ডাইনীর বাঁশী

ডাইনীর বাঁশী (ইস্কাপনের সাহেব হরতনের বিবি) – কিরীটী অমনিবাস – নীহার রঞ্জন গুপ্ত

০১. সরকার লজের সারদা সরকার

সরকার লজের সারদা সরকার নাকি নিহত হয়েছেন। বিখ্যাত জুয়েলার সারদাচরণ সরকার ইদানীং বয়স হওয়ায় ব্যবসা আর দেখাশোনা করতেন না। বীরভূম জেলাতেই একটি স্বাস্থ্যকর নির্জন স্থানে প্রায় এক বিঘে জমির উপর যে চমৎকার বাড়িটি সরকার-ভিলা, ইদানীং বৎসরখানেক যাবৎ সেইখানেই কর্মক্লান্ত জীবনের...

০২. সময়টা পূজার ছুটির অব্যবহিত পরেই

সময়টা পূজার ছুটির অব্যবহিত পরেই। অর্থাৎ অগ্রহায়ণের শুরু সবে। সুশান্ত, বিনয় ও ফ্যাটি গুপ্ত, দি ফেমাস্ ট্রায়ো জায়গাটা স্বাস্থ্যকর বলে এবং বিশেষ করে নির্জন ও নিরিবিলি বলে বিনয়ের বাবার যে ছোট বাড়িটি সরকার-ভিলার প্রায় কাছাকাছি ছিল সেই বাড়িতে এসে মাসখানেক ধরে বাস করছিল।...

০৩. নিছক যে একটা উত্তেজনা

নিছক যে একটা উত্তেজনা বা কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই সুশান্ত সরকার-ভিলায় এসেছিল তা নয়। মাস-দুই পূর্বে একটা সুইসাইডের বিচিত্র রহস্যপূর্ণ মামলার ব্যাপারে ঘটনাচক্রে সুশান্ত ও বিনয়ের বিখ্যাত সত্যসন্ধানী কিরীটী রায়ের সঙ্গে আলাপের সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই সময় থেকেই উভয়ের মন, বিশেষ করে...

০৪. বিমলের অতর্কিত প্রশ্নটা

বিমলের অতর্কিত প্রশ্নটায় যেন সহসা ভূত দেখার মতই চমকে উঠলেন বৃন্দাবন সরকার। এবং কয়েকটা মুহূর্ত তাঁর কণ্ঠ দিয়ে একটি শব্দও বের হল না। তারপর যেন আত্মগতভাবেই বললেন বৃন্দাবন, এ–এ আপনি কি বলছেন দারোগাবাবু? বলছিলাম ওঁকে কেউ হত্যাও তত করে থাকতে পারে! হত্যা? হাউ অ্যাবসার্ড? হাউ...

০৫. কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই

কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে শকুন্তলা দেবী! বলুন। মৃদুকণ্ঠে কথাটি বললে শকুন্তলা। গলাটিও মিষ্টি। মিঃ সরকারের মুখে শুনলাম আপনি সারদাবাবুকে বইটই পড়ে শোনাতেন, তাঁর লেখাপড়ার কাজও সব করে দিতেন? হ্যাঁ। তাহলে কতকটা তাঁর পার্সোন্যাল অ্যাসিস্টেন্টের মতই আপনি ছিলেন বলুন এখানে...

০৬. মধুসূদন সরকার

মধুসূদন সরকার। পরিধানে দামী সার্জের মভ কলারের লংস। গায়ে গলাবন্ধ কালো ভেনিসিয়ান সার্জের লম্বা কোট। পায়ে ডার্বী সু। চেহারাটা বেশ লম্বা-চওড়া ও বলিষ্ঠ। মাথার চুল পালিশ করা। রগের দুপাশে সামান্য পাক ধরেছে চুলে, বয়সের ইঙ্গিত। মুখে ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি। পাকানো গোঁফ। ছড়ানো চৌকো...

০৭. কিন্তু দুর্ভাগ্য

কিন্তু দুর্ভাগ্য, দশরথকে আর কোন প্রশ্নাদি করার কিরীটীর কোন সুযোগই হল না পরের দিন। তার আগেই সে মানুষের সমস্ত প্রশ্নের সর্বপ্রকার নাগালের বাইরে চলে গেল একান্ত আকস্মিক ভাবেই যেন। অর্থাৎ পরের দিন প্রত্যুষে সরকার ভিলায় যাবার পূর্বে সকলে বসে যখন চা-পান করছে, সংবাদ পাওয়া গেল...

০৮. সকলে এসে লাইব্রেরী ঘরে

সকলে এসে লাইব্রেরী ঘরে প্রবেশ করল। মধুসূদন ও বৃন্দাবন সরকার দুই ভাই দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসেছিলেন, ওদের পদশব্দে মুখ তুলে তাকালেন দুজনেই একসঙ্গে। দেখলেন বিমলবাবু? প্রশ্নটা করলেন মধুসূদনই। হ্যাঁ। বৃন্দাবনবাবু মধুসূদনবাবু, মিঃ রায়কে তাহলে আপনারা এই ব্যাপারের মীমাংসা...

০৯. যে লাইব্রেরী ঘরের মধ্যে

যে লাইব্রেরী ঘরের মধ্যে সকলে তখন উপস্থিত ছিল, সেই ঘরেরই পশ্চিম কোণে একটা বদ্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বৃন্দাবনবাবুর দিকে সহসা চোখের ইঙ্গিত করে কিরীটী প্রশ্ন করল একসময়, ঘরের ঐ দরজাটা কিসের বৃন্দাবনবাবু? ঐ দরজা-পথে কোথায় যাওয়া যায়? এই ঘরের সঙ্গেই ছোট একটা অ্যান্টিরুম মত আছে।...

১০. লাইব্রেরী ঘর থেকে বের হয়ে

লাইব্রেরী ঘর থেকে বের হয়ে তারই লাগোয়া ঘরটির পর্দা-ফেলা-দরজার সামনে এসে সকলে দাঁড়াল। চলুন। বৃন্দাবনবাবুই সর্বাগ্রে দরজার পর্দাটা হাত দিয়ে সরিয়ে ওঁদের আহ্বান জানালেন ভিতরে প্রবেশের। প্রথমে বৃন্দাবনবাবু ও তার পশ্চাতে কিরীটী ও সর্বশেষে সুশান্ত ঘরের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করে।...

১১. শকুন্তলার ঘর থেকে বের হয়ে

শকুন্তলার ঘর থেকে বের হয়ে উভয়ে আবার লাইব্রেরী ঘরেই ফিরে এসে প্রবেশ করল। লাইব্রেরী ঘরের মধ্যে দুটো সোফায় মুখোমুখি বসে তখন বৃন্দাবন সরকার ও মধুসুদন। সরকার দুই ভাই নিম্নকণ্ঠে কি সব কথাবার্তা বলছিলেন। ওদের পদশব্দে দুজনাই মুখ তুলে তাকালেন। বৃন্দাবনবাবু, আপনার কাকা...

১২. একটা কথা জিজ্ঞাসা করব

একটা কথা জিজ্ঞাসা করব মিঃ রায়? সুশান্ত সহসা প্রশ্ন করে। নিশ্চয়ই। আপনার সন্দেহের তালিকার মধ্যে– সুশান্তর কথাটা তাকে শেষ না করতে দিয়ে কিরীটী বলে ওঠে, শকুন্তলাও আছেন কিনা, এই তো আপনার প্রশ্ন সুশান্তবাবু? দুঃখের বিষয়, আছেন। কি জানেন সুশান্তবাবু, ক্রিমিন্যাল...

১২. সরকার-ভিলা থেকে বের হয়ে

সরকার-ভিলা থেকে বের হয়ে কিরীটী আর সুশান্ত দুজনে মণি লজের দিকে হাঁটতে শুরু করে। বাইরে রৌদ্রের তাপ বেশ প্রখর হয়ে উঠেছে তখন। পথে দুজনার মধ্যে আর বিশেষ কোন কথাবার্তা হয় না। দ্বিপ্রহরে আহারাদির পর পাশাপাশি বিনয় ও সুশান্ত একটা সোফায় বসে এবং কিরীটী তাদের অল্প ব্যবধানে অন্য...

১৪. শকুন্তলার মুখের দিকে তাকিয়ে

শকুন্তলার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদুকণ্ঠে কিরীটী এবারে বলে, না, একা আসিনি, আমার সকালের সেই বন্ধুটিও এসেছেন। ওদিককার গোলাপ বাগিচার দিকে গেলেন গোলাপ দেখতে এইমাত্র। নিজের অনুমানটা যে মিথ্যা নয় বুঝতে পেরে কিরীটী মনে মনে একটু যেন উল্লসিতই হয়। কিন্তু চোখেমুখে তার সে ভাবটা...

১৫. আমাকে অনুসরণ করে আসুন

আমাকে অনুসরণ করে আসুন মিঃ রায়। মদুসূদন সরকার বললেন, আপনারা পথ ঠিক হয়তো চিনতে পারবেন না। আর একটু সাবধানে আসবেন, যা চারিদিকে ঝোপ-ঝাড় বলা যায় না কিছু! কেন, এখানে সাপ আছে নাকি? কিরীটী প্রশ্ন করে চলতে চলতেই অন্ধকারে। খুব কি বিচিত্র নাকি কথাটা! মৃদু হেসে মধুসূদন সরকার কথাটা...

১৬. কিরীটী বিজনের সঙ্গে

কিরীটী বিজনের সঙ্গে এত তন্ময় হয়ে কথাবার্তা বলছিল যে অদূরে সোফার উপর উপবিষ্ট সুশান্ত ও শকুন্তলার দিকে তেমন নজরই দিতে পারেনি। তারর হঠাৎ একসময় বিজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওদের দিকে নজর পড়তেই কিরীটীর ওপ্রান্তে চাপা একটা হাসির বিদ্যুৎ যেন খেলে গেল। সুশান্ত ও শকুন্তলা...

১৭. সুশান্তদের বাড়ি থেকে

সুশান্তদের বাড়ি থেকে স্থানীয় থানার দূরত্বটা একেবারে কম নয়। বেশ কিছুটা পথ। ঘোট শহর। মিউনিসিপ্যালিটির আলোর ব্যবস্থাও রাস্তায় তেমন যথেষ্ট নয়। তার উপরে রাতটাও ছিল কৃষ্ণপক্ষ। দূরে দূরে রাস্তার দুপাশে যে কেরেসিনের আলোর ব্যবস্থা, তাতে করে আলোর চাইতে অন্ধকারটাই যেন বেশী জমাট...

১৮. বৃন্দাবন সরকার ইচ্ছা করে

বৃন্দাবন সরকার ইচ্ছা করে ভাগ্নে বিজনকে সরকার ভিলায় আমন্ত্রণ করে আনেননি জরুরী চিঠি দিয়ে। মৃত সারদাচরণের নির্দেশমতই বিজনকে আসার জন্য তাঁকে চিঠি দিতে হয়েছিল। এবং শুধু বিজনকেই নয়, আরও দুজন ভদ্রলোকও পরের দিন বৃন্দাবন সরকারের সঙ্গে কলকাতা হতে এলেন ঐ উইলের নির্দেশমতই। একজন...

১৯. কিন্তু যাক সে কথা

কিন্তু যাক সে কথা। সেই রাত্রির কথায়ই ফিরে আসা যাক। অন্ধকার ঘর। কাঁচ করে মৃদু শব্দ হতেই চকিতে কিরীটী ঘুরে দাঁড়ালো। কিরীটীর ঘরের দরজা ভেজানোই ছিল। নিঃশব্দে সেই দরজার ভেজানো কপাট দুটো যেন ধীরে ধীরে একটু একটু খুলে যাচ্ছে। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে কিরীটী সেই দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে...

২০. আর্তকণ্ঠে যেন কথাটা প্রশ্নের মত

ডেড! আর্তকণ্ঠে যেন কথাটা প্রশ্নের মতই পুনরুচ্চারণ করলেন বৃন্দাবন সরকার। হ্যাঁ, স্টোন ডেড! সকলে স্তম্ভিত নির্বাক। ডাঃ অধিকারী একটু পরে মৃতদেহের সামনে একসময় ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু ঘরের মধ্যে উপস্থিত সকলেই স্তম্ভিত নির্বাক হলেও—মধুবাবুর চায়ের কাপটা কোথায়...