অগস্ত্য

অগস্ত্য–ইনি বেদের একজন মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি। ঋকবেদে কথিত আছে, ইনি মিত্র অর্থাৎ তেজোময় সূর্য ও বরুণের পুত্র। আদিত্য–যজ্ঞে মিত্র ও বরুণ উর্বশীকে দেখে যজ্ঞকুম্ভের মধ্যে শুক্রপাত করেন। সেই কুম্ভে পতিত শুক্র হতে বশিষ্ঠ ও অগস্ত্যের জন্ম হয়। ভাগবতে অগস্ত্যকে পুলস্তের পুত্র বলা হয়। এঁর অনেক নামের মধ্যে কয়েকটি নাম এইরূপ–ইনি কুম্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে নাম হয় কলসীসুত, কুম্ভসম্ভব, ঘটোৎভব, কুম্ভযোনী, মিত্ৰ-বরুণের পুত্র বলে মৈত্রাবারুণি, সমুদ্র পান করেছিলেন বলে পীতাব্ধি, বাতাপিকে বিনাশ করেছিলেন বলে বাতাপিদ্বীট, উর্বশীর জন্য উর্বশীয়, মহাতেজ বলে আগ্নেয়, বিন্ধ্যকে শাসন করেছিলেন বলে বিন্ধ্যকুট, ক্ষুদ্রাকৃতি বলে তাঁর নাম মান। অগস্ত্য প্ৰতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি চিরকাল কৃতদার থাকবেন, কিন্তু একদিন ভ্রমণ করতে করতে দেখতে পেলেন, তাঁর পিতৃপুরুষরা এক গুহার ভিতর অধোমুখে লম্বমান অবস্থায় অতি কষ্টে ঝুলছেন। জিজ্ঞাসা করে অগস্ত্য জানতে পারলেন, বংশরক্ষা না করলে তাঁদের সদগতির কোন আশা নেই। অগস্ত্য আশ্বাস দিলেন যে, পিতৃপুরুষগণের জন্য তিনি বংশরক্ষার ব্যবস্থা করবেন। তখন | জ্ঞাতা বাতাপীকে তিনি ধ্বংস করেন। তিনি তপোবলে পৃথিবীর সমন্ত প্রাণীর সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ অংশ গ্ৰহণ করে এক পরমাসুন্দরী নারী সৃষ্টি করলেন এবং তাকে বিদর্ভরাজের হাতে পালন করার ভার দিলেন। সেই থেকে এই কন্যার নাম হলো লোপামুদ্রা। কারণ, সমস্ত জীবের সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ জিনিস এই নারী ‘লোপ’ করে নিয়েছেন। এই কন্যা যখন বড় হ’ল, তখন অগস্ত্য এঁকে স্ত্রীরূপে প্ৰাৰ্থনা করলেন; বিদৰ্ভরাজ অনিচ্ছাসত্ত্বেও লোপমুদ্রাকে তাঁর হাতে দান করলেন।

কিছুদিন পরে লোপামুদ্রা একদিন ঋতুস্নান করে অগস্তোর কাছে এলে মুনি পুত্রোৎপাদনের জন্য এঁকে আহবান করলেন। লোপামুদ্রা তখন বললেন যে, পিতৃগৃহে যেরূপ অলঙ্কারভূষিতা হয়ে শয্যায় শয়ন করতেন, সেইরূপ র্তাকে ভূষিত করতে ও মুনিকে ভূষিত হতে বললেন। অগস্ত্য তখন জানালেন যে, এইরূপ ধনরত্ন সংগ্ৰহ করা তার পক্ষে অসম্ভব। ঋতুকাল গত হবার সময় হয়েছে বলে অগস্ত্য অর্থ সংগ্রহের জন্য ভিক্ষায় বের হলেন। কিন্তু সব স্থান হতেই তিনি বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এলেন। তখন যে রাজার তীকে অর্থ দিতে অসমর্থ হয়েছেন, তাঁরা তাকে দানবরাজ ইষলের কাছে যেতে বললেন। সেখানে অনেক ঘটনার পর ইম্বল তাঁকে ধনদান করলেন। এই ধনরত্ন নিয়ে মুনি লোপামুদ্রার কাছে উপস্থিত হলেন। তখন লোপামুদ্রার মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ায়, তিনি অগস্ত্যের কাছ হতে বীৰ্যবান পুত্র প্রার্থনা করলেন। এঁর ফলে দৃড়স্যু নামে এক শক্তিশালী পুত্রের জন্ম হয় এবং এই পুত্ৰই পূর্বপুরুষদের মুক্ত করেন। পুত্রের জন্মের পর অগস্ত্য কিছুদিন আশ্রমে বাস করে যোগবলে দেহত্যাগ করে নক্ষত্ৰলোক প্রাপ্ত হন।

অগস্ত্য বিন্ধ্যপর্বতের গুরু ছিলেন। বিন্ধ্যপর্বত একদিন ইচ্ছা করলেন, সূৰ্য যেমন উদয়ান্তকালে সুমেরু পবিতকে প্ৰদক্ষিণ করেন, সেইরূপ বিন্ধ্যপবীতও সুর্যকে প্ৰদক্ষিণ করবেন। সুর্য এতে অসম্মত হয়ে বলেন যে, তিনি বিশ্বনিয়ন্তার আদিষ্ট পথেই পরিভ্রমণ করেন এবং করবেন।–বিন্ধ্য ক্ৰোধে হঠাৎ নিজের দেহ এমনভাবে বৃদ্ধি করতে লাগলেন যে, সূর্যের পথ রোধ হল। তখন দেবতারা ভীত হয়ে অগস্ত্যের শরণাপন্ন হলেন। অগস্ত্য ভক্তশিষ্য বিন্ধ্যের কাছে উপস্থিত হলে, বিন্ধ্য অবনত মস্তকে তাঁকে প্ৰণাম করলেন। অগস্ত্য বললেন, আমি যতক্ষণ প্ৰত্যাবতন না করি, ততক্ষণ তুমি এইরূপ মস্তক অবনত অবস্থায় থাক। বিন্ধ্যকে এই অবস্থায় রেখে অগস্ত্য ১লা ভাদ্র দক্ষিণাপথে যাত্রা করলেন এবং আর ফিরলেন না। এইরূপে দেবতারা বিন্ধ্যকে দমন করলেন। এ জন্য ১লা ভাদ্রা শুভযাত্রার পক্ষে নিষিদ্ধ হয়ে আছে। ক্রমে সকল মাসের প্রথম দিনেই শুভযাত্রার পক্ষে নিষিদ্ধ হিসাবে পরিগণিত হয়। তাই প্ৰতি মাসের প্ৰথম দিনকে “অগস্ত্য-যাত্ৰা” বলা হয়।

কালকেয় নামে অসুররা বৃত্ৰাসুর বধের পর দেবতাদের ভয়ে সমুদ্রের মধ্যে পলায়ন করে প্রাণরক্ষণ করে। এরা রাত্রে সমুদ্র হতে উঠে দেবতাদের উপর অত্যাচার করত। এই অসুরদের অত্যাচারে দেবতারা অগাস্ত্যের শরণাপন্ন হন। দেবতাদের অনুরোধে অগস্ত্য সমুদ্রকে পান করে ফেলেন। সমুদ্র শোষণের পর অসুররা নিরাশ্রয় হয়ে দেবতাদের হাতে ধবংস হয়।

জনশ্রুতি আছে, অগস্ত্য দক্ষিণাকাশে নক্ষত্ররূপে চির-উজ্জল হয়ে আছেন। তিনি শরৎকালের প্রথমে দক্ষিণাপথে গিয়েছিলেন বলে ভাদ্রের ১৭ কি ১৮ তারিখে আকাশে নক্ষত্ররূপে তাঁর আবির্ভাব ঘটে থাকে।

ইন্দ্র একবার ব্ৰহ্মহত্যার পাপে সমুদ্রের ভিতর বাস করছিলেন, সেই সময় ধার্মিক রাজা নহুষকে ইন্দ্রের অভাবে স্বর্গের রাজা করা হয়। সিংহাসন অধিকার করে রাজা নহুষ ইন্দ্রের স্ত্রী শচীকে হস্তগত করতে চান। বৃহস্পতির উপদেশ অনুসারে শচী বললেন, রাজা নহুষ যদি সপ্তর্ষি, চালিত রথে আরোহণ করে তাঁর কাছে আসেন, তবেই তিনি তাঁকে গ্ৰহণ করবেন। এই কথা অনুসারে ঋষিচালিত রথে রাজা নহুষ আসছিলেন। রথের একজন বাহক ছিলেন অগস্ত্য। হঠাৎ রাজার পা আগস্ত্যের দেহ স্পর্শ করে। এতে ঋষি অগস্ত্য ক্রুদ্ধ হয়ে রাজাকে “সৰ্প হও” এই অভিশাপ দেন। তৎক্ষণাৎ নহুষ রথ হতে পতিত হয়ে সৰ্পে পরিণত হন। অভিশাপগ্ৰস্ত নহুষ তখন অগস্ত্যের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। নহুষের একান্ত অনুরোধে ঋষি তাঁর অভিশাপকে সামান্য পরিবর্তন করেন। তারপর যুধিষ্ঠিরের সাহায্যে তিনি আবার নিজ মূর্তি ফিরে পান ও পুনরায় স্বৰ্গে ফিরে যান। বনবাসকালে রাম অগস্ত্যাশ্রমে উপস্থিত হলে অগস্ত্য এঁকে বৈষ্ণবধনু, অক্ষয়তূণীর ও নানারকম মহাস্ত্র দান করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *