০৩. মেয়ের নাম আঁখিতারা

মেয়ের নাম আঁখিতারা।

নেত্রকোনার অতি অজপাড়াগাঁর মেয়ের জন্য খুবই আধুনিক নাম। বয়স দশ থেকে এগারো। শশকের মতো ভীত চোখ। মিসির আলি ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেললেন। তার কাছে মনে হলো মেয়েটি রবীন্দ্ৰনাথের ‘পোস্টমাস্টার’-এর মেয়েটির চেয়েও অসহায়। ‘পোস্টমাস্টার’-এর মেয়ে ছিল নিজের গ্রামে। এই মেয়েটি হঠাৎ উঠে এসেছে অতি আধুনিক এক শহরে। আজমল সাহেব মিসির

মেয়েটির ভয় কাটানো দরকার। এমন কি তাকে বলা দরকার যা শোনামাত্র তার ভয় কেটে যায়। এই ঘর তার নিজের ঘর বলে মনে হতে থাকে। মিসির আলি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ভয় লাগছে গো মা?

মেয়েটি সামান্য চমকাল। মিসির আলি তার চোখ দেখেই বুঝলেন মেয়েটির প্ৰাথমিক ভয় কেটে গেছে। মিসির আলি বললেন, আঁখিতারা, শোনো, তোমার যখনই দেশের বাড়িতে চলে যেতে ইচ্ছা করবে। আমি তখনই তোমাকে পাঠিয়ে দেব। এখন কি তোমার বাবা-মার কাছে চলে যেতে ইচ্ছা করছে?

আঁখিতারা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

মিসির আলি বললেন, আচ্ছা, আজ সন্ধ্যার মধ্যে তোমাকে দেশে পাঠিয়ে দেব। আজমল সাহেবকে বলে এর মধ্যে একজন কাউকে জোগাড় করব যে তোমাকে দেশের বাড়িতে দিয়ে আসবে। কেউ মনে কষ্ট নিয়ে আমার সামনে হাঁটাহাঁটি করলে আমার ভালো লাগে না। আঁখিতারা, তুমি কি ডাল-ভাত এইসব রাধতে পারো?

পারি।

আমার খুবই ক্ষিদে লেগেছে। গ্যাসের চুলা কীভাবে ধরায় তোমাকে দেখিয়ে দেই। তুমি আমাদের দু’জনের জন্য ডাল-ভাত রান্না করে ফেলো।

আঁখিতারা হ্যাসূচক ভঙ্গিতে ঘাড় কাত করল।

ডিম রান্না করতে পারে?

পারি।

একসেলেন্ট, ঘরে ডিম আছে। ডিমের ঝোল রান্না করো। আজ সকাল থেকে কেন জানি ডিমের ঝোল খেতে ইচ্ছা করছে।

মেয়েটি তার ছোট্ট পুটলি এক পাশে রেখে রান্না শুরু করল। মিসির আলি লক্ষ্য করলেন মেয়েটির চোখ চাপা আগ্রহে চকচক করছে। তার মুখ থেকে শঙ্কার ভাব অনেকটাই চলে গেছে। বেচারির বোধহয় খুব ক্ষিদে লেগেছে। রান্নার আগ্রহটা সেই কারণে।

দুপুরে মিসির আলি তাকে নিয়ে খেতে বসলেন। বেগুন দিয়ে ডিমের ঝোল রান্না হয়েছে। তরকারির রঙ দেখে মনে হচ্ছে খেতে ভালো হয়েছে। আঁখিতারা একটা মাত্র ডিম রান্না করেছে। মিসির আলি বললেন, ডিম একটা কেন?

আঁখিতারা ভয়ে ভয়ে বলল, আপনার জন্য রানছি।

তুমি ডিম খাও না?

আঁখিতারা নিচু গলায় বলল, খাই।

মিসির আলি ডিমটা সমান করে দু’ভাগ করে একটি ভাগ মেয়েটির থালায় তুলে দিলেন। এবং গভীর বেদনায় লক্ষ করলেন মেয়েটির চোখে পানি এসে গেছে। বোধ হয় বেচারীকে কেউ কোনোদিন আদর করে পাতে কিছু তুলে দেয়নি।

আঁখিতারা, তোমার রান্না খুব ভালো হয়েছে। তুমি আরাম করে খাও। খেয়ে বিশ্রাম করো। সন্ধ্যাবেলা আমি তোমাকে তোমার দেশে পাঠিয়ে দেব। মেয়েটি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

দুপুরের খাবারের পর কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকা মিসির আলির অনেক দিনের অভ্যাস। আগে ঘুমাতেন না। ইদানীং ঘুম এসে যায়। ঘুম ভাঙার পর খুবই অস্বস্তি লাগে। কিছুদিন থেকে তিনি চেষ্টা করছেন দুপুরে না ঘুমাতে। এই সময় জটিল ধরনের কিছু বই নিয়ে বসেন। বইয়ের জটিলতার ভেতর একবার ঢুকে পড়লে ঘুম কেটে যায়। ঘুম কাটানোর ওষুধ হিসেবে সায়েন্স অ্যান্ড প্যারাডক্স বইটা খুব কাজ করছে। আজও তাই করেছেন। তবে আজ সায়েন্স অ্যান্ড প্যারাডক্স বইটির সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিসে আসা মফস্বলের একটা পত্রিকাও আছে। প্রেরকের নাম–মনসুর। মেন্টাল ম্যাজিকের যুবক। মিসির আলি ঠিক করেছেন বিজ্ঞানের বই পড়ার পর ঘুম যখন পুরোপুরি কাটবে তখন পত্রিকা নেড়েচেড়ে দেখবেন।

আপনার মাথায় তেল দিয়া দিব?

মিসির আলি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। আঁখিতারা সঙ্কুচির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বললেন, লাগবে না। আমি মাথায় তেল দেই না।

আঁখিতারা বলল, আমি যাব না। আমি আপনার সাথে থাকব।

আচ্ছা, ঠিক আছে।

আমি কোন ঘরে থাকিব?

মিসির আলি আঙুল দিয়ে ঘর দেখিয়ে দিলেন। আঁখিতারা বলল, আপনারে আমি কী ডাকব?

তোমার যা ডাকতে ইচ্ছা করে ডাকবে। কোনো অসুবিধা নেই।

বড় বাবা ডাকি? এত কিছু থাকতে বড় বাবা ডাকতে চাও কেন? মেয়েটা জবাব দিল না। পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেঝেতে নকশা করতে লাগল। মিসির আলি বললেন, বড় বাবা ডাকটা খারাপ না; ডাকো, বড় বাবা ডাকো।

আঁখিতারা সামনে থেকে চলে গেল। মিসির আলি কুরিয়ার সার্ভিসে আসা প্যাকেট খুললেন। মফস্বল পত্রিকা। পত্রিকার নাম সোনার বাংলা। প্রথম পৃষ্ঠাতেই লেখা অনিয়মিত পাক্ষিক। পত্রিকার মালিকই যেখানে ঘোষণা করেন। অনিয়মিত তখন বোঝা যায়। এই পাক্ষিক হঠাৎ হঠাৎ বের হয়। ছয় পাতার পত্রিকার তিন পাতাই সাহিত্যে নিবেদন। কবিতা, গল্প, রম্যরচনা। এক পাতা সিনেমা সংক্রান্তহলিউড-বিচিত্রা, ঢালিউড-বিচিত্রা। পাতাটি সচিত্ৰ। নায়ক-নায়িকাদের ছবি আছে। কোনো ছবি দেখেই বোঝার উপায় নেই ছবিটা কার। পত্রিকার প্রথম পাড়ার লিড নিউজ–

স্বামী-পুত্ৰ হস্তারক স্ত্রী
নিজস্ব সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, রাবেয়া খন্দকার ওরফে রেবু হিংসার বশবতী হয়ে স্বামী-পুত্ৰকে হত্যা করেছে। হিংসার কারণ রেবুর স্বামীর আপনি চাচীর সঙ্গে অবৈধ প্ৰেম। নিজস্ব সংবাদদাতা অবৈধ প্রেমের অংশটি যত্ন করে লিখেছেন। ভাতিজা নিশিরাতে চাচীর সঙ্গে কোথায় কোথায় মিলিত হতেন তার বিবরণ আছে। দীর্ঘ দুই কলামের সংবাদ। সংবাদের শেষে লেখা–

‘আগামী সংখ্যায়। চাচী-ভাতিজার অবৈধ প্ৰণয় বিষয়ে আরো বিস্তারিতভাবে লেখা হইবে।’

ছয় পাতার পুরো কাগজটা মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে পড়লেন। সাহিত্য অংশও বাদ দিলেন না। চৌধুরী খালেকুজ্জামান মিয়ার লেখা ছোটগল্প পড়লেন। একটি রম্যরচনা পড়লেন। লেখক সেখানে ছদ্মনাম নিয়েছেন চৌখামি। এই চৌখামি যে চৌধুরী খালেকুজ্জামান সেটা বোঝা যাচ্ছে। ইনিই পত্রিকার সম্পাদক এবং মুদ্রাকর।

সোনার বাংলা পত্রিকার সঙ্গে একটি হাতে লেখা চিঠিও আছে। চিঠিটি লিখেছে মনসুর।

পরম শ্রদ্ধাভাজন
জনাব মিসির আলি। সোনার বাংলা পত্রিকাটা পাঠালাম। রেবুর খবরটা প্ৰথম পাতায় আছে। আপনি খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন রাবেয়া খোন্দকারই রেবু।

মেয়েটি অতি ভয়ানক। আপনার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা আছে। আমি ভয় পাচ্ছি। সে আপনার কোনো ক্ষতি না করে ফেলে।

আমি আপনাকে অত্যন্ত পছন্দ করি। মানুষকে বেশি পছন্দ করা ঠিক না। হয়তোবা বেশি পছন্দের কারণেই আপনার সঙ্গে কখনো আমার সম্পর্ক হবে না। আপনাকে সাবধান করতে চাচ্ছি। সাবধান হোন।

ঐদিন মেন্টাল ম্যাজিকের নাম করে আপনাকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেছি।

এই ক্ষমতা আমার সত্যি সত্যি আছে। বিশেষ বিশেষ সময়ে সেটা বোঝা যায়। যদি কখনো বিশেষ সময় এসে উপস্থিত হয় আপনাকে ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে যাব। তখন হয়তোবা আপনি আমার আগের

অপরাধ ক্ষমা করবেন।

ইতি
মনসুর।

চিঠিতে তারিখ নেই। ঠিকানা নেই। কোনো বানান ভুল নেই। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এই চিঠি আগে একবার ড্রাফট করা হয়েছে, তারপর সেই ড্রাফট দেখে দেখে কপি করা হয়েছে। সরাসরি লেখা চিঠি এবং কপি করা চিঠি সহজেই বোঝা যায়। কপি করার সময় মূল চিঠি পড়তে হয়। একটি লাইন পড়ে শেষ করে লেখায় আসতে হয়। যে কারণেই ড্রাফট করা চিঠির প্রতি লাইনের শুরুর শব্দটা লেখা হয় সাবধানে।

মিসির আলি ভুরু কুঁচকালেন। মনসুর নামের ছেলেটা ড্রাফট করার পর তাকে চিঠি লিখছে নাকি সরাসরি লিখছে এটা কোনোই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না। তাকে নিয়ে গবেষণা করার মতো কিছু ঘটেনি। তবুও তার বিষয়ে জানা তথ্যগুলি মাথার ভিতরে সাজিয়ে রাখতে দোষ নেই।

নাম : মনসুর (নকল নাম হওয়ার সম্ভাবনা!)

স্বভাব : ???

স্বভাব সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার কোনো ধারণা তৈরি হয় নি। সময় লাগবে। অনেক সময় লাগবে। মিসির আলি চোখ বন্ধ করলেন। পাশের ঘর থেকে খুটাখুটি শব্দ হচ্ছে। আঁখিতারা নামের মেয়েটা হয়তো নিজের ঘর গুছাচ্ছে। ঝাড়ুর শব্দও পাওয়া গেল। মনসুর প্রসঙ্গ থাক। মেয়েটাকে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবা যাক। মেয়েটা কেমন, কোন ধরনের পরিবার থেকে এসেছে–এইসব। পরে মিলিয়ে দেখা যাবে তাঁর অনুমান কতটুকু শুদ্ধ। এটা এক ধরনের খেলা। মানুষ দুটা সময়ে খেলতে পছন্দ করে। শৈশবে এবং বৃদ্ধ বয়সে। শৈশবে খেলার সঙ্গী জুটে যায়। বৃদ্ধ বয়সে কাউকে পাওয়া যায় না। তখন খেলতে হয় নিজের মনের সঙ্গে।

আঁখিতারার বিষয়ে মিসির আলি অনুমান করতে শুরু করলেন—

১. মেয়েটা দুঃখী। (এই বিষয়টা অনুমান করতে চিন্তাশক্তির প্রয়োজন হয় না। যে মেয়ে গ্রাম থেকে শহরে কাজ করতে এসেছে সে দুঃখী হবেই।)

২. মেয়েটির বাবা নেই। (এই অনুমানও সহজ অনুমান। বাবা জীবিত অবস্থায় এমন ফুটফুটে একটা মেয়েকে শহরে কাজ করতে পাঠাবেন না।)

৩. মেয়েটি তার নিজের সংসারে বাস করে না। আশ্রিত। (একমাত্র আশ্রিতরাই সামান্য আদরে অভিভূত হয়। তিনি অর্ধেকটা ডিম তার পাতে তুলে দিয়েছেন। এতেই তার চোখে পানি এসে গেছে। যে মেয়ে নিজের সংসারে থাকে। সে আব্দর পেয়ে অভ্যস্ত।)

মিসির আলির চিন্তা বাধাগ্ৰস্ত হয়েছে। আঁখিতারা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে ঠিক আগের মতো করেই বলল, মাথায় তেল দিয়া দেই?

মিসির আলি বললেন, তোমাকে তো আমি একবার বলেছি আমি মাথায় তেল দেই না।

মেয়েটি তারপরেও মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। সে মনে হয় মাথায় তেল দিয়েই ছাড়বে। গ্রামের বাচ্চা একটা মেয়ের তুলনায় জেদ তো ভালোই আছে।

মিসির আলি বললেন, আঁখিতারা, শোনো। তুমি কি তোমার বড় বাবার মাথায় রোজ তেল দিয়ে দিতে?

মেয়েটি খুবই বিস্মিত হলো। অবাক হয়ে মিসির আলির দিকে তাকিয়ে রইল।

মিসির আলি বললেন, কীভাবে বললাম জানো? তুমি আমাকে বড় বাবা ডাকছি। আমার মাথায় তেল দিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। খুব সহজ অনুমান। আচ্ছা, শোনো, তোমার বাবা কি মারা গেছেন না বেঁচে আছেন?

বাঁইচা আছেন।

তুমি কি তোমার বাবার সঙ্গে থাকো?

হুঁ।

তোমার সঙ্গে আর কে থাকে?

আমরা তিন ভইন আর বড় বাবা।

মিসির আলি বললেন, যাও, তেল নিয়ে এসে তেল দাও। কী তেল দেবে? ঘরে তো সয়াবিন তেল ছাড়া কোনো তেল নেই। সয়াবিন তেল কি মাথায় দেয়া যায়?

নারিকেল তেল দিমু। আমি সাথে কইরা আনছি।

তুমি তো দেখি খুবই গোছানো মেয়ে!

মিসির আলির মেজাজ, সামান্য খারাপ হয়েছে। মেয়েটির ব্যাপারে তার বেশিরভাগ অনুমানই ঠিক হয় নি। কেমন কথা? তিনি কি আগের মতো চিন্তা করতে পারছেন না? বৃদ্ধ বয়সের স্থবিরতা তাঁকে গ্রাস করছে? এগিয়ে আসছে মহাশক্তিধর জরা?

মাথায় তেল দেওয়ার ব্যাপারটা এত আরামদায়ক তা তিনি জানতেন না। শারীরিক আরাম পেয়ে তার অভ্যাস নেই। কেউ একজন আরাম দিচ্ছে। আরাম নিতে অস্বস্তি লাগছে। সেই অস্বস্তিটা কাটাতে পারছেন না। কিন্তু আরামটা অগ্রাহ্য করতে পারছেন না। আঁখিতারা মাথায় তেল দিতে দিতে টুকটুক করে কথা বলছে। কথাগুলি যে পরিষ্কার কানে আসছে তা না। তিনি কিছু শুনছেন। কিছু শুনছেন না। মাঝে মাঝে ই হাঁ করে যাচ্ছেন। কথার পিঠে কথা বলছেন। তাকে কথা না বললেও চলত। আঁখিতারা মিসির আলির জন্য অপেক্ষা করছে না। নিজের মনেই কথা বলছে।

আমার ব্যাপজান বাদাইম্যা।

বাদাইম্যাটা কী?

ঘর থাইক্যা চইল্যা যায়, ফিরে না। এক মাস, দুই মাস, তিন মাস পরে ফিরে। চাইর-পাঁচ দিন থাকে, আবার চইল্যা যায়।

সংসার চলে কীভাবে?

চলে না। মা চিড়া কুটে, মুড়ি ভাজে, মুড়ি-লাডভু বানায়। আমি লুচি-লাডভু বানাইতে পারি। আমাকে ভেলিগুড় আইন্যা দিয়েন।

ভেলিগুড়টা কী?

ভেলিগুড় চিনেন না?

না।

কুষার থাইক্যা হয়। কুষার চিনেন?

না।

ইক্ষু চিনেন?

হুঁ। এখন বুঝেছি। আখের গুড়।

আমরা চাইর ভাইনের মধ্যে সবচাইতে সুন্দর যে জন তার নাম নয়নতারা। আমার বড়। তিন বছরের বড়।

তোমাদের সব বোনের নামের শেষেই তারা আছে নাকি?

হুঁ। আমার পরেরটার নাম স্বৰ্ণতারা, তার পরের জনের নাম লজ্জাতারা।

তোমরা দেখি তারা-পরিবার। ভাই হলে কী নাম হতো?

বাপজান সেইটাও ঠিক কইরা রাখছে। ভাই হইলে নাম হইত। তারা মিয়া। হি হি হি…

আঁখিতারার হাসির মধ্যেই মিসির আলি ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যেও তাঁর চেতনার কিছু অংশ কাজ করতে লাগল। তিনি স্বপ্নে দেখছেন নৌকায় করে কোথাও যেন যাচ্ছেন। নৌকা খুব দুলছে। নৌকায় কোনো মাঝি নেই। অথচ নৌকা ঠিকই যাচ্ছে। স্বপ্নের ভেতরও তিনি চিন্তিত বোধ করছেন। মাঝি নেই, নৌকা চলছে কীভাবে? স্রোতের অনুকূলে যাচ্ছে? নাকি নৌকায় পাল আছে? পালের নৌকার তো এত দ্রুত যাওয়ার কথা না। নাকি এটা ইনজিনের নৌকা? ইনজিনের নৌকা হলে ভটভট আওয়াজ আসত। কোনো আওয়াজ নেই। শুধুই ঝড়ের শব্দ।

মিসির আলির ঘুম ভাঙল ঠিক সন্ধ্যায়। দুপুরে এত লম্বা ঘুম তিনি এর আগে ঘুমান নি। অসময়ের লম্বা ঘুম শরীর আউলে ফেলে, মাথায় ভোঁতা। যন্ত্রণা হয়। তার হচ্ছে। মাথার এই যন্ত্রণা কমানোর জন্য আবার ঘুমিয়ে পড়তে হয়। ঘুমের যন্ত্রণা ঘুম দিয়ে সারানো।

রান্নাঘরে খুঁটিখাট শব্দ হচ্ছে। আঁখিতারা মনে হয় রান্নাবান্নায় লেগে গেছে। তাকে কয়েকটা জিনিস শেখাতে হবে। চা বানানো। নানা রকম চা। দুধ চা, লিকার চা, আদা চা, মসলা চা, ঠাণ্ডা। চা।

রাত ন’টার দিকে বাড়িওয়ালা আজমল সাহেব বেড়াতে এলেন। তাঁর আসার প্ৰধান উদ্দেশ্য আঁখিতারা কাজকর্ম কেমন করছে খোঁজ নেওয়া। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, কাজের মেয়ে রাখতে হয় মারের ওপর। সকালে একটা থাপ্পড় দেবেন, সারাদিন ভালো থাকবে। মাগরেবের নামাজের পর আবার থাপ্নড়, রাতটা আরামে কাটবে।

মিসির আলি বললেন, মেয়েটা ভালো, থাপ্পড় দিতে হবে বলে মনে হয় না। আজমল সাহেব বললেন, গ্রামের পিচকা মেয়ে কখনো ভালো হয় না। মায়ের পেট থেকে এরা যখন বের হয় তাদের ভালো জিনিস সব মায়ের পেটে রেখে দিয়ে বের হয়। রান্নাবান্না কিছু জানে?

মনে হয় জানে।

রেবুর কাছে পাঠিয়ে দেবেন? দু-একটা আইটেম শিখিয়ে দেবে।

রেবু রান্না জানে?

খুব ভালো রান্না জানে। তার হাতে চিতলের পেটি খেলে বাকি জীবন মনে থাকবে।

মিসির আলি বললেন, রেবুর ভালো নাম কি রাবেয়া? আজমল সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ভালো নাম রাবেয়া হবে কোন দুঃখে। ভালো নাম শেফালী। রেবু কি বলেছে তার ভালো নাম রাবেয়া?

না।

বলতেও পারে। মাথা ঠিক নাই। কখন কী বলে নিজেও জানে না। আপনাকে বলে নাই তো তার বিবাহ হয়েছে? স্বামী তালাক দিয়ে চলে গেছে?

জি না, এ রকম কিছু বলে নাই।

আজমল সাহেব দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, পাগলামি এমন এক অসুখ একবার হয়ে গেলে কখনো পুরোপুরি সারে না। অসুখের বীজ থেকেই যায়। ঠিকমতো আলো-হাওয়া পেলে বীজ থেকে গাছ হয়ে যায়? ঠিক বলেছি না ভাই সাহেব।

মিসির আলি কিছু বললেন না। আজমল সাহেব হতাশ গলায় বললেন, গত বৃহস্পতিবার সে তার মামীর সঙ্গে আপনাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলেছে।

মিসির আলি বললেন, কী বলেছে?

বলেছে, আপনি নাকি তাকে বলেছেন, দুদিন পরপর তোমাকে দেখার জন্য পাত্ৰ পক্ষের লোকজন আসে। পছন্দ হয় না বলে ফিরত যায়। এত ঝামেলার দরকার কী? আমাকে বিয়ে করে ফেলো। তার মামী আবার তার কথা বিশ্বাসও করে ফেলেছে। মেয়েরা এই জাতীয় কথা দ্রুত বিশ্বাস করে। আমার কানে যখন কথাটা আসল আমি রেবুকে ডেকে কষে এক চড় লাগালাম। রেবু সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করল যে মজা করার জন্য বানিয়ে বানিয়ে এইসব বলেছে।

বলেন কী!

আজমল সাহেব দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, সাধারণ মানুষের কথা এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিতে হয়। পাগলের কথা যে কান দিয়ে শুনবেন সেই কান দিয়েই বের করবেন। এক কান থেকে আরেক কানে যাওয়ার সময় দেবেন না, বুঝেছেন?

মিসির আলি মাথা নেড়ে জানালেন যে বুঝেছেন। আজমল সাহেব হঠাৎ প্ৰসঙ্গ পরিবর্তন করে বললেন, আপনি কি খাজা বাবার ডাক পেয়েছেন?

মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, কার ডাক?

খাজা বাবার, উনার ডাক পেয়েছেন?

আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না।

আজমল সাহেব বললেন, খাজা বাবা আজমীর থেকে না ডাকলে কেউ আজমীর শরিফ যেতে পারে না। আপনি কখনো আজমীর শরীফে গিয়েছেন?

জি না।

তার মানে ডাক পান নাই। আমি আগামী নভেম্বরে ইনশাল্লাহ। আজমীর যাব। চলেন আমার সঙ্গে। যাবতীয় খরচ আমার। ট্রেনে উঠে যদি একটা পান খেতে ইচ্ছা করে সেই পানটাও আমি কিনে দেব।

মিসির আলি জবাব দিলেন না। আজমল সাহেব বললেন, কথা ফাইনাল। না। করবেন না। আমি দু-তিন বছর অন্তর একবার করে খাজা বাবার কাছে। যাই। সমস্যা নিয়ে যাই। উনার রওজা মোবারকে উপস্থিত হয়ে সমস্যার ফানা চাই। উনি ব্যবস্থা করেন। আজ পর্যন্ত তার কাছে গিয়ে খালি হাতে ফিরত আসিনি।

এইবার কী সমস্যা নিয়ে যাচ্ছেন?

রেবুর সমস্যা নিয়ে যাচ্ছি। তার মাথাটা যেন ঠিক হয়ে যায়। তার একটা ভালো বিবাহ যেন দিতে পারি। ভাইজান, অনেক কথা বলে ফেললাম। আজমীরের ব্যাপারটা যেন মনে থাকে। জবান যখন দিয়ে ফেলেছি তখন আপনাকে নিয়ে যাবই। আর আমার পীর ভাই-এর সঙ্গেও আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিব। কথা বললেই বুঝবেন ইনি এই দুনিয়ার মানুষ না। উনাকে আপনার কথা বলেছি। উনিও আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।

আজমল সাহেব উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই মনসুরের আসল নাম কি মিসির আলি ধরে ফেললেন। আজমল সাহেবের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে মনসুরের আসল নামের কোনো সম্পর্ক নেই। তবু নামের ব্যাপারটা পরিষ্কার হওয়ার ঘটনা। এই সময়ই ঘটল।

মনসুরের আসল নাম চৌধুরী খালেকুজ্জামান মিয়া। সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক। চৌধুরী খালেকুজ্জামান মিয়ার লেখা–সম্পাদকীয়, গল্প এবং রম্যরচনা তিনটিতেই বিশেষ একটা শব্দ দিয়ে বাক্য শুরুর প্রবণতা আছে। শব্দটা হলো ‘হয়তোবা’। মনসুর তাকে যে চিঠি লিখেছে সেই চিঠিতেও দুটি বাক্য শুরু হয়েছে হয়তোবা দিয়ে।

সোনার বাংলা পত্রিকার প্ৰিন্টার্স লাইনে পত্রিকার ডিক্লারেশন নাম্বার, রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার সবই দেওয়া। বাংলাদেশ সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন-এ টেলিফোন করলে চৌধুরী খালেকুজ্জামান মিয়ার সব খবর বের হয়ে আসবে। ছোট্ট একটা জটি খুললে অনেকগুলি জট খুলে যায়।

রান্নাঘর থেকে আঁখিতারা উকি দিচ্ছে। মিসির আলি বললেন, আঁখিতারা, চা, বানাতে পারে?

আঁখিতারা হাসি মুখে বলল, পারি।

কোথায় শিখেছি?

বাপজান খুব চা খায়।

কড়া করে এক কাপ চা বানাও। চিনি দেবে এক চামচ। সমান সমান করে এক চামচ দেবে কনডেন্সড মিল্ক।

আঁখিতারা অতিদ্রুত চা বানিয়ে নিল। কাপে একটা চুমুক দিয়েই মিসির আলি বললেন, আজ থেকে তোমার নাম চা-কন্যা। আমি এত ভালো চা আমার জীবনে খাই নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *