েছিলাম, আর ফিরে আসি নি। এই অন্যায়টি কেন করেছি আপনার মতো বুদ্ধিমান মানুষের তা না বোঝার কোনো কারণ নেই। স্যার, আমি থার্মোমিটার দিয়ে কোনো ম্যাজিক দেখাতে পারি না। থার্মেমিটার নিয়ে উপস্থিত হলে ম্যাজিক দেখাতে হতো। কাজেই আমি পালিয়ে চলে গেছি।

আপনি আমার কাজকর্মে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। সন্দেহভাজন একজন মানুষ যত ভালো কাজই করুক তার কাজকে দেখা হয় সন্দেহের চোখে।

আপনি যখন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো আঁখিতারাকে চেনো না, তাহলে তার নাম কীভাবে জানলে? আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবার কারণে তৎক্ষণাৎ জবাব দিলাম না। কী করে তার নাম জানি আর কেনইবা আমি পকেটে থার্মোমিটার নিয়ে ঘুরছিলাম সেটা বলি। আপনার কাছে জোড়হাতে অনুরোধ করি, আমার কথাগুলি দয়া করে পড়ুন। হয়তোবা আপনি আমার বিচিত্র কর্মকাণ্ড বুঝতে পারবেন।

ওইদিন আঁখিতারা মেয়েটি প্রবল জুরে ছটফট করছিল। আমি তখন এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা করতে। আপনার ঘরের দরজা বেশিরভাগ সময়ই খোলা থাকে। আমি ঢুকে গেলাম আপনার বসার ঘরে। সেখান থেকে শুনলাম। আপনি মেয়েটার সঙ্গে কথা বলছেন। মেয়েটার প্রবল জ্বর তাও বুঝলাম। আমি আপনাকে চমকে দেবার জন্যই ঘর থেকে বের হয়ে ফার্মেসিতে চলে গেলাম। জ্বর কমানোর অষুধ প্যারসিটামল কিনলাম। আপনার বাসায় থার্মোমিটার নাও থাকতে পারে, এই ভেবে একটা থার্মোমিটারও কিনলাম। স্যার, আমি যে সত্যি কথা বলছি তা কি বিশ্বাস করছেন? যদি বিশ্বাস করেন তাহলে আরেকটা সত্যি কথা বলি। রেবু (রাবেয়া) নামের মেয়েটা তার স্বামী ও সন্তানকে হত্যা করেছে–এই ঘটনাটাও সত্যি। মেয়েটা সাইকোপ্যাথিক! সে তার পছন্দের মানুষদের খুন করে। আমি জানি আপনি তার পছন্দের মানুষদের একজন। একই ঘটনা আপনার ক্ষেত্রেও ঘটতে যাচ্ছে। আপনি অতি বুদ্ধিমান মানুষ হয়েও ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। এইখানেই আমার দুঃখ।

স্যার, আমার কথা। আপনি যদি বিশ্বাস নাও করেন, একটু সাবধানে থাকবেন। আমার মন বলছে কোনো এক গভীর রাতে সে আপনার ঘরে ঢুকে পড়বে। হয়তোবা ইতিমধ্যেই ঢুকেছে।

ইতি চৌধুরী খালেকুজ্জামান।

চিঠি শেষ করে মিসির আলি সিগারেটে টান দিয়ে আবারও খকখক করে কাশতে লাগলেন। আঁখিতারা বলল, বড় বাবা, আপনারে আরেক কাপ চা দিব?

মিসির আলি বললেন, দাও।

চা সে বানিয়েই রেখেছিল। মিসির আলির কথা শেষ হবার আগেই সে চায়ের কাপ নিয়ে উপস্থিত হলো। মিসির আলি কাপ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আজমল সাহেব ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে রিকশা করে ফিরছিলেন। মিসির আলিকে দেখে বললেন, আপনার কাজের মেয়েটার কী হয়েছে? হাসপাতালে নাকি ভর্তি করিয়েছেন? ডেঙ্গু-ফেঙ্গু নাকি?

মিসির আলি বললেন, না। এখন সুস্থ। বাসায় নিয়ে এসেছি।

এই এক যন্ত্রণা, একশ’ টাকা মাসের কাজের মেয়ে তার চিকিৎসার পেছনে খরচ পাঁচশ’। আমার ঘরে তো অসুখ-বিসুখ লেগেই আছে। এখন আবার একটার হয়েছে জণ্ডিস। বড় বিপদে আছি।

মিসির আলি বললেন, ব্যাগভর্তি বাজার। আজ কি কোনো উৎসব?

আজমল সাহেব আনন্দিত গলায় বললেন, আপনি বুদ্ধিমান লোক। ঠিকই ধরে ফেলেছেন। রেবুকে আজ দেখতে আসবে। ছেলে সুইডেনে থাকে। ভালো কিছু করে বলে মনে হয় না। লেবার টাইপ। আমি মেয়ে পার করতে পারলেই খুশি। বিদেশে গিয়ে বাথরুমের গু-মুত পরিষ্কার করলে করবে। আমার কি? আপনি আমার নিজের লোক। আপনাকে বলতে অসুবিধা নাই। ওর ইতিহাস ভালো না। শুনলে চমকে উঠবেন। যদি ভালোয় ভালোয় বিয়ে হয়ে যায়, রেবুকে বিদায় করতে পারি, তাহলে দুঃখের কথা বলব। কাউকে বলতে ভালো লাগে না।

বলতে ইচ্ছা না করলে বলবেন না।

আপনাকে তো আমি বলতেই পারি। শুনুন ভাই, আজ রাতে আমাদের সঙ্গে খানা খাবেন। আমিন বাজার থেকে গরুর মাংস কিনেছি। খেলে বুঝবেন কী জিনিস। আসবেন কিন্তু মনে করে। আর একটু খাস দিলে দোয়া করবেন। আমার পীর ভাই বলেছেন, এই বিয়ে হবে। উনি যা বলেন তাই হয়। উনি কিন্তু বলেছেন আর হয় নি তা কখনো হয় নাই। অতি কামেল লোক, উনার কথা মিথ্যা হবে না। বাকি আল্লাহ মালিক। আপনাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন? এত চিন্তা করবেন। না। সব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেন। রাতে মনে করে খানা খেতে আসবেন।

মিসির আলি বললেন, আজ বরং বাদ থাকুক। বাইরের লোকজন থাকবে। আমি আবার অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে খেতে পারি না।

আজমল সাহেব বললেন, আমারও একই প্রবলেম। আমিও পারি না। আপদরা বিদায় হলে আপনাকে খবর দিব। তারপর দুই ভাই মিলে খানা খাব। এই আমার ফাইনাল কথা।

আজমল সাহেব বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলেন। মিসির আলি লক্ষ করলেন দোতলার বারান্দায় রেবু এসে দাঁড়িয়েছে। সে একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। রেবুকে একটা প্রশ্ন করবেন বলে তিনি ভেবে রেখেছিলেন। তার সঙ্গে যখন দেখা হয় তখন আর প্রশ্নটা করা হয় না। আজ অবশ্যই প্রশ্নটা করতে হবে। প্রশ্নটা হিন্দি ছবি নিয়ে। মারামারির দৃশ্যে দেখা গেল নায়কের শার্টের একটা বোতাম নেই। কিন্তু মৃত্যুদৃশ্যে বোতামটা ঠিকই আছে। এর পেছনে রহস্যটা কী?

রসুন ভর্তা জিনিসটা যে এত সুস্বাদু মিসির আলি কল্পনাও করেন নি। তিনি শুধু রসুন ভর্তা দিয়েই এক গামলা ভাত খেয়ে ফেললেন। আঁখিতারার দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ থেকে আমি তোমার নাম দিলাম কুটু মিয়া।

কুটু মিয়া কে?

কুটু মিয়া একটা উপন্যাসের চরিত্র। তার মতো রান্না কেউ করতে পারে না।

আঁখিতারা আনন্দে নুয়ে পড়ল। মিসির আলি বললেন, এখন তুমি আমাকে বলো, তুমি যে রাতে জ্বিনকে দেখলে সেই জিন কী করল?

চিমটি দিছে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিমটি দিল না বসে চিমটি দিল?

বসছে। তারপরে চিমটি দিছে।

ভূত চিমটি দেয় আমি কোনোদিন শুনি নি। চিমটি দেয় মেয়েরা।

আঁখিতারা গম্ভীর গলায় বলল, আমারে চিমটি দিছে জিনে।

মিসির আলি বললেন, এখন তো আর চিমটি দিতে পারবে না। গলায় তাবিজ। ঠিক নয়?

হুঁ।

তোমার চৌকিটা আমি আমার ঘরে ঢুকিয়ে ফেলব। জিন যদি আসে তুমি আমাকে ডাকবে।

আনন্দে অভিভূত হয়ে আঁখিতারা ডান দিকে ঘাড় কাত করল। মিসির আলির মনে হলো বাচ্চা এই মেয়েটির জীবনে যে ক’টি আনন্দময় ঘটনা ঘটেছে আজকের এই সিদ্ধান্ত তার একটি।

আঁখিতারা।

জি।

মন দিয়ে শোনো, ভবিষ্যতে তুমি যতবার রান্না করবে একটা আইটেম যেন অবশ্যই থাকে। রসুন ভর্তা।

আঁখিতারা আবার ঘাড় কাত করল। তার এতই আনন্দ হচ্ছে যে, কেঁদে ফেলতে ইচ্ছা করছে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না একটা মানুষ এত ভালো হয় কীভাবে? সামান্য কিছু মন্দ তো মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। যদি না থাকে তাহলে মানুষ আর ফেরেশতায় তফাৎ কী?

আঁখিতারা!

জি।

তুমি লেখাপড়া জানো?

না।

লেখাপড়া শিখতে হবে। রসুন ভর্তা বানালে হবে না। আমি তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব।

আঁখিতারা ঘাড় কাত করল। এইবার সে আর চোখের পানি আটকাতে পারল না। তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।

মিসির আলি তাকিয়ে দেখলেন। কিছু বললেন না। তিনি চাচ্ছেন মেয়েটা আরো কাদুক। আনন্দের কান্না দেখতে তাঁর বড় ভালো লাগে।

আঁখিতারা।

জি।

খাওয়া শেষ করে আমার মাথায় তেল দিয়ে দাও। তুমি আমার অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছ। রসুন ভর্তা দিয়ে যে খাওয়া খেয়েছি আজ দুপুরে না ঘুমুলে চলবে না। আজ আমি মড়ার মতো ঘুমাব।

মিসির আলি সত্যি সত্যি মড়ার মতো ঘুমালেন। তার ঘুম ভাঙল রাত ন’টায়। দিনের বেলায় এত লম্বা ঘুম তিনি তাঁর জীবনে আর কখনো ঘুমিয়েছেন বলে মনে করতে পারলেন না। মৃত্যুর কাছাকাছি ঘুম। শান্তি এবং তৃপ্তির ঘুম। সবকিছুরই কারণ আছে। তৃপ্তিময় দীর্ঘ ঘুমেরও নিশ্চয়ই কারণ আছে। সব সময় কারণ খুঁজতে ভালো লাগে না। তিনি হাত-মুখ ধুতে গেলেন। রাতে আজমল সাহেবের বাড়িতে খেতে যেতে হবে। আঁখিতারাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। মেয়েটাকে অবশ্যই একা রেখে যাওয়া যাবে না। জিনবিষয়ক ভীতি মেয়েটার মাথার ভিতর আছে। যে কোনো সুযোগে আবার সেই ভয় ডালপালা মেলতে পারে।

আঁখিতারা বলল, বড় বাবা, চা খাইবেন?

মিসির আলি বললেন, না। দাওয়াত খেতে যাব। তুমিও সঙ্গে যাবে।

আঁখিতারা বলল, আপনের কি শইল খারাপ?

মিসির আলি বললেন, শরীর খারাপ না। শরীর ভালো।

আপনে ঘুমাইতেই আছেন। ঘুমাইতেই আছেন। ঘুমাইতে ঘুমাইতে মানুষ মারা যায়।

কে বলেছে?

বড় বাবা বলেছে। এই জন্যে বড় বাবা যখন বেশি ঘুমায় তখন আমার ভয় লাগে। আমি ডাক দিয়া তুলি।

আমাকে ডাক দিয়ে তুললে না কেন?

আমি ডাকছি। আপনের ঘুম ভাঙে নাই।

মিসির আলি বললেন এত লম্বা আরামের ঘুম কেন ঘুমিয়েছি শোনো। কারণটা কিছুক্ষণ আগে পরিষ্কার হয়েছে। আমার মাথা জট পাকিয়ে গিয়েছিল। আন্ধা গিন্টু লেগে গিয়েছিল। গিন্টু খুলে গেছে বলে আরাম করে ঘুমিয়েছি, বুঝেছি?

কিছু না বুঝেই আঁখিতারা মাথা নাড়ল। মানুষটা যে ঘুমের মধ্যে মরে যায় নি। এতেই সে খুশি।

রাতে মিসির আলি আজমল সাহেবের বাড়িতে খেতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়লেন। বাড়িতে শোকের ছায়া। বরপক্ষের লোকজন কেউ আসে নি। তারা কোনো খবরও পাঠায় নি। আজমল সাহেব বললেন, মানুষ এত খারাপ কেন, বলেন তো ভাই সাহেব? আসবি না ভালো কথা। একটা খবর তো দিবি।

মিসির আলি বললেন, ক’টার সময়ে আসার কথা?

সন্ধ্যাবেলা আসার কথা। মুরুব্বিরা আসবে, বিয়ের কথাবার্তা হবে, তারপর খানাপিনী।

রাস্তার যানজটে মনে হয় আটকা পড়েছে। সব মুরুব্বিদের একত্র করে আসতেও দেরি হয়।

আজমল সাহেব হতাশ গলায় বললেন, ওরা আসল খবর পেয়ে গেছে। সবকিছু এত গোপন করে রাখি, তারপরেও আসল খবর বের হয়ে যায়। আপনি আমার নিজের লোক, আপনাকে বলি। রেবুর আগে বিয়ে হয়েছিল। একটা মেয়েও হয়েছিল। স্বামী-সন্তান দু’জনই মারা যায়। তারপর থেকে রেবুর মাথা খারাপ। নতুন করে ঘর-সংসার হলে মাথা ঠিক হয়ে যেত। মাথা খারাপের আসল অষুধ বিবাহ।

প্রশ্ন করবেন না করবেন না ভেবেও মিসির আলি প্রশ্ন করে ফেললেন। তিনি ইতস্তত করে বললেন, তারা মারা যায় কীভাবে?

আজমল সাহেব বললেন, কাজের মেয়ে খুন করে টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। বিশাল ইতিহাস। আরেকদিন বলব। আপনাকে বলতে কোনো বাধা নেই রে ভাই। আপনি আমার আপনা লোক। পুলিশ টাকা খাওয়ার জন্যে কী যে করেছে বললে বিশ্বাস হবে না। পুলিশ আসামি করেছিল রাবেয়াকে।

রাবেয়া কে?

রেবুর ভালো নাম রাবেয়া। ঘটনার পরে আমরা রেবুর নাম চেঞ্জ করে ফেলি–তার নাম দেই শেফালী। ডাক নাম শেফু। মেয়েটার বিয়ে তো দিতে হবে। আগের নামধাম রাখার কোনো যুক্তি আছে, আপনিই বলেন?

মিসির আলি কিছু বললেন না। ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেললেন। আজমল সাহেব মিসির আলির দিকে এগিয়ে এসে গলা নিচু করে বললেন, স্ত্রী স্বামীকে খুন করে, এ ইতিহাস আছে। কিন্তু কোনো মা তার সাত মাসের ফুটফুটে বাচ্চা খুন করতে পারে? আপনি বলেন? আপনি তো ‘বোকা.. না’ খারাপ কথা বলে ফেলেছি। ভাই, কিছু মনে করবেন না।

আজমল সাহেব বললেন, তোরা পারলে যে কাজের মেয়ে খুন করে পালিয়েছে তাকে ধরে আন। তা না, উল্টাপাল্টা জেরা। রেবুর মাথাটাই খারাপ করে দিল। মামলা থেকে রেবুকে বের করে আনতে কত টাকা গেছে বলুন তো? দেখি আপনার অনুমান?

বলতে পারছি না। মামলা-মুকাদমা বিষয়ে আমার অনুমান খুবই খারাপ।

চার লাখ একুশ হাজার। থানা স্টাফ নিয়েছে দুই লাখ, আর এসপি সাহেবকে দিয়েছি দুই লাখ।

মিসির আলি বললেন, একুশ হাজার টাকার হিসাবটা কী?

পত্রিকাওয়ালাদের দিতে হয়েছে। উল্টাপাল্টা খবর ছেপে দিলে মুশকিল না? ভাই সাহেব আপনার কি ক্ষিদে লেগেছে? খানা দিতে বলি?

মিসির আলি বললেন, আরেকটু অপেক্ষা করি।

আজমল সাহেব বললেন, কোনো লাভ নেই। শুয়োরের বাচ্চারা আসবে না। রেবু মেয়েটা কী কপাল নিয়ে এসেছে! ঝাড়ু মারি কপালে। একবার ইচ্ছা করে আমিই গলা টিপে মেয়েটিকে শেষ করে দেই। যন্ত্রণা শেষ হোক।

নিচে গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। একটা না, বেশ কয়েকটা গাড়ি। মিসির আলি বললেন, আমার ধারণা বর পক্ষের লোকজন চলে এসেছে। আপনার পীর ভাই-এর কথা সত্যিই হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *