সূর্য-দীঘল বাড়ি (উপন্যাস)

সূর্য-দীঘল বাড়ি – আবু ইসহাক রচিত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা উপন্যাসের একটি। তিনি ১৯৪৬ সালে মাত্র বিশ বছর বয়সে রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ এবং পুস্তকাকারে বের হয় ১৯৫৫ সালে।

০১. আবার তারা গ্রামে ফিরে আসে

আবার তারা গ্রামে ফিরে আসে। পেছনে রেখে আসে স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, মা-বাপ, ভাই-বোন। ভাতের লড়াইয়ে তারা হেরে গেল। অনেক আশা, অনেক ভরসা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে তারা শহরের বুকে পা বাড়িয়েছিল। সেখানে মজুতদারের গুদামে চালের প্রাচুর্য, হোটেলে খাবারের সমারোহ দেখে দেখে তাদের জিভ...

০২. পাশাপাশি পিঁড়ে বিছিয়ে বসে দুটি ভাইবোন

পাশাপাশি পিঁড়ে বিছিয়ে বসে দুটি ভাইবোন—হাসু ও মায়মুন। জয়গুন পান্তা বেড়ে ছেলে ও মেয়ের সামনে দুটো থালা এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটা নিয়ে বসে। মায়মুন আড়চোখে হাসুর থালার দিকে চায়। রোজ সে এমনি চেয়ে দেখে। রোজই হাসুকে বেশী করে খেতে দেয় মা। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস তার হয় না।...

০৩. আজকের ডিম দুটো মায়মুনের

আজকের ডিম দুটো মায়মুনের। সে বাচ্চা ফুটাবে। মা রাজী হয়েছে। সারা রাত তার ভাল ঘুম হয়নি। তার ছোট মনে কত কল্পনা জেগেছে। হাঁসের বাচ্চা হবে, সেগুলো বড় হবে, ডিম দেবে—ফকফকে সাদা ডিম। সেই ডিমের থেকে আবার বাচ্চা হবে। নানা রঙের হাসে তাদের খাঁচা ভরে যাবে। স্বপ্নেও সে দেখে...

০৪. রেল-রাস্তার ধারে

রেল-রাস্তার ধারে মা-কে নামিয়ে দিয়ে হাসু কোষা ডুবিয়ে রাখে। কেউ নিয়ে যেতে পারে। এই ভয়ে সে তার ওপর কচুরি ঢাকা দিয়ে রাখে। এ ব্যাপারে খুবই হুঁশিয়ার সে। কারণ, বর্ষার দিনে কোষাটা তাদের চলাফেরার একমাত্র সম্বল। হাসু গাড়ীর দেরী বুঝে রেল-রাস্তা ধরে দক্ষিণমুখি পথ নেয় নারায়ণগঞ্জের...

০৫. বয়সের সাথে সাথে মানুষের মেজাজ

বয়সের সাথে সাথে মানুষের মেজাজ পরিবর্তন হয়। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে করিম বকশের মেজাজ ঠাণ্ডা না হলেও কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে বৈকি। তা না হলে তার শড়কির হাতল ঘুণে ধরতে পায়? চার বছর বোধ হয় লাঠিটায়ও তেল মাজা হয়নি। তেলের দামও বেড়েছে, আর লাঠির দরকারটাও কমেছে অনেক। মাটির ওপর পুরানো...

০৬. হিন্দু-মুসলমানে কাটাকাটি

১৫ই আগষ্ট শুক্রবার, ১৯৪৭ সাল। হাসু মা-কে মোড়ল পাড়ায় নামিয়ে দিয়ে রেল-রাস্তার পাশে আসে। রোজ সেখানে কোষা ডুবিয়ে রেখে সে কাজে যায়। রাস্তায় উঠেই সে চমকে ওঠে। চারদিক থেকে চিৎকারের ধ্বনি শোনা যায়। হিন্দু-মুসলমানে কাটাকাটি শুরু হল না ত! রেল-রাস্তা ধরে সে ভয়ে ভয়ে পা ফেলে।...

০৭. চারদিকে আনন্দকোলাহল

চারদিকে আনন্দকোলাহল। মায়মুন ডাকে—মা, চান ওঠছে বুঝিন, ঈদের চান। মায়মন দৌড়ে যায় বাড়ীর পশ্চিম দিকে। শফি এসে দাঁড়ায় এর পাশে। পশ্চিম দিগন্তের রঙিন মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ওরা তন্ন তন্ন করে খোঁজে চাদ। জয়ন এসে যোগ দেয়। মায়মুন বলে—কই মা? —অই সাঁকুয়া তারাডার কাছ দিয়া দ্যাখ। ওডার...

০৮. ফুড কমিটির সেক্রেটারী

খুরশীদ মোল্লা গ্রামের ফুড কমিটির সেক্রেটারী। ঈদের দিন ভোর হওয়ার সাথে সাথে তার বৈঠকখানার বাইরে জড় হয় অনেক লোক। কেউ কেউ ভেতরেও আসে। খুরশীদ মোল্লা একটু দেরীতেই ঘুম ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে চৌকির উপর এসে বসে। তার মুখে বিরক্তির স্পষ্ট আভাস সবার চোখেই ধরা পড়ে। গ্রামের...

০৯. জয়গুন ও হাসু

জয়গুন ও হাসু আজ সকাল সকালই বেরিয়ে গেছে। মায়মুন হাঁস দুটো খাঁচা থেকে বের করে পানিতে ছেড়ে আসে। এবার সে হাঁসের বাচ্চা দুটো বের করে ঘরের মেঝের ওপর ছেড়ে দেয়। নিজেও হাত দুটো মাটিতে রেখে উপুড় হয়ে চেয়ে থাকে। হলুদ রঙের বাচ্চা দুটো কেমন সুন্দর হাঁটে আর চিপচিপ করে। মায়মুনের...

১০. সূর্যের মুখ দেখা যায় না

এমন দিন পড়েছে, এক মুহূর্তের জন্যেও সূর্যের মুখ দেখা যায় না। সারাদিন টিপিরটিপির বৃষ্টি পড়ে। হাসু ঘরের বার হয় না। শরীরটাও ভালো নেই। শরীরের সমস্ত গিঁঠে গিঁঠে বিশেষ করে ঘাড়ে টনটনে ব্যথা হয়েছে। হাসু মা-কে বলে—গর্দানডায় বেদনা করেগো, মা। শীত শীত লাগে। হাসুর গায়ে হাত দিয়ে...

১১.  মোরগের ডাক শুনে

কুউ—কুরু—ত—কু—উ– মোরগের ডাক শুনে জয়গুন আর বিছানায় পড়ে থাকে না। তাড়াতাড়ি উঠে আগে ফজরের নামাজ পড়ে, তারপর মায়মুনকে ডাকে—গা তোল, মায়মুন। আত-মোখ ধুইয়া জলদি কইর‍্যা চুলা জ্বাল। —মিয়াভাই আহে নাই, মা? –উহুঁ। জয়গুন আর কিছু না বলে কোষায় ওঠে। অনভ্যস্ত হাতে লগি বেয়ে...

১২. গন্ধভাদাল পাতা

বিকেল বেলা ঘুরে ঘুরে জয়গুন অনেক গন্ধভাদাল পাতা যোগাড় করে আনে। শহরের গিন্নিরা এ জংলী শাকের বড়া খেতে ভালবাসে। পাতাগুলো শুকিয়ে ওঠে বলে রাত্রিবেলা ওগুলো সাজিয়ে ঘরের চালার ওপরে রেখে দেয়া হয়। রাত্রির শিশির-ভেজা হয়ে ভোর বেলায় পাতাগুলো সতেজ ও সজীব হয়ে ওঠে। রোদ উঠবার আগে জয়গুন...

১৩. মেয়ে লোকটি কে

মেয়ে লোকটি কে? কাসুর মনে বারবার এই প্রশ্নটাই আনাগোনা করতে থাকে। তাকে কোলে নিয়ে কত আদর করলো! আখ খেতে দিলো। দরদর করে পানি পড়ছিল তার চোখ বেয়ে! কে সে? একবার তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু করিম বকশের মুখ-চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্নটা চাপা পড়ে যায়। করিম বকশের রাগ তখনও...

১৪. আজ মায়মুনের বিয়ে

৯ই অগ্রহায়ণ। আজ মায়মুনের বিয়ে। লতিফ মিয়ার বাড়ী গিয়ে এই শুভ দিনটি জেনে এসেছিল শফির মা। লতিফ মিয়া তার পকেট পঞ্জিকা বের করে। একটা পাতার ওপর নজর দিয়ে সে আপন মনেই বলে—চন্দ্র রাজ্জা বুধ মন্ত্রী। তারপর শুভকার্যের নির্ঘণ্ট দেখে বলে দেয়—অগ্রাণ মাসের ১ তারিখে একটা শুভদিন আছে।...

১৫. কাসুকে কড়া নজরে পাহারা

আজকাল করিম বক্‌শ কাসুকে কড়া নজরে পাহারা দেয়। যত দিন মাঠ-ভরা পানি ছিল ততদিন কালাপানির বন্দীর মত ছিল কাসু। কিন্তু মাঠে পথ পড়ার সাথে সাথে করিম বক্‌শ চিন্তিত হয়। তার মনে আশকা জাগে—কাসু হয়তো একদিন ফুড়ুত করে ওর মা-র কাছে চলে যাবে। সেদিন আর একটু আগে দুধ বেচতে বেরিয়ে গেলে...

১৬. মায়মুন শ্বশুর বাড়ী থেকে চলে এসেছে

মায়মুন শ্বশুর বাড়ী থেকে চলে এসেছে। জয়গুন রাগে ফেটে পড়ে। কঠিন স্বরে জেরা করতে আরম্ভ করে—না কইয়া পলাইয়া আলি ক্যাঁ? এহন মাইনষে হুনলে ঝাটা মারব মোখে। —পলাইয়া আহি নাই মা। খেদাইয়া দিছে। —খেদাইয়া দিছে! —হ, দ্যাহ না আমার নাক-কান খালি। গয়নাগুলা খুইল্যা নিছে। পিন্দনের কাপড়...

১৭. জয়গুন আহার-নিদ্রা ভুলে

জয়গুন আহার-নিদ্রা ভুলে দিনের পর দিন ছেলের শয্যা-পার্শ্বে কাটিয়ে দেয়। মায়মুনও থাকে মা-র কাছে। প্রত্যেক দিন খাবার সময়ে করিম বক্‌শের ইঙ্গিতে আঞ্জুমন জয়গুনের হাত ধরে টানাটানি করে খাওয়ার জন্যে। বলে—এই রহম পেডে পাথর বাইন্দা থাইক্য না। দুইডা দানাপানি মোখে দ্যাও বুজান, নালে...

১৮. টিয়া-ঠুঁইট্যা আমগাছ

–কারা ওইখানে? কেডা, কেডারে? শফির মা চেঁচিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।–খবরদার, ফলগাছে কোপ দিলে আজগাই ঠাডা পড়ব মাতায়, কইয়া রাখলাম। কে একজন বলে—আমরা কিনছি এই গাছ। জিগাও গিয়া হাসুর মা-রে। শফির মা রাগে গরগর করতে করতে আসে—অ্যাই হাসুর মা, টিয়া-ঠুঁইট্যা আমগাছটাও...

১৯. সূর্য-দীঘল বাড়ীর ভূত ক্ষেপেছে

সূর্য-দীঘল বাড়ীর ভূত ক্ষেপেছে। রাতে জয়গুনের ঘরের বেড়া ও চালের ওপর ঢিল পড়তে শুরু করে। হাসু, কাসু ও মায়মুন চিৎকার করে ওঠে, শেষে গলা দিয়ে চিৎকারও বের হয় না। ভয়ে তারা মা-কে জড়িয়ে ধরে। ওদিকে শফির মা-র চিৎকার শোনা যায়। পরের দিন ভোরে সে বলে–হেসুম কইছিলাম পাহারা বদলাইতে। অখন...