২.০১ মাতিয়াস ফান খোইত

শার্দুল ও শয়তান
আবার মঁসিয় মোক্লের-এর বিবরণী থেকে

২.০১ মাতিয়াস ফান খোইত

আমাদের শিবির বসানো হয়েছে ধবলগিরির তলদেশে, সমুদ্রতল থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচুতে, কলকাতা থেকে একহাজার মাইল দূরে। আমাদের ভ্রমণের প্রথম পর্যায় এখানে এসেই শেষ হয়েছে; কয়েক সপ্তাহ বিশ্রাম গ্রহণ করে অতঃপর আমরা যাবো দক্ষিণাপথে-কর্নেল মানরো পুনরায় অক্লান্ত সন্ধানে বেরুবেন তার চিরশত্রু নানাসাহেবের। জানি না কোনোদিন এঁরা দুজনে পরস্পরের মুখোমুখি হবেন কিনা–হয়তো পুরোটাই এক-অর্থে বন্যহংসের পশ্চাদ্ধাবন : তবু কর্নেল মানরোর পরিকল্পনার কোনো প্রতিবাদ আমরা করিনি। হয়তো ধীরে-ধীরে সমগ্র ভারত ভূখণ্ড ভ্রমণ করে আসার পর তার এই জ্বালা ও যন্ত্রণা কিঞ্চিৎ প্রশমিত হবে। নানাসাহেব যদি সত্যি নেপালে আশ্রয় নিয়ে থাকেন, যদি তিব্বতের সীমান্তে তরাইয়ের জঙ্গলে সেই বিদ্রোহী মানুষটি জ্বলন্ত মশালের মতো জ্বলে-জ্বলে ঘুরে বেড়ান, তাহলে এই জায়গাটিই যে তার দেখা পাবার পক্ষে সবচেয়ে প্রশস্ত ও অনুকূল স্থল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের জীবন অত্যন্ত রহস্যময়-ভবিষ্যৎ কখন যে কাকে কী দেয়, তা কেউ বলতে পারে না। হয়তো সেই রহস্যধূসর ভবিতব্যের প্রতীক্ষ্ণ করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করণীয় নেই। তবু মাঝে-মাঝে সার এডওয়ার্ডের গম্ভীর ও থমথমে মুখের দিকে তাকালে আমার বুকের ভিতরটা যেন কেমন করে ওঠে। কী-একটা চাপা বেদনা ও জ্বালা এই মানুষটিকে যুগপৎ কী-রকম অস্থির ও নিশ্চিন্ত করে রেখেছে।

এই অবস্থার মধ্যে একঝলক টাটকা হাওয়ার মতো হলো ক্যাপ্টেন হুড। মানুষটি ভালোবাসে হই-চই ও হাস্যরোল, লোকটা সে ছটফটে ও জ্যান্ত; প্রতিমুহূর্তেই অদ্ভুত কোনো-কিছুর পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। সার এডওয়ার্ডের সম্পূর্ণ উলটো বলা যায় তাকে। ভালোবাসে তর্কাতর্কি ও উত্তেজনা-নানা বিষয়ে কৌতূহল ও শখ রয়েছে— সার এডওয়ার্ডের মতো অমন একরোখা নয়। কেবল শার্দুলশিকারের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই মানুষটি মুহূর্তে কীভাবে যেন একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়। পঞ্চাশ নম্বর বাঘ তার চাই-ই-শার্দুলবিক্ৰীড়িত ছন্দে এটাই বারেবারে সে ঘোষণা করে। এবং তার অনুচর ফক্স প্রত্যাশায় জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে।

ব্যাঙ্কস বোধহয় কর্মসূত্রে সারা ভারতবর্ষ চষে ফেলেছিলো। উপরন্তু এঞ্জিনিয়ার মানুষ, বিশেষ করে রেলে কর্ম করে বলেই ভারতের সব অঞ্চলের খবর রাখে। সে-ই আমাদের বোঝালে যে আমরা যেখানে শিবির ফেলেছি, সে-জায়গাটা শিমলা কিংবা দার্জিলিং-এর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। শিমলা অনেকটা সুইৎজারল্যাণ্ডের মতো, সুতরাং আমাদের কাছে সে ততটা নতুন নয়, বললে সে, আর দার্জিলিং-এর গৌরব হচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার ঝলমলে শিখর—কিন্তু বৃষ্টি বা কুয়াশায় সেটা প্রায় সবসময়েই এমন লুকিয়ে থাকে যে কাঞ্চনজঙ্ঘার অভুদয় আমাদের চোখের সামনে কতদিনে হতো কে জানে। তার চেয়ে ধবলগিরিই বা মন্দ কী?

ধবলগিরি আশ্চর্য! সেদিনই স্বচ্ছ স্পষ্ট সকালবেলায় ধবলগিরি উন্মোচিত হয়েছিলো আমাদের সামনে-সেই আশ্চর্য তুষারমৌলি গিরিশৃঙ্গের উজ্জ্বল দৃশ্যটি আমি কোনোদিনও ভুলবো কি না কে জানে।

তাছাড়া, ব্যাঙ্কস আরও বললে, এখানে শিবির ফেলে আমরা অন্যদিক থেকেও ভালো করেছি, মোক্লের। রাস্তাটা এখানে পাহাড়ের গায়ে দুটো ভাগ হয়ে গেছে-পুবে আর পশ্চিমে। আর তারই ফলে আশপাশের ছোটো-ছোটো পাহাড়ি গ্রামগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে আমাদের মোটেই বেগ পেতে হবে না। সবচেয়ে কাছের গ্রামটা আমাদের স্টীম হাউস থেকে মাত্র মাইল পাঁচেক দূরে। এখানকার পাহাড়ি মানুষেরা বেশ অতিথিবৎসল-ছাগল আর ভেড়া পোষে, শটি আর গম ফলায়-প্রয়োজন হলে অনায়াসেই আমরা তাদের সাহায্য নিতে পারবো।

বেহেমথ যেখানটায় আস্তানা গেড়েছে, সেটা একটা মালভূমিমাইল খানেক লম্বা আর আধমাইলটাক চওড়া। ছোটো-ছোটো ঘন মখমলের মতো ঘাসেভরা জায়গাটা; কোথাও কোথাও ভায়োলেট ফুটে আছে, কোথাও-বা রডোডেনড্রনের গুচ্ছ; ফুটেছে ক্যামেলিয়াও; আর কোথাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা ওকগাছ। এই সুন্দর বাগানটার পরিকল্পনা করার জন্য প্রকৃতি-ঠাকরুনকে স্মার্না কি ইস্পাহানের মালি ডাকতে হয়নি : বরং দখিনা হাওয়ায় উড়ে এসেছে কিছু বীজ, আর এই উর্বর ভূমিতে ঝরেছে কিছু রোদ-বৃষ্টি–আর সব মিলিয়ে আপনা থেকেই যেন তৈরি হয়েছে এই সুন্দর ভূদৃশ্য।

একপাশে চলে গেছে ঘন বন—প্রায় আঠারো হাজার ফুট অব্দি উঠে গেছে এই নিবিড় বনানী। ওক, সিডার, বীচ, মেপল গাছের সঙ্গেই কোথাও সহাবস্থান করছে বেণুবন, কোথাও-বা কলাগাছের ঝাড়, জাপানি ড়ুমুর গাছ। এ-রকমই একটা ছোট্ট শাখাঝোঁপের ছায়ায় বেহেমথ জিরিয়ে নেবে কয়েক সপ্তাহ-তার সঙ্গে-সঙ্গে আমরাও।

মঁসিয় পারাজারের খানাঘর থেকে সুগন্ধি ধোঁয়া ওঠে কুণ্ডলী পাকিয়ে, আমরা চলন্ত বাড়ির বারান্দায় বসে-বসে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বোদ পোহাই আর জমাট আড্ডা দিই, মাঝে-মাঝে ধবলগিরির গগনভেদী চুড়ো চোখে পড়ে, যখন হাওয়া এসে নিচু ভারি ঝোলামেঘ আর কুয়াশা সরিয়ে দেয়।

এইভাবেই ধবলগিরিতে আমাদের ছুটি শুরু হলো।

+

২৬শে জুন সকালবেলায় আমার ঘুম ভাঙলো ক্যাপ্টেন হুড আর ফক্সের জ্যান্ত সংলাপ শুনে—খাবার ঘরে বসে তারা শশব্যস্ত ও উত্তেজিত আলোচনায় মগ্ন ছিলো। আমিও গিয়ে তাদের বৈঠকে যোগদান করলুম। ব্যাঙ্কসও তার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তক্ষুনি সে-ঘরে ঢুকলো। তাকে দেখেই হুড বলে উঠলো : কী-হে ব্যাঙ্কস, তাহলে এখানে আর নেহাৎ দু-এক ঘণ্টার বিশ্রাম নয়—আস্ত কয়েকটি মাস কাটাতে হবে আমাদের?

ঠিকই বলেছো, হড, চেয়ার টেনে বসতে-বসতে ব্যাঙ্কস জবাব দিলে, এবার ইচ্ছে-করলে তোমরা শিকারে বেরুতে পারো—বেহেমথের বাঁশি শুনে তোমাদের আর তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসতে হবে না।

শুনলে তো, ফক্স?

শুনলুম, ক্যাপ্টেন, ফক্স জানালে।

হুড বললে, এই তোমাদের বলে রাখছি, ব্যাঙ্কস, আমার ওই পঞ্চাশ নম্বরটাকে ঘায়েল না-করে এই ধবলগিরি থেকে আমি আর নড়ছি না। পঞ্চাশ নম্বরটাকে চাই, ফক্স, চাই-ই। আমি ঠিক জানি হতভাগাকে ঘায়েল করা তেমন সহজ কর্ম হবে না।

তবু ঘায়েল তাকে করবোই আমরা, ফক্স বিনীতভাবে জানিয়ে দিলে।

আমি জিগেস করলুম, কী করে বুঝলে যে তাকে ঘায়েল করা তেমন সহজ হবে?

নেহাৎই আমার ধারণা, মোক্লের, তার বেশি কিছু নয়। শিকারিদের মাথায় মাঝেমাঝে আগে থেকেই অমন ধারণা ঢুকে বসে।

তাহলে তুমি আজ থেকেই বুঝি, ব্যাঙ্কস জিগেস করলে, শিকারে বেরুবার মৎলব আটছো?

আজ থেকেই শিকারের যাবতীয় শুলুক-সন্ধান নিতে হবে–তরাইয়ের জঙ্গলে গিয়ে ঢুকতে হবে ময়না তদন্ত করতে। আগে তো গিয়ে দেখতে হবে বাঘেরা আমার আগমনবার্তায় ডেরা ছেড়ে পালিয়েছে কি না?

শোনো, কথা শোনো, কী অহংকার!

অহংকার নয়—আমার দুর্ভাগ্যের কথা বলছি!

দুর্ভাগ্য। হিমালয়ের জঙ্গলে? তাও কি সম্ভব? জিগেস করলে ব্যাঙ্কস।

দেখাই যাবে শিগগিরই! হুড আমার দিকে ফিরলো! তুমিও সঙ্গে যাবে তো, মোক্লের?

নিশ্চয়ই যাবো।

আর তুমি, ব্যাঙ্কস?।

আমিও যাবো, বললে ব্যাঙ্কস, আর আমার মনে হয় মানরোও সঙ্গে যেতে চাইবেন—অবশ্য আমার মতো, অ্যামেচার হিশেবে, পেশাদার শিকারি হিশেবে নয়!

তা অ্যামেচার হিশেবে আসতে চাও আপত্তি নেই, তবে সঙ্গে গুলিভরা রাইফেল রেখো। ছড়ি ঘোরাতে-ঘোরাতে শৌখিন ফুলবাবুটির মতো জঙ্গলে যাবার মানে হয় না।–লজ্জায়-অপমানে সব জন্তুই শেষটায় মুখ লুকোবে।

তা-ই হবে তাহলে, ব্যাঙ্কস সম্মতি জানালে।

এবারে কিন্তু, ফক্স, দেখো, কোনো ভুল যেন না-হয়। খেয়াল রেখো। আমরা কিন্তু এবার বাঘের তল্লাটে। কর্নেল, ব্যাঙ্কস, মঁসিয় মোক্রের আর আমার জন্যে চারটে এনফিল্ড রাইফেল, তোমার আর গৌমির জন্যে দুটো বুলেটভরা বন্দুক!

ভয় নেই, ক্যাপ্টেন, ফক্স তাকে আশ্বাস দিলে, বাঘেরা নালিশ করার কোনো সময় বা কারণই পাবে না, এটাই আপনাকে জানিয়ে রাখছি!

বেলা এগারোটা নাগাদ, অতএব, আমরা দু-জনে যথাবিধি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জঙ্গলের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লুম; কুকুর দুটোকে সঙ্গে নেয়া হলো না—কারণ এ-ধরনের শিকারে কুকুরেরা কোনো কাজেই লাগে না। স্টর, কালু আর মঁসিয় পারাজারকে নিয়ে সার্জেন্ট ম্যাক-নীল বেহেমথেই থেকে গেলো—সব গোছগাছ করার জন্যে। তাছাড়া এই দু-মাস একটানা চলবার পর বেহেমথের কলকজা সাফসুফ করে রাখা দরকার। কোথাও কিছু বিকল হয়ে গেছে কিনা, পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সেজন্যে অবিশ্যি, বলাই বাহুল্য, অনেক সময় লাগবে, কারণ ভালো করে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখাই ভালো। আর সে-কাজে স্টর ও কালুর সাহায্য প্রতি মুহূর্তেই কাজে লাগবে।

বৃষ্টিবাদল নেই, পরিষ্কার উজ্জ্বল দিন। পাহাড়ি পথ, পাকদণ্ডী বেয়ে ঘুরে-ঘুরে নেমে গেছে জঙ্গলের দিকে। আমাদের অবিশ্যি হাঁটতে ভালোই লাগলো, যদিও সত্যিকার জঙ্গলে গিয়ে ঢুকতে সময় লাগলো পাক্কা দেড় ঘণ্টা!

জঙ্গলে ঢোকবার আগে হুড আমাদের সবাইকে সম্বােধন করে ছোটোখাটো একটা বক্তৃতাই দিয়ে ফেললে। যেহেতু আমরা এখন হিংস্র জন্তুর ডেরায় হানা দিতে যাচ্ছি। সেইজন্যে আমাদের একটু সাবধান থাকা উচিত-বাঘ মারতে গিয়ে শেষটায় বাঘেরই শিকার হয়ে-যাওয়াটা তেমন উপভোগ্য ঠেকবে না বলেই নাকি তার মনে হয়। সেইজন্যে—হুডের সুচিন্তিত পরামর্শ—আমরা যেন কিছুতেই দলছাড়া হয়ে না-যাই–আর, সর্বোপরি, মাথা ঠাণ্ডা রাখি যেন সবসময়।

তার মতো একজন জাঁদরেল শিকারির মুখ থেকে এই উপদেশ শুনে আমরা যথোচিত সতর্কহলুম। বন্দুকে গুলি ভরা হলো, চোখ-কান রইলো খোলা ও স্পর্শাতুর, এবং ভারতীয় জঙ্গলের ভয়াবহ সর্পকুলও যাতে আমাদের পদচুম্বন না-করে, সেইজনে, আরো-একডিগ্রি সাবধান হলুম!

সাড়ে-বারোটার পর আমরা বেশ গভীর জঙ্গলেই প্রবেশ করলুম! কাঠুরেদের পায়ে-চলার-পথ দিয়ে যাচ্ছি আমরা, সাবধানে, নিবিষ্টভাবে। ঝোপঝাড়ে কোনো টু-শব্দ হলেই বন্দুক উঁচিয়ে ধরছি, ঝোপঝাড় ও ডালপালাগুলোকে অবলোকন করছি সন্দেহের দৃষ্টিতে : কোথায় কোনখানে কোন বেশে জঙ্গলের আচম্বিত জান্তব মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে, কে জানে। মাঝে-মাঝে নিচু হয়ে মাটিতে জীবজন্তুর পায়ের দাগ দেখে বুঝছি যে ক্যাপ্টেন হুডের আশঙ্কা অমূলক—তার আগমনবার্তায় তরাইয়ের হিংস্র জন্তুরা আদপেই ডেরা ছেড়ে পালিয়ে যায়নি।

হঠাৎ হুডের মুখ থেকে একটা অস্ফুট চীৎকার শুনে আমরা সবাই স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে গেলুম। তাকিয়ে দেখি, সামনেই প্রায় কুড়ি-পা দূরে একটি অদ্ভুত গড়ন। কোনো বাড়ি নয়–কারণ তার না-আছে কোনো চিমনি, না-আছে কোনো জানলা। কোনো শিকারির ডেরাও নয়, কারণ তাতে কোনো ফোকর বা গবাক্ষ কিছুই নেই। বরং পাহাড়ি-কোনো মানুষের সমাধিই হবে হয়তো এটা–জঙ্গলের গভীরে এখন হারিয়ে গেছে। লম্বা একটা চুরুটের মত আকার, পাশাপাশি গাছের ডাল বসিয়ে তৈরি-করা, মাটিতে শক্ত করে বসানো, মোটা-মোটা লতা দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা। গাছের ডাল পেতেই ছাত হয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যায়, এটা যে বানিয়েছিলো, সে ব্যাপারটাকে মজবুত করার জন্যে কোনোকিছু করতেই বাদ রাখেনি। ছ-ফিট উঁচু, বারো ফিট লম্বা আর পাঁচ ফিট চওড়া একটা ব্যাপার—কোনো দরজা চোখে পড়লো না; হয়তো একটা দরজা ছিলো, কোনো দূরঅতীতে, কিন্তু এখন মোটা গাছের গুড়িতে ঢাকা পড়ে গেছে। একদিকে একটা লিভার রয়েছে, সেই লিভারটাই ছাতের উপরকার কয়েকটা লম্বা ডালকে টেনে রেখেছে, যেভাবে লিভারের সঙ্গে এগুলো বাধা রয়েছে, তাতে লিভারের ভারসাম্য একটু এদিকওদিক হলেই ডালগুলো নিচে নেমে এসে ছাতের দিকটা পুরোপুরি আটকে দেবে।

আশ্চর্য তো! কী এটা? আমি জিগেস করলুম।

ব্যাঙ্কস ভালো করে সরেজমিন তদন্ত করলে, ঠোঁট বেঁকিয়ে বললে, কী আবার–নেহাৎই একটা ইঁদুরধরা ফাঁদ। অবশ্য ইঁদুরটা আসলে কী, সেটা অনুমান করার ভার তোমাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি।

বাঘ ধরার ফাঁদ নাকি? হুড জিগেস করলে।

হ্যাঁ, ব্যাঙ্কস বললে, বাঘ-ধরা–ফাঁদ। ওই-যে গাছের গুড়িটা দিয়ে দরজাটা আটকানো দেখছো, গুড়িটা আসলে ছাতের ওই ডালগুলো দিয়ে শুন্যে উঠে ঝুলছিলো–ভিতরে কোনো জন্তু ঢুকতেই তার ভারে আপনা থেকেই সেটা নিচে নেমে এসেছে!

এই প্রথম, হুড বললে, ভারতবর্ষের জঙ্গলে আমি এ-রকম কোনো ফাঁদ দেখলুম! ইঁদুর-ধরা-ফাঁদ-হুম কিন্তু এ-সব-ফাঁদ-টাদ আসলি শিকারিদের যোগ্য নয় মোটেই।

বাঘেরও সম্মান তাতে নষ্ট, ফকু যোগ করলে।

সে-কথা মানি, বললে ব্যাঙ্কস, তবে যখন এ-সব হিংস্র জন্তুকে শেষ করে ফেলাটাই সবচেয়ে জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়ায়-ফুর্তি বা আমাদের জন্যে শিকার নয়, কোনো হিংস্র জন্তুদের ধ্বংস করাটাই যখন বাধ্যতায় পরিণত হয়, তখন যেনতেন প্রকারেণ কাজ হাশিল করাই তো ভালো-তাছাড়া ফাঁদ পেতে ধরলে সংখ্যাতেও বেশি পাওয়া যায়। এই ফাঁদটা আমাকে কিন্তু খুবই আকৃষ্ট করছে—অত্যন্ত চতুর-কোনো লোকের কাজ এটা, সাধারণ মানুষের বুদ্ধিতে এতটা কুলোত না। এমন আশ্চর্য উদ্ভাবনী শক্তি সচরাচর দেখা যায় না।

এতক্ষণে কর্নেল মানরো কথা বললেন, আমি একটা কথা বলবো? গাছের গুড়িটা নেমে পড়ে দরজাটা যখন বন্ধ করে দিয়েছে, তখন ভিতরের ভারসাম্যটা কোনো কারণে নিশ্চয়ই নষ্ট হয়েছে। সম্ভবত আচমকা কোনো বুনো জন্তু ঢুকেছিলো ভিতরে, আর তাতেই ফাঁদের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে।

সেটা আমরা এক্ষুনি জানতে পারবো, বললে হুড। আর ভিতরের ইঁদুরটা যদি এখনও জ্যান্ত থাকে— বলেই হুড বন্দুক তুলে বন্দুকের ঘোড়ায় আঙুল ছোঁয়ালে। দেখাদেখি আমরাও সে-দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলুম।

ক্যাপ্টেন হুড, ফক্স আর গৌমি প্রথমে ফাঁদটার চারপাশে ঘুরে দেখলে কোথাও এতটুকু ফুটো চোখে পড়ে কি না। ভিতরটায় কী আছে, একবার যদি কোনোরকমে বাইরে থেকে দেখা যেতো!

কিন্তু কোথাও চুলমাত্র ফঁক দেখা গেলো না।

তখন উৎকর্ণ হয়ে তারা শোনবার চেষ্টা করলে ভিতর থেকে কোনো আওয়াজ আসে কি না। কিন্তু সব কী-রকম যেন গোরস্থানের মতো নিঃঝুম ও স্তব্ধ। ভারি অস্বস্তিকর।

তখন আবার সামনে এসে গাছের গুড়িটা তারা পরীক্ষা করলে। দুটো মোটা লতা আকড়ে ধরে আছে গুড়িটা-লিভারটায় চাপ দিয়ে ওটাকে শুন্যে তুললেই ফাদের দরজা খুলে যাবে।

টু-শব্দটিও তো শুনলুম না—এমনকী নিশ্বেসের শব্দ অব্দি না, দরজায় কান লাগিয়ে হুড শোনবার চেষ্টা করলে, ফাঁদটা নিশ্চয়ই ফাঁকাই পড়ে আছে।

ফাঁকা হলেও সাবধানের মার নেই, কর্নেল মানরো বাঁদিকটায় একটা গাছের গুড়ির উপর বসে পড়লেন। আমি গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালুম।

হুড তখন গৌমিকে ডাক দিলে ডাক শুনেই গৌমি বুঝে নিলে তাকে কী করতে হবে। একলাফে সে গিয়ে হাতে উঠে পড়লো, তারপর সেই লিভারটার কাছে গিয়ে আস্তে সেটাকে আঁকড়ে ধরলে—অমনি তার ভারে চট করে গাছের গুড়িটা শূন্যে উঠে গেলো, আর গৌমি লিভারটা আঁকড়ে ধরে ঝুলতে লাগলো।

যতটা ফাঁক হলো তাতে যে-কোনো মস্ত জন্তুও অনায়াসেই বেরিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু ছোটো-বড়ো কোনো জন্তুরই কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। হয়তো আমাদের কথাবার্তা ও ফাঁদের ডালপালার আওয়াজে বন্দী জানোয়ারটি ফাঁদের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে ঘাপটি মেরে আছে—হয়তো সুযোগ বুঝে লাফিয়ে বেরুবে হঠাৎ দুম করে–আর চট করে জঙ্গলে মিলিয়ে যাবে।

উত্তেজনায় আমার বুকের মধ্যেটা যেন কেমন করতে লাগলো।

হঠাৎ দেখি, ক্যাপ্টেন হুড বন্দুকের ঘোড়ায় আঙুল চেপে ফাঁদের দরজার কাছে গিয়ে ভিতরটা দেখবার চেষ্টা করছে। বনের ডালপালার আড়াল দিয়ে আলো এসে পড়েছে দরজার সামনে, ভিতরে কী আছে দেখতে কোনো অসুবিধেই হবার কথা নয়।

হঠাৎ শুনতে পেলুম ভিতরে অস্পষ্ট একটু খশখশে শব্দ হলো, তারপরেই ঘোঁৎ করে একটা গর্জন—সব যেন কেমন সন্দেহজনক। বোধহয় ভিতরে কোনো জানোয়ার ঘুমুচ্ছিলো, এখন পাশ ফিরে শব্দ করে হাই তুলছে।

হুড আরো এক-পা এগিয়ে গেলো; ভিতরে কালো-মতো কী-একটা যেন নড়ে উঠলো, বন্দুকটা তার দিকেই তাগ-করা। হঠাৎ এমন সময় কে যেন ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, তার পরেই স্পষ্ট ও চমৎকার ইংরেজিতে কে যেন বলে উঠলো : গুলি করবেন না! দোহাই ভগবানের, গুলি করবেন না। বলতে-বলতে ভিতর থেকে কে-একজন বেরিয়ে এলো।

আমরা এতটাই অবাক হয়ে গিয়েছিলুম যে গৌমি লিভার ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে নামলো নিচে, অমনি ধপ করে গাছের গুড়িটা আবার মাটিতে পড়ে ফাঁদের দরজাটা বন্ধ করে দিলে।

ততক্ষণে সেই অপ্রত্যাশিত মানুষটি হুডের দিকে এগিয়ে গেছেন, স্পষ্ট স্বরে বলছেন, দয়া করে বন্দুকটা একটু নামাবেন, আমি বাঘ নই—আপনাকে বাঘের সঙ্গে বোঝাঁপড়া করতে হবে না।

একটু ইতস্তত করে হুড বন্দুকটা নামিয়ে নিলে।

ব্যাঙ্কস এগিয়ে এলো এবার। কার সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য পেলুম জানতে পারি কি?

প্রকৃতিবিজ্ঞানী মাতিয়াস ফান খোইত-লণ্ডনের মিস্টার চার্লস রাইস আর হামবুর্গের হের হাগেনবেকের জন্যে পাচিডেরমাট, টার্ডিগ্রেডস, প্ল্যাণ্টিগ্রেডস, প্রােবোস্কিড়েট ও কার্নিভোরা যোগাড় করতে বেরিয়েছি। তারপর হাত নেড়ে আমাদের দেখিয়ে বললেন : এঁরা?

কর্নেল মানরো ও তার বন্ধুবান্ধব, বললে ব্যাঙ্কস।

হিমালয়ের জঙ্গলে বেড়াতে বেরিয়েছেন? ফান খোইত বললেন, সত্যি, ভারি সুন্দর জঙ্গল।  ……আপনারা আমার নমস্কার নেবেন?

কে এই অদ্ভুত মানুষটি? মাথায় কিছু পোকা আছে বোধহয়—নয়তো এভাবে বাঘের ফাঁদে বন্দী থেকেই ঘিলু নিশ্চয়ই ভেস্তিয়ে গেছে।

মাতিয়াস ফান খোইতের বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি; চোখে পুরু চশমা, তার আড়ালে চোখের তারা ঝিকমিক করছে, মসৃণ মুখ, একটু উন্নাসিক, প্রতিমুহূর্তেই অস্থির হয়ে আছেন, অঙ্গভঙ্গিসহকারে এমনভাবে কথা বলেন যে মনে হয় মফস্বলের রঙ্গমঞ্চের কোনো কৌতুক অভিনেতাই বুঝি-বা হবেন। চোখে-মুখে কথা বলেন, প্রতিমুহূর্তে ভঙ্গি করেন নাটকীয়, মাথাটার অন্তঃস্থলে কিছু আছে কিনা জানি না—তবে সবসময়েই মাথাটা একটু কাৎ করে আছেন।

পরে অবিশ্যি আমরা তারই মুখ থেকে জানতে পেলুম যে তিনি আগে টারডাম সংগ্রহশালায় প্রকৃতিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন, কিন্তু শিক্ষকতায় তেমন উন্নতি করেননি। নিশ্চয়ই ছাত্রেরা ক্লাসে তার ভাবভঙ্গি দেখে হাস্যরোল বন্ধ করতে পারতো না; তারা যে তার ক্লাসে ভিড় করে আসতো, তা নিশ্চয়ই জ্ঞানস্পৃহাবশত নয় বরং কিঞ্চিৎ মজা করে নেবার জন্যে। শেষটায় জীববিদ্যার অধ্যাপনা ছেড়ে তিনি ঈস্ট ইণ্ডিজে পশুশালায় কর্ম নিলেন—দেখা গেলো তত্ত্বকথা বলার চেয়ে পশু সংগ্রহেই তিনি অধিকতর পারঙ্গম। ক্রমে তিনি লণ্ডন ও হামবুর্গের দুটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পশু সংগ্রহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়লেন। এখন তিনি তরাইতে এসেছেন ইওরোপ থেকে মস্ত একটা অর্ডার পেয়ে—অনেক জন্তু ধরে নিয়ে যেতে হবে তাকে। যেখানে তিনি ছাউনি ফেলেছেন, সে-জায়গাটা এই ফাঁদ থেকে মাইল দু-এক মাত্র দূরে।

অল্পক্ষণের মধ্যেই মাতিয়াস ফান খোইতের জীবনচরিত আমাদের জানা হয়ে গেলো, কিন্তু তবু সেই রহস্য কিছুতেই ভেদ হলো না তিনি কেমন করে ওই ফাঁদের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। শেষটায় ব্যাঙ্কস এ-বিষয়ে তাকে সরাসরি জিগেস করে বসলো। জানা গেলো, কাল বিকেলে তিনি তার কাল থেকে এই ফাঁদটা দেখতে এসেছিলেন—সঙ্গে অবশ্য ভৃত্যেরা ছিলো কিন্তু তারা অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলো বলে তিনি একাই এই ফঁদটার মধ্যে ঢুকে পড়েন। ঢুকেছিলেন লিভারটা কাজ করছে কিনা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য। ঢোকবামাত্র হঠাৎ কেমন করে যেন তার হাত লেগে দড়িটা ঢিলে হয়ে যায় আর তিনি আবিষ্কার করেন যে তিনি নিজের ফাদে নিজেই বন্দী হয়ে গেছেন; এবং উদ্ধার পাবার উপস্থিত কোনো আশাই আর নেই।

এতখানি বলে মাতিয়াস ফান খোইত একটু থামলেন-বোধহয় অবস্থার গুরুত্বটা বোঝবার সময় দিলেন আমাদের। তারপর আবার শুরু করলেন, একবার বুঝুন ব্যাপারটা-মস্ত একটা ঠাট্টা নয় কি? প্রথমটায় এই হাসির দিকটাই আমার চোখে পড়লো : নিজের ফাঁদে নিজে বন্দী! ভেবেছিলুম, আমার অনুচরেরা ক্রাল*-এ ফিরে গিয়ে আমাকে না-দেখতে পেয়ে খোঁজ নিতে বেরুবে–মুক্তি পেতে বেশি দেরি হবে না। কিন্তু সন্ধে হয়ে গেলো, রাত হয়ে গেলো-তবু তাদের কোনো পাত্তাই নেই। শেষটায় তাদের জন্যে বসে থেকে-থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েই পড়লুম। হঠাৎ কীসের শব্দ শুনে ধড়মড় করে জেগে উঠে দেখি দরজা খোলা, ভিতরে আলো, এবং আমার বুক লক্ষ্য করে বন্দুক তোলা! আরেকটু হলেই অকালেই অক্কা পেতুম আর-কি! মুক্তির মুহূর্ত আর মৃত্যুর মুহূর্ত এক হয়ে যেতো। কিন্তু শেষটায় ক্যাপ্টেন যখন দেখলেন যে আমিও হোমো সাপিয়েনের একজন, তখন বন্দুক নামালেন। তা আপনাদের আবারও ধন্যবাদ জানাই—আমাকে মুক্তি দেবার জন্যে।

তাহলে আপনিও তরাইয়ের এদিকটায় ছাউনি ফেলেছেন? ব্যাঙ্কস জিগেস করলে।

হ্যাঁ, বললেন মাতিয়াস ফান খোইত। আগেই বোধহয় আপনাদের বলেছি যে আমার ক্রালটা এখান থেকে মাত্র মাইল দু-এক দূরে; আপনারা অনুগ্রহ করে সেখানে পদধূলি দিলে আমি যথার্থই কৃতার্থ হব।

নিশ্চয়ই, মিস্টার ফান খোইত, বললেন কর্নেল মানরো, আমরা গিয়ে আপনার ক্রাল দেখে আসবো।

শিকার করতে বেরিয়েছি আমরা, হুড তাকে জানালেন, কাজেই ক্রাল-এ আপনি কী ব্যবস্থা করেছেন, দেখলে নিশ্চয়ই অনেককিছু শিখতে পারবো।

শিকারে বেরিয়েছেন? মাতিয়াস ফান খোইত চেঁচিয়ে উঠলেন, শিকারি? বুনো জানোয়ার খুঁজে বার করেন—সে শুধু তাদের মারবার জন্যে?

হ্যাঁ, মারবার জন্যে,–উত্তর দিলে হুড।

আপনি তাদের মারেন, আর আমি তাদের ধরি, গর্বের স্বরে বললেন ফান খোইত।

তা আর কী করবেন? আমাদের দু জনের দেখবার ধরন আলাদা, বললে হুড।

ফান খোইত অসহিষ্ণুভাবে মাথা ঝাঁকালেন কেবল। কিন্তু আমরা শিকার করতে বেরিয়েছি জেনেও তিনি তার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নিলেন না। তাহলে চলুন, ক্রাল-এর দিকেই এগুনো যাক।

কিন্তু তার মুখের কথা মেলাবার আগেই দূরে কাদের যেন গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো। একটু পরেই গাছপালার আড়াল থেকে উঁকি দিলে জনা ছয়েক স্থানীয় লোক।

এই-যে—এরাই আমার অনুচর, বললেন ফান খাইত, তারপর আমাদের গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে মুখে আঙুল দিয়ে নিচু গলায় বললেন, কিন্তু আমার ওই দুর্দশার কথা ওদের বলবেন না। আমি যে নিজের ফাদেই নিজে গ্রেপ্তার হয়ে গিয়েছিলুম, তা যেন তারা ঘুণাক্ষরেও জানতে না-পারে। তাহলে ওদের চোখে আমি হয়তো অনেকটাই খাটো হয়ে যাবো।

আমরা ইঙ্গিতে তাকে আশ্বস্ত করায় তবে তিনি শান্ত হলেন।

ইতিমধ্যে তার অনুচরদের মধ্য থেকে একজন চটপটে ও চালাক লোক এগিয়ে এলো। হুজুর, আমরা আপনাকে একঘণ্টারও বেশি সময় খুঁজে বেড়াচ্ছি…

আমি এই ভদ্রলোকদের সঙ্গে কথা বলছিলুম শোনো, এঁরা আমাদের ক্রাল দেখতে যেতে চাচ্ছেন—কিন্তু ক্রাল-এ ফেরবার আগে ফাঁদটাকে ঠিকঠাক করে দাও তো।

অনুচরেরা তৎক্ষণাৎ ফাঁদটাকে ঠিকঠাক করতে লেগে গেলো। আমরাও ততক্ষণে ফাদের ভিতরটা একবার ভালো করে অবলোকন করে এলুম।

সত্যি, ভারি কৌশলী ফাঁদটা। এমনকী হুড শুক্কু প্রশংসা না-করে পারলে না। আর তার প্রশংসা শুনেই ফান খোইত পুনর্বার বললেন, আপনি তো দুম করে গুলি ছুঁড়েই খালাশ–মেরে ফেললেই ল্যাঠা চুকে গেলো। আমাকে কিন্তু জ্যান্ত ও অক্ষত অবস্থায় এদের পাকড়াতে হয়।

তা তো বটেই—আমাদের দুজনের দেখবার ভঙ্গিটাই আলাদা, আবারও বললে হুড়।

আমারটাই বোধকরি আদর্শ উপায়। অন্তত জন্তুদের যদি একবার জিগেস করে দ্যাখেন

ফান খোইতের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে হুড বললে, আমার অবিশ্যি সে-ইচ্ছে আদৌ নেই।

বুঝলুম, ফান খোইত আর ক্যাপ্টেন ইডের মধ্যে অহরহ এ-রকম কথা কাটাকাটি হতে থাকবে। তক্ষুনি হয়তো দুজনের মধ্যে একটা ছোটোখাটো তর্ক বাধতো, কিন্তু হঠাৎ বাইরে একটা প্রবল শোরগোল উঠলো। হুড়মুড় করে আমরা বেরিয়ে এলুম।

বাইরে এসে দেখি, কর্নেলের পায়ের কাছে একটা ভীষণ বিষাক্ত সাপ দু-টুকরো হয়ে পড়ে আছে, আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি লোক, তার হাতে একটা গাছের ডাল। লোকটা আর কেউ নয়, ফান খোইতের সেই সপ্রতিভ ও বুদ্ধিমান অনুচরটি। সে যদি হাতের ডালটা দিয়ে নামারতো তাহলে সার এডওয়ার্ড এতক্ষণে সর্পাঘাতেই মরতেন। ভিতর থেকে আমরা যে-চীৎকার শুনেছিলুম, তা ফান খোইতের আরেকজন অনুচরের। মাটিতে পড়ে সে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে, কারণ আহত সাপটা সামনেই তাকে পেয়ে তক্ষুনি তাকে ছুবলে দিয়েছে।

কর্নেল মানরোর কাছে ছুটে গেলুম আমরা।

আপনার লাগেনি তো?

না, আমার কিছু হয়নি, বললেন সার এডওয়ার্ড। তারপর সেই ভারতীয়টির দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনি বললেন, তোমাকে আমি ধন্যবাদ জানাই।

ভারতীয়টি ইঙ্গিতে জানালে যে সে ও-সব ধন্যবাদ-টন্যবাদের কোনো ধার ধারে।

কী নাম তোমার? জিগেস করলেন কর্নেল মানরো।

সেই হিন্দুটি উত্তর দিলো, কালোগনি।

———-

*ক্রাল একটা ওলন্দাজ শব্দ, তার মানে ছোট্ট গ্রাম। বিশেষ করে ওলন্দাজ আফ্রিকার ছোট্ট বসতিকেই হ্যাঁল বলে অভিহিত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *