২.০৭ এক বনাম একশো

২.০৭ এক বনাম একশো

সার এডওয়ার্ড আদৌ ভুল বলেননি। প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটি হাতি এখন আমাদের পিছনপিছন ধাবমান। দল বেঁধে এগুচ্ছে তারা একযোগে, ইতিমধ্যেই স্টীম হাউসের এত কাছে এসে পড়েছে–বেহেমথের সঙ্গে তাদের দূরত্ব মাত্র দশগজ হবে এখন-যে তাদের খুব ভালো করে লক্ষ করা যাচ্ছিলো।

হুড, আমি বললুম, একবার তাকিয়ে দ্যাখো কতগুলো হাতি! এখনও কি তুমি বলতে চাও যে বিপদের কোনো সম্ভাবনা নেই?

ফুঃ, হুড আমার কথা যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলে, এরা আমাদের ক্ষতি করতে চাইবে কেন, বলো? এরা তো আর বাঘের মতো নয়, কী বলো, ফক্স?

নেকড়েদের মতোও নয়, প্রভুর কথায় ধুয়ো ধরলে অনুচরটি।

কিন্তু এ-কথায় দেখলুম কালোগনি ঘন-ঘন মাথা নাড়লে। বোঝা গেলো, সে এবিষয়ে মোটেই একমত নয়।

তোমাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে, কালোগনি, ব্যাঙ্কস বললে।

কালোগনি কেবল বললে, বেহেমথের বেগ কি আর বাড়ানো যায় না?

বেশ কঠিন কাজ, ব্যাঙ্কস বললে, তবু একবার চেষ্টা করে দেখি।

এই বলে ব্যাঙ্কস বারান্দা থেকে গিয়ে হাওদায় উঠলো। স্টর দাঁড়িয়েছিলো হাওদায়। কী কথা হলো দুজনে, তারপরেই বেহেমথের বেগ আরো বেড়ে গেলো। বেড়ে গেলো, তবে অতি সামান্যই, কারণ রাস্তাটা বন্ধুর। কিন্তু বেহেমথের গতি যদি দ্বিগুণ বাড়ানো হতো, অবস্থাটা তবু রইতো তথৈবচ–কারণ হাতির পালও সেই তুলনায় গতি বাড়িয়ে দিলে।

ঘণ্টা কয়েক কেটে গেলো এইভাবেই। শেষে নৈশভোজ সেরে আমরা আবার বারান্দায় এসে দাঁড়ালুম। পিছনে সোজা চলে গেছে রাস্তাটা-কোনো বাঁক না-নিয়ে মাইল দু-তিন { অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করলুম ইতিমধ্যে হাতিরা সংখ্যায় আরো বেড়েছে। গুনবার চেষ্টা করে দেখলুম, অন্তত একশো হবে তারা সংখ্যায়। দু-তিনটি সারি ধরে এগুচ্ছে তারা, চুপচাপ, একই তালে, একই ছন্দে, শুঁড় শূন্যে তোলা। জোয়ারের জল যেমন ভাবে এগোয়, তেমনি অনিবার্য ভঙ্গি তাদের। এখন সব শান্ত, কিন্তু একবার খেপে উঠলে কী-যে হবে কে জানে।

এদিকে সব ঝাঁপসা হয়ে এসেছে। চঁাদ ওঠেনি। তারাও দেখা যাচ্ছে না আকাশে–পাৎলা একটা কুয়াশার আস্তরণ পড়েছে এর মধ্যেই। ব্যাঙ্কস ঠিকই বলেছিলো : অন্ধকারে এ-রকম বিশ্রী রাস্তায় এগুনো দুঃসাধ্য হবে। সামনে উপত্যকাটা একটু চওড়া হলেই বেহেমথকে থামিয়ে দিয়ে রাতের মতো বিশ্রাম নেয়া হবে, এটাই ঠিক হয়েছিলো খাবার টেবিলে।

অন্ধকার ঘন হয়ে আসতেই হাতিদের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে গেলো, যেটা সারাদিনে একবারও দেখা যায়নি। কেমন যেন একটা চাপা গর্জন করলে তারা, তারপরেই আরো-একটা অদ্ভুত ডাক উঠলো তাদের মধ্যে, অনেকটা দূরে কোথাও বাজ পড়ার শব্দের মতো।

মানবরা জিগেস করলেন, হঠাৎ এই ডাকাডাকির অর্থ কী?

এ-রকম শব্দ তারা করে, কালোগনি জানালে, শত্রুর সামনে পড়লে।

তার মানে এরা আমাদের শত্রু বলে মনে করছে? ব্যাঙ্কস বললে।

তা-ই তো আশঙ্কা করছি, উত্তর দিলে কালোগনি।

রাত নটা নাগাদ আমরা অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত একটি সমতলভূমিতে এসে পৌঁছুলুম–আধমাইল চওড়া গোল একটা চত্বর যেন—এখান থেকেই রাস্তা গেছে পুটুরিয়া হ্রদের দিকে—যেখানে গিয়ে আমরা বম্বাইয়ের রাস্তায় পৌঁছুবো। কিন্তু হ্রদটা এখনও দশ মাইল দূরে-এই অন্ধকার রাতে সেদিকে যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ব্যাঙ্কস থামবার সংকেত করলে, অমনি বেহেমথ থমকে দাঁড়ালো, কিন্তু চুল্লি নিভিয়ে ফেলা হলো না। স্টরকে আগেই বলা হয়েছিলো এঞ্জিন চালু রাখতে, যাতে মুহূর্তের মধ্যে আবার রওনা হয়ে পড়া যায়।

মানরো তাঁর ঘরে চলে গিয়েছেন, কিন্তু ব্যাঙ্কস আর হুড বারান্দায় বসে আছে। আমারও একা শুয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিলো না, অন্যরাও তৈরি হয়ে আছে। কিন্তু হাতিরা হঠাৎ স্টীম হাউস আক্রমণ করলে কী-যে করবো, তা-ই ঠিক করতে পারছিলুম না আমরা।

প্রায় ঘণ্টাখানেক সেই চাপা সুরে বাজ পড়ার মতো আওয়াজ শোনা গেলো আমাদের চারপাশে। হাতির পালটা সমতলভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা কি তবে বেহেমথের পাশ কাটিয়ে আরো দক্ষিণে চলে যাবে? তা-ই মনে হলো, কারণ রাত সোয়া-এগারোটা নাগাদ আর-কোনো সাড়াশব্দ শোনা গেলো না; সব হঠাৎ কেমন অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ হয়ে গেছে। শুধু বেহেমথের এঞ্জিনের ফেঁাশ-ফেঁশ আওয়াজ ছাড়া আর-কোনো শব্দ নেই কোথাও।

কেমন? ঠিক বলিনি? হাতিগুলো নিজেদের পথে চলে যাবে, বললে হুড।

উঁহু! আমি ততটা নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। বললে ব্যাঙ্কস, তবু দেখা যাক। বলে সে হাঁক পাড়লে, স্টর! সন্ধানী আলোটা জ্বালো দেখি।

তক্ষুনি দুটো তীব্র বিজলি বাতি জ্বলে উঠলো বেহেমথের চোখে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশে দেখা হলো আলো ফেলে।

দেখা গেলো, হাতিরা স্টীম হাউসকে ঘিরে স্থিরভাবে চুপচাপ শুয়ে আছে। ওই তীব্র আলো পড়ে তাদের কালো পাহাড়প্রমাণ শরীরগুলো কী-রকম ভুতুড়ে দেখালো–কেমন যেন অতিকায় ও প্রাগৈতিহাসিক। আলো পড়তেই যেন খোঁচা খেয়ে জেগে গেলো তারা। শুঁড় উঠে গেলো শূন্যে, চোখা দাঁতগুলো উদ্যত হলো অস্ত্রের মতো, চাপা রাগি গুমগুমে গর্জন উঠলো।

আলো নিভিয়ে ফ্যালো, এক্ষুনি, ব্যাঙ্কস নির্দেশ দিলে।

তক্ষুনি আলো নিভে গেলো হঠাৎ, আর অমনি যেন মন্ত্রবলে সব চাঞ্চল্যও থেমে গেলো মুহূর্তে।

দেখলে তো, স্টীম হাউসকে ঘিরে ফেলেছে এরা। বললে ব্যাঙ্কস।

হুম। হুডের বিশ্বাস এতক্ষণে একটা মস্ত ঝাঁকুনি খেলো।

কিন্তু কী করা যায় এখন? কালোগনির কাছে পরামর্শ চাওয়া হলো। সে তার উদ্বেগ চাপা দেবার কোনো চেষ্টাই করলে না। রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে চলে যাওয়া যায় না? উঁহু, অসম্ভব! তাছাড়া তাতে কীই-বা লাভ হবে? হাতির পাল যে অন্ধকারেও আমাদের অনুসরণ করবে, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। তাছাড়া রাতের বেলায় এই পাহাড়ি রাস্তায় বেরিয়ে-পড়ার অনেক বিপদ আছে। কাজেই আলো ফোটবার আগে রওনা হবার কোনোরকম চেষ্টা না-করাই ভালো। হাতির পালকে না-চটিয়ে তখন আমরা চলে-যাওয়ার একটা আপ্রাণ চেষ্টা করতে পারি।

কিন্তু তখনও যদি হাতির পাল পাছু না-ছাড়ে? আমি জিগেস করলুম।

তখন আমরা এমন-কোথাও যাবার চেষ্টা করবো, যেখানে তারা আর বেহেমথের নাগাল পাবে না, বললে ব্যাঙ্কস।

বিন্ধ্যপর্বত অতিক্রম করবার আগে এমন কোনো জায়গা কি পাবো আমরা? নাছোড় হুড জানতে চাইলো।

একটা জায়গা অবিশ্যি আছে, বললে কালোগনি।

কোথায়?

লেক পুটুরিয়া।

এখান থেকে হ্রদটা কতদূরে?

প্রায় ন মাইল।

কিন্তু হাতিরা তো সাঁৎরাতে পারে—প্রায় সমস্ত দিনই তারা জলে কাটিয়ে দিতে পারে! বললে ব্যাঙ্কস। ওরা যদি লেক পুটুরিয়া অব্দি আমাদের ধাওয়া করে যায়, তাহলে তো অবস্থা আরো সঙিন হয়ে পড়বে।

কিন্তু তাছাড়া তো এদের হাত এড়াবার আর-কোনো উপায় দেখছি না।

তাহলে তা-ই করা হোক। ব্যাঙ্কস রাজি হলো।

তাছাড়া অবিশ্যি আর-কিছু করারও ছিলো না। হাতিগুলো হয়তো জলে নেমে পড়ার ঝুঁকি নেবে না; যদি-বা নেয়, তাহলে তাদের এড়িয়ে যাবার জন্যে অনা-কোনো উপায় তখনই না-হয় ভাবা যাবে।

আমরা অধীরভাবে দিনের অপেক্ষা করতে লাগলুম। তখন রাত শেষ হতে বেশি বাকিও ছিলো না। কিন্তু দিন হলে দেখা গেলো, একটি হাতিও নড়েনি—স্টম হাউসকে তারা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে। এবার দিনের বেলায় কয়েকটা হাতি এসে একেবারে বেহেমথের গা ঘেঁসে দাঁড়ালো। ব্যাঙ্কস বলে দিয়েছিলো কেউ যেন কিছুতেই হাতিদের চটিয়ে না-দিই। হাতিরা নিশ্চয়ই এখন নিশ্চল বেহেমথকে ঘিরে বুঝতে চাচ্ছে হাতিরই মতো দেখতে এই অতিকায় দানবটা কোন আজব কিম্ভূত জন্তু। তাদেরই কোনো আত্মীয় কি? তার ক্ষমতা তাদের চেয়ে বেশি, এটা কি তারা বুঝতে পারছে? আগের দিন তারা ভালো করে দেখতে পায়নি তাকে, কারণ সারাক্ষণই একটু দূরে-দূরে ছিলো। কিন্তু এখন তারা কী করবে, যখন ঘোঁৎ করে আওয়াজ করে গুড় দিয়ে ভলকে-ভলকে ধোঁয়া ছাড়বে বেহেমথ? যখন দেখবে যে মস্ত পা ফেলে-ফেলে বেহেমথ দুটো আস্ত বাড়ি টেনে নিয়ে চলেছে, তখন তাদের সকলের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

কর্নেল মানরো, ক্যাপ্টেন ইড, কালোগনি আর আমি স্টীম হাউসের সামনের দিকে গিয়ে দাঁড়ালুম; সার্জেন্ট ম্যাক-নীল তার সঙ্গীদের নিয়ে দাঁড়ালো পিছনে। কালু চুল্লির সামনে দাঁড়িয়ে কেবলই জ্বালানি দিয়ে স্টীম বাড়িয়ে চললো। ব্যাঙ্কস রইলোস্টরের সঙ্গে হাওদায়, চাকায় হাত দিয়ে প্রস্তুত, যাতে যে-কোনো দিকে স্টীম হাউসকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়!

অবশেষে যাবার মুহূর্ত এলো। ব্যাঙ্কসের ইঙ্গিতে স্টর স্প্রিং ধরে টান দিলে, তীব্র একটা কানে-তালা-ধরানো বাঁশির আওয়াজ হলো। আশপাশের হাতিরা মাথা তুলে একটু সরে দাঁড়ালো পিছনে, সামনে কয়েক ফুট জায়গা ফাঁকা করে দিলে।

বেহেমথের শুঁড় দিয়ে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে এলো, চাকাগুলো গড়িয়ে গেলো সামনের দিকে, বেহেমথ চলতে শুরু করে দিলে।

বেহেমথকে চলতে দেখেই সামনের হাতিদের মধ্যে অদ্ভুত-একটা সাড়া পড়ে গেলো। ভীষণ অবাক হয়ে গেলো তারা, কী-রকম ভ্যাবাচাকা খেয়ে সরে গেলো সামনে থেকে, আর রাস্তা করে দেয়ার ফলে বেহেমথ সামনের দিকে এগিয়েই চললো।

কিন্তু হাতিরাও সঙ্গ ছাড়লে না কিছুতেই। তারাও পিছনে আসতে লাগলো, আগেরই মতে, উপরন্তু এবার দু-পাশেও হাতির পাল বেহেমথের সমান্তরভাবে এগুতে লাগলো। যেমনভাবে ঘোড়সোয়াররা রাজারানীর গাড়ির সঙ্গে-সঙ্গে এগোয়, অনেকটা সেইভাবে। এই চমকপ্রদ পুরো দলটা চললো আশ্চর্য শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে, তাড়াহুড়ো করলো না, কোনো উত্তেজনা প্রকাশ করলো না—কেবল বেহেমথের গতির সঙ্গে সমানে তাল রাখতে লাগলো।

এরা যদি এইভাবেই আমাদের সঙ্গে-সঙ্গে হ্রদ পর্যন্ত যায়, বললেন কর্নেল মানরো, তাহলে আমি কোনো আপত্তি করবো না।

কিন্তু রাস্তা যখন সংকীর্ণ হয়ে যাবে, তখন কী হবে? আশঙ্কা প্রকাশ করলে কালোগনি।

ঘণ্টা তিনেক কেটে গেলো, আমরা আট মাইল পথ পেরিয়ে এসেছি–ওর মধ্যে নতুন-কিছুই ঘটেনি। হাতিদের দেখে-দেখে আমরা কী-রকম যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি —প্রথম যে-চমক আর ভয়টা ছিলো, তা ক্রমশই থিতিয়ে গিয়ে ভোতা হয়ে আসছে। হ্রদটা মাত্র আর মাইল দু-এক দূরে-সেখানে গিয়ে একবার পৌঁছুতে পারলেই আরকোনো ভয় থাকবে না, আমরা ভাবলুম।

এই জায়গাটা ঠিক বন্য নয়, কিন্তু মরুভূমির মতো ফাঁকা। কোনো গ্রাম পড়লো নাপথে, একটা গোলাবাড়িও নয়, কোনো পথিক পর্যন্ত দেখতে পেলুম না এ-পর্যন্ত। বুন্দেলখণ্ডের এই পার্বত্যপ্রদেশে আসার পর থেকে একটি মানুষও আমাদের চোখে পড়েনি।

এগারোটা নাগাদ উপত্যকাটা সংকীর্ণ হয়ে এলো, রাস্তার দু-পাশে উঁচু হয়ে উঠতে লাগলো পাহাড়—এবং আবার আমাদের বিপদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো। হাতিরা যদি আমাদের পিছন পিছন আসতো, কিংবা এগিয়ে যেতে সামনে, তাহলে কোনো আশঙ্কাই ছিলো না। দু-পাশে কুচকাওয়াজ করে আসছে অনেকে। হয় বেহেমথের ধাক্কায় তারা এখানে চেপ্টে মরবে, নয়তো চিৎপটাং হয়ে গড়িয়ে পড়ে যাবে খাদে।

রাস্তাটা সরু হয়ে আসছে দেখেই হাতির পাল দু-ভাগ হয়ে কেউ চলে গেলো সামনে, কেউ-বা পিছনে। আর তারই ফলে বেহেমথের পক্ষে এগুনো বা পিছোননা অসম্ভব হয়ে উঠলো।

ব্যাপারটা ভারি গোলমেলে হয়ে উঠলো তো, মানরো মন্তব্য করলেন।

হ্যাঁ, বললে ব্যাঙ্কস, এবার দেখছি সোজা এদের উপর দিয়েই বেহেমথকে চালিয়ে নিতে হবে।

তাহলে তা-ই করো! হুড বলে উঠলো, বেহেমথের লোহার দাঁত ওদের উজবুক গজদন্তের চেয়ে অনেক জোরালো, সন্দেহ নেই। পরিবর্তমান হুডের চোখে বুদ্ধিমান হাতিরা ইতিমধ্যেই গবেট ও উজবুকে পরিণত হয়ে গেছে।

ম্যাক-নীল বললে, কিন্তু বেহেমথ একা, আর ওরা একশো।

এগোও, যা-হয় হবে। ব্যাঙ্কস চেঁচিয়ে নির্দেশ দিলে, না-হলে হাতির পাল শেষটায় আমাদের পিষে মারবে।

বেহেমথের শুঁড় থেকে ভলকে-ভলকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে এলো, সামনের হাতিটার গায়ে তার চোখা লোহার দাঁত বিধে গেলো মুহূর্তে। হাতিটা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলো, আর তৎক্ষণাৎ পুরো দলটা থেকে একযোগে একটা চাপা রাগি গর্জন উঠলো। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।

আমাদের হাতে বুলেটভরা রাইফেল, এমনকী রিভলবারগুলোয় পর্যন্ত গুলি ভরা। অন্তত কোনো প্রতিরোধ না-করে বেহেমথ মাথা নোয়বে না!

আক্রমণটা প্রথমে এলো একটা মস্ত পুরুষ হাতির কাছ থেকে; হাতিটা কেবল অতিকায় নয়, দেখতে সাংঘাতিক, ভীষণ; পিছনের পা মাটিতে রেখে সে বেহেমথের মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়ালো।

একটা গণেশ। কালোগনি চেঁচিয়ে উঠলো।

ফুঃ, হুড তাচ্ছিল্য করে কাঁধ ঝাঁকালে, হাতিটার মাত্র একটাই দাঁত! সেইজন্যেই তো সে আরো-ভীষণ, কালোগনি জানালে।

গণেশ বলে এক-সেঁতো পুরুষ হাতিকে—বিশেষ করে তার ডান দিকের দাঁতটা–থাকলে সে আরো ভীষণ হয়ে ওঠে। গণেশরা অসাধারণ ডাকাবুকো-কোনো-কিছু রেয়াৎ করে না, ভয় করে না। গণেশের অকুতোভয় পরাক্রম আমরা তক্ষুনি বুঝতে পারলুম।

বেপরোয়া একটা গর্জন করে উঠলো গণেশ, ক্রুদ্ধ ও স্পর্ধিত; শুঁড়টা শুন্যে তোলা, সেই একটামাত্র দাঁত উঁচিয়েই সে ছুটে এলো।

লোহার পাতের গায়ে এমন ভয়ংকরভাবে তার দাঁতটা লাগলো যে সমস্ত স্টীম হাউস থরথর করে কেঁপে উঠলো;ইস্পাতের চাদরে মোড়া না-থাকলে বেহেমথ নিশ্চয় এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যেতো; কিন্তু বেহেমথ নিশ্চিতভাবে এগিয়ে যেতে থাকলো সামনে-আর সেই প্রচণ্ড সংঘাতে গণেশের দাঁতটা দু-টুকরো হয়ে ভেঙে গেলো। কিন্তু তবু সেই বেপরোয়া গণেশ সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে বেহেমথকে–আর তার ডাকে সাড়া দিয়ে পুরো হাতির পালটা সামনে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো, অনড় মাংসপিণ্ডের স্কুপের মতো—আর পিছন থেকে অন্য হাতিরা এসে ধাক্কা দিলে বেহেমথকে। উদ্দেশ্য, দুই দলের মধ্যে পড়ে বেহেমথ চূর্ণ হয়ে যাক।

থামলে চলবে না, তাহলে মুহূর্তে তারা বেহেমথকে কাৎ করে ফেলবে; কোনোরকম ইতস্তত না-করে আমাদের উলটো আক্রমণ করতে হবে এবার। রাইফেলগুলো উদ্যত হলো হাতে। হুড তারস্বরে চেঁচিয়ে বলে দিলে, একটা গুলিও বাজে খরচ কোনো না। শুঁড়ের গোড়ায় গুলি কোরো-কিংবা চোখ দুটোর মাঝখানে, কপালে। ওগুলোই হলো আসল জায়গা।

হুডের কথা শেষ হবার আগেই কয়েকটা বন্দুক গর্জে উঠলো, সেই সঙ্গে হস্তীকুলের মধ্য থেকে উঠলো কাতর চীৎকার। তিন-চারটে হাতি মারাত্মক জায়গায় গুলি লেগে পড়ে গেলো পিছনে ও দু-পাশে—আর সেইজন্যেই বাঁচোয়া, সামনে পড়লে তাদের মৃতদেহগুলোই বেহেমথের কাছে মস্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতো। আর্তনাদ শুনে সামনের হাতিগুলো একপাশে সরে দাঁড়ালোবেহেমথ এগিয়ে চললো, নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত।

গুলি ভরে নাও বন্দুকে, হুড বললে।

ততক্ষণে হাতিরা আবার সবেগে একযোগে আক্রমণ করেছে বেহেমথকে। আমরা হাল ছেড়ে দিলুম। কারণ হাতিরা যখন বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তখন কার সাধ্য তাদের রোধ করে, ঠেকায়!

এগোও সামনে, ব্যাঙ্কস নির্দেশ দিলে স্টরকে।

গুলি করে, আবার! হুডের চীৎকার শোনা গেলো।

হাতির ক্রুদ্ধ গর্জন, বেহেমথের তীক্ষ্ণ্ণ বাঁশি, আর আমাদের রাইফেলের শব্দ–সব মিলে যেন একটা তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। গোলমালে লক্ষ্য স্থির করে গুলি করার উপায় নেই। মাংসে গুলি লাগছে, তবে তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। দু-একটা গুলি কেবল কারুকারু দুই চোখের মাঝখানে লাগলো, আর সেই হাতিগুলিই শুধু হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো। যারা কেবল আহত হলো তারা আরো-রাগিভাবে এগিয়ে গেলো বেহেমথের দিকে—স্টীম-হাউসের দেয়ালশুদু যেন তাদের চাপে ভেঙে যাবে।

বেহেমথের স্টীমের আওয়াজ হচ্ছে ফেস-ফেস-সেও যেন অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো গর্জাচ্ছে—যেন আদিম কোনো আবেগে ছুটে যাচ্ছে সামনে; আর তার লোহার শুঁড় সামনে যাকে পাচ্ছে আঘাত করছে প্রচণ্ড, তার ইস্পাতের দাঁত বিধে যাচ্ছে কারু-কারু গায়ে-থরথর করে কাঁপতে-কাঁপতে সে এগুচ্ছে-আর ইতিমধ্যে দূরে দেখা যাচ্ছে হ্রদের জল।

হঠাৎ, এমন সময়, সামনের বারান্দায় একটা প্রকাণ্ড শুড লা্যাসোর মতো বিদ্যুৎবেগে নেমে এলো—সেই জীবন্ত ল্যাসো মুহূর্তে কর্নেল মানরোকে তুলে নিতে পেঁচিয়ে, কিন্তু মস্ত একটা কুঠার হাতে লাফিয়ে পড়লো কালোগনি, প্রচণ্ড আঘাতে দুখানা করে দিলে সেই শুঁড়টা।

তারপর থেকে লড়াইটা আরো-প্রচণ্ড হয়ে উঠলো—আমরা অবিশ্রাম গুলি চালিয়ে গেলুম, আর কালোগনি সারাক্ষণ কর্নেল মানরোকে আড়াল করে রাখলে সব বিপদ থেকে, চোখে-চোখে রাখলে সবসময়।

বেহেমথের ক্ষমতার এটাই অগ্নিপরীক্ষা। যেন কোনো প্রচণ্ড গজালের মতো সে ভেদ করে যাচ্ছে এই মাংসস্তৃপ।

হঠাৎ, এমন সময়, পিছনে স্টীম হাউসের দ্বিতীয় বাড়ি থেকে প্রচণ্ড শোরগোল উঠলো। একপাল হাতি দ্বিতীয় বাড়িটাকে পাথরের গায়ে উলটে পিষে ফেলার চেষ্টা করছে।

ব্যাস চেঁচিয়ে সবাইকে দ্বিতীয় বাড়িটা থেকে চলে আসতে বললো। ফক্স, গৌমি আর ম্যাক-নীল ততক্ষণে চলে এসেছে সামনের বারান্দায়।

পারাজার কোথায়? হুড জিগেস করলে।

সে তার রান্নাঘর ছেড়ে কিছুতেই বেরুবে না, ফক্স বললে।

আসতেই হবে তাকে—পাঁজাকোলা করে ওকে নিয়ে এসো।

মঁসিয় পারাজার কিছুতেই তার রসুইখানা ছেড়ে বেরুবে না, কিন্তু তখন তর্কাতর্কি করার সময় নেই, গৌমি তাকে জোর করে কাঁধে তুলে নিয়ে এলো।

সবাই এসেছো? ব্যাঙ্কস জিগেস করলে।

হ্যাঁ, সাহেব, গৌমি জানান দিলে।

জোড়া খুলে দাও।

তার মানে? স্টীম হাউসের আধখানা ফেলে যাবো আমরা?

তাছাড়া আর উপায় নেই। বিপদের সময় পণ্ডিতেরা আদ্ধেক ছেড়ে যান! ব্যাঙ্কস জানালে।

সংযোগ-শিকল ছিন্ন করে তক্ষুনি দ্বিতীয় বাড়িটাকে আলাদা করে দেয়া হলো। আর পর মুহূর্তেই ক্রুদ্ধ খ্যাপা হাতিদের পায়ের তলায় গোটা বাড়িটা লণ্ডভণ্ড শতখণ্ড হয়ে গেলো। দ্বিতীয় বাড়িটার বদলে হাতিরা যদি সামনের বাড়িটা আক্রমণ করতো…আমি আর ভাবতে পারলাম না।

লেক পুটুরিয়া আর মাত্র কয়েক গজ দূরে তখন।

স্টর পৃর্ণবেগে চালিয়ে দিলে বেহেমথকে—বেহেমথের শুঁড় দিয়ে তখন গরম বাষ্প বেরুচ্ছে সামনে, ছ্যাকা দিচ্ছে সামনের হাতিদের-যেমন দিয়েছিলো একবার ফরুনদীর তীর্থযাত্রীদের।

একবার হ্রদে পৌঁছুতে পারলেই আমরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হবো। হাতিরাও বোধকরি সেটা বুঝতে পেরেছিলো–ক্যাপ্টেন হুড যে তাদের বুদ্ধির কথা বলছিলো, এটাই তার প্রমাণ। তারা একটা মরীয়া শেষ চেষ্টা করলে বেহেমথকে বাধা দিতে।

বারেবারে গর্জন করে উঠছে আমাদের বন্দুক। বেহেমথের শুঁড় দিয়ে বেরিয়ে আসছে গরম বাষ্প, যেন রাগে ফেঁশ-ফেঁাশ করছে এই অতিকায় লৌহদানব। এত জোরে ছুটছে যে হঠাৎ যে-কোনো সময় স্টীম হাউস উলটে যেতে পারে-সামনে তখনও কয়েকটা হাতি শুঁড় তুলে একটা শেষ চেষ্টা করলে, কিন্তু এক ঝটকায় তাদের সরিয়ে দিয়ে দুর্ধর্ষ বেহেমথ জলে নেমে পড়লো–এবং জলে নেমেই শান্ত জলে ভেসে চললো, জাহাজের মতো।

দু-তিনটে হাতিও জলে নেমে পড়েছিলো, কিন্তু ধাবমান বেহেমথ থেকে কয়েকটা গুলি ছুটে আসতেই তারা আবার চটপট উঠে পড়লো ডাঙায়।

কী, ক্যাপ্টেন? ব্যাঙ্কস জিগেস করলে ঠাণ্ডা গলায়, ভারতীয় হস্তিকুলের ভদ্র ও সুমধুর স্নিগ্ধ সম্ভাষণ কেমন লাগলো।

ধেৎ! হুড বলে উঠলো, এরা আবার বন্য জন্তু নাকি। এই একশোটা উজবুকের জায়গায় যদি তিরিশটা বাঘ হতো, তাহলে কী হতো একবার ভাবো দেখি-এই অদ্ভুত গল্পটা শোনাবার জন্যে আমাদের একজনও যে আর বেঁচে থাকতো না, এটা আমি বাজি ধরে বলতে পারি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *