আমরা কি এমন অন্ধকার চেয়েছিলাম?

রবিন তার সদ্য কেনা কম্পিউটারে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করতে পারছে না। যখনই কাজটার ৭০ থেকে ৮০ ভাগ সম্পন্ন হয় তখনই বিদ্যুৎ চলে যায়। তাকে আবার শুরু থেকে কাজটা করতে হয়। ২০২১ সালে যদি দেশটা সত্যি সত্যি ডিজিটাল হয়ে যায় তারই প্রস্তুতি হিসেবে বেচারা নতুন কম্পিউটার কিনেছিল।
সেদিন বিকেলে ভয়ানক বিরক্তি নিয়ে তার বাবা যখন অফিস থেকে এসে বাথরুমে ঢুকে আধা গোসল হয়ে বের হলেন তখন রবিন বাবার দিকে তাকিয়ে ইয়াহু বলে একটা ছোটখাটো চিৎকার দিল। এমনিতেই তার বাবার মেজাজ তিরিক্ষি, সেই সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়ার সময় দেখেছেন বাসায় বিদ্যুৎ নেই, এখন এসেও দেখছেন বিদ্যুৎ নেই। এই অবস্থায় ফাজিল ছেলেটা এমন কী পেয়েছে যে ইয়াহু বলে চিৎকার শুরু করবে।
‘বাবা, বাবা পৃথিবীতে তো টাইম মেশিন আবিষ্কার হয়ে গেছে।’ ধমক না দিলেও বাবা তার দিকে যে চাহনি দিলেন সেটা রীতিমতো যুদ্ধ শুরুর নির্দেশের মতো। কিন্তু বরাবরের মতো রবিন বাবার মেজাজকে তোয়াক্কা না করে বলেই চলল, ‘আচ্ছা বাবা, ধরো ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন শিক্ষিত লোক যদি বাংলাদেশে আসে, তাহলে সে কী দেখবে?’ বাবা চুপ, তাঁর ক্ষুধা পেয়েছে; কিন্তু টেবিলে বসতে পারছেন না বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান না ঘুরলে তিনি আবার খেতে পারেন না। এবার বোধহয় তিনি একটু মনোযোগ দিয়েছেন ছেলের কথায়। আপাতত বিদ্যুৎ না আসা পর্যন্ত যতক্ষণ ফালতু আলোচনা করে সময় কাটানো যায়, ততই মঙ্গল। ‘সেই ভদ্রলোক তাদের ইতিহাস বইয়ে যা যা পড়েছিল তাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে তার বাস্তব চিত্র এখানে দেখতে পাবে। তার মানে সে তার সময়ের অতীতে চলে গেল। আবার বাংলাদেশের একজন যদি ইংল্যান্ড, আমেরিকা কিংবা ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া যায়, সে গিয়ে কী দেখবে? সে যা কল্পনাও করতে পারেনি ওখানে তা-ই চলছে। তার মানে কী? একই পৃথিবীতে আমরা চাইলে অতীত এবং ভবিষ্যতে চলে যেতে পারি। টাইম মেশিনের ধারণাটা তো এ রকমই ছিল, তাই না বাবা?’ অন্য সময় হলে ছেলের এমন মন্তব্য শুনে হয়তো কষে একটা থাপ্পড় লাগাতেন; কিন্তু এই লোডশেডিং, রাস্তার অসহনীয় জ্যাম আর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর অরাজকতার খবরের মধ্যে তাঁর মনে হলো রবিন খুব একটা মিথ্যে বলেনি।
বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রযুক্তিবিদ ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সেদিন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ওয়াই-ফাই প্রযুক্তিকে কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন। শুনে খুব ভালো লেগেছে। আমরা নিশ্চয় বর্তমান সরকারের স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশ খুব শিগগিরই পেয়ে যাচ্ছি। আরও ভালো লাগত যদি তিনি বলতেন ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি চালাতে কোনো বিদ্যুৎ লাগে না।
বিদ্যুৎ পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কারণে আফ্রিকার বেশির ভাগ মানুষই কৃষ্ণবর্ণের হতো, ইদানীং কিছুটা পরিবর্তন এসেছে; ওসব জায়গায় এখন সাদা মানুষও দেখা যায়। একটি টিভি চ্যানেলে এক বিজ্ঞাপনদাতা এসে অভিযোগ করলেন, আমরা আর বিজ্ঞাপন দিব না। যে হারে বিদ্যুৎ যায়, তাতে মানুষ টিভিই তো দেখার সময় পায় না।
প্রত্যন্ত একটি অঞ্চল ঘুরে এসে এক প্রতিনিধি তাঁর পত্রিকার সম্পাদককে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘ওখানে প্রতিদিন সতেরো-আঠারোবার কারেন্ট যায়, আর একবার গেলে সাত-আট ঘণ্টা কারেন্ট আসে না।’ ব্যাপারটা কিছুটা তা-ই, ঠিক বোঝা যায় না কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকে আর কতক্ষণ থাকে না।
আপনি কি জানেন ছাত্রলীগ কেন ক্যাম্পাসে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে? কারণ হচ্ছে লোডশেডিংয়ের ফলে তারা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। তাই জ্ঞানার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা প্রতিবাদের এই ভিন্নপথ বেছে নিয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যার জন্য তো আর বিরোধী দলকে দোষী করলে হবে না, তাই মারামারিটা লাগে নিজেদের মধ্যেই।
বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে নিজেদের ইশতেহারকে বলেছিলেন দিনবদলের সনদ। সেটা বোধহয় অনেকে ভুলে গেছেন, ভুলে যাওয়াটাই সংগত। আওয়ামী লীগের সব নেতা-কর্মী-সমর্থকের জন্য একটা পরীক্ষার আয়োজন করা দরকার। সেখানে শুধু একটাই প্রশ্ন থাকবে, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার ছেপেছিল সেখান থেকে যতটুকু পারো মুখস্থ লেখো।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পরীক্ষাটা আপনিও দিয়ে দেখতে পারেন। কিন্তু সেদিন পরীক্ষার হলে যদি বিদ্যুৎ না থাকে তার জন্য পরীক্ষা বাতিলের ব্যবস্থা থাকবে কি না, সেটাও ভাবা দরকার।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সকালে ভোটকেন্দ্র থেকে খুব হাসি-খুশিভাবে ফেরে কৌশিক। পরদিন ভোরে তার হাসি কান পর্যন্ত লম্বা হয়। টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে বাজার করে আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত করে খাওয়ায়। খাওয়ার টেবিলে ঠিক প্রধানমন্ত্রীর মতো করে সেও বলেছিল দিনবদলের কথা, নতুন বাংলাদেশের কথা। এবারই প্রথম ভোটার হয়েছিল সে। প্রথমবারেই তার ভোট দেওয়া দল ক্ষমতায় গেছে। তার তো খুশি হওয়ার কথাই। কৌশিক এখন আর কোনো আত্মীয়ের বাসায় যায় না। কারও সঙ্গে দেখা হলে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। মনে মনে শুধু ভাবে, ‘আমরা কি এই আওয়ামী লীগ চেয়েছিলাম? আমরা কি এমন একটি সরকার চেয়েছিলাম? তাহলে কি এ দেশের মানুষের ভাগ্য কোনো দিনও বদলাবে না?
হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘আমাদের যায় দিনগুলো ভালো যায়।’ আজ তো বিদ্যুৎ তাও কয়েকবার এসেছিল, কিন্তু আগামীকাল?

তাওহিদ মিলটন
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ২৭, ২০০৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *