রঙ্গভরা লাইভ টেলিভিশন

একটা সময় ছিল, যখন এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছাত্রটার কাছে ছুটে যেতেন টিভি-সাংবাদিকেরা। মাইক্রোফোন বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘আপনার কেমন লাগছে?’
এখন আর কৃতী ছাত্র হতে হয় না। পেছনে বিডিআর জওয়ানদের উন্মত্ত গোলাগুলি থেকে বাঁচতে আপনি প্রাণভয়ে, সন্তানকে কোলে লুকিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন। আপনার গতি রোধ করে দাঁড়াবে টিভি-সাংবাদিক। ঠাঠাঠাঠা গর্জন পেছনে রেখে জানতে চাইবে, ‘আপনার কেমন লাগছে?’
কিংবা ধরুন, আপনি দমকল বাহিনীর একজন কর্মী। আগুন লেগেছে বহুতল বিপণিবিতানে। কাঁধে পানির পাইপ নিয়ে আপনি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছেন। আপনার পৌঁছানোর ওপর নির্ভর করছে আগুন কত দ্রুত নেভানো সম্ভব হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা, হঠাৎ আপনার পিছু ধাওয়া করবে টিভি ক্যামেরা। পথ আগলে দাঁড়াবে টিভি-সাংবাদিক। হাতে ধরা ‘বুম’টা দুম করে এগিয়ে দিয়ে জানতে চাইবে, ‘এই যে এত বড় দালানে আগুন লাগল, আপনি নেভাতে যাচ্ছেন, কেমন লাগছে আপনার?’
পাবলিকও কম যায় না। কিছুদিন আগে কোনো এক শবযাত্রার ছবি দেখাচ্ছিল একটা চ্যানেলে। শোকাবহ ভাবগম্ভীর পরিবেশ। হঠাৎই সেটা গুবলেট পাকিয়ে গেল। অতি উৎসাহী এক শবযাত্রী কী বুঝে জানি দেখাল ‘ভি’ চিহ্ন! শোক প্রকাশে? নাকি যমদূতের বিজয় বোঝাতে?
তীব্র পানিসংকটের এই কালে আমাদের দেশ আর ‘সুজলা’ না-ই থাকুক, কিছু ক্ষেত্রে এখনো বেশ ‘সুফলা’। বর্তমানে সবচেয়ে ফলবতী ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ‘টিভি চ্যানেল’ বোধহয় অন্যতম। হু হু করে বাড়ছে আমাদের টিভি চ্যানেল।
কিছুদিন হলো এই চ্যানেলগুলোতে পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে ‘লাইভ’ নামের এক আজব দর্শনীয় বস্তু। সঠিক পরিবেশনার অভাবে সুস্বাদু খাবারও বিস্বাদ লাগতে পারে। সেটাই হয়েছে আমাদের প্রায় সব টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে। যেটি টিভি চ্যানেলগুলোর অহংকার হতে পারত, সেটিকে তারা নিয়ে গেছে হাস্যকর পর্যায়ে।
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের কথাই ধরুন। একদম পড়শি বাড়িতে আগুন লাগার মতো ঘটনাটি ঘটেছে বলে বেশ দ্রুত সেটা ‘লাইভের’ কবজায় নিয়ে আসতে পেরেছে টিভি চ্যানেলগুলো। কিন্তু দেখা গেল, এখানেও সেই হাস্যকর দৃশ্য। এক সংবাদ-পাঠক প্রায় মিনিট দশেক ধরে ভাঙা রেকর্ডের মতো বলে গেলেন, ‘দর্শক, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। আমরা সেটা সরাসরি সম্প্রচার করছি। দর্শক, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠছে···!’
ভাঙা রেকর্ডও একসময় থামে। শেষ পর্যন্ত সেই সংবাদ-পাঠকও থেমেছেন। হয়তো ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন বলেই। ওদিকে আরেক চ্যানেলের সাংবাদিককে ‘লাইভ’-এর শেষ পর্যায়ে স্টুডিওর উপস্থাপক বারবার বলছেন, ‘ঠিক আছে, আমরা কিছুক্ষণ পর ফিরে আসছি।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা? তিনি বলেই চলছেন, ‘আমরা আরও দেখতে পাচ্ছি···।’
উল্টোটাও ঘটেছে। ‘এখন আমরা সরাসরি যোগ দেব তাঁর সঙ্গে’ বলে যে সাংবাদিককে ধরা হলো ক্যামেরায়, তিনি তখন ফোনেই নেই, পাশের জনের সঙ্গে গল্পে মশগুল। স্টুডিও থেকে মাঝেমধ্যে উপস্থাপক আবার জুড়ে দিচ্ছেন অদ্ভুত সব আবদার, ‘আচ্ছা, আগুন কেন লাগল আপনি জানতে পেরেছেন? ভেতরে যারা আগুন নেভাচ্ছে, তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন না···!’
ব্যাপারটা আরও আকর্ষণীয় করতে স্পট থেকে নিজেদের এক সহকর্মীকে ধরে এনে বসিয়ে দেওয়া হলো স্টুডিওতে। যে ঘটনা পাঁচ মিনিটে বলে ফেলা সম্ভব, তিনি সেটা ৫০ মিনিটে ব্যাখ্যা করলেন। এরপর তাঁর কথা শেষ। তিনিও নিরুত্তর, উপস্থাপকও নির্বাক। দর্শক হিসেবে সবার মধ্যেই চাপা টেনশন শুরু হলো-এখন কী হবে! সেই সহকর্মী কিছু বুঝে না উঠতে পেরেই গলাটা যথাসম্ভব খাদে এনে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি আরও বলব?’ উপস্থাপকের হুঁশ ফিরল, ‘না না, থামবেন না। বলে যান বলে যান।’
এঁদের থামানো যাচ্ছে না। বিডিআরের ওই ঘটনায় জিম্মিদশা থেকে মুক্ত, ভীতসন্ত্রস্ত মানুষজনকে গেট দিয়ে বের করে আনা হতে না হতেই চারদিক থেকে মৌমাছির মতো হামলে পড়ে ক্যামেরা। অসহায় এক পিতাকে করজোড়ে অনুরোধও করতে দেখা গেল, ‘প্লিজ ভাই, আমাদের ছেড়ে দিন। এ অবস্থায় কথা বলতে পারব না।’
দিব্যদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, পরলোকে বসে হতাশায় নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছেন জন বেয়ার্ড, টেলিভিশন নামের এই বিভীষণ আবিষ্কারের হতাশায়। সুযোগ থাকলে টিভি ক্যামেরা পৌঁছে যেত তাঁর কাছেও। বুম বাড়িয়ে জানতে চাইত, ‘এখানকার সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?’

রাজীব হাসান
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ২৩, ২০০৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *