০৫. আঁখিতারার জ্বর এসেছে

আঁখিতারার জ্বর এসেছে।

সে চাদর গায়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। চাদরে শীত মানছে না। একটু পরপর কোপে কেঁপে উঠছে। মিসির আলি তার কপালে হাত রেখে চমকে উঠেছেন। জুরে গা পুড়ে যায় বলে যে বাক্যটি প্রচলিত সেটা পুরোপুরি সত্যি বলে

মনে হচ্ছে।

আঁখিতারা, শরীর বেশি খারাপ লাগছে?

সে চোখ মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। মিসির আলি অস্থির বোধ করলেন। অসুখ-বিসুখের ব্যাপারগুলিতে তিনি অস্থির বোধ করেন। অসহায়ও বোধ করেন। অসুখ-বিসুখের সমস্যা মোকাবিলার মতো শক্তি তার নেই।

পানি খাবে? পানি?

আঁখিতারা আবারও চোখ মেলল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

মেয়েটির জ্বর কমানোর ব্যবস্থা করা দরকার। ডাক্তার ডাকা দরকার। মেয়েটি যেভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার অবশ্যই শীত লাগছে। তিনি কি এখন তার গায়ে লেপ দিয়ে দেবেন? এতে মেয়েটার শীত ভাব কমবে। অথচ তিনি জানেন জ্বর কমানো কী করে সম্ভব।

আঁখিতারা, শরীর বেশি খারাপ লাগছে?

না।

অনেকক্ষণ পর সে প্রথম একটা শব্দ করল। এক অক্ষরের এই শব্দ করতেও মনে হয় তার খুব কষ্ট হলো।

মিসির আলি বললেন, শীত লাগছে?

হুঁ।

গায়ে লেপ দিয়ে দেব?

হুঁ।

মিসির আলি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। লেপ দিয়ে কি মেয়েটাকে ঢেকে দেবেন? শরীর তার প্রয়োজনের কথা জানাচ্ছে। এই প্রয়োজন কি মিটানো উচিত নয়? আমাদের যখন ক্ষিদে পায় শরীর সেটা জানান দেয়। তখন খাদ্য গ্ৰহণ করতে হয়। আঁখিতারার শরীর জানাচ্ছে তার শীত লাগছে। কাজেই তার শীত কমানোর ব্যবস্থা করাই তো যুক্তিযুক্ত। যদিও ডাক্তাররা বলেন–এই অবস্থায় গায়ে পানি ঢালতে হবে। প্রয়োজনে বরফ-মেশানো পানিতে বাথটাবে গলা পর্যন্ত ড়ুবিয়ে রাখতে হবে। ব্যাপারটা এমনও হতে পারে–জ্বরতপ্ত মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। নিউরোন এলোমেলো সিগন্যাল দেয়।

দরজার কড়া নড়ছে। কেউ একজন এসেছে। মিসির আলি স্বস্তিবোধ করলেন। যে এসেছে তার সঙ্গে পরামর্শ করা যাবে। বিপদের সময় নিজের বুদ্ধির ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। সে অন্যের বুদ্ধির দিকে তাকিয়ে থাকে।

কড়া নাড়ছিল মনসুর।

মিসির আলি দরজা খুলতেই সে বলল, জ্বর কার?

মিসির আলি বললেন, আমার একটা কাজের মেয়ে আছে, নাম আঁখিতারা। তার অসুখ। মিসির আলির একবারও মনে হলো না মনসুরের জানার কথা না জ্বর কার। প্রশ্নটা সে করল কীভাবে?

মনসুর বলল, জ্বর কি বেশি?

অনেক বেশি। কী করা যায় বলো তো?

মনসুর বলল, আপনি অস্থির হবেন না। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।

মিসির আলি স্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করলেন মনসুর ছেলেটা কাজের। সে অতিদ্রুত মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করল। পাঞ্জাবির পকেট থেকে একপাতা প্যারাসিটামল বের করে দুটা টেবলেট খাইয়ে দিল। মিসির আলি বললেন, তুমি অষুধ পকেটে নিয়ে ঘোরো নাকি?

মনসুর বলল, আমার মাথাধরা রোগ আছে। যখন-তখন মাথা ধরে। সঙ্গে অষুধ রাখতে হয়। স্যার, আপনার ঘরে কি থার্মোমিটার আছে?

না।

জ্বরটা দেখা দরকার। আপনি মাথায় পানি ঢালতে থাকুন, আমি চট করে একটা থার্মোমিটার কিনে নিয়ে আসি।

মনসুর ঘর থেকে বের হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই থার্মোমিটার নিয়ে ফিরে এলো। জ্বর মাপা হলো। একশ’ পাঁচ।

কারোর জ্বর একশ’ পাঁচ হতে পারে তা মিসির আলির ধারণার মধ্যেও নেই। মেয়েটির মুখ ছাইবৰ্ণ হয়ে গেছে। চোখ লাল টকটক করছে। মিসির আলি বললেন, মনসুর, এখন আমাদের করণীয় কী?

মনসুর বলল, আপনার করণীয় হলো চুপচাপ বসে থাকা। আমি বাকিটা দেখছি। সামান্য অসুখে এতটা নাৰ্ভাস হতে আমি কাউকে দেখিনি।

একশ’ পাঁচ জ্বর, এটাকে তুমি সামান্য বলছ?

ভাইরাসের জ্বর ধুমধাম করে বাড়ে। বাচ্চারা সামাল দিতে পারে। বয়স্ক মানুষের জন্য অসুবিধা হয়। স্যার, আপনি বসার ঘরে চুপচাপ বসে থাকুন। আমি যা করার করছি।

তুমি কী করবে?

প্ৰথমে আপনাকে কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াব। তারপর মেয়েটাকে বাথরুমে নিয়ে যাব। মাথায় চার-পাঁচ বালতি পানি ঢালব।

আমাকে চা খাওয়াতে হবে না। তুমি একজন ডাক্তার ডেকে আনো।

সকালে কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না। ডাক্তাররা প্ৰাইভেট রোগী দেখতে শুরু করেন বিকেলে। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি আঁখিতারার জ্বর নামিয়ে দিচ্ছি। বিকেলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। আপনি সিগারেট টানতে থাকুন। আমি এক ফাঁকে চা বানিয়ে দিয়ে যাব।

মিসির আলি বসার ঘরে এসে সিগারেট ধরালেন। মেয়েটাকে বাথরুমে নেওয়া হয়েছে এবং তার মাথায় বালতি বালতি পানি ঢালা হচ্ছে। একেকবার পানি ঢালা হচ্ছে মেয়েটা আর্তনাদের মতো করছে। মিসির আলি চমকে চমকে উঠছেন।

স্যার, চা নিন।

পানি ঢালার ফাঁকে ফাঁকে মনসুর চা বানিয়ে ফেলেছে। ছেলেটার কাজ করার ক্ষমতা আছে। মিসির আলি বললেন, জ্বর কি কিছু কমেছে?

মনসুর বলল, এখনো থার্মোমিটার দিয়ে মাপি নি। তবে কিছু নিশ্চয়ই কমেছে। চায়ে চিনি-টিনি সব ঠিক আছে কি-না দেখুন।

মিসির আলি চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। চিনি ঠিক আছে। যে রকম ঘন লিকার খেয়ে তিনি অভ্যস্ত সেই ঘনত্ব ঠিক আছে। মিসির আলি দ্বিতীয় সিগারেট ধরালেন। বাথরুমে পানি ঢালার শব্দ শুনতে শুনতে তিনি সিগারেট টানছেন। তার মাথায় কিছু প্রশ্ন চলে এসেছে। তিনি চাচ্ছেন না। এই মুহুর্তে প্রশ্নগুলি আসুক। কিন্তু প্রশ্নগুলি আসছে।

১. মনসুরকে তিনি মেয়েটির নাম বলেন নি। কিন্তু সে স্পষ্ট বলেছে আমি আঁখিতারার জ্বর নামিয়ে দিচ্ছি। নামটা সে জানল কীভাবে?

২ থার্মোমিটার আনার জন্য সে ছুটে ঘর থেকে বের হলো। থার্মোমিটার নিয়ে দু’মিনিটের মাথায় ফিরে এলো। আশপাশে কোনো ফার্মেসি নেই।

অষুধ যেমন তার পকেটে ছিল। থার্মোমিটারও কি পকেটে ছিল? অনেকেই অষুধ সঙ্গে নিয়ে ঘোরে। পকেটে থার্মোমিটার নিয়ে ক’জন আর ঘুরে? তারপরেও ধরে নেওয়া যাক মনসুর অল্প কিছু অদ্ভুত মানুষের একজন, যার স্বভাব পকেটে থার্মোমিটার নিয়ে ঘোরা। তাহলেও সমস্যা আছে। কেন সে বলল, থার্মোমিটার কিনে নিয়ে আসি? সে বলতে পারত। আমার সঙ্গে থার্মোমিটার আছে।

স্যার, আরেক কাপ চা খাবেন?

মিসির আলি বললেন, না। মেয়েটার অবস্থা কী?

অবস্থা ভালো না স্যার।

ভালো না মানে?

জ্বর নামে নি। হাসপাতালে ফেলে দিয়ে আসি?

মিসির আলি কঠিন গলায় বললেন, হাসপাতালে ফেলে দিয়ে আসি মানে! এটা কেমন কথা?

কথার কথা বলেছি। স্যার। শিশু হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেই। আমার জানাশোনা আছে অসুবিধা হবে না। একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে আসি। আপনি কি সঙ্গে যাবেন?

অবশ্যই আমি সঙ্গে যাব।

আপনি রেস্ট নিন, আমি ভর্তি করিয়ে আপনাকে খবর দিয়ে যাব। কোনো সমস্যা নেই।

আমার রেস্টের চেয়ে মেয়েটির চিকিৎসা অনেক বেশি প্রয়োজন। তুমি সময় নষ্ট না করে ট্যাক্সি, বেবিট্যাক্সি কী আনবে আনো।

মনসুর সিগারেট ধরাল। মিসির আলির দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলল, মেয়েটা বাঁচবে না।

মিসির আলি হতভম্ভ হয়ে বললেন, তুমি কী বলতে চাচ্ছ?

মনসুর আবেগশূন্য গলায় বলল, মেয়েটা বাঁচবে না।

তুমি কী করে বুঝলে?

স্যার, আমি ডাক্তার না। কিন্তু আমার কিছু ক্ষমতা আছে। আমি কিছু কিছু জিনিস আগে আগে বুঝতে পারি। আমি মৃত্যুর গন্ধ পাই। আপনাকে তো স্যার আগেও বলেছি আমার কিছু বিশেষ ক্ষমতা আছে। মৃত্যুর গন্ধ কেমন আপনাকে একটু ব্যাখ্যা করি।

কোনো ব্যাখ্যা করতে হবে না। তুমি মেয়েটকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করে।

এক কাপ চা খেয়ে নেই। স্যার? পাঁচ মিনিট লাগবে। পানি গরম দিয়েছি। আপনি আরেক কাপ খাবেন?

মিসির আলি জবাব দিলেন না।

তিনি মনসুরের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।

আঁখিতারাকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ডাক্তার এনে সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে দেখানোর ব্যবস্থা মনসুর অতি দ্রুত করে ফেলল। মিসির আলি তার কর্মক্ষমতার প্রশংসা না করে পারলেন না। সব কিছুই যেন তার হাতের মুঠোয়। সিস্টারদের সঙ্গে হাসিমুখে আপা আপা করে কথা বলছে। যেন কত দীর্ঘদিনের পরিচয়। এক ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার সময় ডাক্তারের বাড়ি মাদারীপুর শুনে মনসুর এমন ভঙ্গি করল যেন মাদারীপুর বাড়ি হওয়াটা বিস্ময়কর ঘটনা। এমন বিস্ময়কর ঘটনা শতাব্দীতে একটা-দুটার বেশি ঘটে না। গলা অন্যরকম করে সে দু’বার বলল ও, আচ্ছা আপনার বাড়ি মাদারীপুর। বলেন কি!

মিসির আলি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তিনি খানিকটা স্বস্তি পাচ্ছেন। চিকিৎসা শুরু হবে। ডাক্তাররা দেখবেন। দেশের ডাক্তারদের প্রতি তাঁর আস্থা আছে। আস্থার পেছনের লজিক হচ্ছে। এ দেশের সব ডাক্তারকেই অসংখ্য রোগী দেখতে হয়। রোগীর প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টের ওপর ডাক্তাররা তেমন ভরসা করেন না। কারণ প্যাথলজিক্যাল ল্যাবগুলির অবস্থা তারা জানেন। ডাক্তারদের নির্ভর করতে হয় অভিজ্ঞতার ওপর। লক্ষণ বিচার করে রোগ নির্ণয়ে তাদের দক্ষতা অসামান্য।

সব কমপ্লিট করে দিয়ে এসেছি স্যার।

বলতে বলতে সিগারেট হাতে মনসুর এসে তার সামনে দাঁড়াল। তাকে কেমন যেন হাসি-খুশি মনে হচ্ছে।

মনসুর সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, রোগীর যদি কিছু হয়ে যায় কেউ আমাদের দোষ দিতে পারবে না। আমরা প্রপার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের দিক থেকে কোনো ভুল নেই। রোগীর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে।

মিসির আলি বললেন, তুমি বারবার মৃত্যুর প্রসঙ্গ আনিছ কেন? মৃত্যু কেন হবে?

মানুষ তো স্যার অমর না। মানুষের মৃত্যু হয়। মানুষ মরণশীল।

তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

বলুন।

মিসির আলি বললেন, তুমি এত নিশ্চিত কীভাবে যে মেয়েটা মারা যাবে?

সব মানুষের মৃত্যুর ব্যাপারেই আমি নিশ্চিত। তবে আঁখিতারার মৃত্যু যে ঘনিয়ে এসেছে এটা বুঝতে পারছি।

আঁখিতারা মেয়েটাকে তুমি চিনতে?

জি না। আমি চিনিব কী করে? সে কাজ করে আপনার এখানে।

মিসির আলি বললেন, চৌধুরী খালেকুজ্জামান মিয়া কি তোমার আসল নাম? নাকি এটাও ছদ্মনাম?

চৌধুরী খালেকুজ্জামান মিয়া?

হ্যাঁ, চৌধুরী খালেকুজ্জামান মিয়া।

মনসুর সিগারেটে ঘন ঘন কয়েকটা টান দিয়ে সিগারেট ছুড়ে ফেলে সেই দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমার এই নাম আপনি কীভাবে জানলেন?

মিসির আলি বললেন, একেকজনের পদ্ধতি একেক রকম। তুমি একটা পদ্ধতিতে বের করেছ যে আঁখিতারা আজ রাতে মারা যাবে। আমি অন্য পদ্ধতিতে তোমার নাম-ধাম-পরিচয় বের করেছি। দু’জনের পদ্ধতি দু’রকম।

আমার নাম-ধাম-পরিচয় বের করেছেন?

হ্যাঁ, বের করেছি। আমার কথা কি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে?

বিশ্বাস হচ্ছে। স্যার, আসুন আমরা কোথাও বসে চা খাই। রেস্টুরেন্টে বসে চা খেতে কি আপনার আপত্তি আছে।

না, আপত্তি নেই।

মনসুর বলল, আমার নাম যে চৌধুরী খালেকুজ্জামান এই তথ্য আপনাকে কে দিল?

মিসির আলি বললেন, তুমিই দিয়েছ! অন্য কেউ দেয় নি।

আমি দিয়েছি?

হ্যাঁ তুমি দিয়েছ। কিভাবে দিয়েছ। শুনতে চাও?

না।

হাসপাতালের কাছাকাছি একটা চায়ের দোকানে দু’জন ঢুকল। চায়ের দোকানের মালিক মনসুরের দিকে তাকিয়ে আনন্দিত গলায় বলল, আরে ময়না ভাই। কেমন আছেন?

মনসুর জবাব দিল না। একবার শুধু আড়চোখে মিসির আলিকে দেখল। চৌধুরী খালেকুজ্জামানের আরেক নাম ময়না এটা জেনে মিসির আলির তেমন কোনো ভাবান্তর হলো না। রেস্টুরেন্ট ফাঁকা। যে তিনজন খদের চা-পাউরুটি খাচ্ছে তারা রেস্টুরেন্টের বাইরে বেঞ্চিতে বসে আছে। ভেতরে মানুষ বলতে তারা দু’জন এবং সাত-আট বছরের একটা ছেলে। ছেলেটা বেঞ্চির ওপর কান্নাকান্না মুখ করে বসে আছে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে মালিকের ছেলে। কোনো অপরাধ করায় কিছুক্ষণ আগে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তখন কান্নাকাটি করেছিল। চোখে পানির দাগ রয়ে গেছে। মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

দোকানের চা ভালো। এই ব্যাপারটা মিসির আলির খুব অদ্ভুত লাগে। নামিদামি রেস্টুরেন্টের চায়ের চেয়ে রাস্তার পাশের সস্তা দোকানগুলোর চা ভালো হয়। সম্ভবত চা বানানোর কোনো বিশেষ কায়দা আছে। বিশেষ কায়দাটা শিখে নিতে হবে।

মনসুর বলল, স্যার, আপনি মনে হয় ধরেই নিয়েছেন। আমি খারাপ লোক।

মিসির আলি বললেন, আমি আগেভাগে কিছু ধরে নেই না। তুমি আমার কাছে আসল নাম গোপন করেছ। নাম গোপন করলেই মানুষ খারাপ হয়ে যায় না। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষ নাম গোপন করতে ভালোবাসতেন। অন্য কোনো পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করতে চাইতেন। এই অস্বাভাবিকতা অনেকের ভেতর আছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের নাম গোপন করে নাম নিয়েছেন নীল লোহিত। বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ের আরেক নাম বনফুল।

মনসুর বলল, স্যার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় না, বলাই চাঁদও না। তবে আমি খারাপ লোক না।

আমি বলি নি তুমি খারাপ লোক। আমার কাজের মেয়েটার নাম যে আঁখিতারা এটা কীভাবে জানলে?

মনসুর তাকিয়ে আছে। চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। মনে হচ্ছে না। এই প্রশ্নের জবাব সে দেবে।

মিসির আলি বললেন, মেয়েটার জন্য থার্মোমিটার আনার কথা বলে তুমি দৌড় দিয়ে বের হলো। থার্মোমিটার তোমার পকেটেই ছিল। তুমি কি থার্মোমিটার পকেটে নিয়ে চলাফেরা করে?

জি।

কেন?

থার্মোমিটার দিয়ে আমি একটা মেন্টাল ম্যাজিক দেখাই। থার্মোমিটারের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি থার্মোমিটারের পারদ ওপরে উঠাতে পারি। আপনাকে এটা দেখাব বলে থার্মোমিটার সঙ্গে করে এনেছিলাম।

দেখি তোমার এই খেলাটা।

থার্মোমিটার। আপনার বাসায় রেখে এসেছি। আপনি সত্যি দেখতে চান?

হ্যাঁ, দেখতে চাই।

আমি থার্মোমিটার একটা কিনে নিয়ে আসি। দু’মিনিট লাগবে। আপনি আরেক কাপ চা নিন। চা শেষ করার আগেই আমি চলে আসব।

মিসির আলি দ্বিতীয় কাপ চা শেষ করার পরেও আরো আধঘণ্টা বসে রইলেন। মনসুর ফিরল না। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। আঁখিতারার খোঁজ নেওয়ার জন্য হাসপাতালে যাওয়া দরকার। মনসুরকে নিয়ে এই মুহুর্তে কিছু না ভাবলেও চলবে। মিসির আলি চায়ের দাম দিতে গেলেন। রেস্টুরেন্টের মালিক খুবই অবাক হয়ে বলল, আপনে ময়না ভাইয়ের লোক, আপনার কাছে থাইক্যা চায়ের দাম নিব এইটা কেমন কথা!

ময়না ভাই এই মানুষটার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কেন গুরুত্বপূর্ণ কে জানে। জানতে ইচ্ছা করছে না। কোনো সমস্যা মাথার ভেতর ঘুরপাক থাক তা চাচ্ছেন না। তাঁর নিজেরই শরীর খারাপ লাগছে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকলে ভালো হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *