খেলারাম খেলে যা

০১. বাসাটা খুঁজে পেল বাবর

দু একজনের কাছে জিগ্যেস করতেই বাসাটা খুঁজে পেল বাবর। কাজী সাহেব তাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। আরে আপনি! কখন এলেন? কীভাবে এলেন? আসুন, আসুন। চলে এলাম। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ এমন কী দূর! গাড়ি চালিয়ে চলে এলাম। পরীক্ষণেই বাবরের মনে হলো আসবার কারণ কিছু না বললে উপস্থিতিটা শোভন হচ্ছে না। তাই সে যোগ করল, এখানে একটা […]

০২. লতিফা

জাহাজে করে কোথাও যাচ্ছিল বাবর। জাহাজটাই ড়ুবে গেল। নিঃশব্দে। নিমেষে। সে এখন পানির অতলে অবিরাম নামছে, নামছে। নামতে নামতে গতিটা হঠাৎ থেমে গেল। স্থির হয়ে রইল বাবর। আর তার চারদিক দিয়ে বয়ে যেতে লাগল। নীল শীতল অগাধ পানি। একটা বড় রূপালি মাছ এলো কোথা থেকে। সে তার ঈষৎ গোলাপি লেজ দিয়ে মৃদু চাপড় মারতে লাগল […]

০৩. উল্কার মত গাড়ি চালিয়ে

পরদিন উল্কার মত গাড়ি চালিয়ে ঢাকায় ফিরল বাবর। পরদিন লতিফার সঙ্গে আর দেখা হয়নি তাঁর। ভোর রাতে ক্রমবর্ধমান অথচ অপূর্ণ, প্রতিহত সেই বাসনাকে নিজ হাতেই বইয়ে দিতে হয়েছে। সেই থেকে কোথায় যেন একা জ্বালা, একটা আক্রোশ, একটা প্ৰায় দৃশ্যমান স্তব্ধতা বড় হতে হতে জগৎ সংসার গ্রাস করবার উপক্রম করেছে। ঢাকায় ফিরে ঘরের তালা খোলার সঙ্গে […]

০৪. মিসেস নাফিস

মিসেস নাফিস বললেন, যাহোক আসা হলো তাহলে? আপনি কী ভেবেছিলেন? সত্যি বলব না মিথ্যে? আপনি যা বলবেন তা-ই আমি সত্যি বলে মেনে নেব। যদি সত্যি বলি, ভেবেছিলাম। আপনি আসবেন না। আর আপনি যে আসবেন, সেটা মিথ্যে মনে হচ্ছিল। বাবর হাসল, টাইয়ের নট ঠিক করল আন্দাজে, বিরল হয়ে আসা চুলের ভেতর হাত চালাল খানিক, হাসল আবার, […]

০৫. উদ্দেশ্যবিহীন কিছুক্ষণ

গাড়ি নিয়ে উদ্দেশ্যবিহীন কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল সে। একবার মনে হলো তার ক্ষিদে পেয়েছে, কিছু খাওয়া দরকার। কিন্তু উৎসাহ পেল না। কোন হোটেলে বসবে, অর্ডার দেবে, অপেক্ষা করবে, খাবার আসবে–বড় দীর্ঘ মনে হলো ব্যাপারটা। ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়ে একটা লোক রঙ্গীন তুলোয় তৈরি সিংহ বিক্রি করছে। কত দাম? আপনার জন্যে দশ টাকা। একবার ভাবল, কেনে। আবার ভাবল, কিনে […]

০৬. বাবলি

পর্দা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখল, সেলিমের সামনে বাবলি একগাদা বইপত্র নিয়ে মুখ কালো করে বসে আছে। বাবরকে দেখে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল বাবলি। এলোপাতাড়ি একটা বই ওল্টাতে লাগল। সেলিম বলল, আয়। তোর কথা শুনে বাবলিকে নিয়ে বসেছিলাম পড়াশুনা দেখতে। হোয়াট ইজ ইকনমিকস তাই বলতে পারল না। তাই নাকি বাবলি? বলতে বলতে বাবর বসল। তবে আর […]

০৭. একজন আসবে বলেও

একজন আসবে বলেও তক্ষুণি বেরুন সম্ভব হয়নি। আরো কিছুক্ষণ বসতে হয়েছে। বসেছে সে। বারবার তার মনে হচ্ছিল বাবলি একবার এ ঘরে আসবে। এলে কী হবে তা সে জানে। না। কিন্তু প্ৰতীক্ষ্ণ করেছে উৎকৰ্ণ হয়ে প্রতিটি মুহূর্ত। ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার প্রবল একটা আকর্ষণ চিরকাল অনুভব করেছে বাবর। বিপদ তার স্বাভাবিক পরিবেশ। উদ্বেগ তার পরিচ্ছেদ। এই […]

০৮. সারা দুপুর সুরাপান

সারা দুপুর সুরাপান করল বাবর। হাঃ হাঃ। তুমি কোথায় আছ? অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝখানে, যেখানে আগেও ছিলে, এখন আছ এবং পরেও থাকবে। তার এক বন্ধুকে প্ল্যান্টার্স পাঞ্চ খেতে দেখেছে মাঝে মাঝে। সে নিজে কোনোদিন চেষ্টা করেনি। কোন কোন সুরা মিশিয়ে করে তাও জানে না। গেলাশের নিচের দিকটা লালচে, ওপরে সোনালি–অস্বচ্ছ, দয়াহীন একটি পানীয় বলে ওটাকে […]

০৯. পতেঙ্গা এয়ারপোর্ট

পতেঙ্গা এয়ারপোর্ট থেকে সোজা শহরে এসে টেলিগ্রাফ অফিসে ঢুকল বাবর। একটা ফরম নিয়ে খসখস করে লিখল–কী লিখবে আগে থেকে ভাবা ছিল তারা— এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম জাহেদা ইসলাম সেইন্ট মেরি কলেজ হোস্টেল ইস্কাটন, ঢাকা ফাদার সিরিয়াসলি ইল, কাম শার্প। –মাদার। পয়সা গুণে দিল বাবর। গলা বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, টেলিগ্রামটা আজকেই পাবে তো? হ্যাঁ, হ্যাঁ। কখন পাবে? এই […]

১০. রাতের আকাশ

প্লেনে রাতের আকাশ দিয়ে ঢাকায় ফিরতে ফিরতে তার মনে পড়ল আজ দুপুরে পরপর সে কয়েকটা স্বপ্ন দেখেছে। কোনটা আগে কোনটা পরে এখন আর মনে নেই। খুঁটিনাটিও মনে পড়ছে না। কেবল কয়েকটা ছবি। একটাতে তার বাবা ছাতা মাথায় বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। গালের দাড়ি বেয়ে টপটপ করে ঝরছে বৃষ্টির ধারা। হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, ভিজে গেছে। বাবা […]

১১. জাহেদা

আজ সকালে বেশ কুয়াশা পড়েছিল। এখন কুয়াশা নেই, কিন্তু চারদিকে সূর্য ওঠার অনেক আগে যেমন অন্ধকার-অন্ধকার তেমনি করে আছে। শীত করছে। হাতের তোলো মরা মাছের মত মনে হচ্ছে। কী যেন কোথায় হলে তারই অপেক্ষায় মুগ্ধ হয়ে আছে বস্তুপুঞ্জ। দ্যালানগুলো যেন ঝুঁকে পড়েছে সম্মুখে, পথটা উঠে গেছে দূরে, যেমন পাহাড়ে। একটা করে গাড়ির শব্দ হচ্ছে, মনে […]

১২. আরিচার পর বাঘাবাড়ি

আরিচার পর বাঘাবাড়ি। শেষ ফেরি এটাই। তারপর সোজা একটানা রংপুর। বাঘাবাড়িতে এসে রেস্ট হাউস দেখে জাহেদা বলল, একটু দাঁড়ান। তার ছোট্ট সুটকেশটা নিয়ে জাহেদা ভেতরে চলে গেল। একটা বাবলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল বাবর। ওপাশে নিচু জমিতে একটা মরা গরু পড়ে আছে। কয়েকটা শকুন খুবলে খুবলে খাচ্ছে তাঁর পচা মাংস। বহুদূরে একটা কুকুর বসে বসে […]

১৩. ডাক বাংলোয়

সার্কিট হাউজে কামরা খালি নেই। ডাক বাংলোয় পাওয়া গেল। ঠিক তখন সন্ধে। দোতলার একটা ঘর খুলে দিল চৌকিদার। জাহেদা বলল, এত টায়ার্ড লাগছে। লাগবে না? কতদূর এসেছে। গাড়িতে একভাবে বসেছিলে। বাতি জ্বালালো চৌকিদার। দুটো খাট। একটা ড্রেসিং টেবিল। তার ওপরে কবেকার একটা মেঘলা গ্লাশ পড়ে আছে। ঘরে ঢুকে জাহেদ, যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। একবার শুধু […]

১৪. বাতি নিভিয়ে

হাত ফিরিয়ে আনল বাবর। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে উঠল সে। বাতি নিভিয়ে হাতরে হাতরে জাহেদার খাটের কাছে এসে দাঁড়াল। বসল। বসে রইল। কিছুক্ষণ। তারপর সন্তৰ্পণে লম্বা হয়ে শুল তার পাশে। বাবরের বাবা মারা গেলেন তার তিনদিন আগে এক রাতে ঘুমিয়েছিল সে। হঠাৎ স্বপ্ন কী স্বপ্নের মত বাস্তবে সে দেখতে পেয়েছিল ঘন কালো কাপড়ে টানটান আবৃত […]

১৫. হেডা, ও হেডা

খুর ভোরে ঘুম থেকে উঠল বাবর। জেগে দেখল জাহেদ আর সে পিঠ ফিরিয়ে শুয়েছিল। জাহেদাকে এখন জাগাল না। দ্রুতপায়ে নেমে বাথরুমে গেল, পরিষ্কার করে গাল কামাল, গরম পানি আনিয়ে গোসল করল অনেকক্ষণ ধরে। পরল তার শাদা ফ্ল্যানেলের সুট। সবুজ ফোঁটা দেয়া টাই বাধল গলায়। মন খুব ভাল থাকলে এই পোশাকটা সে পরে। টাইটা আলজিরিয়া থেকে […]

১৬. আকাশটা লাল

বাবর চোখ খুলে দেখে আকাশটা লাল হয়ে উঠছে। আরাম চেয়ারে শুয়ে ঘাড়টা ব্যথা করছে তার। পাশে তাকিয়ে দেখে, জাহেদা। তখন বুঝল জাহেদা তার ঘুম ভাঙ্গিয়েছে। দুপুরের পোশাকটা পালটে শাদা জামা পাজামা পরেছে। তাতে কালো বর্ডার দেয়া। চুল পিঠের পরে ছেড়ে দেয়া, কাঁধের নিচে ডোল হয়ে আছে। বাবর হাসল। যান, মুখ ধুয়ে নিন। চা আনতে বলেছি। […]

১৭. শীত করছে

গাড়িতে বসে গায়ে কাঁপন দিল জাহেদার। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। এতক্ষণ শিশিরে ভিজে ভেতরটা একেবারে হিমাগার হয়ে আছে। শীত করছে? হুঁ। বাবর তার জ্যাকেট খুলে দিল। এটা জড়িয়ে নাও। না। দাঁতে দাঁত বেজে উঠল জাহেদার। বাবর শাসন করে উঠল, শীতে মরবে তবু কথা শুনবে না মেয়ে। জোর করে জ্যাকেটটা চাপিয়ে দিল জাহেদার গায়ে। বলল, গাড়ি চললে […]

১৮. খেলারাম, খেলে যা

হাঃ। খেলারাম, খেলে যা। পাশে শুয়ে আছে জাহেদা। ঘুমন্ত, পরিশ্রান্ত, অধিকৃত, শিথিল। দীর্ঘলয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তার নিঃশ্বাস। সমস্ত দেহ এখন মসৃণ, কেবল কীসের স্মৃতিতে স্তনমুখে কিছু পদ্মকাঁটা ধরে আছে। ঋজু বাঁ পায়ের ওপর ডান পা-টা ভাজ হয়ে চেপে আছে দেখাচ্ছে হেনটি মাতিসের বার্নস মিউরাল ডান্স ওয়ানের মধ্য-ফিগারের মত। চুলে ঢাকা গাল চিবুক গলার কোল। চোখের […]

১৯. দুপাশে আখের খেত

দুপাশে আখের খেত। সোনার মত রং। সবুজ ফেটি বাঁধা লাঠিয়ালদের মত ভিড় করে আছে, এই হাসছে, এই কানাকানি করছে। দ্রুত সরে যাচ্ছে, পিছিয়ে যাচ্ছে পথের দুপাশে। জাহেদা আর বাবরের চোখে মুখে এসে লাগছে ভোর সকালের নির্মল হিম হিম হাওয়া। রংপুর থেকে দিনাজপুরের দিকে চলেছে ওরা। জাহেদা তখন থেকে কী একটা সুর গুন গুন করছিল। কী […]

২০. হাসু, হাসনু, হাসুরে

হাসু, হাসনু, হাসুরে। তীব্র আর্তনাদের মত তার নিজেরই সে ডাক যেন কানে শুনতে পায় বাবর। হাসুরে। মুখ খানা কেমন ছিল হাসনুর? পথের দিকে চোখ রেখেই চোখ তীক্ষ্ণ করে বাবর ভাবতে চেষ্টা করে। যেন নিজেরই সঙ্গে একটা মল্লযুদ্ধ চলতে থাকে তার। কিছুতেই সে পারছে না জয়ী হতে, কিছুতেই পারছে না। মনে করতে, কেমন ছিল দেখতে হাসু। […]

পাতা 1/212