তিনি

তিনি

ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কাছাকাছি। জুলফির চুল সব পাকা। মাথার চুলও পাকা, তবে কলপ দেবার অভ্যাস আছে। কলপের কারণে মাথার চুল কাচা মনে হচ্ছে, যদিও চুলের গোড়া সাদা হয়ে আছে। তার পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রঙ সামান্য হলুদ। কাপড়ের রঙের ভাষায় একেই সম্ভবত অফ হোয়াইট বলে। গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে একটু লম্বা। গায়ের রঙ গৌছ। মুখমণ্ডলে চারকোণা ভাব আছে। পশ্চিমবঙ্গের ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চেহারার সঙ্গে তার চেহারার ভালো মিল আছে। তবে এই ভদ্রলোক সুনীলের মতো সুলকায় না। ভদ্রলোকের চোখে মেটালিক ফ্রেমের চশমা। চশমার কাচ তেমন ভারি না। কাচের ভেতর দিয়ে তার চোখ দেখা যাচ্ছে। চোখে ভরসা হারানো দৃষ্টি।

ভদ্রলোকের বড় ধরনের একটা সমস্যা হয়েছে। তিনি কিছুই মনে করতে পারছেন না। তিনি দাড়িয়ে আছেন এলিফ্যান্ট রোডের চশমার দোকানের সামনে। তার পাশে একটা লোক পেয়ারা বিক্রি করছে। রাস্তায় এবং ফুটপাথে প্রচুর ভিড়। খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থেকে তিনি লোক চলাচলের অসুবিধা করছেন। পেয়ারওয়ালার দিকে একটু সরে গেলেন এবং বিস্ময়ের সঙ্গে চারপাশ দেখতে লাগলেন।

মানুষের সাময়িক ব্ল্যাকআউট হয়। ব্লাভপ্রেসার বেড়ে গেলে হয়। রক্তের সুগার বা অক্সিজেন কমে গেলে হয়। কিন্তু তার হয়েছেটা কী? স্থায়ী ব্ল্যাকআউট হয়ে গেছে? তিনি তার নাম মনে করতে পারছেন না। বাসা কোথায় মনে করতে পারছেন না। এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন এবং কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন তাও মনে করতে পারছেন না। আতঙ্কে অস্থির হয়ে যাবার মতো ব্যাপার ঘটেছে। তবে তিনি এখনো। অস্থির হন নি। পুরো ঘটনায় বিস্ময় বোধেই অভিভূত হয়েছেন। তার চিন্তাশক্তি যে কাজ করছে এতেই তিনি খানিকটা আশ্বস্ত বোধ করছেন। তার নিজেকে বুদ্ধিমান মানুষ বলে মনে হচ্ছে। একজন বুদ্ধিমান মানুষ নিজেকে খুঁজে পাবেই। তিনি পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিলেন। পকেটে মানিব্যাগ থাকবে। একটা মোবাইল টেলিফোন থাকবে। যেখান থেকে ঠিকানা বের করা তিন-চার মিনিটের ব্যাপার।

পকেটে মোবাইল নেই, মানিব্যাগও নেই। একটা রুমাল আছে। বাম পকেটে কিছু টাকা পাওয়া গেল–দুশ তেত্রিশ টাকা। টাকাটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। টাকার সঙ্গে একটা ছোট্ট কাগজে লেখা রসমালাই। তিনি কি দুইশ তেত্রিশ টাকা নিয়ে রসমালাই কিনতে বের হয়েছেন? তাহলে তো তার মিষ্টির দোকানের সামনে থাকার কথা। এখানে আশেপাশে কোনো মিষ্টির দোকান নেই। সারি সারি জুতার দোকান।

তার কাছে একটা মানিব্যাগ কেন থাকবে না? এটা হতে পারে তিনি মানিব্যাগ গাড়িতে ফেলে এসেছেন। হয়তো তার গাড়ি আছে। গাড়ির পেছনের সিটে মানিব্যাগ এবং মোবাইল পড়ে আছে।

একটু দূরে তিন-চারটা গাড়ি পার্ক করা। এর কোনো একটা কি তার? একটা প্রায় নতুন পাজেরো গাড়ি দেখা যাচ্ছে। পাজেরো গাড়িটা কি তার? যার একটা এত বড় পাজেরো গাড়ি থাকবে সে দুইশ তেত্রিশ টাকা রাবার ব্যান্ডে বেঁধে পকেটে রেখে ঘুরবে না। তবে পয়সাওয়ালা লোকদের মধ্যে নানান একসেনট্রিসিটি থাকে। তার মধ্যেও হয়তো আছে। তিনি গাড়িগুলির দিকে এগুলেন। কোনো গাড়ির ড্রাইভার এগিয়ে এল না। তিনি পেয়ারাওয়ালার কাছে ফিরে গেলেন। নতুন পৃথিবীতে পেয়ারাওয়ালাটাকেই তার আপন মনে হচ্ছে। যদিও লোকটা নোংরা, যে পানিতে পেয়ারা ধুচ্ছে সেটা নোংরা কুচকুচে কালো। পানি। ধারালো একটা ছুরি দিয়ে কচকচ করে সে পেয়ারা কাটছে। ছুরিটা ঝকঝক করছে। খবরের কাগজের কাটা অংশে বিট লবণ মাখিয়ে পেয়ারা দিচ্ছে, সেই কাগজও নোংরা। মনে হয় রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছে।

পেয়ারা কত করে?

পাঁচ টাকা পিস।

বড়টাও পাঁচ টাকা ছোটটাও পাঁচ টাকা?

সব একর। কোনটা নিবেন বলেন কাইটা দেই।

তিনি সময় নিয়ে পেয়ারা বাছলেন, প্রধান কারণ কিছু সময় কাটানো। এর মধ্যে যদি ঝট করে সবকিছু মনে পড়ে। তাছাড়া তার মন বলছে তার এখানেই থাকা উচিত। কেউ তার খোঁজে এলে এখানেই আসবে।

বিট লবণ দিয়ে বেশ আগ্রহ করে তিনি পেয়ারা খেলেন। পেয়ারাগুলি ভালো। বাসার জন্যে কিছু নিয়ে গেলে হয়। সমস্যা একটাই–বাসা কোথায় তিনি জানেন। বাসায় কে কে আছে তাও জানেন না। তাদের চেহারা কেমন কে জানে? নিজের চেহারাও দেখতে ইচ্ছা করছে। সেটা কোনো সমস্যা না। চশমার দোকানে ঢুকে পড়েলেই হলো। চশমার দোকানে ঢোকার প্রয়োজনও আছে। হয়তো তিনি চশমার অর্ডার দিতে এসেছিলেন। তা না হলে চশমার দোকানগুলির সামনে দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন? তার চশমার ফ্রেমটাও এদের দেখানো দরকার। যদি চশমার ফ্রেম দামি হয় তাহলে নিজের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে একটা ধারণা হবে। সস্তা ফ্রেম হলে এলেবেলে ধরনের কেউ। রিটায়ার্ড স্কুল টিচার।

একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। তার মানে কি এই যে, তিনি একজন স্মোকার? স্মোকার হলে পকেটে সিগারেটের প্যাকেট থাকত। মুখে সিগারেটের গন্ধ থাকত। তিনি তো পেয়ারাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন না–এই, আমার মুখটা তাঁকে দেখ তো মুখে সিগারেটের গন্ধ আছে কি-না।

তিনি চশমার দোকানে ঢুকলেন। আয়নায় নিজেকে দেখলেন। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি দেখে অবাক হলেন। তার মানে শেভ না করেই বের হয়েছেন। তিনি কি অতি সাধারণ অর্থনৈতিক অবস্থার কেউ? যার প্রতিদিন শেভ করা এক ধরনের বিলাসিতা। তিনি চোখ থেকে চশমার ফ্রেম খুলে সেলসম্যানকে বললেন, ভাই, এই ফ্রেমটা একটু দেখুন তো?

কী দেখব?

ফ্রেমটা কত দামের এটা দেখবেন। ঠিক এই ধরনের আরেকটা ফ্রেম কিনব।

সাধারণ চায়নিজ ফ্রেম, দুশ আড়াইশ টাকা দাম হবে। আমাদের কাছে একই রকম দেখতে ভালো জার্মান ফ্রেম আছে। দাম সামান্য বেশি পড়বে। দেখাব?

থাক। আরেকদিন দেখব।

তিনি প্রতিটি চশমার দোকানে গেলেন। যদি কেউ তাকে দেখে বলে–স্যার আপনি! কিছু ফেলে গেছেন? যদি এরকম কিছু বলে তাহলে তিনি বলবেন–কিছু ফেলে যাই নি। অর্ডার যেটা দিয়েছি সেই অর্ডার স্লিপটা দেখব। বাসার ঠিকানা ভুল দিলাম কি-না।

চশমার দোকানের কেউ কিছু বলল না। তিনি বাইরে এসে একটা সিগারেট কিনলেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় যদি কিছু হয়। সিগারেট ধরিয়ে আনন্দ পেলেন। তার জীবন পুরোপুরি কর্মশূন্য হয়ে যায় নি এই ভেবে আনন্দ। তার চিন্তাশক্তি যে নষ্ট হয়ে যায় নি এটাও একটা সুসংবাদ। স্মৃতিশক্তিহীন মানুষ যদি লজিকও হারিয়ে ফেলে তাহলে তাকে যা বলা হবে তা হলো পাগল। সে তখন রাস্তায় ট্রাফিক কনট্রোল করবে। পাগলরা ট্রাফিক কনট্রোল করতে অত্যন্ত ভালোবাসে। শুরুতে কাপড় গায়ে দিয়েই ট্রাফিক কনট্রোল করে, তারপর এক বিশেষ মুহূর্তে গায়ের সব কাপড় খুলে নতুন উদ্যমে ট্রাফিক কনট্রোল শুরু করে।

পাগল সম্পর্কে এই চিন্তাটা যে তার এসেছে এতে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত বোধ করছেন। মানুষের পরিচয় তার স্মৃতিশক্তিতে না, মানুষের পরিচয় তার চিন্তায়।

তিনি সিগারেটের দোকানির দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, ভাই আপনার নাম কী?

সিগারেটের দোকানি অবাক হয়ে বলল, আমারে জিগান?

হ্যাঁ।

নাম দিয়া কী করবেন?

এম্নি জানতে চাচ্ছি। একটা পশুর সঙ্গে আরেকটা পশুর যখন দেখা হয়, তখন তারা কিন্তু কেউ কারো নাম জানতে চায় না। মানুষ চায়।

দোকানি খানিকটা ভীত গলায় বলল, কালাম।

আপনার নাম কালাম?

জি।

ভেরি গুড। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমি আমার নামটা আপনাকে বলতে পারছি। দুঃখিত।

দোকানি অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। তিনি সিগারেটের শেষ টান দিয়ে উৎসাহিত ভঙ্গিতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। কালো রঙের বিশাল একটা গাড়ি এসে থেমেছে। গাড়ির পেছনের সিটে সতেরো-আঠারো বছরের যে তরুণী বসে আছে, সে হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার চেহারা শ্যামলা। চোখ বড় বড়। তার নিজের চোখও বড় বড়। কিছুক্ষণ আগে চশমার দোকানে দেখেছেন। মেয়েটি তারই মেয়ে এটা মনে হয় ধরে নেয়া যায়। বাবাকে এখানে রেখে কোনো একটা কাজে গিয়েছিল, এখন ফিরে এসেছে। বাবাকে নিয়ে বাসায় যাবে।

তিনি গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়ালেন। একটু ঝুঁকে এলেন মেয়েটির দিকে। মেয়েটি বলল, আপনি কী চান?

তিনি বললেন, কিছু চাই না।

মেয়েটি দ্রুত জানালার কাচ তুলে দিচ্ছে। তার দৃষ্টিতে ভয়। তিনি মন খারাপ করলেন। মন খারাপ এ জন্যে না যে মেয়েটা তার না। মন খারাপ কারণ মেয়েটি ভয় পেয়েছে। ভয় পাবে কেন? তার চেহারায় কি পাগল পাগল ভাব এসে গেছে?

তিনি কালামের কাছে ফিরে এসে আরেকটা সিগারেট কিনলেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলেন কালামের চোখেও ভীত ভাব। তার মুখের খোঁচা খোঁচা দাড়ির কারণে কি এটা হচ্ছে? সম্ভাবনা আছে ৷ চুলও অনেক বড় হয়েছে। পাগলদের চুল দাড়ি বড় থাকে। তারা কখনো নাপিতের কাছে যায় না।

কালাম! এখানে নাপিতের কোনো দোকান আছে? সেভ করব।

কালাম হাতের ইশারায় নাপিতের দোকান দেখিয়ে দিল। কোনো কথা বলল না।

 

শেভ করতে করতে তিনি কিছু সিদ্ধান্ত নিলেন।

১. মাথায় চাপ পড়ে এমন কিছু আগামী কিছুক্ষণ করবেন না। রিলাক্সেন জাতীয় ট্যাবলেট খেয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকবেন।

২. বিশ্রামের পর তিনি কোন সামাজিক অবস্থার মানুষ এটা চিন্তাভাবনা করে বের করবেন।

৩. এক জায়গায় দাঁড়িয়ে না থেকে একটা রিকশা নেবেন। রিকশা হুড ফেলা থাকবে। তিনি হাতের রুমালটা এক হাতে উঁচু করে ধরে রাখবেন। যাতে সবাই তার দিকে তাকায়। চুপচাপ রিকশায় বসে থাকলে কেউ তাকাবে না। একটা হাত উঁচু করে সেই হাতে সাদা রুমাল। মোটামুটি অদ্ভুত দৃশ্য। তখন সবাই তাকাবে। এদের মধ্যে কেউ-না-কেউ বলবে–আরে কালাম! (কিংবা সালাম, কিংবা রহমত কিংবা অন্যকিছু) সমস্যা কী? কোথায় যান?

৪. পত্রিকা অফিসে গিয়ে ছবিসহ একটা বিজ্ঞাপন ছাপার কি সময় হয়েছে? ছবির নিচে কি লেখা থাকবে? কেউ কি জানেন আমি কে? এই জাতীয় কিছু।

 

নাপিত বলল, চুল অনেক বড় হয়েছে। চুল কেটে কলপ দিয়ে দিব?

কত লাগবে?

সব মিলায়ে দেড়শ টাকা লাগবে। বিলাতি কলপ।

আমার কাছে আছেই দুইশ টাকার মতো। এত টাকা খরচ করতে পারব না। ঘণ্টা হিসাবে রিকশা ভাড়া করব, এতেই মেলা টাকা যাবে।

একশ টাকায় করাইবেন?

তিনি হতাশ গলায় বললেন, প্রতিটি পয়সা এখন আমাকে হিসাব করে খরচ করতে হবে।

মাথা মালিশ করবেন? কুড়ি টাকা।

তিনি বললেন, মাথা মালিশ করা যায়। এতে কিছু সুবিধা হবার কথা, তবে ঘাড় মটকাবেন না। এখন বাজে কয়টা?

একটা বাজে।

আশেপাশে কোনো পার্ক আছে যেখানে শান্তিমতো ঘুমাতে পারি?

বাড়িতে গিয়া ঘুমান।

বাড়িতে গিয়ে ঘুমানোর সামান্য সমস্যা আছে।

বুঝেছি। আর বলতে হবে না। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে চলে যান। ভালো। একটা বেঞ্চি দেখে ঘুম দেন।

আপনার নাম কী?

নিবারণ।

হিন্দু?

জে হিন্দু।

তিনি বিড়বিড় করে বললেন, আমি কোন ধর্মের কে জানে?

নাপিত বলল, কী কইলেন?

তিনি বললেন, কিছু বলছি না।

নাপিত চুল টানছে। ঘাড়ে থাবা দিয়ে নানান চটকাচটকি করছে। বেশ আরাম লাগছে। আরামে কিছুক্ষণের জন্যে ঘুমিয়েও পড়লেন। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলেন, তিনি ট্রাফিক কনট্রোল করছেন। তবে তার গায়ে ট্রাফিক পুলিশের পোশাক। মুখে বাঁশিও আছে। ট্রাফিকের বিরাট বিশৃঙ্খলা অবস্থা দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি করে তিনি মোটামুটি সামলে ফেলেছেন। শুধু সিগারেটওয়ালা কালামকে সামলানো যাচ্ছে না। সে একটা ট্রাক নিয়ে বের হয়েছে। ট্রাকের একটা চাকা নর্দমায় পড়ে গেছে।

স্যার, বিরাট ঘুম দিয়েছেন। এখন যান।

তিনি নাপিতের চেয়ার থেকে লজ্জিত ভঙ্গিতে নামলেন। নাপিতকে পাওনার ওপরে দশ টাকা বখশিস দিলেন। ঘুমের কারণে শরীরটা ফ্রেস লাগছে। তবে প্রচণ্ড ক্ষুধা বোধ হচ্ছে। ঢাকা শহরে নিশ্চয়ই তার কোনো একটা বাসা আছে। হয় বড়লোকের বাসা, নয় সাধারণ একটা বাসা। যাই থাকুক, বাসায় পৌঁছতে পারলে সাবান ডলে গরম পানি দিয়ে একটা ভালো গোসল দিয়ে খেতে বসতেন। খাবার। পর গল্পের বই চোখের সামনে ধরে আরামের ভাতঘুম।

তিনি নাপিতের দোকান থেকে বের হয়ে একটা ফার্মেসিতে গেলেন। প্রেসার মাপালেন। প্রেসার ঠিক আছে। ওপরেরটা ১৫০ নিচেরটা ৮৫র কিছু কম। এই বয়সে পঁচাশি প্রেসার তেমন কিছু না। তিনি দুটা রিলাক্সিন কিনে ফার্মেসিতেই খেয়ে ফেললেন। নার্ভ রিলাক্সড হওয়া দরকার। এতে যদি কিছু মনে পড়ে। তার। দরকার লম্বা ঘুম। নাপিতের দোকানের তিন মিনিটের ঘুম না।

তিনি চলে গেলেন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, বিভিন্ন বেঞ্চে অনেকেই আরাম করে ঘুমাচ্ছে। তিনি একটা খালি বেঞ্চ খুঁজে বের করলেন। আর তখনই তেরো-চৌদ্দ বছরের এক ছেলে এসে বলল, খানী খাবেন স্যার?

কী খানা?

তেহারি, সঙ্গে হাফ ডিম আছে। ত্রিশ টাকা প্লেট।

খাব।

বোতলের পানি দিব না কলের পানি? বোতলের পানি পাঁচ টাকা। তয় কলের পানি কিন্তু ভালো। নিজের হাতে কল চাইপা আনি।

কলের পানিই খাব। নাম কী তোমার?

জেমস।

জেমস মানে কি মণিমুক্তা?

জানি না। আপনি বসেন, আমি খানা নিয়া আসি। অন্যের কাছ থাইক্যা খানা নিবেন না।

আমি আপনেরে বুক করেছি।

আমি তোমার কাছ থেকেই খানা নিব। অন্যের কাছ থেকে নিব না।

বালিশ লাগবে স্যার?

বালিশ পাওয়া যায়?

পাওয়া যায়। ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া। দুই টেকা ঘণ্টা।

বালিশ নিব।

জেমস মানে যে মণিমুক্তা এটা মনে পড়ায় তিনি খুবই আনন্দ পাচ্ছেন। ইংরেজি ভাষাটা জানা আছে। তার উচিত একটা ইংরেজি পত্রিকা জোগাড় করে পড়া। পড়লেই বুঝা যেত ভাষার ওপর তার দখল কতটা। জেমস ছেলেটাকে পাঠিয়ে একটা ইংরেজি পত্রিকা কিনতে হবে।

দুপুরের খাবারটা তিনি খুব আরাম করে খেলেন। তেহারি ছিল গরম এবং সুস্বাদু। তেহারির সঙ্গে সালাদ ছিল। সালাদের কাঁচামরিচ যথেষ্ট ঝাল। ঝাল মরিচের সঙ্গে গরম তেহারির তুলনাই হয় না। খাওয়া শেষ করে তিনি জর্দা দিয়ে পান খেলেন। একটা সিগারেট খেলেন। ভাড়া করা বালিশে মাথা এলিয়ে শুয়ে পড়লেন।

জেমস বলল, টিপার পুলাপান দিব স্যার? শইল টিপ্যা ঘুম পাড়ায়ে দিবে। পাঁচ টেকা নিবে। ডাকব স্যার?

তিনি বললেন, আচ্ছা ডাক।

তার কাছে এখন হঠাৎ মনে হচ্ছে তিনি আনন্দে আছেন। স্মৃতিশক্তি ফিরে আসার পর এই আনন্দ আর নাও থাকতে পারে। হয়তো জানা যাবে তার মাথা খারাপ ছিল। তাকে একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হতো। হঠাৎ সুযোগ পেয়ে তিনি পালিয়ে গেছেন।

কিংবা জানা যাবে তিনি বাস করেন গুলশানে। লেকের পাড় তার বাড়ি। রোজ সন্ধ্যায় তিনি স্ত্রীর সঙ্গে লেকের পানি দেখতে দেখতে চা খান।

এক ঘুমে তিনি বাকি দিন পার করলেন। গা টেপা ছেলেটা চলে গেছে। মাথার নিচের বালিশটাও নেই। পকেটের টাকা এবং টাকার সঙ্গে রসমালাই লেখা কাগজের টুকরাটাও নেই। কে লিখেছিল লেখাটা? তার বড় মেয়ে?

আঙ্কেল, কিছু লাগব?

তিনি চমকে তাকালেন। তার সামনেই অল্পবয়সি একটা মেয়ে ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক মেখে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে ঠোঁট নিগ্রো মেয়েদের মতো মোটা এবং কালো দেখাচ্ছে। মেয়েটার পরনে লাল শাড়ি। শাড়ির লাল রঙ টের পাওয়া যাচ্ছে। হাতে বেলিফুলের মালা জড়ানো।

লাগব কিছু আঙ্কেল? আমার বয়স কিন্তু কম। পিপটিন। পনেরো বছর।

আমার কিছু লাগবে না। তোমার নাম কী?

মেয়েটা বেঞ্চিতে বসতে বসতে বলল, একেক দিন একেক নাম নেই। আইজ আমার নাম কমলা।

তিনি বললেন, কমলা, আমি একটা বিরাট বিপদে পড়েছি। কী বিপদ তোমাকে বলতে পারছি না। কারণ তুমি কিছু করতে পারবে না।

কমলা বলল, চা খাইবেন?

চা খাব না। আমার পকেটে টাকাপয়সা নেই। সামান্য যা ছিল কে যেন নিয়ে গেছে।

কমলা বলল, চায়ের পয়সা আমি দিব। চা খান।

তুমি চা খাওয়াবে?

দোষ কী? খাওয়াইলাম এক কাপ চা।

তিনি ধরা গলায় বললেন, কমলা! তুমি যাই কর না কেন তুমি অতি ভালো একটা মেয়ে। আমার মেয়ের মতোই ভালো।

আপনার একটাই মেয়ে?

জানি না কমলা।

জানেন না কেন?

জটিল ঝামেলায় পড়েছি কমলা।

কমলা বিস্মিত গলায় বলল, কানতেছেন কেন?

তিনি জবাব দিলেন না। রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে লাগলেন।

 

রাত এগারোটা। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। দোকানপাট সব বন্ধ। রাস্তা ফাঁকা। এলিফ্যান্ট রোডের চশমার দোকানগুলির সামনে তিনি দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছেন। তার প্রচণ্ড ভয় লাগছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *