০৬. অধ্যাপক ক্লার্ক ব্লেইস

অধ্যাপক ক্লার্ক ব্লেইস দুপুরে তাঁর সঙ্গে খাবার জন্যে নিমন্ত্রণ করেছেন। ভারতী মুখোপাধ্যায় কেলিফোর্নিয়া থেকে ফিরে এসেছেন। এই উপলক্ষে তার সঙ্গেও দেখা হবে। ক্লার্ক এসে নিয়ে গেলেন। ভেবেছিলাম রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বাড়ি দেখব–তা নয়, ছোট্ট বাড়ি। ভারতী মুখোপাধায়ের সঙ্গেও দেখা হলো। শাড়ি পরা বাঙালি মেয়ে। এককালে ডাকসাইটে রূপসী ছিলেন তা বোঝা যায়। রূপের খানিকটা এখনো ধরে আছে। তিনি নিজেও একজন ঔপন্যাসিক। সাহিত্য চর্চা করেন ইংরেজি ভাষায় তাঁর লেখা একটা উপন্যাস ‘জেসমিন আমেরিকায় বেস্ট সেলার হয়েছে। অবশ্যি এই উপন্যাসে তিনি ভারতকে ছোট করে দেখিয়ে পশ্চিমের জয়গান করেছেন।

ভেবেছিলাম মন খুলে কথাবার্তা বলা যাবে–তা সম্ভব হলো না। কারণ আমার সঙ্গে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন শ্রীলংকার কবি জেন এবং তাঁর স্ত্রী প্রতিভায় মুগ্ধ স্বামী। বলাই বাহুল্য জেন সঙ্গে করে একগাদা কবিতা নিয়ে এসেছেন এবং ক্রমাগত পড়ে যাচ্ছেন। এক সময় তিনি প্রাকৃতিক নিয়মেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন ভাবলাম এইবার হয়তো কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে, তা পাওয়া গেল না। জেন-এর স্বামী তখন আসরে নামলেন। ছোটবেলা থেকে তাঁর যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আছে সেই সব বলতে লাগলেন। জেন স্বামীকে উস্কে দিচ্ছেন–দেবীর সঙ্গে দেখা হবার গল্পটা বলো হানি। হানি, প্রিকগনিশন ড্রিমের ঐ অসাধারণ গল্পটা বলো।

ভদ্রলোক অদ্ভুত সব গল্প শোনাতে লাগলেন। বিংশ শতাব্দীতে–আমেরিকায় বসে এইসব গাঁজাখুরী গল্প শোনার কোনো মানে হয় না। কিন্তু যেহেতু আমরা সভ্য মানুষ–কান পেতে শুনে যাই। ভদ্রলোকের একটি কাহিনী হলো–দেবি স্বরস্বতীর সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎ। এক দুপুরে তিনি তাঁর গ্রামের রাস্তায় হাঁটছিলেন। বয়স খুবই কম-ন’-দশ। কোথাও লোকজন নেই। হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো এক মন্দিরের কাছে চলে এলেন। মন্দিরের কাছে এসেই মিষ্টি ফুলের গন্ধে চমকে উঠলেন। তারপর দেখেন মন্দিরের ভেতর থেকে দেবী সরস্বতী বের হয়ে হাত ইশারা করে তাঁকে ডাকছেন।

আমি গল্পের এক পর্যায়ে উঠে গিয়ে অধ্যাপক ক্লার্কের ঘরের সাজসজ্জা দেখতে লাগলাম। সমস্ত ঘর ভর্তি ছোট ছোট ফ্রেম বাঁধানো প্রাচীন সব গ্রন্থের পৃষ্ঠা। ক্লার্ক বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোনটা কি। এর মধ্যে আছে মূল শাহনামা গ্রন্থের এক পৃষ্ঠা যা তিনি তিন হাজার ডলার দিয়ে কানাডা থেকে কিনেছেন। দু’হাজার বছর আগের কোরআন শরীফের একটি পৃষ্ঠা। মোগল আমলের কিছু গ্রন্থের মলিন পাতা। সবই অতি যত্নে সংরক্ষিত।

খাবার ডাক পড়ল।

আশা করেছিলাম ভাত-ডাল-মাছ এইসব থাকবে। তা না, পিজা ডিনার। সেই পিজাও ঘরে বানানো নয়–দোকান থেকে কিনে আনা। পিজা খাচ্ছি এবং শ্রীলংকার ভদ্রলোকের অলৌকিক গল্প শুনছি। জেনের কবিতার মতো উনার গল্পও অফুরান।

প্রফেসার ক্লার্ক এক পর্যায়ে বললে, আমরা হুমায়ূনের গল্প শুনি।

আমি বললাম, আমার তো কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই কি গল্প বলব?

আমেরিকা প্রসঙ্গে অভিজ্ঞতার গল্প শুনি। ভেতর থেকে নিজেদের দেখা কঠিন। বাইরে থেকে দেখা সহজ। আমি এক বছর কোলকাতায় ছিলাম। তার ওপর ভিত্তি করে একটি বই লিখেছি–’Nights and Days and Calculta তোমাকে একটা কপি দেব। এখন তুমি বলো তুমি যে নর্থ ডেকোটায় ছিলে, কি দেখেছ? বরফ ছাড়া কি দেখেছ?

আমি নর্থ ডেকোটায় এক হাসপাতালে আমার মেজ মেয়ে শীলার জন্মের গল্পটি শুরু করলাম। তার জন্মমুহূর্তে আমাকে শীলার মার পাশে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। শিশু জন্মের এই ভয়াবহ ব্যাপারটাই প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। আমি চলে গিয়েছিলাম এক ধরনের ঘোরের রাজত্বে। মনে হচ্ছিল চোখের সামনে যা দেখছি তা সত্যি নয় স্বপ্ন। স্বপ্ন ভঙ্গ হলো গুলতেকিনের কথায়, তুমি এরকম করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? বাচ্চার কান্না শুনতে পাচ্ছ না? আজান দাও। আমি বিকট শব্দে আজান শুরু করলাম। ডাক্তার এবং নার্সদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে গেল–এই বাঙাল কি করছে?

একটা মজার গল্প। যাদেরকেই এই গল্প করেছি তারাই প্রাণ খুলে হেসেছে। এখানে ভিন্ন ব্যাপার হলো। দেখি কবি জেন-এর চোখ ছলছল করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি কেঁদে ফেলবেন। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, আমি এমন মানবিক গল্প এর আগে শুনিনি। আমি অভিভূত। এই নিয়ে একটি কবিতা না লেখা পর্যন্ত আমি শান্তি পাব না। আমার গায়ের সব লোম খাড়া হয়ে গেছে। দেখো হুমায়ূন দেখো।

তিনি তার হাত আমার সামনে এগিয়ে দিলেন। সেই হাতে কোনো লোম নেই কাজেই লোম খাড়া হলো কি হলো না তা বুঝতে পারলাম না তবে অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম একটা মজার গল্প বলে এ কি বিপদে পড়লাম।

এই ঘটনার দিন সাতেক পরের কথা। সন্ধ্যাবেলা প্রেইরি বুক স্টোরে কবিতা পাঠের আসর বসেছে। কবিতা শুনতে গিয়েছি। প্রথম কবিতা পাঠ করলেন পোলিশ কবি ও গল্পকার পিটার। তারপর উঠে দাঁড়ালেন জেন। গম্ভীর গলায় বললেন

আমি যে কবিতাটি পাঠ করব তা উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদকে। তাঁর একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প শুনে আবেগে অভিভূত হয়ে আমি কবিতাটি লিখি।

সব দর্শক ঘড়ি ঘুরিয়ে তাকাল আমার দিকে। উঠে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে আমাকে নড করতে হলো। জেন কবিতা পাঠ শুরু করলেন–আবার তার চোখে পানি এসে গেল। এবং আশ্চর্য আমার নিজের চোখও ভিজে উঠল। এই অতি আবেগপ্রবণ কবির কবিতাটি পাঠক-পাঠিকাদের জন্যে হুবহু তুলে দিচ্ছি। একজন কবি আমার সামান্য একটি গল্প শুনে কবিতা লিখে আমাকে উৎসর্গ করেছেন এই আনন্দও তো কম নয়।

DESH
[POEM FOR HUMAYAUN]

Beside your wife’s bed side awaiting the birth
Of your child you uttered the name of God
Many times
Allah-U-Akbar–
This was not your country
You were fare away but is one ever apart
For those gods who are so intimate
A part of your life?
You will nevr be alone here
Even in the snowy deserts of winter
Or when the trees shed all the leaves in Fall,
When you pray for the safety of mother of child,
The gods have a way of following you
And you of taking them with you
Just as, over the oceans, you carry
A Litlle of the Desh, the earth of your
Country and when you are lonely, touch it
As you would its fields, its rivers and its trees
And feel that this is your home,
It is where you belong.
I also remember your words, friend,
“My mother told me, fill your palm
with some soil of the Desh
when my daughter was born
Or else, the baby will cry for the soil”

But those, tear won’t they irrigate
The arid earth of our lives?

সন্ধ্যা থেকে টিভির সামনে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে আছি। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তুষার পড়ছে না তবে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে গেছে। ঘরে হিটিং-এর ব্যবস্থা আছে। সেই ব্যবস্থা কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। আমেরিকানরা একটি নির্দিষ্ট দিনে হিটিং চালু করে সেই দিন আসার এখনো দেরি আছে। শীতে কাঁপছি, মনটাও খারাপ হয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে বাসায় টেলিফোন করেছিলাম–ছোট মেয়ে টেলিফোন ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল–বাবা, আম্মা আমাকে মেরেছে।

কেন মেরেছে?

শুধু শুধু মেরেছে।

বলেই আমার অতি আদরের মেয়ে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগল। আমি তের হাজার মাইল দূরে। হাত বাড়িয়ে তাকে আদর করতে পারছি না। আমার নিজের চোখও ছলছল করতে লাগল, কোমল গলায় বললাম–

তোমার জন্যে কি কি আনতে হবে আরেকবার বলো মা।

সে ধরা গলায় বলল, কিছু আনতে হবে না, তুমি এসে আমাকে আদর করো।

আমি মন খারাপ করে টেলিফোন রেখে টিভির সামনে এসে বসেছি। ভালো প্রোগ্রাম হচ্ছে–সিচুয়েশন কমেডি কিন্তু মন দিতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে কেন এলাম এই দেশে, কি প্রয়োজন ছিল?

আমেরিকা দেখা? আমেরিকা জানা? কি হবে আমেরিকা দেখে এবং জেনে?

নিজের দেশে এবং নিজের দেশের মানুষকে কি আমি ঠিকমত জানতে পেরেছি? বা সত্যিকার অর্থে জানার চেষ্টা করেছি?

টেলিফোন বাজছে। উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরলাম। ঢাকা থেকে গুলতেকিন টেলিফোন করেছে।

শোনো, বুঝতে পারছি মেয়ের সঙ্গে কথা বলে তোমার মন খারাপ হয়েছে। এই জন্যেই টেলিফোন করলাম। তোমার মেয়ে শান্ত হয়ে ঘুমুচ্ছে। আমি তাকে সামান্য বকা দিয়েছিলাম–বড় যন্ত্রণা করে। মাঝে মাঝে ওদের বকা দেয়ার অধিকার তো আমার আছে। আছে না?

অবশ্যই আছে।

তোমার মন ভালো হয়েছে তো?

হয়েছে। টেলিফোন করার জন্যে ধন্যবাদ।

থাক, আমেরিকানদের মতো ফর্মাল হবার দরকার নেই। খাওয়া-দাওয়া

এখনো করিনি–রান্না শুরু করব।

আজকের মেনু কি?

ভাত এবং ডিমভাজা।

তুমি তো মনে হচ্ছে আমেরিকান সব ডিম খেয়ে শেষ করে ফেলছ।

কি করব বলো ডিম ছাড়া তো আর কিছু রাঁধতে পারি না।

আবার টিভির সামনে এসে বসলাম। এখন প্রোগ্রামগুলি ভালো লাগছে। ভড়ামো ধরনের রসিকতাতেও প্রচুর হাসি পাচ্ছে। রাত দশটার দিকে ডিম ভাজতে গেলাম। এখানকার প্রোগ্রামের একটি বড় অংশ হচ্ছে নিজের সংসার গুছিয়ে নিজের মতো করে থাকা। ঘুরে বেড়ানো। মাঝে মাঝে লেখকদের প্যানেল ডিসকাশন। ইচ্ছে করলে সেখানে যাওয়া যায় ইচ্ছা না করলে যাওয়ার দরকার নেই। লেখকরা নিজেদের লেখা সম্পর্কে বলেন, কবিতা পড়েন বা গল্প পড়ে শোনান। সবই খুব ঘরোয়া ভঙ্গিতে। কোনোদিন আসর বসে কফি শপে, কোনোদিন আইসক্রিম শপে, কোনোদিন পথের মোড়ে।

একদিন আমাদের বাড়ির লনে আসর বসল। বার্বিকিউ হচ্ছে, বিয়ার খাওয়া হচ্ছে। এর মধ্যেই গল্প পাঠের আসর। পাঠ করা হবে বাংলাদেশের গল্প। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনয় কলায় পড়াশোনা করছে এমন একজনকে ঠিক করা হলো আমার ১৯৭১ উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ পড়ে শোনানোর জন্যে। সম্ভবত আমার পড়ার ওপর ওদের আস্থা নেই। উপন্যাসটির অনুবাদ করেছেন ঢাকা কলেজের ইংরেজি ভাষার অধ্যাপিকা রহিমা খাতুন। খুব সুন্দর অনুবাদ। পাঠও খুব চমৎকার হলো। এত ভালো হবে আমি নিজেও ভাবিনি। আমি অবশ্যি সব সময়ই নিজের লেখার ভক্ত। আজ যেন আরো ভালো লাগছে।

সিকাট তার একটি এক অঙ্কের নাটক অভিনয় করে দেখালেন। একটিই চরিত্র। কুড়ি মিনিটের অভিনয়। মূল নাটক টেগালোগ ভাষায় লেখা–অভিনীত হলো ইংরেজি ভাষায়। সবাই খুব আগ্রহ ও আনন্দ নিয়ে দেখলেন। পলিটিক্যাল নাটক। লেখা হয়েছে মার্কোসের সময়কে বিদ্রুপ করে।

সিকাট অভিনয় শেষে মার্কোসের আমলের নৃশংসতার একটি গল্পও বললেন ফিলিপাইনে একবার একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান হবে। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা। মার্কোস হুকুম দিলেন নতুন একটি ভবন তৈরি করতে হবে এবং তা করতে হবে এক মাসের মধ্যে। ভবন তৈরি শুরু হলো–দিনরাত কাজ হচ্ছে। এমন সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটল। ছাদ ধসে পড়ল। পঞ্চাশ জনের মতো শ্রমিক আটকা পড়ে গেল। বেশিরভাগই মারা গেল তবে কিছু আহত হয়েও ভেতরে রইল। ওদের উদ্ধার করতে হলে আরো দিন সাতেক লাগবে। অথচ হাতে সময় নেই। মার্কোস হুকুম দিলেন উদ্ধারের দরকার নেই। যথাসময় কাজ শেষ হওয়া চাই। হলোও তাই।

শিউরে উঠতে হয় গল্প শুনে। আমরা কোথায় আছি? কোন জগতে বাস করছি? এই কি আমাদের সভ্যতা? আমরা মধ্যযুগীয় নৃশংসতার কথা বলি–এই যুগের নৃশংসতা কি মধ্যযুগের চেয়ে কিছু কম? মনে তো হয় না।

পার্টি পুরোদমে চলছে। বার্বিকিউ হচ্ছে, বিয়ার খাওয়া হচ্ছে। পৃথিবীর সব দেশের লেখকই কি পানীয়ের প্রতি বিশেষ মমতা পোষণ করেন। অবস্থাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে। ব্রাজিলের লেখক রেইমুন্ডু ক্যারেরো পুরো মাতাল হয়ে পড়েছেন বলে মনে হলো। আবোলতাবোল বকছেন এবং লাফালাফি করছেন। খানিকক্ষণ পর পর আমার দিকে তাকিয়ে হুংকার দিচ্ছেন–Bangladesh! Bangladesh প্যালেস্টাইনের মহিলা কবিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন। সেই বেচারির পুরো ব্যাপারটি হেসে উড়িয়ে দেয়া ছাড়া কিছু করার রইল না। অন্য মহিলারাও খানিকটা শংকিত বোধ করছেন।

ভারতীয় কবি গগন গিল আমার কাছে এগিয়ে এসে শুকনো গলায় বললেন, হুমায়ুন খুব বিপদে পড়েছি।

কি বিপদ?

ঐ চেক কবি আমাকে ঝামেলায় ফেলে দিয়েছে। কি করব বুঝতে পারছি।’

কি ঝামেলায় ফেলেছে?

ও বলছে তোমার ড্রেস অসম্ভব সুন্দর। আমাকে তুমি এরকম একটা ড্রেস পরিয়ে দাও। ঐ ড্রেস পরে আমি পরবর্তী পার্টিতে যাব। আমি তাকে বলেছি এই ড্রেসটার নাম শাড়ি, এটা মেয়েদের গোষাক। তুমি পুরুষ মানুষ। তোমার জন্যে নয়। সে মানছে না। সে বলছে–তোমরা মেয়েরা তো আমাদের শার্ট-প্যান্ট পরছ। আমরা তোমাদের একটা ড্রেস পরলে অসুবিধা কি? তা ছাড়া পুরুষ-রমণীর কোনো ভেদাভেদ আমার কাছে নেই।’

এই অবস্থা হলে ওকে একটা শাড়ি পরিয়ে ছেড়ে দাও। প্রচুর ছবি তুলে দেশে নিয়ে যাও। ছবি দেখে সবাই মজা পাবে।

তুমি কি সত্যি তাই করতে বলছ?

হ্যাঁ বলছি।

আমি নিজে কখনো মনে করি না একজন লেখক অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা কিছু। কোনো লেখকই হয়তো তা মনে করেন না তবে নিজেদের খানিকটা আলাদা করে দেখানোর ইচ্ছা তাদের থাকে না তাও বোধ হয় সত্যি না। সচেতনভাবে না হলেও অবচেতন একটি বাসনা বোধ হয় থেকেই যায়। নিজেকে আলাদা করে দেখানোর এই প্রবণতাটি প্রকাশ পায় লম্বা চুলে, লম্বা দাড়িতে কিংবা বিচিত্র পোশাক-আশাকে। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভাধর মানুষকেও আলখাল্লা বানিয়ে পরতে হয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে আর্জেন্টিনার লেখক এনরিখে বুটির কথা বলি। চমৎকার মানুষ। মাথা ভর্তি ঘনকালো চুল। হঠাৎ এক সকালে দেখি পুরো মাথা কামিয়ে বসে আছেন। কি ব্যাপার জিজ্ঞেস করতেই বললেন, কিছু করার ছিল না। ঘরে বসে বোর হচ্ছিলাম। কাজেই মাথাটা কামিয়ে ফেললাম।

দেখলাম তিনি মাথা পেতে বসে আছেন, অন্য লেখকরা কামানো মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। এনরিখে বুটি বিমলানন্দে হাসছেন। পুরো ব্যাপারটায় মনে হলো তিনি খুব মজা পাচ্ছেন।

রাতে মে ফ্লাওয়ারের হল ঘরে আমার লেখা ধারাবাহিক টিভি নাটক অয়োময়ের একটি পর্ব। (চতুর্থ পর্ব, এই পাগলকে নৌকায় করে গ্রামের বাইরে ফেলে দিয়ে আসা হয়) দেখানো হলো। প্রজেকশন টিভির মাধ্যমে বড় পর্দায় সিনেমার মতো করে দেখা। সাব টাইটেল নেই, কাহিনী বোঝা খুব মুশকিল। অবশ্যি এটা বক্তৃতা এবং লিখিতভাবে কি হচ্ছে না হচ্ছে আগেই বলে দেয়া হয়েছে তবু মনে হলো অধিকাংশ দর্শক বেশ কনফিউজড। অনেকেই দুটি বৌ নিয়ে অবাক। দুজন বৌ কি করে থাকে? পাগলকে চিকিৎসা না করে গ্রামের বাইরে ফেলে দিয়ে আসার ব্যাপার কি সত্যি ঘটে?

কিছু আমেরিকান ছাত্র–যারা লেখক নয় তবে ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স নিচ্ছে কি করে লেখক হওয়া যায় তারা অয়োময়ে মির্জার দুই বৌ নিয়ে আমাকে কঠিন আক্রমণ করল। তাদের ধারণা এটা এসেছে মুসলিম কালচার থেকে। ইসলাম ধর্মে চার বিয়ের বিধান–কাজেই এই ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ে বহু বিবাহ ঢুকে পড়েছে। উঠে এসেছে তাদের সাহিত্যে। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললাম–আমার তো মনে হয় প্রকৃতিই বহু বিবাহ সমর্থন করে। তাকিয়ে দেখো জীব জগতের দিকে একটি পুরুষ নেকড়ে অনেক ক’টি মেয়ে নেকড়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বন্য মহিষ, বাইসন, সিংহ, শেয়াল সবার বেলায় এই নিয়ম। মানুষ তো এক অর্থে পশু, তার বেলাতেই হবে না কেন? প্রকৃতি এটী চায় বলেই মেয়েদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি। কূট তর্কে হারিয়ে দিলাম ঠিকই কিন্তু আমি তো

জানি তর্কে ফাঁক আছে। জীবজগতে অনেক প্রাণী আছে যাদের বেলায় উল্টো নিয়ম–একটি মেয়ে প্রাণীর পেছনে থাকে এক ঝাক পুরুষ, যেমন রানী মৌমাছি।

তর্কে জেতার অনিন্দ আছে তবু মনটা একটু খারাপ হলো কারণ অয়োময়ে বহু বিবাহকে সহজ এবং স্বাভাবিক নিয়মে উপস্থিত করা হয়েছে। তার জটিলতাকে তুলে ধরা হয় নি। এই নাটক দেখলে যে কোনো পুরুষ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবতে পারেন–দুটি বৌ থাকা তো মন্দ না।

একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে এই জাতীয় ধারণাকে আমি অবশ্যই প্রশ্রয় দিতে পারি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *