এক বিবাহিত মেয়ের প্রতি – শওকত হোসেন

এক বালিকার সঙ্গে তখন তুমুল প্রেম করি। সেই বালিকা একদিন আবেগঘন হয়ে জানতে চাইল, ‘বিয়ের পরও কি তুমি আমাকে এভাবে ভালোবাসবা?’
আমি বলেছিলাম, ‘অবশ্যই বাসব। আমি বিবাহিত মেয়েদেরই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।’
বালিকা এ কথার অর্থ কী বুঝল কে জানে। একদিন এসে বলল, কিছুদিন ধরেই তার আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া যেতে মন চায়। সে চলে যাচ্ছে। তবে একা যেতে কেমন দেখায়, তাই বাধ্য হয়েই বাবার বন্ধুর এক ছেলের সঙ্গে যেতে হচ্ছে। আমার মুখ দেখে মনে হয় একটুখানি মায়া হলো। সে বলল, ‘চিন্তা কোরো না, আমার চেয়েও অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে। সে রকম দেখে একজনকে বিয়ে করে ফেলো।’
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলাম, ‘তুমিই বিয়ে করতে রাজি হলে না, কোনো সুন্দরী মেয়ে কি আর রাজি হবে!’
আমার আশঙ্কা ভুল প্রমাণ করে কোনো এক ভালো ও সুন্দরী মেয়ের সঙ্গেই আমার বিয়ে হয়েছে। আর আমিও সেই বালিকাকে দেওয়া আমার কথা রেখেছি। সেই যে বলেছিলাম ‘আমি কেবল বিবাহিত মেয়েকেই ভালোবাসি’, সেটা এখনো মেনে চলছি। আমার বউয়ের যখন বিয়ে হয়নি, তখন তাকে মোটেই ভালোবাসতাম না, তাকে চিনতামই না। কিন্তু এখন সে বিবাহিত। আমি তাকেই ভালোবাসি।
আমার এই বউয়ের সঙ্গে কিন্তু আমার একটা অসাধারণ মিল আছে। আমার আর আমার বউয়ের বিয়ে একই দিন হয়েছিল। একই দিন, একই মাস ও একই সালে। সবচেয়ে বড় কথা, দেখতে দেখতে বিয়ের বয়স সাত বছর চলেও গেল। দিন, তারিখ আর সালের সেই মিলটা কিন্তু এখনো আছে।
মেরিলিন মনরোর একটা বিখ্যাত ছবি আছে। দি সেভেন ইয়ার ইচ। বাংলা করলে হয় ‘সাত বছরের চুলকানি’। এ ছবিতেই বাতাসে স্কার্ট ওড়ার সেই বিখ্যাত দৃশ্যটা আছে। ছবিটার মূল কথা হলো, বিয়ের পর সাত বছর পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই থাকে। তার পরই শুরু হয় চুলকানি। বিয়ের সাত বছর পর বেশির ভাগ মানুষই এদিক-ওদিক হোঁচট খায়। আমরা হোঁচট খাইনি।
অলক্ষুনে কথা বাদ দিয়ে তার চেয়ে বরং বিয়ের শুরুর দিকের কিছু কথা বলি। বিয়ের পরপরই গেলাম এক বন্ধুর বাসায়। দেখি, বন্ধু তার বউকে আদর করে ডাকে ‘জানু’ আর বন্ধুর বউ তাকে ডাকে ‘জান’ বলে। বাসায় এসে আমার বউ উদাস একটা ভাব নিয়ে আমাকে বলল, আহা! তারা কী সুন্দর আদর করে একজন আরেকজনকে কত নামে ডাকে! আর আমি নতুন বউকে সেই পুরোনো নাম ধরেই ডাকছি। আমি যে কতটা রোমান্টিকহীন, সেটা সে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে লাগল। নতুন বউ তো, বউয়ের মন খারাপ দেখলে নিজের মন খারাপ করাটা নিয়ম। সেই নিয়ম মেনে আমারও মন খারাপ হলো। আমি তখন তাকে দুটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যেমন—তার পিতৃপ্রদত্ত নাম সামসুন্নাহার। আমি বললাম, ‘ছোট করে আমি তোমাকে সামসু বলে ডাকতে পারি।’ সে রাজি তো হলোই না, উল্টা চোখ গরম করে তাকিয়ে থাকল। তখন দ্রুত প্রস্তাব পাল্টে বললাম, ‘এখন আমরা যদি জান-জানু বলা শুরু করি, তাহলে আমার বন্ধু ও তার বউ ভাববে, তাদের নকল করছি।’ তাই নতুন প্রস্তাব দিয়ে বললাম, ‘তুমি বরং আমাকে প্রাণ বলে ডাকো।’ আমার বউ, যে আমাকে রসকসহীন বলে এরই মধ্যে ভাবতে শুরু করেছিল, সে-ও আমার প্রস্তাবে চমকে গেল। খুশি হতে হতে হঠাৎ কপাল কুঁচকে বলল, ‘তাহলে তুমি আমাকে কী ডাকবা?’ আমি জীবনের সেরা সাহস দেখিয়ে বললাম, ‘আমি প্রাণ হলে তোমাকে তো প্রাণী বলে ডাকব।’ আমার বউ এ প্রস্তাবেও রাজি হলো না।
আমার আর বউয়ের মধ্যে মিল দিয়ে শুরু করেছিলাম। জীবন কি খালি মিলে ভরা থাকে? অমিলও থাকে। শুরুতে সবকিছু ভালো লাগলেও যত সময় যায়, অমিলগুলো চোখে পড়ে। এবার সবচেয়ে বড় অমিলটার কথাই বলি। আমাদের বিয়ে একই দিনে হলেও আমার চেয়ে আমার বউয়ের বিয়েটাই আসলে ভালো হয়েছে। কী চমৎকার! ভালো, শান্তশিষ্ট একটা জামাই পেয়েছে সে। আমাদের পুরো পরিবারের মধ্যে আমার বউয়ের বিয়েটাই আসলে ভালো হয়েছে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *