সাংঘাতিক যে জীবন

এক বন্ধু চিকিৎসক, অন্যজন সাংবাদিক। দুজনই মহা ব্যস্ত। সাংবাদিক অসুস্থ কিংবা চিকিৎসক কোনো ঝামেলায় পড়লেই কেবল দেখা হয়। তো, অনেক দিন পর দুই বন্ধুতে দেখা। একথা সেকথার ফাঁকে চিকিৎসক বন্ধু সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করল, ‘দোস্ত, তোর বড় ছেলেটা কত বড় হয়েছে?’ সাংবাদিক দুই দিকে দুই হাত ফুট দুয়েক প্রসারিত করে বলল, ‘এই এত বড়!’ ‘আর মেজ মেয়েটা?’ সাংবাদিক দুই দিকে দুই হাত ফুট দেড়েক প্রসারিত করে বলল, ‘এই এত বড়!’ ‘আর ছোট ছেলেটা?’ আবারও সাংবাদিক দুই দিকে দুই হাত ফুটখানেক প্রসারিত করে বলল, ‘এই এত বড়!’
বন্ধুর দুই দিকে হাত প্রসারিত করে উচ্চতা নির্দেশ করার কায়দা দেখে চিকিৎসক বন্ধু তো যারপরনাই বি্নিত! ‘দোস্ত, সব সময় দেখি মানুষ মাটি থেকে ওপরে হাত দেখিয়ে বলে, আমার মেয়েটা বা ছেলেটা এত বড়। তুই দেখছি দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে বলছিস। ঘটনা কী?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাংবাদিকের উত্তর, ‘কী করব দোস্ত, রাত করে যখন অফিস থেকে ফিরি, দেখি ছেলেমেয়েরা ঘুমাচ্ছে। সব সময় ওদের শোয়া অবস্থাতেই দেখি কিনা!’
কৌতুকটা মনে পড়ল প্রথম আলোর বুধবারের ক্রোড়পত্র নারীমঞ্চের জরিপটা দেখে। ‘কেমন পাত্র চাই’ শিরোনামে ১০০ জন নারীর ওপর চালানো হয়েছিল ওই জরিপ। সেখানে মাত্র একজন হবু বরের পেশা হিসেবে পছন্দ করেছেন সাংবাদিকতা। হার মাত্র এক শতাংশ! বর হিসেবে সাংবাদিক হওয়া কোনো বর তো নয়ই, এ যে মূর্তিমান অভিশাপ!
নারীমঞ্চের প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর আমাদের পত্রিকা অফিসে বেশ শোরগোল পড়ে গেল। বিবাহিতরা স্বস্তি পেলেন। আর ব্যাচেলর সাংবাদিকেরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেন শঙ্কিত! পাত্রী জুটবে তো কপালে?
পাত্রী-সংকটে পড়ে গেছে আমাদের দেবাও। দেবাকে তো আপনারা চেনেনই। কিছুদিন আগে ‘আর কত রাত একা থাকব’ গানটা শোনার পর দেবার বুক হু হু করে উঠল। দেবা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাবাকে গিয়ে জানাল, ‘বাবা, আমি বিয়ে করতে চাই।’ বাবা বললেন, ‘দাঁড়া বাবা, তোর এখনো বয়স হয়নি।’ দেবার জিজ্ঞাসা, ‘আমার কবে বয়স হবে, বাবা?’ বাবার উত্তর, ‘যখন তুই আর বিয়ে করতে চাইবি না!’
কিন্তু দেবাকে আর কিছুতেই নিরস্ত করা যাচ্ছে না। দিল্লি কা লাড্ডু সে খেয়েই পস্তাতে চায়। কিন্তু কিছুতেই আর পাত্রী মেলে না। আমাদের সন্দেহ বাড়ে, আদৌ একশতাংশ নারীও কি আছে, সাংবাদিকের গলায় বিয়ের মালা পরাতে যিনি রাজি? পাত্রীর অভিভাবকেরা তো সাংবাদিক শুনতেই দশ পা পিছিয়ে যান। অবশেষে দেবার অভিভাবকেরা বুদ্ধি বের করলেন। এবার আর তার পেশা হিসেবে সরাসরি সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া হবে না।
যথারীতি পাত্রীপক্ষ জানতে চাইল, ‘পাত্র কী করে?’ হাত কচলে ঘটকের উত্তর, ‘আজ্ঞে, লেখালেখি করে।’ ‘লেখালেখি করে মানে? দলিল-লেখক?’ দ্বিগুণ হাত কচলে, হাতের চামড়া তুলে দেওয়ার উপক্রম করে ঘটক জানালেন, ‘আজ্ঞে না, পাত্র তো লাখে একটা। মানে সাহিত্যিক, ইয়ে মানে সাংবা···।’ শেষ পর্যন্ত না আইবুড়োই থেকে যেতে হয় দেবাকে!
বিয়ে না করে দেবারা সুখেই আছে। সেদিন আমাদের অফিসের সিঁড়িতে বড় এক দীর্ঘশ্বাস উগরে দিয়ে এক সহকর্মী জানাচ্ছিলেন তাঁর দুঃখের কথা। অফিসে সম্পাদকের ঝাড়ি খেয়ে রাত করে বাড়ি ফিরে আরেক দফা খেতে হয় বাড়ির সম্পাদিকার ঝাড়ি। সেই সহকর্মী আফসোস করে বলছিলেন, ‘ভাই রে, প্রতিদিন রাতে গিয়ে দেখি, ভাত হয়ে গেছে ঠান্ডা, আর রণমূর্তি বউ যে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো গরম!’
ক্ষোভে-দুঃখে অনেকে সাংবাদিকতাই ছেড়ে দিতে চান। তবু কি মুক্তি আছে? এই গল্পটা শুনুনঃ
একজন আলোকচিত্রী, একজন প্রতিবেদক আর একজন সম্পাদক মিলে গেছেন কক্সবাজারের একটা সম্মেলনে যোগ দিতে। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে দুই সাগরেদকে বগলদাবা করে সম্পাদক সাহেব গেছেন সমুদ্রসৈকতে হাওয়া খেতে। সেখানেই বালুকায় পড়ে ছিল আলাদিনের সেই চেরাগ। হঠাৎ সেই চেরাগে ঘষা লাগতেই বেরিয়ে এল বিরাটকায় দৈত্য। ‘হু হা হা হা, হুকুম করুন আমার মালিক।’ কিন্তু মালিক তো তিনজন। শেষে রফা হলো, প্রত্যেকের একটি করে ইচ্ছা পূরণ করা হবে।
প্রথমে সেই আলোকচিত্রীর পালা। ‘ধুস, এই মরার চাকরি আর ভাল্লাগে না! আমাকে সুইজারল্যান্ড পাঠিয়ে দাও।’ সঙ্গে সঙ্গে হুকুম তামিল। ফুস করে সেইজন চলে গেলেন সুইজারল্যান্ড। এরপর ওই প্রতিবেদকের পালা। তাঁরও একই কথা, ‘ধুস, এই মরার চাকরি আর ভাল্লাগে না। আমাকে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও।’ জো হুকুম। ফুস করে তিনি চলে গেলেন আমেরিকা। এবার সম্পাদকের পালা। ‘হুজুর, বলুন আপনি কী চান?’ সেই দৈত্য করজোড়ে জানাল সম্পাদকের কাছে। রাশভারী সম্পাদক কণ্ঠে বজ্রনিনাদের হুঙ্কার তুলে বললেন, ‘ইয়ার্কি পেয়েছ? এক্ষুনি ফিরিয়ে আনো ওই দুজনকে। একটু পরই আমাকে পত্রিকা প্রেসে পাঠাতে হবে!’

রাজীব হাসান
সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ১৭, ২০০৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *