২৩. বেলুনের সব গ্যাসই ফুরিয়ে গেলো

কেননা বেলুনের সব গ্যাসই ফুরিয়ে গেলো একটু পরে। হু-হু করে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে নেমে পড়লো ভিক্টোরিয়া। ছোটো বলের মতো বারেবারে ধাক্কা খেয়ে কয়েকবার ওঠা-নামা করতে-করতে কিছুদূর এগিয়ে গেলো। মস্ত একটি বাওবাব গাছ দাঁড়িয়ে ছিলো একদিকে, শেষটায় তার মগডালে ঠেকে গেলো বেলুন, তার জাল আটকে গেলো তার ডালে, আর তক্ষুনি একেবারে গতিহীন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।

তবে আর কোনো আশাই নেই! নিশ্বাস ছেড়ে বললেন কেনেডি। সব শেষ হয়ে গেলো।

আর ঠাট্টাটা দ্যাখো একবার! তা কিনা হলো নদীর একশো গজের মধ্যে এসে!

হতভাগ্য অভিযাত্রীরা বেলুনের জাল থেকে নিচে নেমে এলেন। চটপট নদীর দিকে যেতে হবে এবার। মস্ত এক জলপ্রপাতের একটানা আছড়ে পড়ার শব্দে জায়গাটা মুখর হয়ে আছে।

আশপাশে কোনো নৌকো বা জনমানবের চিহ্ন মাত্রও নেই। নদী এখানে প্রায় দু-হাজার ফিট চওড়া, প্রায় দেড়শো ফিট উঁচু থেকে হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে প্রপাতের মতো নেমে এসেছে। জল শুধু তুলকালাম ফেনা ছিটোচ্ছে আর তার ভীষণ গজরানিতে গোটা এলাকাটা ভরে আছে, মাঝে-মাঝে মস্ত সব পাথরের টুকরো চোখা থ্যাবড়া নানারকম কিম্ভুতকিমাকার অদ্ভুত আকার নিয়ে জলস্রোতের ভিতর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সাঁৎরে নদী পেরুবার চেষ্টা করার অন্য নামই হলো সাধ করে মৃত্যুর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া। দেখেই কেনেডি একেবারে হতাশ হয়ে পড়লেন। তার আর কোনো উদ্যমই রইলো না, যেন গোটা দৃশ্যটা তার মনের ভিতর এক বিচ্ছিরি হত্যুশে ভাব ছড়িয়ে দিয়ে তার সব উৎসাহকে বিকল করে দিয়ে গেছে। ফার্গুসনেরও যে খুব-একটা আশা হচ্ছিলো, তা নয়; তবু মুখে অন্তত তিনি বন্ধুকে ভরসা দিলেন। একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ছিলো তার; যতই বিপদের মুখে পড়তেন, ততই যেন তার মাথা ঠাণ্ডা হয়ে উদ্ধারের ফন্দিগুলো আটতে শুরু করে দিতে। বিপদ যেন তার বুদ্ধিকে শানিয়ে-শানিয়ে তীক্ষ্ণ ও ধারালো করে তুলতে। কতগুলো শুকনো ঘাসের দিকে চোখ পড়তেই তার মুখ আশায় ঝলমল করে উঠলো। হঠাৎ কে যেন একটানে তার মনের ভেতরে পর্দা তুলে দিলো, আর সবগুলো জট নিখুঁতভাবে খুলে গিয়ে একটি ভীষণ ধাঁধার সমাধান হয়ে গেলো যেন মনের ভেতর : নিটোল একটি পরিকল্পনা জেগে উঠলো তার মনে। সবাইকে নিয়ে ফের বেলুনের কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। বললেন, আমরা বোধহয় ঐ দস্যুদের চেয়ে ঘণ্টাখানেকের পথ এগিয়ে আছি, কাজেই আর-একটুও সময় নষ্ট না করে এক্ষুনি কাজে লেগে যেতে হবে। যত পারো শুকনো ঘাস এনে। জড়ো করো। নিনে একশো পাউণ্ড শুকনো ঘাস আমার দরকার।

কেন? তা দিয়ে হঠাৎ আবার কী হবে?

আমাদের বেলুনে তো আর গ্যাস নেই! কাজেই হালকা গরম হাওয়ার সাহায্যে বেলুন ফুলিয়ে আমরা নদী পেরুবো।

পরিকল্পনাটি শুনেই কেনেডির মুখে খুশির আভা ফুটে উঠলো। আবারও একবার বন্ধুর বুদ্ধি এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে রীতিমতো চমৎকৃত হয়ে গেলেন তিনি; শতমুখে প্রশংসা করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো তার।

প্রচুর পরিমাণে শুকনো ঘাস এনে বাওবার গাছের তলায় স্কুপ করে রাখা হলো। বেলুনের মুখটা যথাসম্ভব বড়ো করে ফাঁক করে ধরা হলো—যাতে বাকি গ্যাসটুকু বেরিয়ে যায়, তারপর সেই মুখের তলায় ঘাসের প রেখে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একশো আশি ডিগ্রি আঁচে হাওয়া গরম হয়ে গিয়ে বেলুনের ভিতর প্রবেশ করে ভেতরকার আটকে-পড়া বাতাসকে হালকা করে তুললো, ক্রমেক্রমে তার গোল চেহারা ফিরে পেলে ভিক্টরিয়া। ঘাস আর আগুনের অপ্রতুলতা ছিলো না, কাজেই বেলুন এবার দুলে-দুলে ওপর দিকে ওঠবার জন্যে তৈরি হলো।

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, প্রখর কিরণ ছড়িয়ে দিচ্ছে মধ্যদিনের রাগি সূর্য, ঘামে তাপে পরিশ্রমে অভিযাত্রীরা তখন শ্রান্ত, এমন সময়ে উত্তর দিকে, বেশ দূরে, সেই দস্যুদলকে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে দেখা গেলো। তাদের ঘোড়ার খুরের একটানা খটখট আওয়াজ আর বিকট গলার ভীষণ শোরগোল ক্রমশই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠলো। তখনও আগুন জ্বলছে ঘাসের স্কুপে, কেঁপে-কেঁপে লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠছে স্বচ্ছ শিখা, এত স্বচ্ছ যে চোখে তাদের দেখা যায় না, কেবল দেখা যায় তাপের একটা স্রোত ঢেউয়েঢেউয়ে ফুলে উঠছে–শুধু ঢেউ আর. শুধু চঞ্চলতা। এদিকে আর-বেশি সময় নেই, মিনিট কুড়ির মধ্যেই দস্যুরা এখানে পৌঁছে যাবে।

ফার্গুসন চেঁচিয়ে উঠলেন, আরো ঘাস দাও, জো! শিগগির! দশ মিনিটের মধ্যেই আমাদের আকাশে উঠে যাওয়া চাই!

ভিক্টরিয়ার তিন ভাগের দুই ভাগ সেই গরম হাওয়ায় ভরে গেছে; একটু-একটু করে ডিমের মতো আকার নিলে তা, তারপর তার পেট মোটা হয়ে গেলো আর অপেক্ষাকৃত রোগা হয়ে গেলো তলার দিকটা।

ফার্গুসন নির্দেশ দিলেন, আগের মতো এবারেও আমাদের দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে যেতে হবে। শক্ত করে ধোররা কিন্তু।

দশ মিনিট পরেই আকাশে ওঠবার উপক্রম করতে লাগলো বেলুন, স্বচ্ছ নীল হাওয়ায় কেঁপে উঠছে তার শরীর, আর আকাশের প্রখর নীল থেকে চুঁইয়ে পড়ছে আরো স্বচ্ছ তাপ। ট্যালিবাস দুস্যরা কেবলই শপাং-শপাং করে চাবুক চালাচ্ছে ঘোড়ার পিঠে, চোখ-কান বুজে ছুটে আসছে পুরোদমে, এখন প্রায় পঁচশো গজের মধ্যে এসে গেছে তারা।

শক্ত করে ধরো, দৃঢ় স্বরে ফার্গুসন নির্দেশ দিলেন।

পা দিয়ে তিনি শেষ ঘাসের আঁটিটা ঠেলে দিলেন আগুনের মধ্যে, আর তারপরেই গরম হাওয়ায় ভরে-ওঠা বেলুনটি এক ধাক্কায় আকাশের দিকে উঠে গেলো। আগুনের শিখারা একবার কেবল লাফিয়ে উঠলো তার নাগাল ধরার জন্যে, কিন্তু বেলুন তখন ভেসে চলে যাচ্ছে শূন্যপথে।

ট্যালিবাস দস্যুরা প্রায় পৌঁছে গিয়েছিলো। রাগি চ্যাঁচামেচির সঙ্গে এবার তাদের বন্দুকগুলিও শেষ চেষ্টায় প্রচণ্ডভাবে গর্জে উঠলো—একটা গুলি তো প্রায় জো-র কাঁধ ঘেসেই চলে গেলো, কেবল একটুর জন্যে বেঁচে গেলো সে। বেলুন ক্রমশ আটশো ফিট ওপরে উঠে গেলো দেখে দস্যুদের সে কী নিষ্ফল আক্রোশ। কোনো লাভ নেই জেনেও তারা খানিকক্ষণ বেলুন লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালালে।

জোরালো হাওয়া ভাসিয়ে নিয়ে চললো বেলুনকে, দুলতে-দুলতে জলপ্রপাতের ঠিক ওপর দিয়ে নদী পেরুতে লাগলো ভিক্টরিয়া। প্রাণপণে দড়ি ধরে ঝুলে আছেন অভিযাত্রীরা, সার্কাসের খেলোয়াড়ের মতো : হাতের শিরাগুলি ফুলে উঠেছে, আর প্রবল চাপে রক্তিম হয়ে গেছে হাত; দরদর করে ঘামছেন, উত্তেজনায় চোখগুলি চকচকে, আর ফার্গুসনের কাপালের শিরাটা ভীষণ রক্তচাপে স্পন্দিত হয়ে উঠেছে। কেউ কোনো কথা বলছেন না, কেবল প্রবল ইচ্ছার জোরে আঁটো করে দড়ি ধরে আছেন। ধীরেধীরে বেলুন সেনেগল নদীর অপর তীরে গিয়ে নামতে লাগলো।

ফার্গুসন একবার ঈশ্বরের কৃপার কথা স্মরণ করে চোখ মুদলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *