আমার আছে জল – ০৭ম পরিচ্ছেদ

রাতের খাবার দেয়া হলো ন’টার দিকে। দেখা গেলো কারোরই খাওয়ার দিকে মন নেই। শুধু সাব্বির, খাবার দেয়া হয়েছে শোনামাত্র, এসে বসেছে এবং খেতে শুরু করেছে। রেহানা বাবুকে কিছু একটা মুখে দেয়াবার জন্য আবার ঘরে এসে সাব্বিরের একা একা খাওয়ার দৃশ্যটি দেখলেন। সাব্বির ঘন ঘন পানি খাচ্ছে। রেহানা বললেন—খুব ঝাল হয়ে গেছে নাকি?

একটু হয়েছে। অসুবিধা নেই।

এরা বেশ ঝাল দেয়। আলিম রান্না করলে এটা হতো না। আলিম অসুখ হয়ে পড়ে আছে।

কি অসুখ?

দাঁতে ব্যথা।

সাব্বির গম্ভীর মুখে খেয়ে যাচ্ছে। রেহানা লক্ষ্য করলেন সে একবারও বললো না—অন্যরা কেউ খেতে আসছে না কেন? এটা একটা সাধারণ ভদ্রতা। দশ এগারো বছর বিদেশে থাকলেই কেউ অভদ্র হয়ে যায় না। বরং আরো ভদ্র হয়। সেটাই স্বাভাবিক। রেহানা বললেন—এত কিছু রান্না হয়েছে কিন্তু কেউ খেতে চাচ্ছে না। সব নষ্ট হবে।

দিলু ঘরে ঢুকলো। সে এসেছে নিশাতের জন্যে এক গ্লাস পানি নিতে। রেহানা দেখলেন, পানি ঢালতে গিয়ে সে অনেকখানি পানি টেবিলে ফেললো। মেয়েটা কাজকর্মে এত আনাড়ি হয়েছে। পানি গড়িয়ে যাচ্ছে সাব্বিরের দিকে। তাকে অল্প সরে বসতে হলো। দিলু বললো—সাব্বির ভাই আপনি এত পেটুক কনে, সবাইকে ফেলে খেতে বসেছেন।

রেহানার কপালে ভাঁজ পড়লো। মেয়েটা এমন রুচিহীন কথাবার্তা বলে। লজ্জায় পড়তে হয়।

দিলু চলে যেতেই সাব্বির বললো—আপনার এই মেয়েটিকে আমার খুব পছন্দ। ওর মধ্যে এক ধরনের সরলতা আছে।

রেহানা কিছু বললেন না। মনে মনে সাব্বিরের কথাটার অন্য কোন অর্থ হয় কিনা বুঝতে চেষ্টা করলেন। এই মেয়েটিকে তার পছন্দ এর মানে কি এই নয় যে বড় মেয়েটিকে পছন্দ নয়। বড় মেয়েটির মধ্যে সরলতা নেই। প্রথম দিকে সাব্বিরকে যতটা ভালো লেগেছিল এখন আর ততটা ভাল লাগছে না। ছেলেটি অভদ্র, অমিশুক। অবশ্যি সে অত্যন্ত সুপুরুষ। চেহারায় অন্য ধরনের কাঠিন্য আছে যা সহজেই চোখে পড়ে।

কবির এ রকম ছিলো না। কবিরের মধ্যে একটা হালকা ফূর্তির ভাব ছিলো যা কোন বয়স্ক মানুষকে ঠিক মানায় না। এটা ভাবতে ভাবতে রেহানা লজ্জিত বোধ করলেন। তিনি ঠিক এই মুহূর্তে কবিরকে অপছন্দ করার চেষ্টা করছেন। এটা অন্যায়। কবিরকে অপছন্দ করার উপায় নেই। সে এ বাড়ির সবাইকে মনমুগ্ধ করে রেখেছিলো। ওসমান সাহেব , যিনি পৃথিবীর কোন কথাই প্রায় বিশ্বাস করেন না তিনি পর্যন্ত কবিরের প্রতিটি কথা বিশ্বাস করেছেন। একবার কবির এসে বললো—খবর শুনেছেন নাকি? মালয়েশিয়ায় একটা মৎস্যকন্যা ধরা পড়েছে।

কি ধরা পড়েছে?

মৎস্যকন্যা। মারমেইড। মালয়েশিয়ার ন্যাশনাল পত্রিকা বিরাট ছবি ছাপা হয়েছে। হুলস্থুল কাণ্ড!

বল কি?

অন্য কেউ এ কথা বললে ওসমান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলতেন। কবিরের বেলায় সে রকম কিছুই হলো না। তাঁর মুখে দেখে মনে হলো তিনি বিশ্বাসও করছেন না আবার ঠিক অবিশ্বাসও করছেন না। রাতে শোবার সময় গম্ভীর মুখে স্ত্রীকে বললেন—দুনিয়ায় কত অদ্ভুত জিনিসই না হয়। রেহানা বললেন—জামাইয়ের কথার কি কোন ঠিক আছে? তুমি এটা বিশ্বাস করে আছ? ওসমান সাহেব রেগে গিয়ে বললেন—কোন কথাটা এ পর্যন্ত সে মিথ্যে বলেছে শুনি? ওসমান সাহেব কবিরের কোন বদনাম সহ্য করতে পারতেন না। এখনো পারেন না। যে লোক জীবনে কোনদিন নামাজ-রোজা করেছে বলে রেহানার মনে পড়ে না সেই লোকও দেখা যায় একুশে আগস্টে একটা জায়নামাজ টেনে বের করেন। এবং গভীর রাত পর্যন্ত টুপী মাথায় বসে থাকেন। অপরিচিত এই পোশাকে তাঁকে অদ্ভুত দেখায়। একুশে আগস্ট কবিরের মৃত্যুদিন।

পানি আনতে এতক্ষণ লাগলো?

দিলু পানি আনতে দেরী করেনি। গিয়েছে নিয়ে এসেছে। নিশাত আজ অকারণে রাগ করছে। দিলু বললো—নাও, পানি খাও।

লাগবে না যা। তৃষ্ণা মরে গেছে।

এটা কেমন কথা? তৃষ্ণা কখনো মরে যায়? তৃষ্ণা থাকেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। দিলু নরোম স্বরে বললো—আপা খেয়ে নাও, প্লিজ। তুমি শুধু শুধু রাগ করছ। নিশাত পানির গ্লাস হাতে নিলো।

তুমি রাতেও কিছু খাবে না?

না।

কেন?

দেখছিস না আমার শরীর ভালো না।

মাথা টিপে দেব?

না, লাগবে না। তুই এখন যা।

অন্ধকারে একা একা বসে থাকবে কেন? আমিও থাকি তোমার সঙ্গে।

দিলু খাটের উপর পা উঠিয়ে বসলো। অন্ধকারে পা নামিয়ে বসতে তার ভাল লাগে না। সব সময় মনে হয় কেউ একজন খাটের নিচ থেকে চুপি চুপি এসে পা চেপে ধরবে।

 

আপা, একটা ভূতের গল্প শুনবে?

নিশাত জবাব দিলো না।

সত্যি গল্প। জামিল ভাইয়ের নিজের জীবনে ঘটেছিলো।

নিশাত তবুও চুপ করে রইলো।

এ গল্প শুনলে তুমি আর একা একা অন্ধকারে বসে থাকতে পারবে না। এবং রাতে ঘুমও আসবে না।

এত ভয়ের গল্প শুনতে চাই নে। থাক। মাথা ধরার মধ্যে গল্প শুনতে ভাল লাগে না।

আপা, তোমার মাথার চুল টেনে দেই?

দে। আস্তে আস্তে টানবি।

দিলু নিশাতের কপালে হাত দিয়েই চমকালো। বেশ জ্বর গায়ে। এতটা জ্বর তা বোঝা যায়নি।

আপা, তোমার গা তো খুব গরম।

হুঁ।

জানালা বন্ধ করে দেই, ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে।

না থাক। জানালা বন্ধ থাকলে আমার কেমন যেন লাগে। মনে হয় নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।

মশারি ফেলা নেই। মাঝে মাঝে মশা কামড়াচ্ছে। দিলু হালকা স্বরে বললো, জানো আপা, আমি কখনো মশা মারি না।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। কারণ যেসব মশা মানুষকে কামড়ায় তারা সব স্ত্রী মশা। পুরুষ মশারা কামড়ায় না। আমি নিজে মেয়ে হয়ে একটা মেয়ে মশাকে কি করে মারি বলো?

পুরুষ মশা কামড়ায় না এ কথাটা তোকে বলেছে কে?

জামিল ভাই বলেছেন।

নিশাত বিছানায় উঠে বসলো। নিচু স্বরে বললো—জামিল ভাইয়র সঙ্গে তোর এত মাখামাখি কেন? দিলু অবাক হয়ে বললো—এই কথা কেন বলছো?

সব সময় তোর মুখে জামিল ভাই। জামিল ভাই। এটা ভাল নয়। ভাল নয় কেন?

তোর বয়স কম। এই বয়সে মেয়েরা খুব সহজে নানান রকম দুঃখ কষ্ট পায়।

নিশাত চুপ করে রইলো। দিলু বললো—পরিষ্কার করে বল আপা। নিশাত কঠিন স্বরে বললো—তোর মত বয়সী মেয়েরা খুব সহজে মুগ্ধ হয়। দুঃখ-কষ্ট আসে সে জন্যেই।

তোমার কথা আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

আমার মনে হয় তুই ঠিকই বুঝতে পারছিস। আমার যখন তোর মত বয়স ছিলো তখন তো আমি সবই বুঝতাম। তুই জামিল ভাইয়ের সঙ্গে বেশী মিশবি না।

কেন, সে কি খারাপ লোক?

না, সে খারাপ লোক না। ভাল মানুষ। বেশ ভাল মানুষ। সে জন্যেই ভয়। এক সময় তুই তাকে ভালবাসতে শুরু করবি। তোর জন্যে সেটা খুব দুঃখের ব্যাপার হবে।

দিলু দীর্ঘ সময় কোন কথাবার্তা বললো না। নিশাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু নিশাতের মনে হলো দিলু কাঁদছে।

তুই কাঁদছিস নাকি?

দিলু কোন উত্তর দিলো না। সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো।

চলে যাচ্ছিস?

দিলু সে কথারও কোন জবাব দিলো না। নিশাতের মনে হলো দিলুকে এসব কথা বলার কোন প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু এখন আর মনে করে কি লাভ? যা বলা হয়ে গেছে তা আর ফেরানোর উপায় নেই।

হ্যারিকেন হাতে রেহানা ঢুকলেন। তার কোলে ঘুমন্ত বাবু। তিনি বাবুকে বিছানায় শুইয়ে দিতে গেলেন। নিশাত বললো—ওকে তোমার কাছে রাখ মা। আমি আজ এ ঘরে একা শোব।

কেন, একা শুবি কেন?

সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না।

তোর শরীর ভাল নেই, একজন কেউ তোর সাথে থাকা দরকার। আমি থাকি কিংবা দিলু থাকুক।

কাউকে থাকতে হবে না।

রেহানা একটি কঠিন কথা বলতে গিয়েও বললেন না। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলেন। সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গ তুললেন—রাতে কি খাবি?

কিছু খাব না।

খাবি না কেন? তোর রাগটা আসলে কার উপর? ঠিক করে বলতো?

কারো উপর আমার কোন রাগ-টাগ নেই। শরীর ভাল নেই তাই খাব না।

ঠিক আছে।

রেহানা চলে যাচ্ছিলেন, নিশাত বললো—দিলুকে একটু পাঠিও তো মা।

দিলু আসবে না। তুই ওকে কি বলেছিস জানি না। দিলু কাঁদছে।

কাঁদার মত আমি কিছু বলিনি।

রেহানা শীতল স্বরে বললেন—তোর কথাবার্তা শুনে আমারই কাঁদতে ইচ্ছে হয় আর ও তো বাচ্চা মেয়ে।

ও বাচ্চা মেয়ে নয়। এই বয়সে মেয়েরা বাচ্চা থাকে না।

সবাই তোর মত নয়। কেউ কেউ বাচ্চা থাকে।

এ কথার মানে কি মা?

মানে-টানে কিছু নেই। তুই নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ নিশাত। যার দুঃখে আজ এরকম করছিস তার সঙ্গে তোর আচার-ব্যবহার কেমন ছিলো? ক’টা দিন তুই কবিরের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছিস?

মানুষ সব সময় হাসিমুখে থাকতে পারে না।

তা পারে না। কিন্তু তুই ভালমত ভেবে দেখ তো কবিরের সঙ্গে তোর ব্যবহারটা কেমন ছিলো।

তুমি যাও তো মা।

রেহানা চলে এলেন। নিশাত অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে দরজার ছিটকিনি লাগানো। দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দীর্ঘ সময়। বাবু ঘুম ভেঙে কাঁদতে শুরু করেছে—মা’র কাছে যাব। মা’র কাছে যাব। রেহানা তাকে সামলাবার চেষ্টা করছেন। নিশাত শুনলো মা বলছেন—কেন যে মরতে এখানে এলাম।

নিশাতের চোখ জ্বালা করছে। আজকাল তার চোখে জল আসে না। চোখ জ্বালা করে। মা একটু আগে যা বলে গেলেন সেটা কি ঠিক? মা কি ইঙ্গিত করতে চেষ্টা করছেন না যে, সে এখন যা করছে তা করার তার কোন অধিকার নেই। মা একটা মোটা দাগের ইঙ্গিত করছেন। স্থূল ধরনের কথা বলছেন।

সবার স্বভাব এক রকম নয়। সব মেয়েরাই তাদের স্বামীকে নিয়ে আহ্লাদ করে না। কেউ কেউ গম্ভীর স্বভাবের থাকে। সহজে উচ্ছ্বসিত হয় না। তাছাড়া কবিরের মধ্যে কি সত্যি সত্যি উচ্ছ্বাসিত হবার মত কিছু ছিলো?

সে ভালো ছেলে এতে সন্দেহ নেই। আমুদে ছেলে। হৈচৈ করতো। প্রচুর মিথ্যে কথা বলতো। টিভি’র প্রতিটা বাংলা সিনেমা গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখতো এবং শেষ হওয়ামাত্র বলতো—শালা, সময়টাই মাটি। আগে জানলে কে বসে থাকতো? কবির এমন একটি ছেলে যে পৃথিবীর যে-কোন মেয়েকে বিয়ে করেই সুখী হতো। এই সব ছেলেদের সুখী হবার ক্ষমতা অসাধারণ। এরা হয় সুখী স্বামী, সুখী বাবা এবং বুড়ো বয়সে একজন সুখী দাদা। সূক্ষ্ম রুচির মানুষ এত সহজে সুখী হয় না। সংসারে সুখী হবার মত উপকরণ ছড়ানো নেই।

বাবু খুব কাঁদছে। নিশাত দরজা খুলে বের হলো। হ্যাজাক লাইটটি বারান্দায় এনে রাখা হয়েছে। জামিল বাবুকে কোলে নিয়ে বারান্দায় এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হাঁটছে।

জামিল ভাই, ওকে আমার কাছে দিন।

জামিল ইশারায় তাকে কথা বলতে নিষেধ করলো। বাবুর ঘুমিয়ে পড়ার একটা সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে। মায়ের কথা শুনে জেগে উঠতে পারে। নিশাত অপেক্ষা করতে লাগলো।

আচ্ছা কবির বেঁচে থাকলে কি এরকম করতো? ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতো? এটা কখনো জানা হবে না। কিন্তু সবাই বলবে—বেঁচে থাকলে কত আদর করেই না ছেলে মানুষ করতো। মৃত মানুষের সম্পর্কে সব সময় ভালো ভালো কথা ভাবতে হয়। মৃত মানুষদের বয়স কখনো বাড়ে না। নিশাত এক সময় বুড়ো হয়ে যাবে। কিন্তু কবিরের বয়স সাতাস বছরেই থেকে থাকবে। তার কোনদিন চুল পাক ধরবে না। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হবে না। কোন মানে হয় না।

 

নিশাত বাবু ঘুমিয়ে পড়ছে। কোথায় রাখবে?

মা’র কাছে দিয়ে আসুন।

জামিল হাঁটছে কেমন ক্লান্ত ভঙ্গিতে। হাঁটার ভঙ্গিটাও কেমন চেনা চেনা। কবির কি এমন করেই হাঁটতো? এখন আর অনেক কিছুই মনে পড়ে না। স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসছে। একদিন হয়তো কিছুই মনে থাকবে না।

নিশাত, ওকে শুইয়ে দিয়ে এসেছি।

থ্যাংকস।

তোমার জ্বর কেমন?

আমার জ্বরের খবর মনে হচ্ছে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

জামিল তাকালো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। মৃদুস্বরে বললো—বেড়াতে এসে অসুখে পড়াটা খুব খারাপ।

আমি বেড়াতে-টেড়াতে আসিনি। সবাই এসেছে, বাধ্য হয়ে আমিও এসেছি।

জামিল হালকা স্বরে বললো, অবস্থা এরকম হবে জানলে আমি তোমার সঙ্গে জুটতাম না।

জুটছেন কেন, আপনাকে তো কেউ সাধাসাধি করেনি। নাকি করেছে?

না করেন। আমি নিজ থেকেই এসেছি।

কেন এসেছেন?

নিশাত, তোমার শরীর ভালো না। যাও তুমি শুয়ে থাক।

না, আপনি আমাকে বলুন আপনি কেন এসেছেন? ইউ গট টু টেল মি দ্যাট!
জামিল একটা সিগারেট ধরালো। সে লক্ষ্য করলো—নিশাত অল্প অল্প কাঁপছে।

জামিল ভাই, আমি আপনাকে আগেও পছন্দ করিনি, এখনো করিনা। আমার মনে হয় আপনি সেটা জানেন না।

নিশাত, যাও ঘুমুতে যাও।

ওসমান সাহেব অবাক হয়ে উঠে এলেন—এই নিশাত কি হয়েছে?

কিছু হয়নি বাবা।

জামিলকে কি বলছিলি?

কিছু বলছিলাম না।

নিশাত ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে চলে গেলো। ওসমান সাহেব বললেন—জামিল, ও চেঁচামেই করছিলো কেন?

জানি না চাচা। আপনি এখনো বারান্দায় বসে আছেন কেন? ঠাণ্ডা লাগবে তো।

ঠাণ্ডা অলরেডি লেগে গেছে। কিন্তু অন্ধকারে বসে থাকতে ভালোই লাগছে। জামিল, তুমি একটা কাজ করতো, দেখ, আলিমকে কোথাও পাও কিনা। আর শোন, এই হ্যাজাকটা এখান থেকে সরাবার ব্যবস্থা কর। আলো চোখে লাগছে। তোমাদের খাওয়া-দাওয়া হয়েছে তো?

হয়েছে।

সাব্বির কোথায়? ওকে এখানে আসার পর একবারও দেখিনি।

উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন।

 

আলিম ওসমান সাহেবের সামনে তাঁর প্রিয় গ্লাসটি রাখলো। লম্বা গ্লাস। জার্মান ক্রিস্টালের অপূর্ব গ্লাস। এই গ্লাস ছাড়া অন্য কিছুতেই তিনি তৃপ্তি পান না। ওসমান সাহেব স্পষ্ট একটা সুখের নিঃশ্বাস ফেললেন। আলিম মনে করে এনেছে। আলিম দ্বিতীয়বার একটা বাটিতে একগাদা বরফ নিয়ে এলো।

আরে তুই বরফ পেলি কোথায়?

আসার সময় নেত্রকোণা থেকে বিশ সের বরফ কিনলাম।

বলিস কি। গলে নাই?

কাঠের গুঁড়া দিছি চাইর দিকে। তবু গলছে। এখন আছে অল্প।

আলিম খুব সাবধানে হোয়াইট হর্সের বোতল খুলে হুইস্কি ঢাললো। ওসমান সাহেবের পেগ সাধারণ পেগের চেয়ে একটু বড়। আলিম মাপটা জানে। তবু অন্ধকারে কিছু বেশী পড়লো। অন্য সময় হলে ধমকে দিতেন। আজ কিছুই বললেন না। বরফের ব্যাপারটা তাঁকে অভিভূত করেছে।

তোর দাঁতের ব্যথার কি অবস্থা?

ব্যথা আছে।

রেহানার কাছ থেকে নিয়ে তিনটা এ্যাসপিরিন খা ব্যথা কমে যাবে।

আলিম কথা বললো না। ওসমান সাহেব দরাজ গলায় বললেন—তোর এখানে থাকার দরকার নেই। যা শুয়ে পড়।

স্যার আপনে ঘরে বসেন বাইরে ঠাণ্ডা।

বাইরেই ভালো। শোন আলিম, দু’টা পানির বোতল আর কিছু বরফ দিয়ে যাস।

আচ্ছা।

আলিম চলে যেতেই বিদ্যুতের মত ওসমান সাহেব দিলুর ধাঁধার রহস্য ভেদ করলেন। অত্যন্ত সহজ উত্তর। বরফ। দশ সের পানিকে প্রথমে জমিয়ে বরফ করতে হবে। তারপর সেই বরফের টুকরোটি হাতে করে যেখানে যাবার সেখানে যেতে হবে।

ওসমান সাহেব গভীর আনন্দ বোধ করলেন। নীলগঞ্জ ডাকবাংলোটি তাঁর কাছে হঠাৎ করে বড় প্রিয় হয়ে গেলো। যেন তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়াটি এই ডাকবাংলোয় পেয়ে গেলেন। যেন তাঁর আর কিছু পাওয়ার নেই। জীবনের সমস্ত সাধ পূর্ণ হয়েছে।

বাবা!

দিলু একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে উঠে এসেছে, শীতে কাঁপছে অল্প অল্প। কি রে দিলু?

তুমি এখানে বসে কি করছ?

কিছু করছিনা। বসে আছি।

আমার ঘুম আসে না বাবা। তোমার সঙ্গে একটু বসি?

বোস।

হুইস্কি খাচ্ছ, না? মা জানলে খুব রাগ করবে।

ওসমান সাহেব একটি হাত মেয়ের পিঠের ওপর রাখলেন। দিলু হালকা স্বরে বললো—বাবা, চা চামুচ দিয়ে এক চামুচ দেখি? আমার খুব খেতে ইচ্ছে করে।

ওসমান সাহেব একবার ভাবলেন বলবেন—যা একটা চামুচ নিয়ে আয়। বলতে পারলেন না।

দিলু বললো—তোমার শীত করছে না?

করছে। তোর মা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?

হ্যাঁ। সবাই ঘুমুচ্ছে। শুধু আমরা দু’জনে জেগে আছি।

জায়গাটা কেমন লাগছে?

ভাল।

পুকুরটা দেখেছিস?

হুঁ।

বিরাট পুকুর তাই না?

হুঁ। এ রকম একটা বাড়ি আমাদের থাকলে খুব ভাল হতো—তাই না বাবা? পেছনে বিরাট একটা পুকুর থাকবে। সামনে থাকবে প্রকাণ্ড সব রেণ্টি গাছ।

এগুলা রেণ্টি গাছ নাকি?

হুঁ।

কে বলেছে?

জামিল ভাই বলেছেন।

দিলু ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললো তারপর খুব হালকা গলায় বললো—আপা আমার সঙ্গে আজ খুব খারাপ ব্যবহার করেছে।

আমরা সবাই কখনো না কখনো খারাপ ব্যবহার করি।

কেউ আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে আমার খুব কষ্ট হয়। আমি তো কারোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি না। করি? তুমি বল?

ঘুমুতে যা দিলু।

দিলু উঠে গেলো। ওসমান সাহেবের হঠাৎ মনে পড়লো, আরে তাই তো, ধাঁধার উত্তরটা তিনি জানেন এটা দিলুকে বলা হলো না। উঠে গিয়ে ডাকবেন নাকি? কিন্তু তাঁর উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

 

দিলু ঘুমিয়েছে নিশাতের সঙ্গে। প্রকাণ্ড একটা খাট। খাটের নীচে আলো কমিয়ে হ্যারিকেনটা রাখা। ঘরময় অবছা অন্ধকার। পায়ের দিকের জানালার একটা কাঁচ ভাঙ্গা। সেই ভাঙ্গা গলে শীতের হাওয়া আসছে। দু’টি কম্বল আছে গায়ে তবু শীত মানছে না। দিলু নিশাতের দিকে আরো একটু সরে এলো। নিশাত শীতল স্বরে বললো—গায়ের উপর এসে পড়ছো কেন দিলু? সরে শোও। এত ঘেঁষাঘেঁষি আমার ভালো লাগে না। দিলু অনেকখানি সরে গেলো। পাশের ঘরে বাবু কাঁদছে। বিড়বিড় করে কি সব যেন বলছে। বোঝা যাচ্ছে না। দিলু বললো—আপু বাবু কাঁদছে।

কাঁদছে কাঁদুক।

ওকে এখানে নিয়ে এসো না। অনেক জায়গা তো।

ভ্যান ভ্যান করিসনা, চুপ করে থাক।

দিলুর চোখ ভিজে উঠলো। এমন বাজে করে কথা বলে কেন আপা? কি করেছে সে? কিছুই তো করেনি। শুধু বলেছে বাবু কাঁদছে। এটা বলা কি দোষের? দিলু কম্বলের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে ফেললো। সেখানে গাঢ় অন্ধকার। বাবুর কান্নার শব্দও সেখানে যাচ্ছে না। অন্ধকার দিলুর ভাল লাগে না। অন্ধকারে তার মৃত্যুর কথা মনে হয়। দাদীজান মারা যাবার সময় থেকেই তার এ রকম হয়েছে। দাদীজান মারা গিয়েছিলেন রাত ন’টায়। সবাই যখন কান্নাকাটি করছে তখন হঠাৎ কারেণ্ট চলে গেলো। কি ভয়াবহ অবস্থা। সবাই কান্না থামিয়ে মোমবাতি মোমবাতি বলে চেঁচামেটি শুরু করলো। দিলু বসে ছিলো সোফায়। হঠাৎ তার মনে হলো দাদীজান যেন উঠে আসছেন তার দিকে। কি অবস্থা। ভাগ্যিস বাবা তখন লাইটার জ্বালিয়ে দিলুর পাশে এসে বসলেন।

নিশাত মৃদুস্বরে ডাকলো—দিলু ঘুমিয়ে পড়েছিস? দিলু জবাব দিলো না। নিশাত কম্বলের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিলুকে কাছে টানলো।

কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। এত অভিমানি হয়েছে কেন? নিশাতের ইচ্ছা হলো দিলুকে ডেকে তুলে খানিকক্ষণ গল্পগুজব করে। সে আবার ডাকলো—দি দিলু এই পাগলি। দিলুর ঘুম ভাঙ্গলো না। নিশাত ছোট্ট একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। আর ঠিক তখন জামিলের হাসির শব্দ শোনা গেলো। কি আশ্চর্য অবিকল কবিরের মত ঘর কাঁপিয়ে হাসি। জামিল ভাইতো এরকম কখনো হাসেন না। তাঁর সব কিছুই মাপা। এবং কোন কিছুর সঙ্গেই কবিরের কোন মিল নেই। তবু আজ এরকম মিল পাওয়া গেলো কেন? নাকি সব মানুষের মধ্যে অদৃশ্য কোন মিল আছে?

রাত বাড়ছে। বাবু কাঁদছে না। চারদিকে সুনসান নীরবতা নিশাত হাত বাড়িয়ে দিলুকে কাছে টানলো। দিলু ঘুমের মধ্যেই কাঁদছে। কোন মিষ্টি স্বপ্ন দেখছে হয়তো। কতদিন হয়ে গেলো নিশাত কোন মিষ্টি স্বপ্ন দেখে না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *