এবার যখন কালবৈশাখী হবে (বেরোতে গেলে কালবৈশাখী লাগে )

এবার যখন কালবৈশাখী হবে তোদের বাড়ি যাব |
লাগোয়া বাগানের কালো পুরোনো পাঁচিল
তার ওপর বসতে পারে একটা দুটো কাক
ঘাসের ওপর লাল পিঁপড়েগুলোকে লক্ষ রেখে
বসে পড়ব |
ততক্ষণে আম গাছের প্রত্যেকটা পাতা
ধুলোর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে
লুটিয়ে পড়েছে ভিজে বাতাসের বুকে |
উতালপাতাল আদরে
বাতাসকেও করে ফেলেছে কচি সবুজ |
বাতাসের গায়ে তখন সবুজ সবুজ গন্ধ,
আমগাছের স্যাঁতসেঁতে কোমরে
পিঠ বিছিয়েই তোকে একটা দেশলাই চাইব |
তুই ছুটবি না— হাসবি একগোছা ফুলের মতো,
তারপর ঘাস পেরিয়ে ঘাস পেরিয়ে
রান্নাঘর |
আমপাতাতে ধুলো নেই
গড়গড়ের সুবলডোমের চোখের কোলে কালি নেই
ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে বৃষ্টি |
হাইস্কুলের সামনের সরানে কাদা হয়েছে
তেঁতুলবোনার জল উপচে পড়ে
বলাই মামাদের বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা ডোবা |
তার ওপর পাটকাঠির বাঁধ দিয়ে
কুঁচো মাছ ধরছে আবান,
ওর পায়ে কাদা ওর হাঁটু ছড়ে যাচ্ছে
ডাবু দিদিমা কি বেঁচে আছে ?
না থাকলে অন্য কেউ ধুনো জ্বেলেছে |
‘আবান আর জল ঘাঁটিস না— বাড়ি আয়—’
তুই চলে এসেছিস, হাতে একটা মোম-দেশলাই |
তোদের বাগানের প্রত্যেকটা পাখিকে তুই চিনিস ?
তাদের আদর করে নাম দিয়েছিস ?
দিসনি ?
তা হলে আমাকে ডায়েরি দিয়েছিস কেন ?
ওই বেগুনি রঙা ফুলের ওপর
হলদে প্রজাপতির কম্বিনেশনে
একটা সালোয়ার বানাসনি কেন ?
সিগারেট ধরাব— একরাশ ধোঁয়া
মিশে যাবে ডাবু-দিদার দেওয়া ধুনোর ধোঁয়ার সাথে |
যদি না মেশে
মেশাতে পারবি না—
তারও সাথে মেশাতে পারবি না ?
দয়াময় কাকুদের মন্দিরের আরতির ঝনাত্ঝম
পৃথিবীর সমস্ত ইলেকট্রিক তার কেটে
পোল ফেলে দিয়ে
জ্বালাতে পারবি না একটা লন্ঠন ?
একদম নিটোল করে কাটতে পারবি না পলতেটা ?
একটুও কালি পড়বে না
একটুও ধুলো না
পাতারা সবুজ — সুবল ডোমের চোখের তলায় কালি নেই
সুডৌল আলো ছড়িয়ে পড়বে
মন্দিরের চাতালে নিজের ইচ্ছেমতো
সমস্ত অন্ধকার না তাড়িয়ে—
পারবি — নাকু, কার্তিক, চন্দ্রশেখর, দীনু সবাইকে ডাকতে ?
আমরা নারকেল কাড়াকাড়ি খেলব |
ওদেরকে না পারিস—
নাম না জানা আরও কয়েকজনকে জোগাড় কর,
আবান ওদের সাথে খেলবে |
হুইসল্ বাজিয়ে ডাক
যেমন করে গৌতম বিকেলবেলা ডাকত সবাইকে
ফুটবল খেলার জন্য,
আর আমরা ওর বাঁশি শুনে ছিটকে বেরোতাম—
আলের ওপর দিয়ে ছ-নম্বর বলটা
হাত বদল করতে করতে |
ডাক—
আবান রোজ হার্বাট হাউস ছুটি হলে
আমার হাতে ওয়াটার বট্ ল, ব্যাগ আর আইকার্ড
দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে
তুমি এসেছো কেন ?
ওর মামমাম-এর মাথায় আমি ব্যুটিক ঢুকিয়ে দিয়েছি
নন্দতাঁতি ঢুকে গেছে—- চাইনিজ প্রিন্ট ঢুকে গেছে
ব্রাশ পেন্ট ফেব্রিক অ্যাপ্লিক
ওর মামমাম জোলাম খায় |
আবানও আধো আধো করে জোলাম চাওয়া শিখে গেছে
আমরা ওকে প্যাপ করে দিই,
ঘাড়ে থাবড়া মেরে ঘুম পাড়িয়ে দিই |
ওর মাথায় আমরা ব্যুটিক ঢোকাইনি
কিন্তু স্কুল ছুটির পর ও
আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়
লাগোয়া একটা সিঁড়ি দিয়ে— রোজ
রোজ ওর ওপর উঠে আমাকে বলে
ওর মামমামকে বলতে
ব্যুটিক থেকে চলে আসতে |
বাচ্চা নিতে আসা একটাও মাকে সুন্দরী মনে হয় না

আবানকে আমি কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া চিনিয়ে দিয়েছি
তাও ফুটেছে বলে
ওকে মন্দিরের চাতাল চেনাতে পারিনি
ওকে চিলছাদের ওপর ওঠাতে পারিনি |
ওখান থেকে বড়োপুকুরের তালগাছগুলো গোনাতে পারিনি !
ও আমাকে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে দিয়েছে
ওর স্কুলের ওপরে কাঠগড়ায় |
আমাকে নামাতে পারবি ?
পারবি না ?
তাহলে ডায়েরি দিয়েছিলি কেন ?
আমি যাব— তোদের বাড়ির পাশের বাগানে
কালবৈশাখী এলেই যাব |
ঠপ ঠাপ ঠুপ ঠাপ করে কচি কচি আমগুলো খসে পড়বে
তুলে তুলে এনে একজায়গায় জড়ো করব
কাঁচা গন্ধে ভিজে যাবে হাতের তালু
আমের বোঁটার কষে হাত চটচটে
ঝাল-নুনের কৌটোটা ফুটো করে রাখবি |
মা জর্দা খায় ?
না স্যাসের মধ্যে ঝাল-নুন চাই না
জর্দার কৌটো চাই—বেগুনি রঙের
পলিপ্যাকের পর পলিপ্যাক উড়ছে আকাশে
সব কটা ঢিল নোঙর করে নামিয়ে ফেলবি
পারবি না ?
না পারলে আবান আবার আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবে
আমার কোনো কথা শুনবে না |
বলবে — মামমামকে আসতে বলো
মামমামকে চলে আসতে বলো
কেন মামমাম ব্যুটিক যাবে ?
আমি পারব না |
তুই পলিপ্যাকগুলো নামিয়ে ফ্যাল
পাখিদের নাম দে
প্রজাপতিদের রং নে
তুই আমাকে ডায়েরি দিয়েছিস
তোর বাড়ির পাশে বাগান আছে
আমি যাব — কালবৈশাখী এলেই যাব |
তোর কাছে দেশলাই চাইব
জর্দার কৌটো চাইব
আমি পেলেই সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে #2472;িয়ে দেব আবানকে |
ওর চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দেব পলিপ্যাক
তুই বাগানটা দে
আর যেভাবেই হোক খুঁজে বের কর, ডেকে আন
নাকু-কার্তিক-দীনু-চন্দ্রশেখরদের |
আমি আর আবানের স্কুলের ওপর উঠে
ডাকতে পারছি না ওর মামমামকে
খুঁজে বের করতে পারছি না— পারছি না
অথচ আমিই ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছি ভাবনা—

ঢুকে যাওয়া কত সহজ
কিন্তু বেরোতে গেলেই একটা কালবৈশাখী লাগে |

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *