ঈদের দিনে রসুইঘরের আয়োজন

আর কয়েক দিন পরেই খুশির ঈদ। সবার ঘরে ঘরে চলছে জোরেশোরে ঈদ আয়োজন। সব আয়োজনে রসুইঘরও বাদ পড়বে না। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন মজার মজার রেসিপির অপেক্ষায় থাকে সবাই। মজার খাবারের পাশাপাশি সবাই চায় খাবার পরিবেশনে আধুনিকতা, আর অবশ্যই রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা। অন্য সব কাজ সামলে রসুইঘরের সাজসজ্জা, কোন রান্না আগে কোনটা পরে−সব মিলিয়ে যেন মাথা খারাপের অবস্থা হয়ে যায়। তাই ঈদের আগের দিন থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত রসুইঘরের সঠিক ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং সাজসজ্জার আয়োজন নিয়ে কথা বলেছেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পুষ্টিবিদ অধ্যাপক শাহীন আহমেদ।

ঈদের আগের দিন
ঈদের আগের দিনটি সবারই ছুটি থাকে। তাই ঈদের দিনের কাজ কিছুটা কমিয়ে নেওয়া যায়; যেহেতু ঈদের দিনের বিরাট একটা অংশজুড়ে থাকে মজার মজার খাবার। এ খাবার তৈরির ঘরটিকে সুন্দর ও সঠিক পদ্ধতিতে গুছিয়ে নেওয়াটা খুব জরুরি বলে জানান শাহীন আহমেদ। তিনি আরও জানান, রোজার দীর্ঘ এক মাস প্রচুর ভাজাপোড়া খাবার তৈরির কারণে রান্নাঘর তেলতেলে ও চিটচিটে হয়ে যায়। ঈদের আগের দিন কিছু সময়ের জন্য ডিটারজেন্ট পাউডার দিয়ে ভিজিয়ে রেখে তারের জালি দিয়ে মেজে নিলে তেলতেলে ভাব দূর হয়ে যাবে।

রান্নাঘরের জানালা, এগজস্ট ফ্যান, লাইট, বেসিন বা হাউস ইত্যাদি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করার কাজটা ঈদের আগের দিনই সেরে নিন। চুলার নব ঠিক আছে কি না বা পরিষ্কার কি না, গ্যাস লাইনটিসহ পরীক্ষার কাজটি করে নিন।

চাঁদরাতের কাজ বা ঈদের আগের রাত
ঈদের আগের দিনটি থেকেই সাধারণত রান্নাবান্না শুরু হয়ে যায়। ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকেই ঈদের দিনের রান্নাগুলোর আয়োজন শুরু করে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ বলে জানান পুষ্টিবিদ শাহীন আহমেদ। তিনি আরও জানান, ঈদের দিনটি সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দঘন হয়। তাই সারাটা দিন যদি রান্নায় চলে যায়, তবে আনন্দটাই মাটি হয়ে যায়।

ঈদের দিনের কাজগুলো যদি আগের দিন ও রাতে কমিয়ে ফেলা যায়, তবে অতিথিকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিজেও একটু ঘোরাঘুরি করা যাবে। ধাপে ধাপে কাজগুলো করতে পারলে খুব সহজেই আপনি আপনার রসুইঘরকে হাতের মুঠোয় রাখতে পারবেন।

প্রথমত, আপনি কী কী ধরনের এবং কয়টি খাবার তৈরি করবেন, এর একটি তালিকা প্রস্তুত করুন। যেমন কয়টি মিষ্টি পদের খাবার, কয়টি ঝাল ও টক।

যেসব খাবার তৈরিতে বেশি সময় লাগবে এবং রেফ্রিজারেটরে রাখলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে না, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে ঈদের আগের রাতে শেষ করে ফেলুন। আর যেসব খাবার টাটকা পরিবেশন করতে হয় এবং আগে প্রস্তুত করে রাখলে খাবারের পুষ্টিগুণ ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়, সেগুলো ঈদের দিনের জন্য রেখে দিন। যেমন সালাদ, পানীয় বা জুসজাতীয় খাবার, ফ্রুট কাস্টার্ড বা ফল দিয়ে তৈরি খাবার প্রভৃতি।

তালিকা শেষে ঈদের দিনে অতিথি আপ্যায়নের জন্য শোকেস থেকে সব ধরনের চামচ, বিভিন্ন ডিশ, প্লেট, পিরিচ, গ্লাস ও ন্যাপকিনজাতীয় সব প্রয়োজনীয় জিনিস ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে চুলা থেকে দূরে রসুইঘরের কাছাকাছি ট্রলি বা অন্য কোনো জায়গায় ঢেকে রেখে দিতে পারেন। এতে বাড়িতে অতিথি এলে ছোটাছুটি করে সময় নষ্ট হবে না, বরং সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করতে পারবেন।

হাতের কাছাকাছি দু-একটা পরিষ্কার পুরোনো কাপড় রাখতে পারেন। এতে বারবার হাত মোছা, খাবার পরিবেশন করে ধুয়ে সহজে মুছে আবার পরিবেশন করতে পারবেন। তা ছাড়া রান্নাঘরে পুরোনো তোয়ালে রেখে দিতে পারেন। এতে পা বা স্যান্ডেল মুছে বাইরে গেলে রান্নাঘরের আঠালো ভাব অন্য ঘরে লাগবে না।

ঈদের দিন ভাজাভাজি করার মতো কোনো খাবার পদ থাকলে তা সকাল সকাল অতিথিদের আসার আগেই শেষ করে ফেলার চেষ্টা করতে বলেন অধ্যাপক শাহীন আহমেদ। কারণ, এতে ঘর গরম হয়ে যায় অথবা ধোঁয়াটে হয়ে চোখ জ্বালাপোড়া করে। তেল খুব বেশি গরম যাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখবেন। কেননা, এতে ঘর ধোঁয়াটে হয়।

ঈদের আগের রাতে যেসব খাবারের পদ তৈরি করবেন, সেগুলো একবারে ওভেনপ্রুভ সুন্দর ডিশে করে রেফ্রিজারেটরে রেখে দেবেন। অতিথি এলে যাতে কম সময়ে ওভেনে দিতে পারবেন। এ ছাড়া ঠান্ডা পরিবেশনযোগ্য খাবারের ক্ষেত্রে তো সুবিধা হবেই। মনে রাখবেন, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে কোনো প্রকার ধাতব পাত্র ব্যবহার করা যায় না। ওভেনের ওপরে কোনো প্রকার ভারী জিনিসপত্র রাখবেন না।

যিনি রান্নাবান্না ও পরিবেশনের কাজ করবেন, তিনি অবশ্যই অ্যাপ্রোন ব্যবহার করবেন। এতে ঈদের নতুন কাপড়টি সুরক্ষিত থাকবে এবং গরম তেল ছিটকে গায়ে লাগবে না। বারবার ডিটারজেন্ট বা সাবানজাতীয় পদার্থ ব্যবহারে হাতের চামড়ার অনেক ক্ষতি হয় বলে জানান শাহীন আহমেদ। তাই তিনি অবশ্যই হাতে গ্লাভস ব্যবহার করতে বলেন। অ্যাপ্রোন ও হাতের গ্লাভস নিউমার্কেটের নিচতলায় পাওয়া যায়।

রসুইঘরের সাজসজ্জা
সাজসজ্জা সম্পর্কে শাহীন আহমেদ জানান, ঈদের দিন অনেক অতিথি কথা বলতে বলতে রান্নাঘরে চলে আসেন এবং যিনি রান্না করবেন তাঁর মনের সজীবতারও দরকার আছে। তাই রান্নাঘরকে সাজিয়ে রাখাটা দরকার। চামচ, খুন্তি এবং প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার জন্য বাজারে আধুনিক অনেক হোল্ডার পাওয়া যায়। মাটির হোল্ডার রেখেও শৈল্পিক ছোঁয়া আনতে পারেন। কেউ ইচ্ছা করলে কিছু প্লাস্টিকের ফুল রাখতে পারেন। আবার ঈদের দিনকে মাথায় রেখে তাজা কিছু ফুল বা ফুলের তোড়া রেফ্রিজারেটর কিংবা রসুইঘরের কোথাও সাজিয়ে রাখতে পারেন।

ঈদের দিনে রসুইঘরকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা ও সাজিয়ে রাখুন। এতে আপনার সময় ও কষ্ট দুটোই কম হবে। আপনি আপনার পরিবার ও অতিথিদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারবেন সানন্দে।

ফারহানা জামান ন্যান্সি
সূত্রঃ প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০০৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *