আগুনপাখি (উপন্যাস)

সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় একটি নাম হাসান আজিজুল হক। ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্ধমান জেলার যুবগ্রামে তার জন্ম। অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘকাল জুড়ে চলেছে তাঁর সৃষ্টির কাজ, অবিস্মরণীয় অনেক গল্পের স্রষ্টা তিনি। গল্প অনেক লিখেছেন, কিন্তু, রহস্যময় কোনো কারণে, উপন্যাস-লেখায় বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। প্রতিভাবান এই কথাসাহিত্যিক এ-বইটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকসমাজের উৎসুক প্রতীক্ষার যেন অবসান হলো, আমাদের হাতে এসে পৌঁছল হাসান আজিজুল হকের হৃদয়স্পর্শী এই উপন্যাস আগুনপাখি।

০১. ভাই কাকালে পুঁটুলি হলো

ভাই কাকালে পুঁটুলি হলো আমার মায়ের য্যাকন মিত্যু হলো আমার বয়েস ত্যাকন আট-ল বছর হবে। ভাইটোর বয়েস দেড়-দু বছর। এই দুই ভাই-বুনকে অকূলে ভাসিয়ে মা আমার চোখ বুজল। ত্যাকনকার দিনে কে যি কিসে মরত ধরবার বাগ ছিল না। এত রোগের নামও ত্যাকন জানত না লোকে। ডাক্তার-বদ্যিও ছিল না তেমন।...

০২. বিছেনা ছেড়ে একদিন আর উঠলে না

বিছেনা ছেড়ে একদিন আর উঠলে না দাদি আমার বাপজিকে একটুকুনি ভয়ই করত। যেদি কিছু খেতে দেবে, একটো লাড়ু, বাতাসা কি পাটালি কিংবা চিনির কদমা, আড়ালে ডেকে নিয়ে যেয়ে লুকিয়ে দিত। লতুন মা য্যাতোদিন ছিল না, বাপজি ত্যাতোটো খেয়াল করত না। সারাদিন বাড়িতেই থাকত না, তা খেয়াল করবে কি? লতুন...

০৩. আমার বিয়ের ফুল ফুটল

আমার বিয়ের ফুল ফুটল দাদি ত্যাকন আর নাই। ভাইটিও কাছে নাই। লতুন মা-ই তার নিজের খোঁকাটিকে দেখে, আমাকে তেমন আর ওকে নিয়ে বেড়াতে হয় না। এই করতে করতে একদিন আমি হঠাৎ কেমন করে যি বড় হলোম, তা নিজেই জানতে পারি নাই। কবে একদিন ফালি ছেড়ে মোটা তাঁতের শাড়ি ধরেছি। তাঁতিবাড়ি থেকেই...

০৪. মাটির রাজবাড়িতে আমার আদর

মাটির রাজবাড়িতে আমার আদর বিহানবেলাতেই আবার বাউরি কাহাররা এল। পালকি সাজাতে লাগলে তারা। আমাকে রাজবাড়িতে নিয়ে যাবে। সি আবার কি বেপার! কেউ কিছু বলে না আমাকে। লতুন বউ, শুদুবই ঝ কাকে? শ্যাষে কত্তা এসে ঘরে ঢুকে ঘাড়টো একটু অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললে, রাজবাড়ি গাঁয়েই বেশি দূরে নয়।...

০৫. বড় সোংসারে থই মেলে না

বড় সোংসারে থই মেলে না লতুন বউ আমি এসে ওঠলম ডোবা থেকে দিঘিতে। বড় সংসার, কিছুতেই থই মিলছে না। আমাদের বংশও বড় ছিল বটে, গাঁ-জোড়া। বংশ। তবে সিসব আলো আলেদা ভাই-ভায়াদের সোংসার। আমাদের নিজেদের সোংসার ছোট, মা য্যাকন বেঁচে ত্যাকনো ছোট। তার মরার পরে কিছুদিন তো আরও ছোট। লতুন মা...

০৬. আমার একটি খোঁকা হলো

আমার একটি খোঁকা হলো বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার একটি খোঁকা হলো। সি দিনই লিকিনি দোপরবেলায় এক কড়াই দুধ উথুলে পড়ে গেয়েছিল। গাই দুয়ে এনে জ্বাল দেবার লেগে দুধ চুলোয় বসিয়েছিল। কেউ আর খেয়াল করে নাই, আঁতুড়ঘরে আমাকে আর লতুন খোঁকাকে নিয়েই সবাই বেস্ত ছিল। এই ফাঁকে সেই উজ্জ্বলন্ত...

০৭. সোয়ামি সোংসার নিয়ে আমার খুব গরব হলো

সোয়ামি সোংসার নিয়ে আমার খুব গরব হলো যে শাশুড়িকে যমের মতুন ভয় করতম, মুখের দিকে তাকাইতে পয্যন্ত সাহস করতম না, সেই শাশুড়ি একদিন বৈকালবেলায় আমাকে তার ঘরে ডাকলে। খোঁকা ত্যাকন খানিকটো ডাগর হয়েছে, সে-ও সেই সোমায় আমার কাছে ছিল। ঘরে যেয়ে দাঁড়াইতেই শাশুড়ি আমার কাছে এসে বললে,...

০৮. সোংসার সুখ-দুখের দুই সুতোয় বোনা বই-তো লয়

সোংসার সুখ-দুখের দুই সুতোয় বোনা বই-তো লয় বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার খোঁকা হয়েছিল। তাপর আট বছরের মধ্যে আমাদের সোংসারে আর কুনো ছেলেপুলে হয় নাই। ভাশুরের বিয়ে কত্তার বিয়ের ক-বছর আগেই হয়েছিল। পেথম পেথম মনে হতো, বড় বউয়ের ছেলেমেয়ে হতে একটু সোমায় লাগছে। তা-পর এক বছর যায়,...

০৯. ও মা, মাগো, কতোদিন যাই নাই, এইবার বাপের বাড়ি যাব

ও মা, মাগো, কতোদিন যাই নাই, এইবার বাপের বাড়ি যাব দুই ছেলে নিয়ে বাপের বাড়ি যেচি। ছোট ছেলেটো ত্যাকন একটু ভঁটো হয়েছে। মাঝখানে পরপর দু-বছর বাপের বাড়ি যাওয়া হয় নাই সাংসারের হ্যাঙ্গামে। বিয়ের পর থেকে পিতিবারেই গরমকালে বাপের বাড়ি যাওয়া হয়েছে। আবার পিতি বছরেই বাপের বাড়ি থেকে...

১০. ছেলে চলে গেল শহরে

ছেলে চলে গেল শহরে ফিরে এসে শ্বশুরবাড়িতে কাউকে কিন্তুক সিসব কথা কিছুই বলি নাই। শুদু বললম, ছেলেদের আর মন টিকছিল না, স্কুলও খুলবে তাই চলে অ্যালম। কত্তা কিছু বুঝেছিল কিনা জানি না। কিছুই শুদোয় নাই আমাকে। উ তো কিছু শুদোবার মানুষ লয়! শাশুড়ি-ননদও কোনো কথা বললে না। বাড়ি এসে...

১১. সব গোলমাল লেগে যেচে

সব গোলমাল লেগে যেচে সোয়ামি পুত্তুর ননদ শাশুড়ি দ্যাওর ভাশুর ইদের নিয়ে সোংসার করি। সেই ভোর ভোর ঝুঝকিবেলায় উঠি, সুয্যি ত্যাকনো দেখা দেয় নাই। সেই শুরু, সারা দিনে একবার কামাই নাই। কাজ কাজ। রেগেমেগে বলি রাবণের গুষ্টি। ঘর-দুয়োর পোষ্কার রাখো, কুটনো কোটো, বাটনা বাটো, রাজ্যের...

১২. খোঁকা ভালো আছে তবে সোময়টো খারাপ

খোঁকা ভালো আছে তবে সোময়টো খারাপ আমার কথাটো রাখলে। কত্তা পরের দিনই শহরে গেল খোঁকার খবর আনতে। কাল রেতে খোঁকার কথা মনে হবার পর থেকে আমার বুকের ভিতর কি যি করছিল সি আমিই জানি। এই একটো জায়গায় খেয়াল করি, ক আমার মনের কথাটো ঠিকই বুঝতে পারে। রাগ-ঝাল যা-ই করুক, কথা শুনে কখনো...

১৩. ছেলে আনো বাড়িতে, আর পড়তে হবে না

ছেলে আনো বাড়িতে, আর পড়তে হবে না এত কথা ভাবলম কিন্তুক যে-ই শোনলম বড় খোঁকাকে ধরে জেলে নিয়ে গেয়েছে, অমনি সব ওলোট-পালোট হয়ে গেল। ছেলেকে জেলে নিয়ে গেয়েছে, দড়ি দিয়ে বেঁধেছে, না শেকল দিয়ে বেঁধেছেলাঠির বাড়ি মেরে টানতে টানতে নিয়ে গেয়েছে–উ ছেলে কুনোদিন কারু হাতে মার খায়...

১৪. যা ভয় করেছেলম তা-ই হলো, ই সান্নিপাতিক জ্বর

যা ভয় করেছেলম তা-ই হলো, ই সান্নিপাতিক জ্বর কি করে শহর থেকে বড় ডাক্তার আনা সোম্ভাব হলো, আমি জানি না। বোধায় জমিই খানিকটা বেচতে হলো। দ্যাওর-রা সব ঘেঁকে ধরলে কত্তাকে।গিন্নি আর ননদও দুটো কড়া কথা শুনিয়ে দিলে তাকে। ছেলেই যদি চলে গেল, সম্পত্তি ধুয়ে কি পানি খাবে কত্তা? ছোট...

১৫. সারা জাহান খাঁ খাঁ–হায়রে শোধ তোলা

সারা জাহান খাঁ খাঁ–হায়রে শোধ তোলা যিসব গাঁয়ে আমাদের আত্মীয়কুটুম জ্ঞাতিগুষ্টি থাকত, সেই রেতেই সিসব গাঁয়ে খবর দিতে লোক চলে গেল। গরমকালের দিনে লাশ বেশি সোমায় থাকবে না, য্যাতো তাড়াতাড়ি মাটি হয়ে যায় ত্যাতোই ভালো। যা গরম, মনে হচে কাল সকাল পয্যন্ত লাশ থাকে কি না সন্দ।...

১৬. সোংসার কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না

সোংসার কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না আমার বড় খোঁকা চলে গেল। দুনিয়াদারিতে আর আমার মন নাইনাই নাই নাই–তবু কি মওত এল? সোংসার কি ক্ষ্যামা দিলে? ছুটি কি প্যালম? বড় খোঁকা গেল তো পরের খোঁকাটি বড় খোঁকার জায়গায় চলে এল। কবে এল তা জানিও না। দেখতে দেখতে সে-ও বড় হয়ে গেল। মোটেই বড়...

১৭. কতো লোকের কতত বিচের, কতো বিধেন

কতো লোকের কতত বিচের, কতো বিধেন কোট বসত রোববারে। যতোদূর মনে হচে রোববারেই কত্তার আদালত বসত। রোববার ছুটির দিন বটে, গাঁয়ের ইশকুলেও ছুটি হতো ঐদিনে শহর-গঞ্জের মতুনই। কিন্তুক ইশকুলটো বাদ দিলে গাঁয়ে আবার ছুটি কি! সেই লেগে মনে হচে দলিজে কোট বসত রোববার দিন। দলিধরের ভেতরে-বাইরের...

১৮. পিথিমির পেজা আর কতো বাড়াব

পিথিমির পেজা আর কতো বাড়াব এবারের সন্তানটি পেটে নিয়ে আমি খুব পেরেশান। কি আর বলব! নিজের ওপরেই নিজের রাগ হয়। কতো মনে হয় আর চাই না, আর বোঝা বইতে পারি না, কিন্তু জম্মের পরে তার শুদু মুখটি দেখা বাকি! কার কারসাজি জানি না, একবার যেই মুখটির ওপর চোখ পড়ল, একদিকে সারা দুনিয়া আর...

১৯. কি দিন এল, সারা দুনিয়ায় আগুন লাগল

কি দিন এল, সারা দুনিয়ায় আগুন লাগল পিথিমিতে এলম কিন্তুক পিথিমির কিছুই দেখলম না। কবে একদিন মায়ের প্যাট থেকে পড়লম, দুনিয়াতে এসে চোখ দুটি মেললম, হয়তো দুবার জোরে চিষ্কার করে কেঁদেছেলম, ঐ পয্যন্তই। তাপর এত কাল পার করলম, কিছুই দেখলম না পিথিমির। সারা জেবনে বাড়ি থেকে তিন কোশ...

২০. আবার অ্যানেকদিন বাদে বাপের বাড়ি

আবার অ্যানেকদিন বাদে বাপের বাড়ি তা অ্যানেকদিন বাদেই বটে! আগের মতুন আর আনন্দ হয় না। বাপজি মারা গেয়েছে বছর চারেক হলো! অসুখের খবর লয়, আমি একেবারে মরার খবরই পেয়েছেলম। কষ্ট কিছু হয় নাই তার। মুখ দিয়ে রক্ত উঠেছিল। ই রোগের নাম লিকিনি সন্ন্যাস রোগ। ওষুধ-পানি আর করতে হয় নাই,...