২২. বন্ড এখন প্রায় পুরো সুস্থ

বন্ড এখন প্রায় পুরো সুস্থ।

লন্ডনে রিপোর্ট পাঠানো হয়ে গেছে। ভেসপারের কিডন্যাপিংটা বিশদভাবে লিখল।

ভেসপার রোজই আসে বন্ডকে দেখতে। দুজনে অনেক গল্প করে। সে জানাল, চিফ অব পুলিশ এবং ক্যাসিনোর এক কর্তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে তার।

বন্ড মেয়েদের খুব একটা পছন্দ করত না। কিন্তু ভেসপারের আন্তরিকতা ওকে অনেকটা মুগ্ধ করেছিল। ভেসপার এক ঝলক পরিষ্কার হাওয়া, যা প্রাণবন্ত, শান্তি দেয়, জীবন জুড়ায়।

বন্ড সুস্থ হয়ে প্রথম দিন বাগানে বসার অনুমতি পেল। তারপর অল্প হাঁটাচলা শুরু করল। প্যারিস থেকে যে ডাক্তার এসেছিলেন তার চিকিৎসার জন্য, তিনি ঘোষণা করলেন–এবার বন্ড একেবারে সুস্থ!

তিন সপ্তাহ আগেই মৃত্যু এসেছিল, সেটা অবশ্য ভোলার নয়।

ভেসপার বলেছিল–আজ আমার সঙ্গে চলো।

–চলো।

কিন্তু কোন দিকে যাচ্ছে, বন্ড জানত না। বন্ড চেয়েছিল শহর থেকে কিছু দূরে যেতে।

–তাই হবে।–ভেসপার বলেছিল, কিন্তু জায়গাটা বলে নি।

ওরা যাচ্ছে সমুদ্রতীর দিয়ে। ল্য শিফের ভিলার দিকে। সেদিনের কথাগুলো মনে পড়ছিল বন্ডের।

–কী ভাবছ?

–না, কিছু না।… মনে হচ্ছিল কেউ ফলো করছে। বোধহয় তা নয়।

হঠাৎ পেছন দিকে তাকিয়ে বন্ড বলল–ওই দেখ!

চারশো গজ দূরে একটা কালো গাড়ি! ভেসপার বেশ ভয় পেয়েছে। বন্ড বলল–রাস্তাটা তো আমাদের একার নয়, যে কেউ গাড়ি চালাতে পারে। তাছাড়া, এখন আমাদের ফলো করে কার লাভ?

হঠাৎ বন্ড ড্রাইভারকে বলল–গাড়িটা রাস্তা পেরিয়ে দাঁড় করাও।

আয়না দিয়ে পেছন দিকটা দেখল বন্ড।

সাঁ করে গাড়িটা পাশ কাটিয়ে চলে গেল। শুধু সিটে বসা লোকটার মুখের একটা পাশ দেখা গেল। লোকটি অবশ্য একটি সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে ছিল। রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড।

ভেসপার বলল–লোকটা কিন্তু আমাদেরই ফলো করছিল। আমাদের দেখে নিশ্চিত হল।

–না, না, সে সব কিছু নয়।

–তাই! সত্যি আমার মনে যা ভয় ঢুকে গেছে!

ওরা এবার নির্দিষ্ট জায়গায় এসে গেল। মানে, যেখানে ভেসপার বন্ডকে আনতে চেয়েছে।

পাইনগাছের মধ্যে একটা সাদামাটা ছোটো হোটেল। দূরে সমুদ্র।

–তেমন কিছু নয়। তবে বেশ নির্জন। খাবারটা চমৎকার।

বেশ আয়েস করে খেতে খেতে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল বন্ড। অর্থাৎ, বন্ড জায়গাটাকে বেশ ভালোভাবে অন্তদৃষ্টি দিয়ে পরীক্ষা করে নিতে চায়।

বন্ডের এই মাথা ঘোরানো, আইবল মুভিং ভেসপারের দৃষ্টি এড়াল না। সে চিন্তিত হল–বন্ড কি জায়গাটাকে নিরাপদ মনে করছে না।

খাবারে একটা কামড় দিয়ে বন্ড একটা শ্বাস ছাড়ল। দেখা দিল মুখে এক হালকা প্রসন্নতা। অর্থাৎ, জায়গাটা নিরিবিলি বলেই মালুম হচ্ছে। চিন্তার সেরকম কোনো কারণ নেই।

হোটেল থেকে সমুদ্রের দূরত্ব বোধহয় হাতে গোনা। ছন্দে ছন্দে সমুদ্রলহরী সোনালি বালুকাভূমিকে সিক্ত করে রাস্তায় ওঠবার সিঁড়িকে এসেও কখনো কখনো ছুঁয়ে যাচ্ছে। আবার ফিরে যাচ্ছে আপন ছন্দে। আঃ, কী মনোরম, শান্ত স্থান। এরকম নিভৃত এক স্থানে যদি জীবনটা কেটে যেত। তাহলে পৃথিবীর নানা উপদ্রবকে কাঁধে নিয়ে তার সমাধানের বোঝা বইতে হত না।

ভাবতে ভাবতে বন্ডের মনটা যখন অন্য জগতে বিচরণশীল, তখন একটা গাড়ির শব্দে তার চমক ভাঙে।

বাড়ির মালিক মঁসিয়ে ভারসোয়া ও তার স্ত্রী।

মাদাগাস্কার যুদ্ধে একটা হাত বাদ গেছে মধ্যবয়সি এই সিয় ভারসোয়ার। সমুদ্রের ধারে এই স্বর্গীয় নিবাসটি তারই। রয়্যালের পুলিশের চিফের বন্ধু তিনি। এবং চিফের অনুরোধেই মঁসিয়ে ভারসোয়া বন্ডের সব ব্যবস্থা করে দেন। অবশ্য তার আগে ভেসপারকেও চিফ সব বলে রেখেছেন। দিন সাতেক এখানে থাকবে বন্ড। সাত দিন কেন, বন্ড ভাবে–যদি সাত সাত করে বহুদিন সে এখানে থাকতে পারত–

বন্ড হোটেলের আশেপাশে কিছুক্ষণ ঘুরতে ঘুরতে অ্যাপ্রন-পরিহিতা মাদাম ভারসোয়াকে দেখলেন। বোঝাই যাচ্ছিল–যুবতি, সুন্দরী এই মহিলা এখন রান্নায় ব্যস্ত। ভারসোয়া দম্পতি নিঃসন্তান। তাই বোধ হয় হোটেলের অতিথিদের সেবাতেই এঁরা বিশেষত মাদাম ভারসোয়া নিজেইএই দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

মাদাম ভারসোয়া বলেন–কেমন লাগছে জায়গাটা মিস্টার?

–দারুণ! এইরকম একটা জায়গায় যদি সারাটা জীবন কেটে যেত—

–তাই! তাহলে থেকে যান এখানেই।

দুজনেই হেসে ওঠে।

একটা গাছের আড়াল থেকে ভেসপার ওদের দেখে।

মাদাম ভারসোয়া এবার বন্ডদের থাকবার ঘর দেখাতে নিয়ে যায়।

বন্ড ও ভেসপারের দুটো ঘর, পাশাপাশি। মাঝখানে টয়লেট। সবকিছুই একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার।

মাদাম ভারসোয়া বলল–আজকে শুধু আপনারা দুজনেই হোটেলের গেস্ট। মঙ্গলবার আজকে। সাধারণত শুক্রবার বিকেল থেকে ভিড় জমে ওঠে। ইংরেজরা তাদের অবকাশ কাটাতে এই সময়টাতে ভিড় করে এখানে। কিন্তু কেন জানি না, এ বছর সেরকম ভিড় হচ্ছে না। তবে রয়্যালে যারা ঢোকে, বেশিরভাগই হেরে ফিরে যায়। সেটাও একটা কারণ। নইলে কিছুদিন আগে পর্যন্তও বেশ ভালোই ভিড় হত।

বন্ড বলে–ঠিক আছে, দেখি আমি আপনার হোটেলে ভিড় বাড়াতে পারি কিনা।

আবার দুজনে হেসে ওঠে। ওরা বাইরে বেরিয়ে আসে। ভেসপার বাইরে চেয়ারে বসে আছে।

বন্ড বলে–এই যে ভেসপার, তুমি এখনও এখানে বসে। আমাদের থাকবার ঘর দুটো দেখেছ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *