নবম অধ্যায় – রাজবিদ্যা-রাজগুহ্যযোগ

“ভগবান্‌ কহিলেন, ‘হে অর্জুন! তুমি অসূয়াশূন্য; অতএব যাহা অবগত হইলে সংসারবন্ধন হইতে মুক্ত হইবে, আমি সেই গোপনীয় উপাসনাসহকৃত ঈশ্বরজ্ঞান কীর্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। এই উৎকৃষ্ট জ্ঞান বিদ্যাশ্রেষ্ঠ, রাজগণেরও গোপনীয়, অতি পবিত্র, প্রত্যক্ষফলদ, ধর্মানুগত ও অব্যয়; ইহা অনায়াসেই অনুষ্ঠান করা যাইতে পারে। যাহারা এই ধর্মে বিশ্বাস না করে, তাহারা আমাকে প্রাপ্ত না হইয়া মৃত্যুসমাকুল সংসারপথে নিয়ত পরিভ্রমণ করিয়া থাকে। হে অর্জুন! আমি অব্যক্তরূপে সমস্ত বিশ্বে ব্যাপ্ত রহিয়াছি; আমাতে ভূত-সকল অবস্থান করিতেছে; কিন্তু আমি কিছুতেই অবস্থিত নহি, আর আমাতেও কোন ভূত অবস্থান করিতেছে না; আমার এই ঐশিকী (ঐশী–নিয়তি বিষয়িণী) অঘটনঘটনাচাতুরী (অসম্ভব-সম্ভবকারিণী নিপুণতা) নিরীক্ষণ কর। আমার আত্মা ভূতসকল ধারণ ও পালন করিতেছে; কিন্তু কোন ভূতেই অবস্থান করিতেছে না। যেমন সমীরণ সর্বত্রগামী ও মহৎ হইলেও প্রতিনিয়ত আকাশে অবস্থান করে, তদ্রুপ সকল ভূতই আমাতে অবস্থান করিয়া রহিয়াছে জানিবে। হে অর্জুন! কল্পক্ষয়কালে (ব্রহ্মার স্থিতিকালের অবসানে–মহাপ্রলয় সময়ে) ভূতগণ আমার ত্রিগুণাত্মিকা মায়ায় লীন হয় এবং কল্পপ্রারম্ভে আমি পুনরায় উহাদিগকে সৃষ্টি করিয়া থাকি। আমি স্বীয় মায়ায় অধিষ্ঠিত হইয়া জন্মান্তরীণ (পূর্ব পূর্ব জন্মের) কর্মানুসারে প্রলয়কালবিলীন (প্রলয়কালে লয়প্রাপ্ত) কর্মাদিপরবশ (স্ব স্ব ধর্মের অধীন) ভূত-সমুদয় বারংবার সৃষ্টি করিতেছি; কিন্তু আমি সেই সকল সৃষ্টি প্রভৃতি কর্মের আয়ত্ত (অধীন) নহি; আমি সকল কর্মেই অনাসক্ত হইয়া উদাসীনের ন্যায় নিরন্তর অবস্থান করিয়া থাকি। মায়া আমার অধিষ্ঠান (আশ্রয়) মাত্র লাভ করিয়া এই সচরাচর বিশ্ব সৃষ্টি করিতেছে এবং আমার অধিষ্ঠান নিমিত্তই এই জগৎ পুনঃ পুনঃ উৎপন্ন হইতেছে। আমি সকল ভূতের ঈশ্বর; আমি মানুষ-বিগ্রহ পরিগ্রহ করিয়াছি বলিয়া বিফল আশাসম্পন্ন, বিফল কর্মপরায়ণ, বিফল জ্ঞানযুক্ত বিচেতন, মূঢ় ব্যক্তিরা আমার পরম তত্ত্ব অবগত না হইয়া আমাকে অবজ্ঞা করিয়া থাকে; কারণ, তাহারা রাক্ষসী , আসুরী ও মোহিনী (মোহকারিণী রাক্ষস ও অসুরসম্বন্ধীয়া) প্রকৃতি আশ্রয় করিয়া আছে। কিন্তু মহাত্মগণ দৈবী প্রকৃতি আশ্রয়পূর্বক আমাকে সকল ভূতের কারণ ও অব্যয়রূপ অবগত হইয়া অনন্যমনে আরাধনা করেন; সতত ভক্তিযুক্ত ও বহিত হইয়া আমার নাম কীর্তন করেন, যত্নবান ও দৃঢ়ব্রত হইয়া আমাকে নমস্কার করিয়া থাকেন এবং প্রতিনিয়ত সাবধান হইয়া ভক্তিসহকারে আমার উপাসনা করেন। আর কেহ তত্ত্বজ্ঞানরূপ যজ্ঞ, হেক অভেদ ভাবনা, কেহ পৃথক ভাবনা দ্বারা, কেহ বা সর্বাত্মক বলিয়া ব্রহ্মরুদ্রাদিরূপে আমাকে আরাধনা করিয়া থাকেন। দেখ, আমি যজ্ঞ, স্বধা, ঔষধ, মন্ত্র, আজ্য, অগ্নি ও হোম; আমি এই জগতের পিতা, পিতামহ, মাতা ও বিধাতাল আমি জ্ঞেয়, পবিত্র, ওঁঙ্কার, ঋক্‌, সাম ও যজু; আমি কর্মফল, ভর্তা (পালনকর্তা), প্রভু, সাক্ষী, নিবাস, শরণ, সুহৃৎ, প্রভব, প্রলয়, আধার, লয়স্থান ও অব্যয় বীজ। হে অর্জুন! আমি তাপপ্রদান এবং বৃষ্টিরোধ ও বৃষ্টি প্রদান করি। আমিই অমৃত, মৃত, সৎ ও অসৎ।
“ত্রিবেদবিহিত কর্মানুষ্ঠানপর (কর্মানুষ্ঠাননিরত), সোমপায়ী বিগত পাপ মহাত্মগণ যজ্ঞ দ্বারা আমার সৎকার করিয়া সুরলোকলাভের অভিলাষ করেন, পরিশেষে অতি পবিত্র সুরলোক প্রাপ্ত হইয়া উৎকীইষ্ট দেবভোগ্যসকল উপভোগ করিয়া থাকেন। অনন্তর পুণ্যক্ষয় হইলে পুনরায় মর্ত্যলোকে প্রবেশ করেন। এইরূপে তাঁহারা বেদত্রয়বিহিত কর্মানুষ্ঠানপর ও ভোগবিলাষী হইয়া গমনাগমন (জন্ম-মৃত্যুরূপ সংসারে আগমন–সংসার হইতে গমন) করিয়া থাকেন। যাহারা অনন্যমনে আমাকে চিন্তা ও আরাধনা করে, আমি সেই সকল মদেকনিষ্ঠ ব্যক্তিদিগকে যোগক্ষেমপ্রদান করিয়া থাকি। যাহারা শ্রদ্ধা-ভক্তিসহকারে অন্য দেবতার আরাধনা করে, তাহারা অবিধিপূর্বক আমাকেই পূজা করিয়া থাকে। আমি সকল যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু; কিন্তু তাহারা আমাকে যথার্থতঃ বিদিত হইতে পারে না; এই নিমিত্ত স্বর্গভ্রষ্ট হইয়া থাকে। দেবব্রতপরায়ণ (যজ্ঞাদিনিষ্ঠ) ব্যক্তিরা দেবগণ, পিতৃব্রতনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পিতৃগণ ও ভূতসেবকেরা ভূত-সকলকে এবং আমার উপাসকেরা আমাকেই প্রাপ্ত হয়। যিনি ভক্তিসহকারে আমাকে ফল, পত্র, পুষ্প ও জল প্রদান করেন, আমি সেই মহাত্মা ব্যক্তির সমুদয় দ্রব্য ভক্ষণ ও পান করিয়া থাকি। হে অর্জুন! তুমি যে কিছু কর্ম অনুষ্ঠান, যাহা ভক্ষণ, যাহা হোম, বে বস্তু দান ও যেরূপ তপঃসাধন করিয়া থাক, তৎসমুদয় আমাকে সমর্পণ করিও; তাহা হইলে কর্মজনিত শুভাশুভ ফল হইতে বিমুক্ত হইবে এবং কর্মার্পণরূপ (কর্মফলত্যাগরূপ) যোগযুক্ত হইয়া আমাকে লাভ করিবে। আমি সকল ভূতে একরূপ; কেহ আমার শত্রু বা মিত্র নাই। যাহারা ভক্তিপূর্বক আমার আরাধনা করে, তাহারা আমাতেই অবস্থান করিয়া থাকে। যদি দুরাচার ব্যক্তিও অনন্যমনে আমার উপাসনা করে, সে সাধু; তাহার অধ্যবসায় অতি সুন্দর; সে অবিলম্বে ধর্মপরায়ণ হইয়া নিরন্তর শান্তি লাভ করে এবং তাহার বিনাশ নাই। অতি পবিত্র ব্রাহ্মণ ও ভক্তিপরায়ণ রাজর্ষিগণের কথা দূরে থাকুক, যাহারা নিতান্ত পাপাত্মা, যাহারা কৃষি প্রভৃতি কার্যে নিরত বৈশ্য ও যাহারা অধ্যয়নবিরহিত শূদ্র, তাহারা এবং স্ত্রীলোকেরাও আমাকে আশ্রয় করিলে অত্যুৎকৃষ্ট গতি লাভ করিতে পারে। হে অর্জুন! তুমি এই অনিত্য অসুখকর লোক প্রাপ্ত হইয়া আমাকে আরাধনা ও নমস্কার কর; আমাকে মন সমর্পণপূর্বক আমার প্রতি ভক্তিপরায়ণ হও এবং সর্বদা আমার পূজা কর। তুমি এইরূপে আমাতে আত্মা সমাহিত করিলে আমাকে লাভ করিবে।’ “