কাকারু

কাকারু

আশরাফুদ্দিন কাঁটাবনে পাখির দোকানে গিয়েছেন কাক কিনতে। তার মেয়ে সুমির জন্মদিনে তিনি একটা কাক উপহার দিবেন। সুমির আগামী বুধবারে দুবছর পূর্ণ হবে। জন্মদিনের অনুষ্ঠানটা হবে শুক্রবারে। বুধবারে আত্মীয়স্বজনদের অফিস-কাচারি আছে। শুক্রবার ছুটির দিন। সবাই আসতে পারবে।

সুমির প্রথম জন্মদিনটা করা হয় নি। বেচারির হয়ে গেল নিউমোনিয়া। যমে মানুষে টানাটানি এমন অবস্থা। এক পর্যায়ে শিশু হাসপাতালের ডাক্তার বলে বসলেন, অবস্থা তেমন ভালো মনে হচ্ছে না। তবে ঘাবড়াবার মতো তেমন কিছু হয় নি। নিউ জেনারেশন ড্রাগ পড়েছে। ইনশাআল্লাহ রেসপন্স করবে। সবই আল্লাহর হাতে।

ডাক্তার যখন বলেন, সবই আল্লাহর হাতে, তখন কলিজা নড়ে যায়। আশরাফুদ্দিনের কলিজা নড়ে গেল। তিনি অদ্ভুত অদ্ভুত সব মানত করলেন। যেমন, মেয়ে যদি বেঁচে যায় বাকি জীবনে তিনি ভাত খাবেন না। রুটি খাবেন। ভাত তার অতি পছন্দের খাদ্য। তিনি সকালের নাস্তাতেও ভাত খান। মেয়ের জন্যে অতি পছন্দের খাবার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা।

তার দ্বিতীয় মানত হলো, পান খাবেন জর্দা ছাড়া।

তৃতীয় মানত, বাকি জীবন বালিশ ছাড়া ঘুমাবেন।

সুমির বয়স দুবছর হতে চলেছে। তিনি প্রতিটি মানত মেনে চলছেন। বাকি জীবন মেনে চলবেন–এই তার প্রতিজ্ঞা। তিনি তার মেয়ের কোনো অমঙ্গল চান না।

আশরাফুদ্দিনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের পেছনে একটা ঘটনা থাকে। জন্মদিনে কাক উপহার দেবার পেছনেও একটা ঘটনা আছে। ঘটনাটা এরকম–

হাসপাতাল থেকে সুমিকে ছেড়েছে। তিনি মেয়েকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় এসেছেন। বারান্দার রেলিং-এ তিন-চারটা কাক বসেছিল। সুমি হঠাৎ কাকগুলির দিকে আঙুল তুলে পরিষ্কার গলায় বলল, কাক। সুমির প্রথম শব্দ উচ্চারণ। সব শিশুই মা, বাবা, দুদু এইসব বলতে শিখে। সুমি শিখল কাক। সুমির মা নতুন শব্দ শেখানোর অনেক চেষ্টা করল–মা, বলো বাবা। বলো বাবা।

সুমি বলল, কাক।

তুমি কত লক্ষ্মীমেয়ে। তুমি সব কথা বলতে পার। বলো তো মা–পানি।

সুমি গম্ভীর গলায় বলল, কাক।

এখন অবশ্যি সুমি সব কথা বলতে পারে। কঠিন কঠিন শব্দও বলে। যেমন, কিছুদিন আগে সে তার বাবাকে বলল, বাবা, তুমি অত্যধিক গরিব।

অত্যধিক শব্দটা নিশ্চয়ই কারো কাছ থেকে শুনে শিখেছে। মেয়ের আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি, যা শুনছে সবই শিখে ফেলছে। সুমির কথাবার্তা আশরাফুদ্দিনের এত ভালো লাগে! এক-একবার আনন্দে চোখে পানি এসে যায়। মেয়েটির প্রতি অতিরিক্ত মমতা যখনি তৈরি হয় তখনি তিনি মেয়ের গায়ে হালকা করে থুতু দেন। এতে ভালোবাসার নজর কাটা যায়। পিতামাতার নজর বড় কঠিন জিনিস। ব্যাপারটা পরীক্ষিত। গত শীতের সময় চারদিকে জ্বরজারি হচ্ছে। সুমি দিব্যি সুস্থ। একদিন তিনি বললেন, বাহ, আমার মেয়েটার শরীর স্বাস্থ্য তো ভালো যাচ্ছে। সুমির মা বললেন, এইসব কী কথা! তুমি দেখি মেয়েটাকে নজর লাগবে। বলল মাশাল্লাহ। তিনি বললেন, মাশাল্লাহ। এতে লাভ হলো না–সেদিন সন্ধ্যা থেকেই সুমির জ্বর। বেচারি এক সপ্তাহ জ্বরে ভুগল।

আশরাফুদ্দিন কাজ করেন একটা বড় ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে। ছোট চাকরি, অ্যাসিসটেন্ট ক্যাশিয়ার। অফিস ছুটি হয় পাঁচটায়, রোজই তার অফিস থেকে বের হতে দেরি হয়। হিসাব মিলছে না, লেজার বুকে গণ্ডগোল। প্রতিদিনই কিছু ঝামেলা থাকে। অফিস থেকে বের হতে রোজই ছটা সাড়ে ছটা, কোনোদিন সাতটাও বেজে যায়। অফিস ছুটি হওয়ার পর থেকেই তার মনটা পড়ে থাকে মেয়ের কাছে। যখন বাসার দিকে রওনা হন তখন সারাপথ চিন্তা করতে করতে যান–আজ সুমির সঙ্গে কী নিয়ে কথা বলবেন। সুমিকে রোজ একটা ভূতের গল্পও শোনাতে হয়। সেই গল্পও চিন্তাভাবনা করে বের করতে হয়। একই গল্প যদি কয়েক দিন পরে আবারো বলেন, সুমি সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলে। মেয়ের এমন বুদ্ধি– মাশাল্লাহ!

বাসায় ফেরার সময় আশরাফুদ্দিন চেষ্টা করেন মেয়ের জন্যে কিছু কিনতে। লজেন্স, বাদাম, আইসক্রিম।

সুমির পছন্দ হাওয়াই মিঠাই। দশ টাকা দাম। আশরাফুদ্দিনের সামর্থ্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু হাওয়াই মিঠাই কেনা যাবে না। কারণ সুমির বড়মামা বলেছেন–এইসব জিনিস কখনো খাওয়ানো যাবে না। বাচ্চাদের পেট খারাপ হয়।

আশরাফুদ্দিনের সংসার সুমির বড় মামা মুনিরের নির্দেশেই চলে। তার কারণও আছে। আশরাফুদ্দিন তেরোশ স্কয়ার ফিটের যে ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকেন তা মুনিরের। আশরাফুদিন বিনা ভাড়ায় থাকছে। শুধু ইউলিটির চার্জ দিচ্ছেন। বিপদে-আপদেও মুনিরকে পাওয়া যায়।

একবার অফিসে ক্যাশে বিরাট গরমিল ধরা পড়ল। পাঁচ লাখ ছাব্বিশ হাজার টাকা ড্রয়ার থেকে গায়েব। দায়িত্ব এসে পড়ল আশরাফুদ্দিনের কাঁধে। অফিসের এম ডি হারুন সাহেব তাকে ডেকে বললেন, আপনি অনেকদিন এই অফিসে কাজ করছেন। আপনাকে আমরা একজন অনেস্ট এবং সিনসিয়ার কর্মচারী হিসেবে জানি বলেই কোনো পুলিশ কেইস করছি না। আপনাকে আমরা সাতদিন সময় দিলাম। এর মধ্যে টাকাটা জমা দিয়ে দেবেন। আমরা কোনো প্রশ্ন করব না। ধরে নেব কোনো কিছুই ঘটে নি। আগে যেভাবে কাজ করতেন সেভাবেই কাজ করবেন।

হতভম্ভ আশরাফুদ্দিন বললেন, টাকা কোথায় পাব স্যার?

হারুন সাহেব বললেন, আপনি টাকা কোথায় পাবেন আপনি জানেন। টাকা ছিল আপনার Custody-তে। সব দায়-দায়িত্ব আপনার। সাতদিন অনেক সময়। আমি নিশ্চিত এই সাতদিনে কোনো একটা ব্যবস্থা হবে। যদি না হয় তাহলে পুলিশের কাছে যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে অন্য অপশন নেই। যদিও আমি চাই

আমাদের অফিসের কেউ জেল খাটুক।

টাকার জোগাড় সাতদিনেই হলো। সুমির বড় মামা গম্ভীর মুখে টাকাটা দিলেন এবং বললেন, আপনি বিরাট ক্যালাস মানুষ। বোকা এবং ক্যালসি। আপনার সঙ্গে বিয়ে হওয়ায় আমার বোনের জীবনটা নষ্ট হয়েছে। আপনি শুধু যে অপদার্থ তা-না, অপদার্থদের অপদার্থ। …

আশরাফুদ্দিন মুখ হাসি হাসি রাখার চেষ্টা করতে করতে সব কথা শুনলেন। মুখ হাসি হাসি রাখাটা ঠিক হয় নি। সুমির বড়মামা এক পর্যায়ে বললেন, আপনি হাসছেন কী মনে করে জানতে পারি? রং তামাশার কোনো ব্যাপার কি ঘটেছে?

বড় মানুষদের কোনো কথা ধরতে নেই। সেই বড় মানুষ যদি আত্মীয় হন তাহলে তো আরো না। আশরাফুদ্দিন সুমির বড়মামার কোনো কথা ধরেন না। কোনো অপমান গায়ে মাখেন না। শুধু যখন বাসায় ফিরে শোনেন সুমির বড়মামা এসে সুমিকে নিয়ে গেছে, আজ সুমি মামার বাসায় থাকবে, তখন বড় খারাপ লাগে। দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছা করে।

সুমির জন্মদিন নিয়ে আশরাফুদ্দিন ভালো দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি উড়া উড়া শুনছেন, জন্মদিন পালন করা হবে সুমির বড়মামার উত্তরার বাড়িতে। (ডুপলেক্স বাড়ি। বারান্দা থেকে লেক দেখা যায়। সুমি ঐ বাড়িতে যেতে খুবই পছন্দ করে।) সত্যি সত্যি যদি উত্তরার বাড়িতে জন্মদিন হয় তাহলে সেখানে তাকে অবশ্যই যেতে হবে, তবে জন্মদিনের উপহার কাক নিয়ে যেতে পারবেন না। কাক দেখলে অনেক আজেবাজে কথা সুমির মামা বলে বসতে পারেন। একটা উপহার কিনে দিতে না পারা দুঃখের ব্যাপার।

কাটাবনের পাখির দোকানের মালিক বলল, কাক কিনতে চান?

জি।

কাক? কাউয়া?

জি কাউয়া।

কাউয়া দিয়ে করবেন কী?

জন্মদিনে উপহার দিব।

উপহার কাউয়া দিবেন কেন? লাভ বার্ড নিয়ে যান। জোড়া তিনশ টাকা। খাঁচা ফ্রি।

আমার কাউয়াই দরকার।

আমরা কাউয়া বেচি না।

বেচেন না কেন?

কাউয়া পাখির মধ্যে পড়ে না।

পাখির মধ্যে পড়বে না কেন? কাক তো উড়তে পারে। কা কা করে গানও গায়।

আপনি অন্য দোকানে যান। কাক কিনে কাকের গান শুনুন।

আশরাফুদ্দিন কোথাও কাক পেলেন না। শুধু এক দোকানি বলল, তারা কাক এনে দেবে, তবে এক হাজার টাকা খরচ লাগবে। পাঁচশ টাকা অ্যাডভান্স।

কাকের দাম এক হাজার টাকা?

দোকানি গম্ভীর গলায় বলল, জি, এক হাজার। কাক ধরা কঠিন ব্যাপার। কাক ধরতে গিয়ে ঠোকর খেয়ে মানুষ মারা গেছে, এটা জানেন?

আশরাফুদ্দিন বললেন, পাঁচশ টাকা পর্যন্ত দিতে পারব। এর বেশি পারব না। ভাই, আমি গরিব মানুষ।

দোকানি বলল, আগামীকাল আসেন। দেখি কাক জোগাড় করতে পারি কি না। তবে কথা দিতে পারব না। পাঁচশ টাকা দিয়ে যান। কাক না পাওয়া গেলে ফেরত নিবেন।

আশরাফুদ্দিন পাঁচশ টাকা জমা দিলেন। তার জন্যে অনেকগুলি টাকা। তা হোক, মেয়েটা খুশি হবে। মেয়ের খুশির কাছে এই টাকা সামান্য। পাঁচশ টাকা জমা দিয়ে সামান্য দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। কাক পাওয়া না গেলে টাকাটা কি ফেরত পাওয়া যাবে? টাকা আদায় করা খুব কষ্ট।

 

শেষ পর্যন্ত কাক পাওয়া গেল। দাম পড়ল পাঁচশ সত্তর। পাঁচশ টাকা কাকের দাম, সত্তর টাকা খাঁচার দাম। দোকানি বলল, ভালো জিনিস পাইছেন অল্প পয়সায়।

আশরাফুদ্দিনের কাছেও মনে হলো তিনি ভালো জিনিস পেয়েছেন। স্বাস্থ্যবান কাক। গায়ের পালক চকচক করছে। চোখ ঘন লাল। কাকের চোখ এমন লাল হয় তিনি জানতেন না। এত কাছ থেকে এর আগে তিনি কাক দেখেনও নি। এই বিশেষ পাখিটা মানুষের আশেপাশেই থাকে, তবে কখনোই খুব কাছে আসে না।

আশরাফুদ্দিন তার ফ্ল্যাট বাড়ির কলিং বেল টিপলেন ভয়ে ভয়ে। সুমির মা দরজা খুলে কাক দেখে কী বলবে কে জানে! হৈচৈ যে করবে বলাই বাহুল্য। তৎক্ষণাৎ কাক ছাদে নিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসতেও পারে। মেয়েদের কাছে কাক অমঙ্গুলে পাখি।

দরজা খুলল কাজের ছেলে রফিক। সে দাঁত বের করে বলল, বাড়িতে কেউ নাই। নাই নাই নাই।

আশরাফুদ্দিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, গেছে কোথায়? সুমির বড়মামার বাড়িতে?

হুঁ। রাইতে থাকবে।

আশরাফুদ্দিন বললেন, অসুবিধা নাই। থাকুক। ঐ বাড়ির সব ঘরে এসি। সুমি আরাম করে ঘুমাবে।

আপনার হাতে এইটা কী? কাউয়া না?

হুঁ।

কাউয়া দিয়া কী করবেন?

এমনি আনলাম। সুমি খেলবে।

ঠোকর দিবে তো।

ঠোকর দিলে দিবে। একটা শিশুর নানান ঠোকর খেয়ে বড় হওয়া দরকার। তুমি কাকটার জন্যে পানি দাও। আর কিছু খাবার।

রফিক বলল, কাউয়ার খানা কই পামু কন! কাউয়া খায় আবর্জনা।

ভাত আছে না? ভাত দাও। আর আমাকে এক কাপ চা দাও।

আশরাফুদ্দিন কাক নিয়ে তার ঘরে ঢুকে গেলেন। তিনি পশ্চিমের ঘরটায় থাকেন। সুমি তার যার সঙ্গে শোবার ঘরে ঘুমায়।

 

আশরাফুদ্দিন রাতের খাবার খেলেন। আয়োজন ভালো না, তবে তৃপ্তি করে খেলেন। অনেক দিন পর আরাম করে টিভি দেখলেন। একটা হাসির নাটক। তিন বন্ধুর কীর্তিকলাপ। তিন বন্ধুর একজন মহানোকা। বোকাটার কাণ্ড দেখে আশরাফুদ্দিন শব্দ করে হাসলেন। সুমির মা থাকলে তিনি শব্দ করে হাসেন না। সে যে রাগ করে তা না। তারপরও কেন যেন হাসি আসে না।

আশরাফুদ্দিনের স্বভাব, গরমেও মশারি খাটিয়ে ঘুমানো। মশারি না টাঙালে তার নাকি নেংটা নেংটা লাগে। সুমির মা আবার মশারির ভেতর ঘুমাতে পারে না। তার দম বন্ধ লাগে। তাদের শোবার ব্যবস্থা এই কারণেই আলাদা। আশরাফুদ্দিন মশারির ভেতর ঢুকতে যাচ্ছেন, ঠিক তখন খাঁচার ভেতরের কাকটা ছটফট করে ডানা ঝাপ্টালো। এবং পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল, হ্যালো স্যার। ঘুমিয়ে পড়লেন না-কি?

আশরাফুদ্দিনের মনে হলো তিনি ভুল শুনেছেন। এরকম ভুল মানুষের মাঝে মধ্যে হয়। আশেপাশে কেউ নেই, তারপরেও মনে হয় কেউ-একজন কথা বলেছে। আশরাফুদ্দিন ভীত গলায় বললেন, কে? কে কথা বলে?

কাকটা বলল, স্যার আমি। আপনার কাজের ছেলেটা আমাকে পানি দেয় নাই। তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছি। কোনো খাবারও দেয় নাই। সে যে বলেছে আমরা আবর্জনা খাই এটা ঠিক না। খাবার পাই না বলে আবর্জনা খাই। শখ করে আবর্জনা কেন খাব?

আশরাফুদ্দিন কাঁপা গলায় বললেন, তুমি কি সত্যি সত্যি কথা বলছ?

জি স্যার। কথা বলার ইচ্ছা ছিল না। বিপদে পড়ে বললাম। তৃষ্ণায় জান। যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সব কাকই কি কথা বলতে পারে?

কাক বলল, স্যার আগে পানি খাওয়ান, তারপর অন্য আলাপ।

আশরাফুদ্দিন পানি আনলেন। টেবিলে ভাত ঢাকা দেয়া ছিল। ভাত আনলেন। একটা কলা অনলেন। এবং সারাক্ষণই মনে মনে বললেন, কোনো কারণে ধান্দা লেগে গেছে বলে এরকম মনে হচ্ছে। কাক কেন কথা বলবে? হযরত সোলায়মান আলায়েস সালাম পশুপাখির কথা বুঝতেন। তিনি তো সোলায়মান নবী না।

খাঁচার ভেতর রাখা কনডেন্সড মিল্কের খালি কৌটায় পানি ঢালা হলো। কাকটা ঠোঁট ডুবিয়ে ডুবিয়ে অনেকক্ষণ পানি খেল। একসময় আশরাফুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বলল, সত্তর টাকা দিয়ে এমন এক খাঁচা কিনেছেন, মাথা উঁচা করে বসতেও পারতেছি না। একশ টাকার খাঁচা একটা কিনলে আরাম করে বসতে পারতাম। ঘাড় ব্যথা হয়ে গেছে।

খাঁচা খুলে দেই?

কাক বলল, দেন। আর কলাটা ছিলে দেন।

আশরাফুদ্দিন খাঁচা খুলে দিলেন। কাক খাঁচা থেকে বের হয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে মেঝেতে কিছুক্ষণ হাঁটল। ডানা ঝাপ্টালো। আশরাফুদ্দিন বিড়বিড় করে বললেন, মনে হয় আমার মাথায় কোনো গণ্ডগোল হয়েছে।

কাক বলল, অসম্ভব কিছু না। গরম পড়েছে মারাত্মক। গরমের কষ্ট এবং নানাবিধ চিন্তায় মাথায় গণ্ডগোল হওয়া স্বাভাবিক। আপনাদের ডাক্তার কবিরাজ কত কিছু আছে। আমাদের কিছুই নাই।

আশরাফুদ্দিন বললেন, মানুষের মতো কথা কি তুমি একাই বলতে পার, নাকি

অন্য কাকরাও পারে?

কাক কলা খেতে খেতে বলল, আমরা সবাই পারি। আমরা সবসময় থাকি মানুষের কাছাকাছি। ওদের ভাষা শিখব না?

তাহলে অন্যরা কথা বলে না কেন?

কাক বলল, সব কাক কথা বলা শুরু করলে উপায় আছে? কা কা বলে দুবার ডাকলেই আপনারা বলেন, গৃহস্থের অমঙ্গল। সেখানে যদি কথা বলা শুরু করি…। বাজে আলাপ বন্ধ থাকুক, আপনার মেয়ে কই? যার জন্যে আমাকে কিনেছেন,

তাকে তো এখনো দেখলাম না।

সে তার বড়মামার বাড়িতে। জন্মদিনের অনুষ্ঠান সেই বাড়িতেই হবে।

আপনি কি সেখানে আমাকে নিয়ে যাবেন?

আশরাফুদ্দিন বললেন, কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি কী বলে?

কাক নিয়ে উপস্থিত হওয়া ঠিক হবে না। কাককে আপনারা বলেন অশুভ। জন্মদিন একটা শুভ অনুষ্ঠান।

ঠিক বলেছ। সুমির বড়মামা সবার সামনে আমাকে পাগল-টাগল বলে বসতে পারে। হঠাৎ বড়লোক হয়েছে তো, আমাকে খুবই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। এমন লজ্জা পাই। সেদিন একগাদা লোকের সামনে বলল, আপনি অপদার্থের শিরোমণি।

কাক বলল, শিরোমণি কী জিনিস?

শিরোমণি মানে সেরা। আমি না-কি অপদার্থের সেরা।

কাক বলল, মুখের উপর বলে দেন–

কা কা কা
তুই গু খা।

আশরাফুদ্দিন বললেন, ছিঃ ছিঃ, এইসব কথা কীভাবে বলি? আমার স্ত্রীর বড় ভাই। বিপদে আপদে সাহায্য করে।

কী সাহায্য করে?

তার কারণে জেলের হাত থেকে বেঁচেছি। বিরাট ইতিহাস, শুনবে?

মানুষের ইতিহাস শুনে আমার লাভ কী। ঠিক আছে বলতে চাচ্ছেন বলুন।

আশরাফুদ্দিন আগ্রহ নিয়ে অফিসে টাকা-পয়সার গণ্ডগোলের গল্প শুরু করলেন। কাকটাকে দেখে মনে হচ্ছে সেও খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছে। মাঝে মাঝে  বলছে। মাথা নাড়ছে। আশরাফুদ্দিনের মনে হলো এত আগ্রহ নিয়ে এর আগে। কেউ তার দুঃখের গল্প শোনে নি।

কাক বলল, টাকাটা ছিল কোথায়?

আমার ড্রয়ারে ছিল। ব্যাংকে জমা দিতে গিয়েছিলাম। তিনটার পরে গিয়েছি বলে জমা দিতে পারি নাই। ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম।

তালা দেয়া ছিল না?

ছিল।

চাবি আপনার কাছে?

হ্যাঁ।

আর কারো কাছেই চাবি নাই?

হেড ক্যাশিয়ার ফরিদ সাহেবের কাছে একটা চাবি আছে।

কাক বলল, টাকাটা ঐ ব্যাটা কি নিয়েছে?

আশরাফুদ্দিন বললেন, অসম্ভব। উনি ফেরেশতার মতো মানুষ। নামাজ। কালামের মধ্যে থাকেন।

ফেরেশতাও তো মাঝে মধ্যে ভুল করে।

তা অবশ্যি করে। দু একবার যে আমার এরকম মনে হয় নাই তা না। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে টেলিফোন করে জিজ্ঞাস করি। পরেই মনে হয় ছিঃ ছিঃ।

কাক বলল, ছিঃ ছিঃ ছিঃ করার কিছু নাই। এখনই টেলিফোন করুন।

এখন করব?

হুঁ। কী বলতে হবে আমি শিখিয়ে দিব।

আশরাফুদ্দিন টেলিফোন করলেন। ফরিদ সাহেবই টেলিফোন ধরলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, কে?

স্যার আমি। আশরাফুদ্দিন। ভালো আছেন স্যার?

এত রাতে! কী ব্যাপার? আমি শুয়ে পড়েছিলাম তো।

আশরাফুদ্দিন রিসিভার চাপা দিয়ে ধরে রেখে ফিসফিস করে কাকটাকে বললেন, কী বলব? স্যার তো খুব রাগ করছেন।

কাক বলল, বলুন কা কা কা। তুই গু খা।

আশরাফুদ্দিন হতাশ গলায় বললেন, এটা কী করে বলব?

কাক বলল, স্পষ্ট গলায় বলবেন।

টেলিফোনের ওপাশ থেকে বিরক্ত গলায় ফরিদ সাহেব বললেন, কী বলবেন বলুন।

আশরাফুদ্দিন বললেন, কা কা কা। তুই গু খা।

ফরিদ সাহেব বললেন, কী বললেন?

আশরাফুদ্দিন কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, স্যার, আমি বলেছি—কা কা কা। তুই গু খা।

What?

আশরাফুদ্দিন টেলিফোন রেখে দিলেন। তাঁর দুশ্চিন্তার সীমা রইল না। আগামীকাল অফিসে কী হবে কে জানে? ফরিদ সাহেব নিশ্চয়ই কমপ্লেন করবেন। বড় সাহেব তাকে ডেকে পাঠাবেন। তারপর? বদ কাকটার কথা শোনা উচিত হয় নাই। দুশ্চিন্তায় আশরাফুদ্দিনের ঘুম হলো না। মাঝে মাঝে ঝিমুনির মতো আসে, তখন বিকট সব স্বপ্ন দেখেন। একটা স্বপ্নে দশ-বারোটা কাক তাকে ঠোকর দিচ্ছে। তিনি ব্যথা পাচ্ছেন না, তবে কাতুকুতু লাগছে।

আশরাফুদ্দিন খুব ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই, ঘুম থেকে উঠেন। আজ শেষ রাতে ঘুমিয়েছেন বলেই নয়টার দিকে ঘুম ভাঙল। ঘুম ভেঙে দেখেন, রফিক দাঁড়িয়ে আছে।

সে বলল, আপনার হইছে কী? শরীর খারাপ?

না।

স্যার, আপনের কাউয়া পালায়া গেছে। কী বুদ্ধি! নিজে নিজেই তার কাইটা পালাইছে। বদ পক্ষী।

আশরাফুদ্দিন কিছু বললেন না। রফিক বলল, অফিসে যাবেন না?

যাব।

আইজ সুমি অফিার জন্মদিন। আপনেরে সকাল সকাল অফিস থাইকা ফিরতে বলছে।

আচ্ছা।

বড়মামার বাড়িতে চইলা যাইতে বলছে।

আচ্ছা।

ভালো ডেরেস পইরা অফিসে যাইতে বলছে।

আচ্ছা।

অফিসে আশরাফুদ্দিন অত্যন্ত টেনশনে কাটালেন। সারাক্ষণ মনে হলো এই বুঝি ফরিদ সাহেব ডাকবেন। কয়েকবার তার সঙ্গে দেখাও হলো। ফরিদ সাহেব একবার শুধু বললেন, কাল রাতে কি আপনি টেলিফোন করেছিলেন? আশরাফুদ্দিন বিড়বিড় করে বললেন, ইয়েস স্যার। ফরিদ সাহেব কিছুই বললেন না। ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আশরাফুদ্দিন মনে মনে বললেন, হে আল্লাহপাক, তোমার পাক দরবারে হাজার শুকরিয়া।

আজকের দিনটা মনে হয় আশরাফুদ্দিনের জন্যে ভালো। সুমির বড়মামার বাড়িতে উপস্থিত হয়ে শুনলেন, মুনির জরুরি কাজে আজ সকালের ফ্লাইটে চিটাগাং গিয়েছেন। আগামীকাল ফিরবেন। সুমির মা মন খারাপ করে বলল, ভাইজান জন্মদিনের জন্যে এত কিছু করলেন আর নিজেই থাকতে পারলেন না।

আশরাফুদ্দিন বললেন, ভেরি স্যাড।

সুমির মা বললেন, জন্মদিন আমি একদিন পিছিয়েছি। ভাইজান আসলে হবে।

আমি কি চলে যাব?

খাওয়াদাওয়া করে যাও। মনু বাবুর্চিকে দিয়ে মোরগপোলাও রান্না করানো হয়েছে।

নিতান্তই অনিচ্ছার সঙ্গে আশরাফুদ্দিন বললেন, আচ্ছা।

রাত নটায় মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আশরাফুদ্দিন মোরগপোলাও খেতে বসলেন। খাওয়ার সময় মেয়ের সঙ্গে নিচু গলায় অনেকক্ষণ কথা বললেন।

সুমি বলল, বাবা, আমার জন্যে কী কিনেছ?

কাক কিনেছি।

সত্যি?

হুঁ। কাকটা কথা বলতে পারে।

কই দেখি।

সঙ্গে আনি নাই।

বাসায় আছে?

হুঁ।

তোমার ঘরে থাকে?

হুঁ।

কাল আনবে?

দেখি আনতেও পারি।

সুমির আনন্দে ঝলমল করা চোখ-মুখ দেখে আশরাফুদ্দিনের মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েকে মিথ্যা কথা বলেছেন–কাক নেই, চলে গেছে। এই কথাটা বলা প্রয়োজন ছিল। একটি শিশু বড় হবে সত্যের ভেতর।

কাকটার নাম কী বাবা?

নাম জিজ্ঞেস করি নাই।

আজ জিজ্ঞেস করবে।

আচ্ছা।

বাবা, তুমি খুব ভালো।

আশরাফুদ্দিনের চোখে পানি এসে গেল। এরকম একটা মেয়ে থাকলে আর কিছুই লাগে না।

আজ ঘুমুতে যেতে একটু দেরি হলো। অনেক হিসাব-নিকাশ করলেন মেয়েটার জন্যে আরেকটা কাক কেনা যায় কি-না। খাঁচার দাম লাগবে না। খাঁচা তো আছেই। তবে এই খাঁচাটা বদলে এক সাইজ বড় কেনা দরকার। যাতে কাক বেচারা ঠিকমতো বসতে পারে। ঘাড়ে ব্যথা না হয়।

স্যার কি ঘুমিয়ে পড়েছেন না-কি?

কাকের গলা। ঠোঁট ফাঁক করে হাই তোলার মতো ভঙ্গি করছে। আশরাফুদ্দিন দ্রুত মশারির ভেতর থেকে বের হলেন। কাকটা জানালায় বসে আছে। আশরাফুদ্দিনের কাছে দৃশ্যটা মোটেই অস্বাভাবিক মনে হলো না।

কাক বলল, ঐদিন আপনাকে না বলে চলে গেলাম। হঠাৎ মনটা খারাপ হলো। মেয়েটার কথা মনে হলো।

তোমার মেয়ে আছে না-কি?

এক মেয়ে। সে তার মার সঙ্গে থাকে।

কোথায় থাকে?

কাওরান বাজারে একটা জারুল গাছ আছে। ঐ গাছে আমাদের বাসা। গত সিডরের সময় বাসা ভেঙে গিয়েছিল। এখন রিপেয়ার করেছি।

ভালো কথা মনে পড়েছে। তোমার নাম কী? আমার মেয়ে তোমার নাম জানতে চেয়েছিল। মেয়েকে তোমার কথা বলেছি।

স্যার, আমার কোনো নাম নেই। আমাদের নাম থাকে না। আপনার মেয়েকে বলবেন সুন্দর দেখে একটা নাম দিতে।

আচ্ছা বলব।

কাক গলা নিচু করে বলল, টেলিফোন কি করেছেন স্যার?

কী টেলিফোন?

ফরিদ সাহেবকে টেলিফোন। আজ আবার তাকে বলবেন, কা কা কা। তুই গু খা।

একবার তো বলেছি। আর কেন?

রোজ একবার বলা দরকার।

অসম্ভব। তোমার কথাবার্তা শুনলে অফিসে রিপোর্ট হবে। চাকরি চলে যাবে।

টেলিফোন করতে না চাইলে করবেন না। তবে…

তবে কী?

কাক নিঃশ্বাস ফেলার মতো ভঙ্গি করে বলল, না থাক। আপনার জানার দরকার নাই।

আশরাফুদ্দিন নিতান্ত অনিচ্ছায় টেলিফোন করলেন। ফরিদ সাহেব বললেন, কে?

আশরাফুদ্দিন বললেন, স্যার আমি।

কী চান?

আশরাফুদ্দিন বললেন, কা কা কা। তুই গু খা।

এর মানে কী?

আশরাফুদ্দিন আমতা আমতা করে বললেন, স্যার, এর মানে আপনাকে গু খেতে বলছে। একটা কাক আপনাকে গু খেতে বলছে।

ফরিদ সাহেব টেলিফোন রেখে দিলেন।

 

বড় সাহেব আশরাফুদ্দিনকে ডেকে পাঠিয়েছেন। জরুরি কথা বলবেন।

আশরাফুদ্দিন বড় সাহেবের ঘরে এসেছেন। স্যার এখনো বসতে বলেন নি বলে বসতে পারছেন না। ভয়ে তার বুক কাঁপছে। স্যারের ঘরে এসি চলছে। ঘর। ফ্রিজের ভেতরের মতো ঠান্ডা। তারপরেও আশরাফুদ্দিনের শরীর ঘামছে। প্রচণ্ড পানির পিপাসা হচ্ছে। বড় সাহেব ফাইল দেখছিলেন। ফাইল দেখা বন্ধ করে ঠান্ডা গলায় বললেন, আশরাফ সাহেব, আপনি না-কি রোজ গভীর রাতে টেলিফোন করে হেড ক্যাশিয়ার ফরিদ সাহেবকে গু খেতে বলেন?

আশরাফুদ্দিন কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, জি স্যার বলি।

কেন বলেন জানতে পারি?

স্যার, চেয়ারে বসে তারপর বলি? দাড়িয়ে থাকতে পারছি না।

বসুন।

আশরাফুদ্দিন বসলেন। বড় সাহেব বললেন, এখন বলুন ঘটনা কী?

স্যার, আমি যে কথাগুলি বলি সেগুলো অন্যায় কথা। ভদ্রসমাজে বলার কথা।। তারপরেও বলি, কারণ কথাগুলো বললে আমার মন শান্ত হয়।

মন শান্ত হয়?

জি স্যার। টাকা চুরির ব্যাপারে উনি অন্যায়ভাবে আমাকে ফাঁসিয়েছেন। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে না পেরে ফিরে এসেছি। উনাকে দিলাম যেন লকারে রাখতে পারেন। উনি বললেন, লকারের চাবি তুলে আনেন নাই। আমি যেন আমার ড্রয়ারে রেখে দেই। আমি আমার ড্রয়ারে রাখলাম। উনার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে এসেছি। কারণ আমার মেয়েটার খুবই অসুখ, তাকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাব। পরের দিন ড্রয়ার খুলে দেখি টাকা নাই। স্যার, এক গ্লাস পানি খাব।

বড় সাহেব তাকে পানির বোতল এবং গ্লাস এগিয়ে দিলেন। আশরাফুদ্দিন পুরো বোতলের পানি খেয়ে ফেললেন। তাতেও তৃষ্ণা মিটল না।

আশরাফুদ্দিন বললেন, পাঁচ বছর আগে স্যার এইরকম আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল। আব্দুল জলিল নামের একজন ছিলেন আমি যে পোস্টে সেই পোস্টে। উনার চাকরি চলে যায় তিন লাখ টাকার হিসাবের গরমিলের জন্যে। স্যার, আমি নিশ্চিত ফরিদ সাহেব ঐ ঘটনায় জড়িত।

যখন তদন্ত হচ্ছিল, তখন এইসব কথা তোলেন নাই কেন?

ফরিদ স্যার সুফি মানুষ। সবাই তাকে মান্য করে। উনার কথাই সবাই বিশ্বাস করে। উনার বিষয়ে কিছু বলার সাহস হয় নাই।

বড় সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, তখন সাহস হয় নাই, এখন কেন হয়েছে?

একটা কাক আমাকে সাহস দিয়েছে স্যার। সে-ই আমাকে ছড়াটা বলতে বলেছে–কা কা কা। তুই গু খা। স্যার, কাকের বিষয়টা বলব? অদ্ভুত ইতিহাস।

বড় সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, শুনি আপনার ইতিহাস।

আশরাফুদ্দিন কাক কেনা থেকে কাকের কথা বলা সবটাই বললেন। কিছুই গোপন করলেন না।

বড় সাহেব বললেন, কাকের কথা বলার বিষয়টা আপনার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা। সম্ভবত আপনার সাবকনশাস মাইন্ড একটা ট্রিক প্লে করেছে। তবে ফরিদ সাহেবের বিষয়টা যেন আবার তদন্ত হয় সেটা আমি দেখব।

আমি কি চলে যাব স্যার?

হ্যাঁ চলে যান। রতিদুপুরে মানুষকে ছড়া শোনাবেন না। মন দিয়ে কাজ করুন।

 

পরের ছমাসে বেশ কিছু ঘটনা ঘটল। নতুন তদন্তে প্রমাণ হয়েছে ফরিদ সাহেব টাকাটা চুরি করেছেন। তার চাকরি চলে গেল। ফরিদ আহমেদ পুরো টাকাটা ফেরত দিয়েও চাকরি বাঁচাতে পারলেন না।

এখনকার কথা, পাঁচ বছর আগে জলিল আহমেদ নামে যে অ্যাসিসটেন্ট ক্যাশিয়ারের চাকরি চলে গিয়েছিল তাকে খোঁজা হচ্ছে। কোম্পানি আবার তাকে চাকরি দিতে চাচ্ছে।

আশাফুদ্দিন হেড ক্যাশিয়ার হয়েছেন। পরীবাগে কোম্পানির নিজস্ব ফ্ল্যাটে উঠেছেন। সুমির বড়মামার কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছিলেন তা ফেরত দিয়েছেন।

আশরাফুদ্দিনের সুখে থাকার কথা। তিনি মোটেই সুখে নেই! কাকটা আর আসছে না। তার মেয়ে কাকটাকে চোখের দেখাও দেখে নাই। বেচারি কাকের জন্যে নাম পর্যন্ত ঠিক করে রেখেছে–কাকারু। সেই নামটা কাকটাকে বলা হয় নি।

প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে দুদিন আশরাফুদ্দিনকে কারওয়ান বাজারের জারুল গাছগুলির পাশে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যায়। তিনি শব্দ করে ডাকেন, কাকারু! কাকারু!

লোকজন সন্দেহের চোখে তাকায়। তবে কেউ মাথা ঘামায় না। ঢাকা বিশাল শহর। বিশাল শহরে নানান কিসিমের মানুষজন থাকবে, কেউ গাছের দিকে তাকিয়ে কাকারু কাকারু ডাকবে। কেউ নেংটা হয়ে ট্রাফিক কনট্রোল করবে। এটাই স্বাভাবিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *