আলোকে আঁধারে

আলোকে আঁধারে - কিরীটী অমনিবাস (কিরীটী রায়) – নীহাররঞ্জন গুপ্ত

০১. প্রস্তাবটা তুলেছিল সজলই

প্রস্তাবটা তুলেছিল সজলই প্রথমে যে, একটা দিন সকলে মিলে বটানিকসে গিয়ে হৈ চৈ করে কাটানো যাক। এবং প্রস্তাবটা তুলেছিল সে মিত্রানীর কাছে এসে তার বাড়িতে এক সকালে। বেলা তখন নয়টা সোয়া নয়টা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারই সেই আনন্দ উৎসবে যোগ দেওয়া হয়ে ওঠেনি। ছুটি না শেষ হতেই তাকে...

০২. সজলের একটা কমপ্লেক্স ছিল

সজলের কিন্তু একটা কমপ্লেক্স বরাবরই ছিল। সেই কমপ্লেক্সের জন্যই বোধ হয় সে অন্যান্যদের সঙ্গে ঠিক মন খুলে মিশতে পারত না। শুধু তাই নয়, জীবনটাকে বরাবরই সে একটু সিরিয়াস ভাবে নিয়েছে—ভাল চাকরি করবে–জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে—জীবনে সাচ্ছল্য আসবে এটাই ছিল তার স্বপ্ন বরাবরের।...

০৩. ঐ ঘটনারই পরের দিন

ঐ ঘটনারই পরের দিন সজল আবার হঠাৎ এলো বিকেলের দিকে মিত্রানীদের ওখানে। শেষের ক্লাস দুটো মিত্ৰানীকে নিতে হয়নি বলে একটু আগেই কলেজ থেকে চলে এসেছিল ও। গতকালের ঘটনার পর থেকেই মনটা তার ভাল ছিল না, টেলিফোনে সুহাসের কথাগুলোই যেন কেবল তার মনে পড়ছিল। মুখে কোনদিন কথাটা সে প্রকাশ না...

০৪. সকলেই সজলের অনুপস্থিতিটা

সকলেই সজলের অনুপস্থিতিটা সেদিন যেন সর্বক্ষণ অনুভব করেছে। তবু সকলে অনেক দিন পর একত্রে মিলিত হওয়ায় প্রচুর হৈ-চৈ করতে লাগল। বৈশাখের ঐ প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও যেন কারো এতটুকু কোন ক্লান্তিবোধ হয়নি। ক্রমে ক্রমে বেলা পাঁচটা বাজে কারোর ফেরার কথা মনেই হয়নি। বরং সবাই স্থির করে,...

০৫. মিত্রানীকে বেশী খুঁজতে হয়নি

মিত্রানীকে বেশী খুঁজতে হয়নি– সুহাস যেখানে পড়ে ছিল–সেই ঝোপটারই অন্য দিকে একটা গাছের নীচে, মিত্রানীকে পাওয়া গেল–চিত হয়ে পড়ে আছে মিত্রানী। হাত দুটো ছড়ানো। বিদ্যুৎই প্রথমে দেখতে পায়। তার পরনের নীল মুর্শিদাবাদী সিল্কের শাড়িটার আঁচল বুকের উপর থেকে সরে...

০৬. সে রাত্রে ছাড়া পেতে পেতে

সে রাত্রে ছাড়া পেতে পেতে প্রায় রাত সোয়া এগারোটা বেজে গিয়েছিল সকলের। শ্রান্ত-অবসন্ন হয়ে ফিরেছিল যে যার গৃহে। ফিরতে ওরা সকলে পারত না হয়, যদি থানার একজন সেপাই কলকাতার দিকে ফিরতি একটা খালি ট্যাক্সি থামিয়ে ওদের ফিরে যাবার ব্যবস্থা করে না দিত। থানা-অফিসার সুশীল নন্দী একটা...

০৭. ঐদিনই দ্বিপ্রহরে লালবাজারে

ঐদিনই দ্বিপ্রহরে লালবাজারে গিয়ে কিরীটী পুলিশ কমিশনার মিঃ রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করলো। লম্বা-চওড়া সুগঠিত চেহারা। অফিসেই ছিলেন রায়চৌধুরী, কিরীটী স্লিপ পাঠাতেই ঘরের মধ্যে ডাকলেন। দুজনার মধ্যে পরিচয় ছিল। রায়চৌধুরী কিরীটীকে শ্রদ্ধা করতেন। আসুন—আসুন, বসুন রায়সাহেব-হঠাৎ এখানে...

০৮. ওদের সকলের পৌঁছাবার আগেই

ওদের সকলের পৌঁছাবার আগেই কিরীটী সুশীল নন্দীর ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল। কিরীটী সুশীল নন্দীকে আগেই ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল, থানার মধ্যে নয়—সম্ভব হলে ঐ বিলডিংয়েরই দোতলায় সুশীল নন্দীর কোয়ার্টার্স-এ সে সকলের সঙ্গে দেখা করতে চায়। সুশীল নন্দী বলেছিল, তাতে কোন অসুবিধা হবে না, কারণ...

০৯. সুব্রত এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি

সুব্রত এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি—নীরব দর্শকের মত কিরীটীর পাশে নিঃশব্দে বসে ওদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। এদেরও সকলের বয়েস অন্য দুইজনার মতই, অমিয়র চেহারার মধ্যে কোন বিশেষত্ব নেই—সাধারণ একজন যুবক, একজোড়া গোঁফ আছে—পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে সরু শৌখিন ফ্রেমের...

১০. সজল চক্রবর্তীর পর এলো সুহাস মিত্র

সজল চক্রবর্তীর পর এলো সুহাস মিত্র। নিয়মিত ব্যায়াম করলে যেমনটি হয়, তেমনি সুগঠিত চেহারা, পরনে ধুতি পাঞ্জাবি। কালোর উপর সব কিছু মিলিয়ে সুহাস মিত্রের চেহারাটা যাকে বলে সুশ্রী তাই। সমস্ত মুখে একটা আত্মবিশ্বাস ও বুদ্ধির ছাপ। বসুন সুহাসবাবু–কিরীটী বললে। সুশীলবাবু...

১১. কিরীটী আর সুব্রত সেদিন

কিরীটী আর সুব্রত সেদিন যখন উঠবে-উঠবে করছে, বিদ্যুৎ সরকার এলো। সবাই তখন চলে গিয়েছে। বিদ্যুৎ ঘরে ঢুকে বললে, সুশীলবাবু, আমি অত্যন্ত দুঃখিত—বিশেষ কাজে আটকা পড়ায় আসতে দেরী হয়ে গেল। সুশীল নন্দী বললেন, ঠিক আছে, বসুন—আলাপ করিয়ে দিন—ইনি—বিদ্যুৎ সরকার আর বিদ্যুৎবাবু, এঁকে...

১২. ছুটির দিন বলেই হয়ত

ছুটির দিন বলেই হয়ত রাস্তায় অত্যন্ত ভিড়—ওদের গাড়ি কেবলই থামছিল সামনের ভিড়ের চাপে। গাড়ি এক সময় হাওড়া ব্রীজ পার হয়ে ডাইনে স্ট্র্যান্ড রোড ধরলো। হঠাৎ কিরীটীর কথা শুনে তাকাল ওর দিকে সুব্রত। সুব্রত! কিছু বলছিস? সকলের কথাই তো মোটামুটি শুনলি— আমি সকলের কথা মন দিয়ে শুনিনি...

১৩. পরের দিন ভোরবেলাতেই

পরের দিন ভোরবেলাতেই কিরীটী মিত্রানীদের ওখানে গিয়ে হাজির হলো। গতরাত থেকেই তার মনে হয়েছে মিত্রানীর ঘরটা একবার তার দেখা দরকার। দোতলায় উঠতেই মাস্টারমশাই অবিনাশ ঘোষালের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। অবিনাশ ঘোষাল বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। কিরীটী— মাস্টারমশায় আমি একবার মিত্রানীর...

১৪. ডাইরীখানা নিয়ে

ডাইরীখানা নিয়ে রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর বসবার ঘরের সোফায় গিয়ে বসল কিরীটী একটা চুরেট ধরিয়ে। বেশী দিন নয়–বৎসর খানেক আগের তারিখ থেকে ডাইরী লেখার শুরু, তাহলেও প্রথম পাতাতেই লিখেছে মিত্রানী—ডাইরা লিখতাম সেই কবে থেকে–কিন্তু মাঝখানে কয়েক বৎসর লিখিনি, লিখতে ইচ্ছাও...

১৫. কিরীটী পাতার পর পাতা পড়ে চলে

কিরীটী পাতার পর পাতা পড়ে চলে ডাইরীর। বাবা আর আমার বিয়ের কথা বলেননি। বলবেনও না জানি। বুঝি বাবা জানতে চান কোথায় আমার মন বাঁধা পড়েছে। কিন্তু কি বলবো তাকে? যাকে মন দিলাম তারই যে সাড়া নেই! আজ হঠাৎ সুহাসের সঙ্গে দেখা হয়েছিল—কলেজ স্ট্রীটের একটা বইয়ের দোকানে। ও আমাকে দেখতে...

১৬. দিন দুই আর কিরীটী কোথাও বেরই হলো না

দিন দুই আর কিরীটী কোথাও বেরই হলো না। মিত্রানীর হত্যারহস্যটা যেন ক্রমশ জট পাকিয়ে পাকিয়ে জটিল হতে জটিলতর হয়ে উঠছে। সূত্রগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ফোন এলে পর্যন্ত কিরীটী ফোন ধরে না। ফোনে কেউ ডাকলেও সাড়া দেয় না। সারাদিন প্রচণ্ড গরমের পর কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ ঝড়ো...

১৭. মিত্রানীর হত্যা-রহস্যের একটা জট

সুহাসবাবু! বলুন। মিত্রানীর হত্যা-রহস্যের একটা জট আমি কিছুতেই খুলতে পারছিলাম না— আপনার স্বীকারোক্তি সেই জটটা খুলে দিল। আচ্ছা সুহাসবাবু, একটা কথা বলুন— মিত্রানীর প্রতি সজলবাবু যে আকৃষ্ট ছিলেন সে কথাটা কি আপনি বুঝতে পেরেছিলেন কখনো? জানতাম– জানতেন? কি করে জানলেন?...

১৮. রবিবার সকালের দিকে

রবিবার সকালের দিকে কাজল বোস এলো। কিরীটী কাজল বোসের অপেক্ষাতেই ছিল—এবং জংলীকে বলে রেখেছিল কাজল বোস এলে যেন সে তাকে তার ঘরে পৌঁছে দেয়। জংলীর সঙ্গে কাজল বোস ঘরে ঢুকতেই কিরীটী বললে, আসুন, মিস বোস–কতকগুলো ব্যাপার আপনার সঙ্গে আমি আলোচনা করতে চাই, তাই আপনাকে কষ্ট দিতে...

১৯. কিরীটীর ওখান থেকে বের

কিরীটীর ওখান থেকে বের হয়ে সুহাস মিত্র একটু অন্যমনস্ক হয়েই যেন বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগুতে থাকে। মিত্রানীর কথাই সে ভাবছিল বোধ হয়, হঠাৎ বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি আসতেই কাজলের ডাক শুনে সুহাস থমকে দাঁড়াল। সুহাস— কে! ও তুমি! বাড়ি ফিরে যাওনি– না। তোমার অপেক্ষাতেই...

২০. বাড়িতে ফিরে সারাটা দিন

বাড়িতে ফিরে সারাটা দিন কিরীটী পেসেন্স খেলেই কাটিয়ে দিল একা একা আপন মনে—কেবল মধ্যে দুচার জায়গায় ফোন করেছিল। সুব্রত আর বাড়িতে ফিরে যায়নি, সে ঐখানেই ছিল। আহারাদির পর কিরীটী যখন তাসের প্যাকেট নিয়ে বসলো, সে একটা উপন্যাস নিয়ে বসেছিল।   বেলাশেষের আলো ইতিমধ্যে একটু একটু করে...
পাতা 1/212